দুই প্রেমিকাকে ‘উপহার’ দেন লিজিং কোম্পানি

রিলায়েন্স ফাইন্যান্স ও এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রশান্ত কুমার (পিকে) হালদার তার দুই প্রেমিকা নাহিদা রুনাই ও অবন্তিকা বড়ালকে দুটি লিজিং প্রতিষ্ঠান ‘উপহার’ দিয়েছিলেন। এ দুটিসহ প্রায় ৩০টি প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণের নামে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা লুট করে পিকে হালদার চক্র। ওই দুই নারীকে নিয়ে পিকে হালদার প্রায় ২৫ বার বিদেশ ভ্রমণও করেন। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানে এসব তথ্য বেরিয়ে এসেছে। পিকে হালদার ও তার সহযোগীদের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ অনুসন্ধানের দায়িত্বে রয়েছেন দুদকের উপপরিচালক মো. গুলশান আনোয়ার প্রধান।

এদিকে ১০টি ভুয়া প্রতিষ্ঠানের নামে প্রায় ৮০০ কোটি টাকা ঋণ দেখিয়ে আত্মসাৎ ও পাচারের অভিযোগে বিদেশে পালিয়ে থাকা পিকে হালদারসহ ৩৭ জনের বিরুদ্ধে ১০টি মামলার অনুমোদন দিয়েছে দুদক। আজ রবিবার এসব মামলা করা হবে। দুদকের উপপরিচালক গুলশান আনোয়ার প্রধান মামলাগুলো করবেন। পিকে হালদারের ৩৩ জন সহযোগীর সম্পদ অর্জনের বিষয়েও অনুসন্ধানে নামছে দুদক। গতকাল শনিবার এদের নামে সম্পদ বিবরণী দাখিলের নোটিশ জারির অনুমোদন দিয়েছে কমিশন। পিকে হালদারের ৪৫ জন সহযোগী যেন দেশ ছাড়তে না পারে সে জন্য ইমিগ্রেশন পুলিশকে চিঠি দেওয়া হয়েছে।

দুদকের অনুসন্ধানী তথ্য বলছে, লিজিং প্রতিষ্ঠান দুটি লুটের পেছনে পিকে হালদারের উচ্চাভিলাষ ছাড়াও ত্রিভুজ প্রেমও দায়ী। দুই প্রেমিকাকে প্রতিষ্ঠিত করতেই তাদের ওই দুই কোম্পানিতে বসান পিকে হালদার। এর মধ্যে রুনাইকে পরোক্ষভাবে ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের কর্ণধার বানান আর পিপলস লিজিংয়ের শেয়ার কিনে অবন্তিকাকে এটির কর্ণধার করেন। জনশ্রুতি আছে, প্রেমিকাদের খুশি রাখতে প্রতিষ্ঠান দুটি তাদের ‘উপহার’ দেন পিকে হালদার।

রিলায়েন্স ফাইন্যান্সে এমডি থাকাকালে পিকে হালদার প্রথমে প্রেমের ফাঁদে ফেলেন নাহিদা রুনাইকে। রুনাই তখন কেবল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে লেখাপড়া শেষ করে রিলায়েন্সে ট্রেইনি অফিসার হিসেবে যোগ দিয়েছেন। একেবারে নতুন অফিসার হয়েও সরাসরি এমডির সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলেন। অন্যদিকে পিকে হালদারের কাছের আত্মীয় অবন্তিকা রিলায়েন্সে প্রথমে টেলিফোন অপারেটরের চাকরি নেন। তিনিও এক সময় পিকে হালদারের সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলেন। এর পর গোপনে দুই তরুণীর সঙ্গেই সম্পর্ক চলতে থাকে পিকে হালদারের। ২০১৩-১৪ সালে গোপনে ঢাকার বিভিন্ন ক্লাবে তাদের নিয়ে যাতায়াত শুরু করেন। রুনাইকে নিয়ে সিঙ্গাপুর ও মালেয়শিয়া এবং অবন্তিকাকে নিয়ে থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুরে যেতে শুরু করেন। এক সপ্তাহে রুনাইকে নিয়ে গেলে পরের সপ্তাহে অবন্তিকাকে বিদেশে নিয়ে যেতেন। ত্রিভুজ প্রেমের বিষয়টি প্রথমে দুই তরুণীর কেউই জানতেন না। ঢাকার একটি ক্লাবের মিটিংয়ে এ তথ্য ফাঁস হয়ে গেলে পিকে হালদারকে নিয়ে তাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা শুরু হয়। রুনাই ও অবন্তিকাকে নিয়ে পিকে হালদার গোপনে ২২ থেকে ২৫ বার মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুর গেছেন বলে উজ্জ্বল কুমার নন্দীর আদালতের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছেন।

তথ্যমতে, ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের এমডি হিসেবে যোগ দেন রাশেদুল হক এবং নাহিদা রুনাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদ হেড অব বিজনেস হিসেবে যোগ দেন। তবে প্রতিষ্ঠানটি চলত পিকে হালদারের নিদের্শ মতো। সোহাগ ও রাফসান রিয়াদ নামে দুজন পিকে হালদারের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় রেকর্ডপত্র নিয়ে এসে রুনাইকে দিতেন। এর পর রুনাইয়ের নির্দেশ মতো ঋণের ক্রেডিট মেমো প্রস্তুত করা হতো এবং বোর্ডে অনুমোদন হতো। ঋণ বিতরণও পিকে হালদারের নির্দেশ মতো হতো। সব মনিটরিং করতেন রুনাই। এভাবে ২০১৫-২০১৭ সাল পর্যন্ত ইন্টারন্যাশনাল লিজিং থেকে প্রায় দুই হাজার ৪০০ কোটি টাকা লুট করা হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং থেকে প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা লুট করা হয়েছে। একই কায়দায় আরও প্রায় ৩০টি প্রতিষ্ঠানÑ এফএএস ফাইন্যান্স, রিলায়েন্স ফাইন্যান্স এবং পিপলস লিজিং থেকে আরও প্রায় সাড়ে ৭ হাজার কোটি টাকা ঋণের নামে উত্তোলন করে আত্মসাৎ করা হয়। এর মধ্যে এফএএস ফাইন্যান্স থেকে প্রায় ২২০০ কোটি টাকা, রিলায়েন্স থেকে ২৫০০ কোটি টাকা, পিপলস লিজিং থেকে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ নিয়ে আত্মসাৎ ও পাচার করা হয়। এ ছাড়া আলিফ অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট থেকে ২ কোটি ৬৫ লাখ টাকা, ফাস ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্ট থেকে ৩৩ কোটি ৩৯ লাখ টাকা, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং সিকিউরিটিজ থেকে ২০৬ কোটি ৬৬ লাখ টাকা, পিএফআই সিকিউরিটিজ থেকে ৭৭ কোটি টাকা, প্রাইম ফাইন্যান্স ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্ট থেকে ৪ কোটি টাকা এবং সিগমা ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্ট থেকে সাড়ে ৩৫ কোটি টাকা ঋণের নামে লুট করা হয়।

দুদকের অনুসন্ধানী তথ্য বলছে, পিকে হালদার একাই ১০ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ ও পাচার করেছেন বিষয়টি এমন নয়। তিনি সিঙ্গাপুর, ভারত ও কানাডায় পাচার করেন ৪০০ কোটি টাকার বেশি। কানাডার টরেন্টোতে মার্কেট ও বিলাসবহুল বাড়ি কিনেছেন। বাকি অর্থ তার সহযোগীরা নিয়েছেন।

দুদকের জনসংযোগ শাখা জানায়, ২০১৯ সালের ৮ জানুয়ারি পিকে হালদারের বিরুদ্ধে ২৭৫ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন ও অর্থপাচারের অভিযোগে মামলা করে দুদক। মামলাটির তদন্ত করছেন দুদকের উপপরিচালক মো. সালাউদ্দিন। মামলার তদন্তকালে পিকে হালদারের সহযোগী অবন্তিকা বড়াল ও শংখ ব্যাপারীকে গ্রেপ্তার করে দুদক।উৎসঃ   আমাদের সময়