যুক্তরাষ্ট্রে ১০ লক্ষাধিক বাংলাদেশির মধ্যে ভোটারের যোগ্য ৬ লাখ ১৭ হাজার

সরকারি হিসাব অনুযায়ী গত বছর পর্যন্ত ভোটার হবার যোগ্যতা অর্জনকারী বাংলাদেশি-আমেরিকানের সংখ্যা ৬ লাখ ১৭ হাজার ২৪৩ জন। এর বড় একটি অংশের বসবাস নিউইয়র্ক, ক্যালিফোর্নিয়া, মিশিগান, নিউজার্সি, ফ্লোরিডা, জর্জিয়া এবং পেনসিলভেনিয়া স্টেটে। এ অবস্থায়ও আজ অবধি (মিশিগানে এক টার্মের জন্যে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত হ্যানসেন ক্লার্ক ছাড়া) কোনো বাংলাদেশি কংগ্রেসে জয়ী হতে পারেননি। নিউইয়র্কের মতো বড় একটি সিটির কাউন্সিলম্যান হবার গৌরবও অর্জন করতে পারেননি কেউই। এর অন্তরায় হিসেবে বলা হচ্ছে অনৈক্যকে।

ঐক্যবদ্ধ শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হলেই নিউইয়র্ক সিটির কাউন্সিলম্যানই শুধু নয়, স্টেট সিনেট কিংবা কংগ্রেসের একাধিক আসন দখলে নেওয়া সম্ভব বলে বিদগ্ধজনেরা মনে করছেন।

প্রসঙ্গত, বলা যেতে পারে, জর্জিয়া স্টেটের সিনেটর হিসেবে জয়ী হয়েছেন বাংলাদেশি আমেরিকান শেখ রহমান  (ডেমক্র্যাট)। তার নির্বাচনী এলাকায় বাংলাদেশির সংখ্যা হাতেগোনা। তবে তিনি অন্যসব ধর্ম-বর্ণ-জাতির মানুষের প্রিয় ব্যক্তিত্বে পরিণত হওয়ায় বিজয় ছিনিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে।

 

আরেকজন রয়েছেন নিউ হ্যামশায়ার স্টেট রিপ্রেজেনটেটিভ হিসেবে। আবুল খান নামক সেই রাজনীতিক রিপাবলিকান পার্টির সঙ্গে রয়েছেন। স্টেট ডিপার্টমেন্ট, ইউএস সিআইএস, হোমল্যান্ড সিকিউরিটি ডিপার্টমেন্টের তথ্য অনুযায়ী গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে বৈধভাবে বসবাসকারী বাংলাদেশির সংখ্যা ১০ লাখ ৪২ হাজার ৭১০ জন।

যুক্তরাষ্ট্র সেনসাসের পদস্থ কর্মকর্তা হিসেবে সম্প্রতি অবসরগ্রহণকারী মুক্তিযোদ্ধা ড. খন্দকার মনসুর ফেডারেল প্রশাসনের তথ্য-উপাত্তের ওপর অনুসন্ধানী দৃষ্টির মধ্য দিয়ে সর্বশেষ তথ্য সংগ্রহ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশিদের সংখ্যার ব্যাপারে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী স্বাধীনতার পর থেকে গত বছর পর্যন্ত ইমিগ্র্যান্ট ভিসায় (ডিভি লটারি, পারিবারিক কোটা, বিশেষ ক্যাটাগরি, বিনিয়োগ, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ভিসা ইত্যাদি) যুক্তরাষ্ট্রে এসেছেন ৩ লাখ ৫৮ হাজার ৪৫২ জন বাংলাদেশি। এ ছাড়া আরও ৭ লাখ ১৮ হাজার ২৬৬ জন এসেছেন ট্যুরিস্ট, ছাত্র, ব্যবসা, চিকিৎসা ইত্যাদি নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসায়। মেক্সিকো অথবা কানাডা সীমান্ত পথে আরো এসেছেন লাখ খানেক বাংলাদেশি। এর মধ্যে অনেকেই অ্যাসাইলামের পথ ধরে সিটিজেনশিপ পেয়েছেন। এ ছাড়া, নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসায় আগতদের বড় একটি অংশও পরবর্তীতে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে স্থায়ীভাবে বসবাসের অনুমতি লাভের পথ বেয়ে সিটিজেনশিপ গ্রহণ করেছেন। এর মধ্য থেকে গত বছর পর্যন্ত সিটিজেনশিপ গ্রহণকারীর সংখ্যা হলো দুই লাখ ৬৪ হাজার ৫৯৮।

অপরদিকে, সীমান্ত অতিক্রম করে আসাদের মধ্যে যারা অ্যাসাইলাম পাননি কিংবা নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসায় আসার পর যারা অবৈধ অভিবাসীর তালিকায় পরিণত হয়েছেন-তাদের সংখ্যা বাড়তে বাড়তে গত বছর পর্যন্ত ৪ লাখ ৩০ হাজার ৯৬০ এ দাঁড়িয়েছে। ফেডারেল, স্টেট, সিটি প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী এ সংখ্যা নিরূপিত হয়েছে। বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত আমেরিকানের সংখ্যা হচ্ছে ৪ লাখ ৫২ হাজার ৬৪৫। তাদেরও বড় একটি অংশের বয়স ১৮ বছরের অধিক অর্থাৎ তারাও ভোটার হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছেন।

সেনসাস ব্যুরোর সাবেক এই কর্মকর্তা এবং বঙ্গবন্ধু ফাউন্ডেশনের যুক্তরাষ্ট্র শাখার সভাপতি ড. খন্দকার মনসুরের পর্যালোচনা অনুযায়ী ডিভি লটারি থেকে প্রচলিত রীতি অনুযায়ী বাংলাদেশ অপসারিত হলেও পারিবারিক কোটায় প্রতি বছরই বিপুলসংখ্যক মানুষ আসছেন গ্রীণকার্ড নিয়ে। অনেক যুবক-যুবতি বাংলাদেশে গিয়ে পরিচিতজনকে বিয়ে করছেন। তারাও স্বল্পতম সময়ে গ্রিনকার্ড নিয়েই যুক্তরাষ্ট্রে আসছেন। অর্থাৎ বিদ্যমান রীতি বহাল থাকলে দিনদিনই আমেরিকায় বাংলাদেশির সংখ্যা বাড়বে।

ড. মনসুর উল্লেখ করেন, সংখ্যাবৃদ্ধির সঙ্গে সংগতি রেখে জাতিগতভাবে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়া জরুরি। মার্কিন প্রশাসনের অংশ হতে না পারলে সত্যিকার অর্থে আমেরিকান স্বপ্ন পূরণের ধারেকাছেও যাওয়া সম্ভব হবে না।

ফেডারেল তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশি গ্রীণকার্ড নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে এসেছেন ২০১৬ সালে। সে সংখ্যা ছিল ১৮৭২৩। এবং একই বছরে সিটিজেন হিসেবে শপথ গ্রহণ করেছেন ৯৯৪৯ জন। ২০১৩ সালে শপথ নেন ৯৫৭১ জন। নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসায় যুক্তরাষ্ট্রে এসেছেন সবচেয়ে বেশি ২০১৮ সালে-৪৫৩৫১ জন। গত দশকে সীমান্ত রক্ষীদের দৃষ্টির আড়ালে মেক্সিকো হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের সময় ধরা পড়েন সবচেয়ে বেশি গত বছর-৯৩৪৩ জন। ২০১৫ সালে সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশিকে গুরুতর অপরাধে লিপ্ত থাকার দায়ে অথবা শাস্তি ভোগের পর যুক্তরাষ্ট্র থেকে বহিষ্কার করা হয়। সে সংখ্যা-২১৩। এর মধ্যে অবশ্য বেআইনি পথে সীমান্ত অতিক্রমের সময়ে ধরা পড়ার পর বিশেষ ফ্লাইটে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়াদের তথ্য নেই।

প্রবাসীদের মধ্যে নানাবিধ কারণে অনৈক্যের একটি তথ্য দৃশ্যমান হয়েছে নিউইয়র্ক সিটি কাউন্সিলে এক আসনে ৬ বাংলাদেশির প্রার্থীতা ঘোষণার মধ্য দিয়ে। সিটিতে বর্তমানে সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশির বসতি গড়ে উঠেছে জ্যামাইকা-কুইন্স ভিলেজে। সে এলাকার একটি আসনে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ান ভোটারের হার ১১%। বাংলাদেশি আমেরিকান রেজিস্টার্ড ভোটার হচ্ছেন ৫%। অপরদিকে শ্বেতাঙ্গ ভোটারের হার ৫০% এর বেশি। এই নির্বাচনী এলাকায় ১৩ অক্টোবর পর্যন্ত প্রার্থী হিসেবে ৮ জনের মধ্যে চারজনই বাংলাদেশি। তারা হলেন ড.দীলিপ নাথ, এটর্নী সোমা সাঈদ, মৌমিতা আহমেদ এবং মো. সাবুল উদ্দিন। আরও দু’জনের নাম ভোটের ময়দানে শোনা যাচ্ছে। তারা হলেন, বাংলাদেশ সোসাইটির সাবেক সেক্রেটারি এবং ডেমক্র্যাটিক পার্টির তৃণমূলের সংগঠক ফখরুল আলম এবং স্থানীয় কমিউনিটি বোর্ড মেম্বার ফখরুল ইসলাম দেলোয়ার। এটি হচ্ছে নিউইয়র্ক সিটি কাউন্সিল ডিস্ট্রিক্ট-২৪।

জ্যামাইকা, কিউ গার্ডেন্স হিল, ফ্রেশ মোডোজ, ব্রায়ারউড-সহ কয়েকটি এলাকা নিয়ে গঠিত এই আসনে ২০১৪ সাল থেকে কাউন্সিলম্যান হলেন ররি ল্যাঙ্কম্যান। টার্ম সীমিত করার কারণে পুনরায় লড়তে পারবেন না। তবে এরই মধ্যে তার ডাক পড়েছে স্টেট গভর্নর অ্যান্ড্রু ক্যুমোর পক্ষ থেকে। গভর্নরের বিশেষ পছন্দের লোক হিসেবে তাকে গুরুত্বপূর্ণ একটি জায়গায় অধিষ্ঠিত করা হবে বলে শোনা যাচ্ছে। এ জন্য তিনি তার পদত্যাগপত্র ইতোমধ্যেই সাবমিট করেছেন, যদিও এখন পর্যন্ত তা গ্রহণের তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি। সেটি শিগগিরই প্রকাশ করা হলে সামনের বছরের জুনে দলীয় প্রার্থী বাছাইয়ের নির্বাচনে অবতীর্ণ হবার আগেই শূন্য পদে বিশেষ নির্বাচনের জন্যও প্রস্তুত হতে হবে সম্ভাব্য প্রার্থীদের। অর্থাৎ খুবই জটিল একটি পরিক্রমা পাড়ি দিতে হবে মূল নির্বাচনে বিজয় পেতে। স্মরণ করা যেতে পারে, সর্বশেষ দলীয় প্রাইমারিতে জুইশ সম্প্রদায়ের সন্তান ররির সঙ্গে লড়েন তৈয়বুর রহমান হারুন। সেখানে জয় না পেয়ে মূল নির্বাচনে অবতীর্ণ হয়েছিলেন রিফর্ম পার্টি থেকে। ভোট পান ১১.০৪%। অপরদিকে ররি পান ৮৮.০৪% ভোট। সেই প্রাইমারিতে বাংলাদেশি হিসেবে একাই ছিলেন হারুন। তবুও ভোট পান মাত্র গৃহীত ভোটের ৩৬.৮৪%। অপরদিকে ররি পেয়েছেন  ৬২.৬০%। অর্থাৎ একমাত্র প্রার্থী হয়েও সব বাংলাদেশি তথা দক্ষিণ এশিয়ানদের সমর্থন লাভে সক্ষম হননি। সেই স্থানে সামনের নির্বাচনের জন্যে মাঠে ইতোমধ্যেই ৬ বাংলাদেশির নাম এসেছে। শোনা যাচ্ছে, জুইশ হিসেবে ররি পুনরায় আরেকজন জুইশের কাছেই আসনটি ন্যাস্ত করতে চান। এ অবস্থায় বাংলাদেশিরা যদি সত্যিকার অর্থেই মূলধারায় আরোহনের সিঁড়ি হিসেবে এই আসনকে বেছে নিতে চান তাহলে নিজেদের মধ্যে ঐক্য রচনা করতে হবে। কমিউনিটির বৃহত্তর স্বার্থে আঞ্চলিকতার মনোভাব পরিহার করতে হবে। এটি তেমন কঠিন কাজ নয়। অতীতের কর্মকাণ্ডের আলোকে এলাকার বিশিষ্টজনেরা ঐক্যের এ উদ্যোগ নিতে পারেন বলে মনে করা হচ্ছে। গত নির্বাচনে তৈয়বুর রহমান হারুনকে পরাজিত করার ক্ষেত্রে যারা কলকাঠি নেড়েছেন তাদেরকে সম্পৃক্ত রাখতে হবে ঐক্য প্রক্রিয়ায়। আর এটি হচ্ছে সময়ের দাবি।

সামনের বছরের সিটি কাউন্সিল নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন লাভের দৌড়ে ব্রঙ্কসের কাউন্সিল ডিস্ট্রিক্ট-১৮ থেকে মোহাম্মদ এন মজুমদার এবং কুইন্সের ওজনপার্ক এলাকার ৩৭ ডিস্ট্রিক্ট থেকে মিসবা আবদীন অবতীর্ণ হয়েছেন। বোর্ড অব ইলেকশনে তারা নাম লিপিবদ্ধ করেছেন ডেমক্র্যাট প্রার্থী হিসেবে। ব্রুকলীনের চার্চ-ম্যাকডোনাল্ড থেকে দু’জনের কথা শোনা গেলেও ১৩ অক্টোবর পর্যন্ত ওই তালিকায় তারা ছিলেন না। এন মজুমদার ও মিসবা আবদীন বহুদিন থেকেই মূলধারায় জড়িত থেকে নানাবিধ কর্মকাণ্ড চালাচ্ছেন। জ্যামাইকার ফখরুল আলম, সাবুল উদ্দিন, ফখরুল ইসলাম দেলোয়ার এবং সোমা সাঈদের ভূমিকা সম্পর্কে সকলেই অবহিত। অপর প্রার্থীরাও মাঠে এসেছেন। তারা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রচারণা শুরুর আগেই ঐক্যবদ্ধ হবেন বলে মনে করা হচ্ছে।

লাবলু আনসার, যুক্তরাষ্ট্র

এমন আরো সংবাদ

একটি উত্তর দিন

দয়া করে আপনার মন্তব্য লিখুন !
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন

সর্বশেষ সংবাদ