তিস্তা মহাপরিকল্পনা বর্ধিত কলেবরে বাস্তবায়ন করুনঃ আইএফসি

দশকের পর দশক স্বাভাবিক প্রবাহ থেকে বঞ্চিত বাংলাদেশে তিস্তা নদী পলিমাটি জমে মরে গেছে। শুস্ক মৌসূমে পানির প্রবাহ সরিয়ে নেয়ায় বিশাল এ নদী শুকিয়ে যায়। পানির প্রবাহ না থাকায় পরিবেশ ও মানুষের জীবনযাত্রার মারাত্মক ক্ষতি হয়। ক্ষরাপ্রবন বাংলাদেশের তিস্তা অববাহকায় ক্ষরা মারাত্মক আকার ধারণ করে। মানুষ পায়ে হেঁটে নদীর এপার ওপার যাতায়াত করতে পারে। বর্ষায় নদীর সম্পূর্ণ প্রবাহ ভারতের গজল ডোবা ব্যারেজের স্লুইস গে্ট দিয়ে ছেড়ে দেয়া হয়। নাব্যতা না থাকায় তিস্তা এই অতিরিক্ত পানি প্রবাহ বহন করতে পারেনা। ফলে বাংলাদেশে প্রতিবছর মারাত্মক প্লাবন ও নদীর পাড় ভাঙ্গনের তান্ডব সৃষ্টি হয়। এবছরের চারদফা বন্যায় তিস্তা নদীর দুইপাড়ের মানুষ সর্বশান্ত হয়েছে।

পানি প্রাপ্তির আশ্বাস অব্যাহত আছে, কিন্তু পানি আসছেনা। অপরদিকে উজানে পানির গতিপথ পরিবর্তন করে গংগা নদীতে ফেলা হয়েছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে যত দিন যাচ্ছে তত পানি প্রাপ্তির সম্ভাবনা ক্ষীণতর হচ্ছে। এই প্রেক্ষিতে তিস্তা বেসিনে প্রতিবছর অতিবন্যা ও ভাঙ্গনে বাংলাদেশের উত্তরপশ্চিমাঞ্চলের মানুষের যে বিপুল ক্ষয়ক্ষতি হয় তা মোকাবেলা করার পাশাপাশি এ অঞ্চলের সার্বিক উন্নয়নের একটা মহাপরিকল্পনার ছক তৈরী করেছে গনচীনের পাওয়ার চায়না কোম্পানী। প্রায় ৮০০০ কোটি টাকার এই পরিকল্পনায় নিলফামারির ডালিয়ায় নির্মিত তিস্তা ব্যারেজ থেকে মহিপুর ও কাউনিয়া হয়ে তিস্তার মোহনা পর্যন্ত ১০২ কিলোমিটার এলাকার টেকসই উন্নয়নের কথা বলা হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে প্রকাশ এই মহাপরিকল্পনা ঋনের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করার প্রস্তাব করে হয়েছে।

ড্রেজিং-এর মাধ্যমে নদীর নাব্যতা বৃদ্ধির পাশাপাশি ১৭০ বর্গকিলোমিটার জমি উদ্ধার এবং নদীর মূল স্রোত ষ্টেবিলাইজ করে উত্তরপশ্চিমাঞ্চলে তিস্তার উভয় তীরে স্যাটেলাইট টাউন নির্মানের কথা বলা হয়েছে। সাথে থাকবে উচ্চ আয়ের শিল্প এবং কৃষি উন্নয়নের ব্যবস্থা। সোলার পার্ক, স্কুল, হেলথ কমপ্লেক্স, মসজিদ, এবং সাধারণের ব্যবহার্য সুযোগ সুবিধা। নদীর দুই তীরে তৈরী বাঁধ এবং তার সাথে সংযুক্ত সড়ক পথে যান চলাচল এবং নদীতে নৌযানের ব্যবস্থা এই অঞ্চলের উন্নয়ন ত্বরান্বিত করবে।

জরীপ করে নদীর বাম তীরে ২৭টি গ্রোয়েন, ক্রসবার ও ৪৬ কিলোমিটার লেভি এবং ডান তীরে ২৩টি গ্রোয়েন, ক্রসবার ও ৭৮ কিলোমিটার লেভি নির্মানের মাধ্যমে মাঝখানে মূলস্রোত সৃষ্টির পরিকল্পনা করা হয়েছে। মূল স্রোত উপরের অংশে ৭০০ মিটার এবং নিম্নাংশে এক কিলোমিটার প্রশস্ত হবে। খননের ফলে নদীর পানি পরিবহন ক্ষমতা বেড়ে যাবে। বন্যা নিয়ন্ত্রনের জন্য ইতোপূর্বে নির্মিত লেভিগুলোর সংস্কার করা হবে। তিস্তার ১০২ কিলোমিটার এলাকাকে তিনটি অংশে উন্নয়নের কথা বলে হয়েছে। তিস্তা ব্যারেজ থেকে মহিপুর ব্রিজ পর্যন্ত ৩৯ কিলোমিটার, মহিপুর ব্রিজ থেকে কাউনিয়া ব্রিজ পর্যন্ত ২৪ কিলোমিটার মধ্যবর্তী অংশ এবং কাউনিয়া ব্রিজ থেকে ব্রহ্মপূত্রে পতিত মোহনা পর্যন্ত ৩৯ কিলোমিটার নিম্নাংশ।

আন্তর্জাতিক ফারাক্কা কমিটি (আইএফসি) এক বিবৃতিতে বাংলাদেশ সরকারের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে। আইএফসি নেতৃবৃন্দ মনে করেন দেশের উত্তরাঞ্চলে যখন মরুকরণের প্রক্রিয়া  ঘনিভুত হচ্ছে তখন কবে পানি পাওয়া যাবে তার জন্য হাত গুটিয়ে বসে থাকা সমিচীন নয়। যদিও এই পরিকল্পনা নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করে নদীকে জীবিত রাখার প্রচেষ্টার বিকল্প নয়, তবুও বন্যা ভাঙ্গনের ক্ষয়ক্ষতি লাঘব ও সমন্বিত উন্নয়ন কর্মকান্ডের মাধ্যমে উত্তরপশ্চিমাঞ্চলের মানুষের ভাগ্য উন্নয়নের এই প্রচেষ্টা সফল হতে পারে। প্রকৃতির স্বাবাভিক নিয়মে উজানে যখন পানির প্রবাহ ফিরিয়ে আনার তাগিদ আসবে তখন বাংলাদেশের তিস্তা অংশ নতুন জীবন ফিরে পাবে।

আইএফসি নেতৃবৃন্দের সুপারিশ, উল্লেখিত মহপরিকল্পনাকে আরেকটু বাড়িয়ে বাংলাদেশে তিস্তার পুরনো মূল অববাহিকায় অবস্থিত আত্রাই, করতোয়া এবং পুনর্ভবা নদী এর আওতায় আনা গেলে দেশের উত্তরপশ্চিমাঞ্চলের সার্বিক  উন্নয়ন নিশ্চিত হবে। এভাবে সাজালে প্রকল্পের ব্যাপ্তি বর্তমান ৪ হাজার বর্গকিলোমিটারের জায়গায় হবে ২৮ হাজার বর্গ কিলোমিটার। বিশাল চলনবিলে বর্ষা মওসূমে অনেক পানি ধরে রেখে মাছ চাষ, হাঁসপালন এবং শুকনো মওসূমে সেচের ব্যবস্থা করা যাবে। নদীগুলো নাব্যতা ফিরে পেলে এই অঞ্চলে সস্তা নৌচলাচল, কৃষি, কৃষিজাত শিল্পসহ শিল্প উন্নয়নে অবদান রাখবে। নদীভিত্তিক আকর্ষনীয় পর্যটন কেন্দ্র গড়ে উঠেবে। আশে পাশের এলাকার ভূগর্ভস্থ পানির স্তর উপরে উঠে আসবে এবং সকল নল্কুপ সারাবছর সচল থাকবে।

আইএফসি নেতৃবৃন্দ বর্তমান তিস্তা প্র্কল্প অনুমোদন ও বাস্তবায়ন করা্র পাশাপাশি তিস্তার অরিজিনাল বেসিনকে তার আওতাভুক্ত করে উত্তরপশ্চিমাঞ্চলের সার্বিক উন্নয়ন নিশ্চিত করার জন্য সরকারকে আহবান জানাচ্ছে।

উক্ত বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেন আইএফসি নিউইয়র্ক চেয়ারম্যান আতিকুর রহমান সালু, মহাসচিব সৈয়দ টিপু সুলতান, আইএফসি বাংলাদেশ সভাপতি অধ্যাপক জসিম উদ্দিন আহমাদ, সিনিয়র সহ-সভাপতি ডঃ এস আই খান এবং আইএফসি সমন্বয়ক মোস্তফা কামাল মজুমদার।