বাংলার কৃষ্টি কালচার সামাজিক ও রাজনৈতিক মানচিত্রে ইসলাম ও মুসলিম শাসন আমলের প্রভাব

মাহবুব রব চৌধুরী, টরেন্টো

জানা অজানা হাজারও কাহিনীতে ভরপুর ঘটনা নিয়েই ইতিহাস। এর একদিকে বিজয়, আনন্দ উচ্ছাস অপর দিকে দুঃখ বেদনা বিস্বাদের মিশ্রন। আছে নানা বাঁক আর চমৎকার সব কাহিনী। বিশ্বের প্রতিটি দেশ ও জাতিরই আছে নিজস্বতা ও স্বতন্ত্রতার কিছু দিক। এই স্বতন্ত্রতা নিয়েই অখন্ড মানব জাতী গঠন করেছে বিশ্ব জুড়ে শত খন্ডে খণ্ডিত আধুনিক জাতীরাষ্ট্র। ণ্ডষ্টি অঞ্চল, ভাষা, বর্ন আর ধর্মই যার অন্তরীণ, অভ্যন্তরীন নিয়ামক চালিকা শক্তি। সাথে যুক্ত হয় নিজস্ব স্বার্থ চিন্তার বাস্তবতা। ইতিহাসের চাকা এভাবেই ঘুরছে হাজার বছর।
নানা রঙের রঙিন এ পথ ধরেই বাংলার বুকে মুসলিম শাসনের শুরু। যা এনেছে বাংলার সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনের সর্বক্ষেত্রে স্থায়ী ভাবে ব্যাপক পরিবর্তন।
ইতিহাস, ঐতিহ্য, শিল্প, সাহিত্য, সংগীত, স্থাপত্য, রাজনীতি, অর্থনীতি, খাদ্য অভ্যাস, পোশাক পরিচ্ছদ, সমাজ, সভ্যতার প্রতিটি দিকেই বাংলায় ইসলাম ও মুসলমানের অবদান অনিস্বীকার্য। এটি বিস্ময়কর! ধ্রুব সত্য। বিশ্ব ইতিহাসের বিচিত্র ধারায় এ এক নুতন সংযোজন। জাতীয় জীবনে ইতিহাসের ণ্ডরুত্ব অপরিসীম। জাতি গঠন ও উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় নিজস্ব ইতিহাস কৃষ্টি, কালচারের প্রয়োজনীয়তাও অপরিহার্য। বাংলায় মুসলিম শাসন আমল পূর্ব এবং পর তুলনামূলক আলোচনার মাঝেই এই পরিবর্তনের ধারা ণ্ডলি সুষ্পট ভাবে দেখান সম্ভব। বোঝা সম্ভব ইতিহাসের প্রকৃত গতিধারা।
মুসলিম শাসন আমল পূর্ব বাংলা ছিল অনেক ণ্ডলি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অঞ্চলে বিভক্ত। গৌড়-নদীয়া, নবদ্বীপ, মালদহ অঞ্চল। গৌড়-গোর গোবিন্দ সিলেট অঞ্চল। বরেন্দ্র- বাংলাদেশের রাজশাহী অঞ্চল। ভাওয়াল- মুন্সীগঞ্জ, বিক্রমপুর অঞ্চল। সমতাটা- ঢাকা, ফরিদপুর, শরীয়তপুর, খুলনা, যশোর, কুষ্টিয়া, বরিশাল অঞ্চল। ভাঙা-বাঙ্গা – বর্তমান পশ্চিম বাংলার দক্ষিণ অঞ্চল। হরিকেল- চিটাগাং, কুমিল্লা অঞ্চল। হিউয়েন সাং-এর বর্ণনায় বাংলায় পুন্ড্রবর্ধন, কর্ণসুবর্ণ, সমতট তাম্রলিপ্তি ও কজঙ্গল, এই রূপ আরো কয়েকটি ছোট ছোট রাজ্যের কথা উল্লেখ আছে।
১২০৪ সালে ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ বখতিয়ার খলজির বাংলা বিজয়ের পূর্বে বাংলায় ছিল হিন্দু সেন শাসন। সামন্ত সেন থেকে লক্ষণ সেন পর্যন্ত ১০৯৫ থেকে ১২০৪ পর্যন্ত। সেনরা শত বছরের কিছু অধিক সময় বাংলা শাসন করেন। গৌড়-নদীয়া, নবদ্বীপ অঞ্চল নিয়ে ছিল তাদের রাজ্য। সেনরা সংস্কৃতিকে রাজ্ ভাষা করেন। সেনরা এসে ছিলেন কর্ণাটক থেকে ভাগ্যান্বেষণে। তারা কোন সংগঠিত সেনাশক্তি নিয়ে কর্ণাটক থেকে আসেননি। এবং কর্ণাটকের কোন সেনা শক্তি দ্বারাও পাল বংশের পতন ঘটেনি।

পাল রাজ বংশের ইতিহাস: সেন শাসন আমলের পূর্বে ১৭ জন পাল প্রায় ৪০০ শত বছর বাংলায় শাসন করেন। ধর্ম মতে এরা ছিলেন মাহিয়ানা বৌদ্ধ। গোপাল ছিলেন প্রথম পাল রাজা সম্মতি ক্রমে তিনি রাজা নিযুক্ত হন।
পাল রাজত্ব শুরুর পূর্বে প্রায় একশ’ বছর বাংলার ইতিহাস ছিল অন্ধকারাচ্ছন্ন। এই সময়কে মাৎস্য ন্যায়: কালীন সময় বলে উল্লেখ করা হয়। (matsya nyaya “fish justice”)- অর্থাৎ এই সময়টা ছিল অরাজকতার সময়।
অরাজকতাকেই “মাৎস্যন্যায়” বলে আখ্যায়িত করা হয়। তখন শক্তিশালী রাজ্ শাসন বা দন্ডধরের অভাবে চলছিল জোর যার মুল্লুক তার নীতি। বলবান দুর্বলকে গ্রাস করত। অর্থাৎ মাছ রাজত্বের মতো বড় মাছ ছোট ছোট মাছকে ভক্ষণ করত। প্রায় শত বছরের অনৈক্য, আত্মকলহ ও বহি:শত্রুর পুন:পুন: আক্রমণের ফলে বাংলার শাসনব্যবস্থা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়ে যায়। এই সময় দেশে কোন রাজা ছিলেন না। তখন নাগরিককে নিজ নিজ বাড়ি ঘর সহায় সম্পত্তি নিজেদেরকেই রক্ষা করতে হত। এই অরাজকতার অবসান ঘটাতেই জনগণ গোপালকে সম্মতির মাঝে- বাংলার সিংহাসনে বসান এইভাবেই পাল বংশের শাসনের সূচনা হয়। এবং গোপাল হন প্রথম পাল রাজা। (গোপাল ছিলেন ৭৮৩ সাল পর্যন্ত)। গোপালের পর তারা পালা ক্রমে মদনা পালা এবং গোবিন্দ পালা পর্যন্ত বাংলার রাজা হিসাবে টিকে ছিলেন।
সেন শাসনে অবস্থার খুব একটা পরিবর্তন আসেনি। সুজলা, সুফলা বাংলায় সুশাসনের অভাবে অর্থনীতিতে দুর্বলতা, সামাজিক বিশৃঙ্খলা, ধর্মীয় অসহিষ্ণতা প্রকট রূপ ধারণ করে। এবং সর্বত্র সামাজিক অরাজকতা দেখা দেয়। সেন শাসকদের কট্টর নীতির ফলে বাংলা থেকে বৌদ্ধ মেজরিটি বিলুপ্ত হয়। বৌদ্ধদের সর্বগ্রাসী সংস্ক্রতিক আগ্রাসন প্রতিরোধের অক্ষমতা বা ব্যর্থতাও এ ক্ষেত্রে দায়ী।
বৌদ্ধ মেজরিটি শাসনের মাঝে হিন্দু মাইনরিটি গৌতম বৌদ্ধকে অবতার হিসাবে মেনে নেন এবং উন্নত সংস্কৃতিক কর্মকান্ড এবং উদার মতবাদ ধর্ম যার যার উৎসব সবার নীতি প্রচার করেন। এই প্রচার কৌশল এবং দুর্বল বৌদ্ধ প্রতিরোধের সাথে সেন শাসন প্রভাবে বৌদ্ধ মেজরিটি হারিয়ে যায়। বিলুপ্তির দ্বার প্রান্তে পৌঁছে যায়।
বাংলায় এখনও মাটি খুঁড়ে পাল আমলের বৌদ্ধ মন্দির- প্যাগোডা বা সেই সময় কার বিভিন্ন ধরনের স্থাপনার নিদর্শন পাওয়া যায় কিন্তু সেন আমলের তেমন কোন বড় ধরনের নিদর্শন এখনও পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। এতে করে সেন শাসন আমল নিয়ে কিছুটা ধারনা অবশ্যিই এসে যায়।

বাংলায় সেন বংশের ইতিহাস: ১০৯৭ থেকে – ১২০৪ পর্যন্ত। দ্বিতীয় মহীপালের রাজত্বকালে বরেন্দ্র-এ ‘সামন্তচক্রের’ বিদ্রোহের সুযোগ নিয়ে সেন বংশের প্রতিষ্ঠাতা বিজয়সেন পশ্চিমবঙ্গে আধিপত্য বিস্তার করেন এবং অবশেষে মদনপালের রাজত্বকালে স্বাধীন সত্ত্বার বিকাশ ঘটান। বিজয়সেন থেকে লক্ষণ সেন পর্যন্ত ১০৭ বছর বাংলায় সেন রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত ছিল। ১২০৪ সালে ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ বখতিয়ার খলজির বাংলা বিজয়ের মাঝেই সেন রাজত্বের সমাপ্তি ঘটে। তখনকার পরিস্থিতিতে বাংলার সাধারণ মানুষ ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খলজির আগমন ও মুসলিম শাসনকে আশীর্বাদ হিসাবে সাদরে গ্রহণ করেন।
ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ বখতিয়ার খলজির বাংলা বিজয় (১২০৪ সাল): বাংলার রাজা লক্ষ্মণসেন বখতিয়ার খলজির বাংলা আক্রমনের সময় তার রাজধানী নদিয়াতেই অবস্থান করছিলেন। মনে করা হত নদিয়া বাংলার বুকে বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে সবচেয়ে সুরক্ষিত অঞ্চল। রাজধানী নদিয়ার প্রবেশপথ রাজমহল ও তেলিয়াগড় সুরক্ষিত ছিল। এবং ধারণা করা হত যে ঝাড়খণ্ডের দুর্গম শ্বাপদশংকুল অরণ্য দিয়ে কোনো সৈন্যবাহিনীর পক্ষে নদিয়া আক্রমণ করা সম্ভব নয় অভিজ্ঞ চৌকস সেনাপতি ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ বখতিয়ার খলজি নিজস্ব পরিকল্পনায় এই পথটিই বেছে নেন। এবং সেইপথেই তার সৈন্যবাহিনীকে নিয়ে আসেন। নদিয়া অভিযানকালে বখতিয়ার ঝাড়খণ্ডের মধ্য দিয়ে এত দ্রুতগতিতে এগিয়ে আসেন যা ছিল সাধারণ চিন্তার বাইরে।
তার আচমকা আগমন রাজা লক্ষ্মণসেনকে দিকভ্রান্ত করে ফেলে। বখতিয়ার খলজি দ্রুত প্রাসাদদ্বারে উপস্থিত হয়ে দ্বাররক্ষী ও প্রহরীদের হত্যা করে প্রাসাদের ভিতরে ঢুকে পড়েন । এই অবস্থায় লক্ষ্মণসেন দিণ্বিদিক হারিয়ে ফেলেন এবং প্রাসাদের পেছনের দরজা দিয়ে পূর্ব প্রস্তুত নৌকা যোগে- নৌপথে পূর্ব বাংলার ভাওয়ালের, বিক্রমপুর মুন্সীগঞ্জ অঞ্চলে আশ্রয় নেন। ১২০৪ সালই ছিল বাংলায় মুসলিম শাসন আমলের শুরু। সেই থেকে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজদ্দৌলার সঙ্গে চরম বিশ্বাস ঘাতকতার ২৩ জুন ১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধে পরাজয় পর্যন্ত সাড়ে পাঁচ শত বছর বাংলা ছিল মুসলিম শাসন আমলের সোনালী যুগ।
ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ বখতিয়ার খিলজি করেন শুরু আর বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজুদ্দৌলার সময় হল বাংলায় মুসলিম শাসন আমলের শেষ। নবাব সিরাজদ্দৌল্লাহ ছিলেন প্রচন্ড সাহসী, তেজী নির্ভিক এক দেশ প্রেমিক নবাব। তিনি বাংলার, তিনি বাংলাদেশের। তার জীবনের প্রথম শ্বাস বাংলার বুকেই নিয়েছেন এবং এই বাংলার বুকেই জীবনের শেষ নিঃশাস ত্যাগ করেছেন। তার জীবন সঞ্চয়ের প্রথম পেনি থেকে শেষ পয়সা এদেশেই রয়ে গেছে। বাংলার মাটিতেই তিনি চির নিদ্রায় শায়িত। মুর্শিদাবাদে তার কবরে আজও মানুষ ভালবাসায়- ফুল রেখে আসেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মত তার পূর্ব পুরুষও আরব থেকে এসে ছিলেন। এটি বাংগালীর পরিচিত ইতিহাসের অংশ।
১২০৪ থেকে ১৭৫৭ পর্যন্ত বাংলার প্রথম মুসলিম শাসন সাড়ে পাঁচ শত বছর ব্যাপী। এই সময় কালে বাংলার সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক সহ সর্ব ক্ষেত্রেই এসেছে আধুনিক ও উন্নয়নমুখী ব্যাপক পরিবর্তন। এই সময়কালেই ঘর মুখী বাংলা হয়েছে বিশ্ব মুখী আন্তর্জাতিক।
হজরত মুহাম্মদ (সঃ) এর জীবদ্দশাতেই সাহাবী মালিক ইবনে দিনার ২০ জন সঙ্গী নিয়ে ইসলাম প্রচারে ভারত আসেন। এবং নব দীক্ষিত রিভার্টেড মুসলিম রাজা কেরালার চেরামন পেরুমলের সঙ্গে যৌথ প্রচেষ্টায় তিনি কেরালার মেথালা থ্রিসুরে ৬২৯ সালে উপমহাদেশের সর্ব প্রথম জুমা মসজিদ প্রতিষ্ঠিত করেন। মসজিদটিতে আজও মুসল্লিরা জুম্মার নামাজ পড়েন।
The Cheramaan Perumal Juma Mosque is The mosque in Methala, Kodungallur, Thrissur in the Indian state of Kerala., it was built in 629 which makes it the oldest convert mosque in the Indian subcontinent which is still in use. *
মুসলিম ধর্ম প্রচারকদের প্রথম স্থাপনা। পরবর্তীতে বিভিন্ন ঘটনা প্রবাহে ৭১০ সালে মুহাম্মদ বিন কাসিম ভারত অভিযানে আসেন এবং রাজা দাহিরকে পরাজিত করে সিন্ধ ও মুলতান জয় করেন। এই অভিযানটি ৬২৯ সনে ভারতে চেরামান জুম্মা মসজিদ প্রতিষ্ঠার প্রায় ১০০ বছর পরের ঘটনা। অর্থাৎ ইতিমধ্যেই ভারতীয় উপমহাদেশে একটি মুসলিম জনণ্ডষ্টি সংখ্যায় অল্প হলেও মুসলিম সমাজ কমিউনিটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
বাংলাদেশে ইসলাম আগমনের সবচেয়ে প্রাচীন লিখিত তথ্য পাওয়া যায় অধ্যাপক ডক্টর হাসান জামানের সমাজ সংস্কৃতি ও সভ্যতা বইতে। তিনি লিখেছেন, “হযরত উমর (রা.) খেলাফতকালে খ্রিস্টীয় সপ্তম শতাব্দীতে কয়েকজন প্রচারক (মুমিন) মুসলমান দরবেশ বাংলাদেশে আসেন। এদের নেতা ছিলেন হযরত মামুদ ও হযরত মুহাইমিন। দ্বিতীয়বার প্রচার করতে আসেন হজরত হামেদ উদ্দিন, হযরত হোসেন উদ্দিন, হযরত মুর্তাজা, হযরত আব্দুল্লাহ ও হযরত আবু তালিব। এরকম পাঁচটি দল পর পর বাংলাদেশে আসেন।
তারা কোনো অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ঘোরাফেরা করতেন না। তারা রাজ ক্ষমতার সাহায্যও নিতেন না। তাদের প্রচার পদ্ধতির একটা উল্লেখযোগ্য বিষয় ছিল এই যে, তারা এ দেশের মানুষের কথ্য ভাষায় ধর্ম প্রচার করতেন ! ছিলেন প্রধানত গ্রাম কেন্দ্রিক। সত্যিকারের মুসলমান তৈরি করা তাদের লক্ষ্য ছিল। এরা গ্রামে বাস করতেন ধর্ম প্রচার এদের কাজ ছিল। এরপর আরও পাঁচটি দল মিশর ও পারস্য থেকে বাংলাদেশে এসেছিল। এদের বলা হতো আবিদ। এরা বিভিন্ন স্থানে খানকা বা প্রচার কেন্দ্র স্থাপন করে ধর্ম প্রচারকার্য চালিয়ে ছিলেন। বাংলাদেশ এই ভাবেই ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে মুমিন ধর্ম প্রচারকরা এসেছিলেন। বাংলাদেশের লালমনিরহাট জেলার মজদের আড়ায় ৬৯ হিজরীর যে প্রাচীন মসজিদ আবিষ্কার হয়েছে তা ওই সময়কার সমসাময়িক। এবং মসজিদ স্থাপন ছিল মুমিন ধর্ম প্রচারক মুসলিমদের কর্ম প্রচেষ্টার সুফল। এছাড়াও মুন্সীগঞ্জের আদম শহীদ (রহঃ) মসজিদ, বণ্ডড়ায় সুলতান মাহীসওয়ার রহ, নেত্রকোনার মদনপুরে সুলতান কমরুদ্দিন রুমি (রহঃ) প্রমুখ। এই সব সূত্র ধরে একাডেমিক গবেষণা চালানোর জরুরী প্রয়োজন এবং তা অবশ্যি জাতীয় স্বার্থেই জরুরী।
ঐতিহাসিক তথ্য এটিই যে ৭১০ সালে মুহাম্মদ বিন কাসিমের সিন্ধ ও মুলতান জয়ের ৪৯৪ বছর অর্থাৎ প্রায় ৫০০ বছর পর ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ বখতিয়ার খলজির বাংলা বিজয় হয় ১২০৪ সালে। বাংলায় মুসলিম শাসন আমলে বাংলা হয়েছে সোনার বাংলা। ১২০৪ সালে মুসলিম শাসন আমল শুরুর সময় অর্থাৎ আজ থেকে ৮০০ শত বছর আগে বাংলার মানুষের অর্থাৎ এ দেশের মানুষের কথ্য ভাষা, লিখিত ভাষার রূপ ঠিক আজকের মত ছিলোনা।
মুসলিম শাসন আমলে রাজভাষা ফার্সি হলেও এই সময় মুসলিম শাসকেরা সাধারনের ভাষা বাংলার উন্নয়নে সত্যিকার অবদান রেখেছেন। সাড়ে পাঁচ শত বছরের মুসলিম শাসন আমলের ইতিহাস তার সাক্ষী। এই সময়কালে প্রয়োজনীয় সর্ব ক্ষেত্রে হয়েছে উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন। শিল্প, সাহিত্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য সব দিকেই। এখানে একটি বিষয় উল্লেখ করতেই হয় তাহল অনেকেরই মনে প্রশ্ন জাগে তাজ মহল, কুতুব মিনার, চার মিনার, লালবাগ কেল্লার মত বাংলার বুকে মুসলিম শাসন আমলের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের বৃহৎ স্থাপনার কাঠামো কেন দেখা যায় না?
মুসলিম শাসন আমলে বেকার হার ছিল সহনীয় পর্যায়ের। অতশত, তত মানুষ বেকার ছিলোনা। তাই বেকার ভাতার প্রয়োজনও ছিলোনা। তখনকার গরিব দুস্থরা সরকারি এবং বেসরকারি ব্যক্তি খাতে অনুদান পেতেন। শিক্ষা ও স্বাস্ব্য ব্যবস্থা মূলত ছিল প্রাইভেট। সমাজ ছিল পেশা ভিত্তিক। কৃষক এর ছেলে কৃষক, হেকিম ও কবি রাজের পেশা নিজ পরিবারে, শিল্পী, স্বর্ণকার, কর্মকার, কুমার, কামার, জোলা, জেলে মূলত ছিল পরিবার ভিত্তিক। শিক্ষাও ছিল পারিবারিক। মসজিদ, মক্তব, মাদ্রাসা ছিল ধর্ম ভিত্তিক।
দিল্লির সম্রাট বাদশা আলমগীর এর ছেলে এবং নবাব সিরাজদ্দৌল্লাহ গৃহ শিক্ষক থেকেই বিদ্যা শিক্ষা অর্জন করেছেন। প্রয়োজন হলে শিক্ষা অর্জন করতে সুদূর চীনে যাও হজরত মোহাম্মদ (সঃ) এর মূল্যবান বাণী। মুসলিম শাসকরা জানতেন। তারপরও বলা যায় আধুনিক শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সিস্টেম বর্তমানের মত ৮০০ শত বছর আগে বাংলায় মুসলিম শাসন আমলে ডেভলপ করেনি।
বাংলার ইতিহাসে যুগান্তকরি সুলতান শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ: সুলতান শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ ছিলেন ইলিয়াস শাহী বংশের প্রতিষ্ঠাতা। তিনি ১৩৫০ সালের ২৭ নভেম্বর নেপাল অভিমুখে এক দুঃসাহসিক অভিযান পরিচালনা করেন এবং নেপাল দখল করেন। নেপাল রাজ বংশাবলির ইতিহাসে সুলতান শামসুদ্দীনের নেপাল আক্রমণের কথা উল্লেখ আছে। তিনি বাংলার রাজধানী লক্ষণাবতী (গৌড়) থেকে পান্ডুয়ায় সরিয়ে নেন। পান্ডুয়ার অবস্থান গৌড়ের ৩২ কিলোমিটার উত্তরে। পশ্চিমবঙ্গের মালদা জেলায়। তিনিই প্রথম বাংলাকে একীভূত করেন। এবং বাংলাহ নাম দেন। এবং দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর সময়ে এই অঞ্চল বাঙালাহ হিসাবে অভিহিত হয় এবং এখানকার অধিবাসীরা বাঙালী হিসাবে পরিচিত হন। এই বাঙালী পরিচিতি ভাষার পরিচিতি ছিল না, ছিল স্থানের পরিচিতি। এখানে বসবাসকারী বাঙলাভাষী বা অ-বাঙলাভাষী সবাই বাঙালী হিসাবে অভিহিত হন। রাজ কাজ ফার্সিতে হলেও স্থানীয় ভাষার উন্নয়নে তিনি যত্নবান ছিলেন।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ -সোনালী অতীতের ইতিহাস: আমাদের স্বাধীনতার ৫৪১ বছর পূর্বে ১৪৩০ সনে বাংলাদেশ- তথা তৎকালীন মুসলিম সুলতানি সুবে বাংলা সম্পূর্ণ নিজ শক্তি, সামর্থ ও উদ্যোগে বার্মিজ মগ দখলদার বাহিনীকে আরাকান থেকে বিতাড়িত করে। এবং আরাকানের স্বাধীনতা পুনঃ উদ্ধারে সেদিন আরাকানি মুক্তিকামী জনতা ও মুক্তি যোদ্ধাদের পাশে বাংলাদেশ সত্যিকার বন্ধুর মত এগিয়ে গিয়েছিলো। এটি বাংলা ও বাংলাদেশের ইতিহাসের স্বর্ণ উজ্বল অধ্যায়। বাংলা ও বাঙালির গর্ব ও গৌরবের এ ইতিহাস আজ মেঘে ঢাকা সূর্যের মত লুকান। এ ইতিহাসই সাক্ষী শুধু নেবার নয় আমাদের দেবার কাহিনীও আছে। প্রয়োজন আজ এ ইতিহাস গর্বের সাথে নুতন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা।
আরাকানে লেমরু শাসনের তৃতীয় পর্বের শেষ রাজা – মিন স মন বা নরমিখলা কে- বার্মার, আভা রাজা মিন খং ১৪০৬ সালে যুদ্ধে পরাজিত করে আরাকান থেকে বিতাড়িত করেন। শুরু হয় আরাকানে বার্মার (আভা মগ বর্মীদের) ২৪ বছরের দখল দারি শাসন, শোষণ ও নির্যাতন নিপীড়ন।
সেদিনের সুবে বাংলা আজকের বাংলাদেশে। রাজধানী সোনার গাঁ। তখন বাংলার সুলতান ছিলেন গিয়াস উদ্দিন আজম শাহ। রাজা নরমিখলা- মিন স মন, বাংলার সুলতান গিয়াস উদ্দিন আজম শাহ এর দরবারে স্ব পরিবারে রাজনৈতিক আশ্রয় নেন। ২৪ টি বছর তখন তিনি বাংলাদেশেই ছিলেন। এই সময় কালে তিনি বাংলা কালচার, মুসলিম ঐতিহ্য, তাহজীব তমুদ্দুমনের প্রতি গভীর ভাবে আকৃষ্ট হন। ১৪৩০ সনে বাংলার সুলতান ও জনগণের সহযোগিতায় যুদ্ধ শেষে বিজয়ী বেশে দেশে ফিরে বাকি জীবন আরাকানে তিনি মুসলিম অতিথী পরনায়তার প্রসংশায় পঞ্চমুখ ছিলেন।
তার আমল থেকেই আরাকান রাজ্ সভায় বাংলা সাহিত্য চর্চার মূল মঞ্চ তৈরী হয়। শুরু হয় আরাকান রাজ্ সভায় বাংলা সাহিত্যের চর্চা।
আরাকান পুনঃ উদ্ধার এবং মগ আগ্রাসন উৎখাতে সুলতান গিয়াস উদ্দিন আজম শাহ প্রতিজ্ঞা করেন ২৪ বছর শেষে তার মৃত্যুর পর পর সুলতান মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন শাহ এটি পূরণ করেন। আরাকান অভিযানে সুলতান মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন শাহ বাংলার ২০ হাজার চৌকষ সেনা প্রেরণ করেন। ১৪০৬ সনে আরাকান রাজা নরমিখলা যখন বাংলার রাজধানী সোনার গাঁ আসেন তখন বাংলার সুলতান ছিলেন- সুলতান গিয়াস উদ্দিন আজম শাহ। তার মৃত্যুর পর ১৪৩০ সনে বাংলার সুলতান ছিলেন, সুলতান মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন শাহ এবং তার আমলেই আরাকান পুনঃ উদ্ধার হয় এবং নরমিখলা আবার আরাকান ফিরে যেতে সক্ষম হন। এ ইতিহাস আরাকানের সাথে বাংলাদেশের জন্যও গর্ব ও গৌরবের এটি অবশ্যই স্মরণে রাখতে হবে।
মাহবুবুর রব চৌধুরী, টরোন্ট
(লেখক পরিচিতি : ইতিহাস গবেষক, রাজনীতি বিশ্লেষক)