‘সুলেখা কালি। এই কালি কলঙ্কের চেয়েও কালো।’-বিজ্ঞাপনেও অনন্য কবি রবীন্দ্রনাথ

লিখেছেন পার্থ প্রতীম ভট্টাচার্য্য

মৃত্যুর ৭৯ বছর পরেও বাংলা ভাষাভাষীদের কাছে এখনও সবচাইতে আকর্ষণীয় মানুষ রবীন্দ্রনাথ। এখনও বাঙালির আলোচনা, কৌতূহল, সাহিত্য, সঙ্গীত, নৃত্যচর্চা সবকিছুই এই মহামানবকে ঘিরে আবর্তিত।

তার গান, কবিতা, উক্তি সবকিছুই এখনও সমসাময়িক। এখনও বাঙালি তার হতাশা, প্রেম, বিরহ, কষ্ট, দুঃখ, আনন্দ- সবকিছুতে কবিগুরুর কবিতা, গান, উক্তিকেই সঙ্গী করে। মানুষের জীবনের প্রত্যেকটা মুহূর্তের অভিব্যক্তি পাওয়া যায় তার সৃষ্টিকর্মে।

তিনি নিজেও বুঝেছিলেন তার সৃষ্টিকর্মের জন্য তাকে অনন্তকাল মানুষ মনে রাখবে। না হলে মাত্র ৩৪ বছর বয়সেই তিনি তার ১৪০০ সাল কবিতায় কিভাবে লেখেন ‘আজি হতে শতবর্ষ পরে/কে তুমি পড়িছ বসি আমার কবিতাখানি/কৌতূহল ভরে/আজি হতে শতবর্ষ পরে।’

আবার হয়তো অমরত্বের আকাঙ্ক্ষা থেকেই মাত্র ২৬ বছরে লিখেছেন, ‘যদি থাকি কাছাকাছি, দেখিতে না পাও ছায়ার মতন আছি না আছি, তবু মনে রেখো।’

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রবন্ধ, গান, সুর, উপন্যাস, নাটক, ছোটগল্প, আর্ট সবকিছুর জন্যেই মানুষ তাকে মনে রেখেছে, বসিয়েছে দেবতার আসনে। তিনি ছিলেন পলিম্যাথ, সহজ বাংলায় সব্যসাচী। একমেবাদ্বিতীয়ম।

এই যে এতকিছু; তার সবকিছুই তিনি মাঝে মাঝে সামলে উঠতে পারতেন না। ১৯৩১ সালে ইউরোপ-আমেরিকা সফর শেষ করে কবি শান্তিনিকেতনে আছেন। গান তাকে পেয়ে বসেছে। শুধুই গান লিখছেন। এক পত্রে সেই সময়ের অবস্থা বর্ণনা করে রবীন্দ্রনাথ লিখলেন, ‘আমি আছি গান নিয়ে, কতকটা ক্ষ্যাপার মতো ভাব। আপাতত ছবির নেশাটা ঠেকিয়ে রেখেছি, কবিতার তো কথাই নেই। আমার যেন বধুবাহুল্য ঘটেছে; সব-কটিকেই একসঙ্গে সামলানো অসম্ভব।’

এই যে কবি, সাহিত্যিক, চিত্রশিল্পী, গল্পকার, গীতিকার, সুরকার রবীন্দ্রনাথের আরে তার আরেকটি পরিচয়ও ছিল। তিনি ছিলেন তার সময়ের সুপার মডেল, শ্রেষ্ঠ জিঙ্গেল রচয়িতা।

আজকালকার সঙ্গে কবিগুরুর তফাৎ ছিল এ রকম, তিনি নিজেই পণ্যের বিজ্ঞাপনের জিঙ্গেল লিখতেন আর সঙ্গে থাকত তার এপিক শ্মশ্রুমণ্ডিত ছবি। তবে অনেক বিজ্ঞাপনে তার লেখা কবিতা, গান, তার সন্তুষ্টিপত্র কিংবা নিছকই তার স্বাক্ষর ব্যবহৃত হয়েছে।

অনেক বিজ্ঞাপন আছে, যেখানে তিনি দেশি পণ্যের শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণনা করে বিদেশি পণ্যের পরিবর্তে দেশি পণ্য কিনতে উৎসাহিত করেছেন।

আবার স্বদেশী আন্দোলন ও স্বদেশী শিল্পকে এগিয়ে নিতে অনেক দেশি পণ্যের বিজ্ঞাপনের ভাষা তিনি স্বেচ্ছায় লিখেছেন।

তবে বিজ্ঞাপনের প্রস্তাব নাকচ করেছেন এমন উদাহরণও আছে বৈকি।

রবীন্দ্রনাথের লেখা এবং ছবিসহ বিজ্ঞাপনগুলো ছাপা হতো তৎকালীন প্রবাসী, বসুমতি, কলকাতা মিউনিসিপাল গেজেট, ভাণ্ডার, শনিবারের চিঠি, সাধনা, তত্ত্ববোধিনী, আনন্দবাজার পত্রিকা, অমৃতবাজার পত্রিকা, দি স্টেটসম্যানসহ বিভিন্ন সংবাদপত্র ও সাময়িকীতে। তবে সবচেয়ে বেশি ছাপা হয়েছে আনন্দবাজারে।

এমন অনেক পণ্যের বিজ্ঞাপনে কবিকে দেখা গেছে, যা তিনি কখনও ব্যবহারই করেননি বা ব্যবহারের প্রশ্নই আসেনা! না হলে ‘কুন্তলীন’ নামক কেশ তেলের বিজ্ঞাপনে কেন লেখা থাকবে, ‘কবীন্দ্র রবীন্দ্রনাথ বলিয়াছেন: কুন্তলীন ব্যবহার করিয়া এক মাসের মধ্যে নূতন কেশ হইয়াছে।’

অন্যান্য বহু ক্ষেত্রের মতো, কেশেও যে তার কমতি ছিল না তা তার ছবি দেখলেই বুঝতে বাকি থাকে না।

আবার এস.সি. রায় এন্ড কোং-এর ডা. উমেশচন্দ্র রায়ের পাগলের মহৌষধের বিজ্ঞাপনেও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন, ‘আমি ইহার উপকারিতা বহুকাল যাবৎ জ্ঞাত আছি।’

অন্যদিকে মুখে মাখার স্নো, পাউডারেও তাকে খুঁজে পাওয়া গেছে। কালি, জুতা, হারমোনিয়াম, বীমা কোম্পানী, মিষ্টির দোকান, ঘি কিংবা ষ্টুডিওসহ কম বেশী ৯০টির মতো বিজ্ঞাপনে রবীন্দ্রনাথকে পাওয়া যায়।

স্ত্রীর গহনা আর বইয়ের স্বত্ব বিক্রির টাকায় শান্তিনিকেতনে প্রতিষ্ঠিত বিশ্বভারতীর ব্যয় বহন করার জন্য কবিগুরুকে অনেক কিছুই করতে হয়েছে। দ্বারে দ্বারে পাততে হয়েছে হাত।

পত্রিকা অথবা সাময়িকীতে লিখতে হয়েছে ধারাবাহিক গল্প কিংবা উপন্যাস, বক্তব্য দিয়ে বেড়াতে হয়েছে দেশে-বিদেশে; করতে হয়েছে শান্তিনিকেতনের ছাত্রদের নিয়ে ভারতের বিভিন্ন স্থানে নাটক মঞ্চায়ন, নিজের নাটক কলকাতায় মঞ্চায়ন করে টিকিট কেটে দেখার ব্যবস্থা করা, বিজ্ঞাপনের জগতে আসা কিংবা বিজ্ঞাপনের জিঙ্গেল লেখা।

কারণ বিশ্বভারতীর টাকা জোগাড় করার দায়িত্ব ছিল তার একার কাঁধে। ব্রক্ষ্মচর্যাশ্রম প্রতিষ্ঠার পর থেকে আমৃত্যু বিশ্বভারতীর খরচের যোগান দেওয়াটা তার দুশ্চিন্তার প্রধানতম কারণ হয়ে উঠেছিল।

শান্তিনিকেতনের জন্য বক্তৃতা দিয়ে বেড়াতে বেড়াতে ক্লান্ত রবীন্দ্রনাথ তার এক পত্রে লিখেছেন, ‘আমি ভিক্ষাপাত্র হাতে নিয়ে দেশে দেশে ঘুরে বেড়াচ্ছি; হাতে নিয়ে বললে ঠিক হয় না, কণ্ঠে নিয়ে! এ বিদ্যা আমার অভ্যস্ত নয়, তৃপ্তিকরও নয়। সুতরাং দিনগুলো যে সুখে কাটছে তা নয়। যখন মন ক্লান্ত হয়ে পড়ে তখন বিশ্বভারতীকে মরীচিকা বলে মনে হয়।’

সর্বতভাবে চেষ্টার পরেও শেষ পর্যন্ত হার মানতে হয়েছে রবীন্দ্রনাথকে। শান্তিনিকেতনে ব্রক্ষ্মচর্যাশ্রম প্রতিষ্ঠার ২০ বছর পর ২৩ ডিসেম্বর, ১৯২১ সালে পৌষ উৎসবে বিশ্বভারতী পরিচালনার দায়িত্ব সর্বসাধারণের হাতে তুলে দিতে হয়েছিল কবিকে।

অবশ্য কবি তার গ্রন্থের লভ্যাংশ, বোলপুরের স্থাবর-অস্থাবর সব সম্পত্তি বিশ্বভারতীকে দান করেন এবং পাশাপাশি নোবেল প্রাইজের টাকার সুদটা বিশ্বভারতীর প্রাপ্ত বলে ব্যবস্থা করেন। (রবীন্দ্র জীবন কথা/প্রভাত কুমার মুখোপাধ্যায়)

বিজ্ঞাপন প্রসঙ্গে ফিরে আসার আগে বিশ্বভারতী নিয়ে কবিগুরুর সংগ্রামের কয়েকটি উদাহরণ দিতে চাই। তাহলে স্পষ্ট হবে, কেন তিনি বিজ্ঞাপনেও অংশ নিতে বাধ্য হয়েছিলেন।

বরোদার মহারাজা সায়জিরাও গায়কাবাড়, যিনি অধিকাংশ সময়ে ইউরোপে থাকতেন, ১৯৩০ সালে দেশে ফিরে রবীন্দ্রনাথকে আমন্ত্রণ জানালেন তার বক্তব্য শোনার জন্য। কিন্তু কবির এই নিমন্ত্রণ পছন্দ হলো না, কিন্তু যেতে বাধ্য হলেন যেহেতু মহারাজ ১৯২৫ সাল থেকে বিশ্বভারতীকে ছয় হাজার করে টাকা অনুদান দেন। এ ব্যাপারে এক পত্রে কবি লিখেছেন, ‘বরোদায় গিয়ে একটা বক্তৃতা দিতে হবে এই আদেশ। বাঁধা আছি রাজদ্বারে রুপোর শৃঙ্খলে-বিশ্বভারতীর খাতিরে মাথা বিকিয়ে বসেছি। একটুও ভালো লাগছে না।’

বিশ্বভারতী নিয়ে কবির অর্থের টানাটানির আরেকটি উদাহরণ না দিলে বলাটা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।

১৯৩৬ সাল, কবির বয়স ৭৫, বিশ্বভারতীর অর্থের জন্য শান্তিনিকেতনের ছেলেদের নিয়ে নৃত্যনাট্য ‘চিত্রাঙ্গদা’ মঞ্চস্থ করতে তিনি উত্তরভারতে গেলেন। পাটনা, এলাহাবাদ, লাহোর ঘুরে তিনি উপস্থিত হলেন দিল্লি।

কবি দিল্লিতে আছেন, এটা শুনে গান্ধীজী কবির সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেন এবং কবিকে প্রশ্ন করলেন, বিশ্বভারতীর কত টাকা ঘাটতি যে এই বয়সে কবিকে এভাবে ঘুরে বেড়াতে হচ্ছে?

ষাট হাজার টাকার ঘাটতির কথা শুনে গান্ধীজী সেই অর্থের ব্যবস্থা করে কবিকে এই বয়সে এভাবে ঘুরে বেড়াতে বারণ করলেন। পরে কবির নাট্যদল মীরাট হয়ে কলকাতায় ফিরল। (রবীন্দ্র জীবন কথা/প্রভাত কুমার মুখোপাধ্যায়)

উদাহরণের পর্বটা একটু লম্বা হলেও সেটা কোন পরিস্থিতিতে রবীন্দ্রনাথকে তার সাহিত্যকর্মের বাইরে অনেক কিছু করতে হতো সেটা বোঝানোর জন্যেই।

কবিগুরুর অক্লান্ত পরিশ্রমে তিলে তিলে গড়ে তোলা স্বপ্নের সেই আশ্রম, সেই শান্তিনিকেতন এখন সারা বিশ্বের সকল রবীন্দ্রপ্রেমী মানুষের কাছে তীর্থক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।

অর্থের জন্য কবি অনেক কিছু করেছেন বটে, তবে অর্থের প্রতি তার মোহ ছিল না। একটা উদাহরণ দিয়ে এই প্রসঙ্গের ইতি টানি।

১৯০৭ সালে প্রবাসী পত্রিকার সম্পাদক রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় আগাম হিসেবে তিনশ টাকা দিয়ে তার পত্রিকার জন্য কবিকে একটা গল্প লিখে দেওয়ার অনুরোধ জানান। সেই হিসেবে কবি লিখলেন ‘মাষ্টার মহাশয়’ গল্পটি।

লিখে পাঠানোর পর কবির মনে হলো গল্পটি তিনশ টাকার উপযুক্ত হয়নি। তাই তিনি প্রবাসী পত্রিকার জন্য ১৯০৭ সালের আগস্ট মাস থেকে ধারাবাহিকভাবে ‘গোরা’ লিখতে শুরু করলেন। আড়াই বছর ধরে তিনি লিখলেন এই উপন্যাস। কোনো মাসেই কবির কাছ থেকে মাসিক কিস্তি আসতে দেরি হয়নি। এমনকি কবির ছোট ছেলে শমীন্দ্রের মৃত্যুর পর পৌষ মাসের কিস্তিও পত্রিকা অফিসে পৌঁছেছিল যথাসময়ে।

ফিরে আসি বিজ্ঞাপনের মডেল রবীন্দ্রনাথের কাছে।

পণ্যের বিজ্ঞাপনে রবীন্দ্রনাথ বিষয়ে প্রাথমিকভাবে তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করেছেন কলকাতার তৎকালীন মাসিক ‘পূরশ্রী’ পত্রিকার সম্পাদক অরুণ কুমার রায়। তার তথ্য অনুযায়ী, ১৮৮৯ থেকে মৃত্যুর বছর পর্যন্ত অর্থাৎ ১৯৪১ সাল পর্যন্ত ছোট-বড়, পরিচিত-অপরিচিত বিভিন্ন পণ্যের বিজ্ঞাপনে রবীন্দ্রনাথ অংশ নিয়েছেন। এই ৫০ বছরে তিনি কমবেশি ৯০টি বিজ্ঞাপনে অংশ নিয়েছিলেন।

বিদেশি ছায়াছবিতে বিজ্ঞাপিত হয়েছিলেন। সরাসরি বিজ্ঞাপনের পাশাপাশি বিজ্ঞাপনে ব্রান্ড হিসেবেও পরিবেশিত হয়েছেন বহু জায়গায়। অজস্র অটোগ্রাফ দিয়েছেন, উপস্থিত থেকেছেন লেকচার কিংবা ডিনারে। (রবীন্দ্রনাথ ও বিজ্ঞাপন/শ্রী অরুণকুমার রায়)

বিজ্ঞাপনের প্রস্তাব ফিরিয়ে দেওয়ারও উদাহরণ আছে কবিগুরুর। ‘রবীন্দ্রনাথ ও বিজ্ঞাপন’ বই থেকে জানা যায় একবার ‘ভারত’ ব্লেড সংস্থা তাদের পণ্যের বিজ্ঞাপনের জন্য কবির কাছে গেলে তিনি তার শ্বেতশুভ্র, দীর্ঘ দাড়িতে সস্নেহে হাত বুলাতে বুলাতে বলেছিলেন, ‘এই দাড়ি নিয়ে আমি যদি বিজ্ঞাপন করি তাহলে কেউ কি তোমাদের ব্লেডের ধারে আস্থা রাখবে? না আমাকে করবে বিশ্বাস?’ (রবীন্দ্রনাথ ও বিজ্ঞাপন/শ্রী অরুণকুমার রায়)

আবার একই ধরণের পণ্যের দুই কোম্পানির বিজ্ঞাপনেও দেখা গেছে রবীন্দ্রনাথকে। যেমন বন্ধু হেমেন্দ্র মোহন বোসের অনুরোধে সুলেখা কালির বিজ্ঞাপনের জিঙ্গেলে লিখেছিলেন, ‘সুলেখা কালি। এই কালি কলঙ্কের চেয়েও কালো।’

ঐ সময় সুলেখা কালিকে বিদেশি কোম্পানীর কালি পার্কারের এবং শেফার্সের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হতো।

আবার একই রবীন্দ্রনাথ ‘কাজলকালি’র বিজ্ঞাপনের জিঙ্গেলে লিখেছেন, ‘কাজলকালি ব্যবহার করে সন্তোষ লাভ করেছি, এর কালিমা বিদেশি কালির চেয়ে কোনো অংশে কম নয়।’

একদিকে সরকারী রেলের বিজ্ঞাপনে যেমন কবির কবিতা ব্যবহার করা হয়েছে, ঠিক তেমন বিদেশি ‘কে এল এম রয়াল ডাচ’ এয়ারলাইন্সের বিজ্ঞাপনেও ব্যবহার করা হয়েছে এই কোম্পানীর বিমান যাত্রায় কবিগুরুর সন্তুষ্টিপত্র।

ইন্ডিয়ার পূর্ব রেলওয়েতে বিজ্ঞাপন হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল কবির শ্যামলী কাব্যের ‘হঠাৎ দেখা’ কবিতার প্রথম দুলাইন- ‘রেলগাড়ির কামরায় হঠাৎ দেখা, ভাবিনি সম্ভব হবে কোনো দিন।’

কবিসত্ত্বাকে বাঁচিয়ে রেখেও কবি লিখেছেন কোনো কোনো বিজ্ঞাপন। যেমন ‘লিপটন চা’য়ের বিজ্ঞাপনে কবি রবীন্দ্রনাথকেই খুঁজে পাওয়া যায়।

লিপটনের বিজ্ঞাপনে তিনি লিখেছিলেন, ‘চা-স্পৃহ চঞ্চল/ চাতকদল চল/কাতলি-জল তল/কলকল হে…’

আবার একই কোম্পানীর সব পণ্যের বিজ্ঞাপন কবি লিখেছেন একসঙ্গে। বাঙালি ব্যবসায়ী হেমেন্দ্রমোহন বোসের কোম্পানীতে তৈরি হতো মাথায় মাখা তেল, পান মশলা এবং সুগন্ধি।

১৩৫২ বঙ্গাব্দে ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় প্রকাশিত এই কোম্পানীর বিজ্ঞাপনে কবি লিখেছিলেন,

কেশে মাখো ‘কুন্তলীন’।

রুমালেতে ‘দেলখোস’।

পানে খাও ‘তাম্বুলীন’।

ধন্য হোক এইচ বোস।

দীর্ঘ বছর ধরে সাবান, স্নো, পাউডারের মতো প্রসাধনীর বিজ্ঞাপনে আমরা নারীর উপস্থিতি দেখতে অভ্যস্ত হলেও রবীন্দ্রনাথকে পাওয়া গেছে এসব বিজ্ঞাপনে। কারণ তার সময়ের সুপার মডেল তিনি।

১৯২১ সালে দেশী কোম্পানীর উৎপাদিত গোদরেজ সাবানের বিজ্ঞাপনে দেখা গেছে কবির শ্মশ্রুমণ্ডিত ছবি। যেখানে কবি লিখেছেন, ‘I know of no foreign soaps better than Godrej’s and I will make a point of using Godrej’s soap.’

পরে আনন্দবাজারে এই বিজ্ঞাপনটি বাংলাতে ছাপা হয়। যেখানে লেখা ছিল, ‘গোদরেজ সাবানের অপেক্ষা ভালো কোনো সাবান আমার জানা নাই। আমি ভবিষ্যতে শুধু এই সাবানই ব্যবহার করিব স্থির করিয়াছি।’

কলকাতার রেডিয়াম ল্যাবরেটরির উৎপাদিত রেডিয়াম ক্রিমের বিজ্ঞাপনে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘রূপচর্চার জন্য স্নো ও ক্রিমজাতীয় প্রসাধন যারা ব্যবহার করেন, তারা রেডিয়াম ফ্যাক্টরির তৈরি ক্রিম ব্যবহার করে দেখুন, বিদেশি পণ্যের সঙ্গে এর কোনো পার্থক্য খুঁজে পাবেন না।’

অবশ্য এই বিজ্ঞাপন নিয়ে একটা মজার গল্পও আছে। ১৯৮১ সালে ‘জয়শ্রী’ পত্রিকার সুবর্ণজয়ন্তী সাধারণ সংখ্যায় শকুন্তলা রায়ের একটি প্রবন্ধ থেকে জানা যায়, একবার ঢাকা থেকে কবিগুরুর কাছে ‘জয়শ্রী’ পত্রিকার জন্য লেখা আনতে গেলে কবিগুরু খুব ক্লান্ত এবং লেখা নিয়ে ব্যস্ত থাকায় তাদেরকে লেখা দিতে পারেননি।

তবে তাদেরকে ফিরিয়ে দেওয়ার সময় রবীন্দ্রনাথ, ‘খালি হাতে ফিরে যাবে!- এই বলে এক বাক্স রেডিয়াম স্নো তাদের হাতে দিয়ে বলেছিলেন, এটা সবাই মিলে মেখো। আমি তো এসব ব্যবহার করি না।’

তখন রবীন্দ্রনাথকে প্রশ্ন করা হয়- আপনি নিজে না মাখলে কেন ওদের বিজ্ঞাপনে লিখে দিয়েছেন? ব্যবহার না করে লিখলেন কি করে!

তখন রবীন্দ্রনাথ হেসে তাদেরকে উত্তর দেন, ‘দুটো লাইন লিখে দিলে আমার ভিক্ষের ঝুলিতে কিছু টাকা পাওয়া যাবে যে! (জয়শ্রীর আদিপর্ব, জয়শ্রী সুবর্ণজয়ন্তী সংখ্যা)

অনেক কোম্পানি তাকে তাদের উৎপাদিত পণ্য পাঠাত কবির ঠিকানায় এবং তিনি উদার হস্তে চিঠি লিখে তাদের প্রশংসা করতেন, সেগুলিকেই পরে কোম্পানীগুলো ব্যবহার করতো বিজ্ঞাপন হিসেবে।

এতে কিছু সমস্যাও তৈরি হয়েছিল। অনেক কোম্পানী তাদের পণ্যের প্রসারের জন্য সেগুলোকে অতিরঞ্জিতভাবে ব্যবহার করেছে।

কেশোরাম কটন মিলের তৈরি শাড়ি, লং ক্লথ, টুইল, তোয়ালে বিষয়ে লেখা তার চিঠি স্বাক্ষরসহ সম্পূর্ণ ছেপে দিয়ে, নীচে লেখা হয়েছিল, ‘পূজায় এই কাপড় কিনিবেন, বেঙ্গল স্টোর্সে পাওয়া যায়।’ (রবীন্দ্রনাথ বিজ্ঞাপন ও সেই সময়/ হিরণ্ময় মাইতি)

ব্রিটেনের তৈরি ‘বোর্ন-ভিটা’র বিজ্ঞাপনে কবির ছবির পাশে তার স্বাক্ষরিত একটা লাইনে পণ্য সম্পর্কে কবি লিখেছেন, ‘বোর্ন-ভিটা সেবনে উপকার পাইয়াছি।’

রবীন্দ্রনাথ কলকাতার ‘জলযোগ মিষ্টান্ন ভাণ্ডার’ এর জন্যও লিখেছেন বিজ্ঞাপন। ঐ বিজ্ঞাপনে তিনি লেখেন, ‘জলযোগের বানানো মিষ্টান্ন আমি চেখে দেখেছি। এটা আমাকে তৃপ্তি দিয়েছে। এর আলাদা স্বাদ আছে।’

ঘিয়ের বিজ্ঞাপনেও আমরা পাই কবিগুরুকে। কলকাতায় তৈরি শ্রীঘৃত সম্পর্কে তিনি লেখেন, ‘বাংলায় ঘিয়ের ভেজাল বাঙালির অন্ত্রের ভেজালকেও অনিবার্য করে তুলেছে। আশা করি শ্রীঘৃত বাঙালির এই ভেজাল রোগের প্রতিকার করবে।’

সে সময়ের স্টুডিও এস ঘোষের বিজ্ঞাপনে কবিগুরুর ছবি ব্যবহার করা হয়েছিল এবং সেখানে কবি লিখেছিলেন, ‘এস ঘোষ আমার যে দুটি ফটোগ্রাফ তুলেছেন তা অতি সুন্দর ও সুনিপুণ। দেখে আমি বিস্মিত ও সন্তুষ্ট হয়েছি। তাদের ব্যবসায়ে তারা যে যথেষ্ট সফলতা লাভ করবেন তাতে আমার সন্দেহ নেই।’

তবে সত্যি সত্যি কবি ঐ স্টুডিও থেকে ছবি তুলেছিলেন কিনা তার বিবরণ পাওয়া যায়নি।

হিন্দুস্থান কো-অপারেটিভ ইনস্যুরেন্সের বিজ্ঞাপনে রবীন্দ্রনাথের গানের একটা কলি এবং একটি উপদেশসহ তার ছবি দেখা যায়।

‘হে নূতন, তোমার প্রকাশ হোক কুহেলিকা করি উদঘাটন সূর্যের মতন’-গানের এই লাইনটার সঙ্গে তার উপদেশের এই লাইন ‘লক্ষ্মীর অন্তরের কথাটি হচ্ছে কল্যাণ, সেই কল্যাণের দ্বারা ধন শ্রীলাভ করে। কুবেরের অন্তরের কথাটি হচ্ছে সংগ্রহ, সেই সংগ্রহের দ্বারা ধন বহুলত্ব লাভ করে’ যোগ করে কবিগুরুর নাম দিয়ে প্রকাশ করা হয়।

শুধু মডেল রবীন্দ্রনাথ নয়, তার সময়ে তিনি কতটা প্রভাবশালী এবং তার সমর্থনের গুরুত্ব কতটা ছিল সেটার প্রমাণ পাওয়া যায় আরেকটি বিজ্ঞাপনে।

১৯৩৬ সালে ‘দ্য রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়া’ এর লোকাল বোর্ডের নির্বাচনের প্রার্থী ছিলেন অমরকৃষ্ণ ঘোষ। সেই বছরের ৯ অক্টোবরে কবি স্বাক্ষরিত বাংলা এবং ইংরেজি পত্রিকায় অমর ঘোষের প্রতি কবির সমর্থনের বিষয়টি বিজ্ঞাপন আকারে প্রকাশিত হয়।

কবির হস্তাক্ষরে সেই বিজ্ঞাপনের কথাটি ছিল, ‘রিজার্ভ ব্যাঙ্কের লোকাল বোর্ডের নির্বাচনে শ্রীযুক্ত অমরকৃষ্ণ ঘোষের সফলতা কামনা করি।’

আর ইংরেজিতে এটা ছাপা হয়েছিল এভাবে, ‘I earnestly desire the success of Sj. Amar Krishna Ghosh at the election to the Local Board of Reserve Bank.’

সেই নির্বাচনে মি. ঘোষ ৫৩৩৪টি ভোট পেয়ে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের লোকাল বোর্ডের সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন।

বিজ্ঞাপনের লেখা, চিঠির উত্তর দেওয়া, নিজের সাহিত্যকর্ম এসব কিছু নিয়ে কবি ক্লান্ত হয়ে উঠেছিলেন। অথচ অর্থের অভাবে কবি একজন সহকারী রাখতে পারেননি, যদিও তিনি সেটার কথা ভেবেছিলেন।

এক পত্রে তিনি দুঃখ করে লিখেছিলেন, ‘এক-একবার ক্লান্ত হয়ে ভাবি একটা সেক্রেটারি রাখা যাক। কিন্তু সে আমিরিটুকুও হিসাবে কুলোয় না দেখতে পাই। কেননা রথীর সংসারেও দেখি অনটন, আমার স্কুলেও দেখি তাই, অতএব ডাইনে বাঁয়ে হিসাবের নিষ্ঠুর খাতার দিক থেকে দৃষ্টি বাঁচিয়ে চক্ষু বুজে মনের শান্তি রাখতে চেষ্টা করি।’  (রবীন্দ্র জীবন কথা/প্রভাত কুমার মুখোপাধ্যায়)

জীবন সায়াহ্নে এসেও এই ব্যাপারে ক্লান্ত ও অসুস্থ কবি তার এক চিঠিতে জানাচ্ছেন, ‘প্রতিদিন অন্তবিহীন চিঠি লেখালেখি, আশীর্বাণীর দাবি, অভিমতের অনুরোধ, বাংলাদেশের নবজাতকদের নামকরণ, আসন্ন বিবাহের সরকারি চৌকিগিরি আমার শরীরের স্বাস্থ্য ও মনের শান্তির পক্ষে অসহ্য হয়েছে।’ (রবীন্দ্রনাথ বিজ্ঞাপন ও সেই সময়/ হিরণ্ময় মাইতি)

রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব বিজ্ঞাপন নিয়ে লিখতে গেলে লেখা শুধু দীর্ঘই হতে থাকবে। তাছাড়া আমি কতটুকুই বা জানি এই কীর্তিমান প্রসঙ্গে।

আসলে কবিগুরুকে নিয়ে নতুন করে কিছু লেখার ক্ষমতা বা বিদ্যা কোনোটাই আমার সে অর্থে নেই। আজ তাকে নিয়ে যেটুকু লিখলাম, যে প্রসঙ্গে লিখলাম এর সবকিছুই আগে লেখা হয়েছে। সব্যসাচী এই মানবের জন্মতিথিকে স্মরণ করে, আমি আমার মতো করে লেখাটি উপস্থাপনের মাধ্যমে শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদনের চেষ্টা করেছি মাত্র।

জন্মজয়ন্তীতে কবিগুরুর প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি।

লেখক: চীফ রিপোর্টার, দ্য ডেইলি স্টার