২০২১-সনের আদমশুমারি, বাংলাদেশ ও একটি পূর্বাভাস।

মাহবুব রব চৌধুরী, টরন্টো

* ২০২১ সনে বাংলাদেশের আদমশুমারি তে প্রথম বারের মত এরাউন্ড ৩ % হিন্দু জনসংখ্যা প্রবৃদ্ধি দেখা যাবে। – বা দেখান হবে। গত ৭ টি সেন্সাসের গড়ে ২ % ক্রমহ্রাস কে অতিক্রম করে অর্থাৎ ৭০ বছরের রেকর্ড ভেঙেই এটা হতে হবে ! কিন্তু কেন ?
গত সাতটি শুমারি পর্যালোচনায় দেখা যায় বাংলাদেশে গড়ে প্রায় ২ % হারে হিন্দু সংখ্যা কমছে- ৭.২ = ১৪. ১৯৫১ থেকে ২০১১ পর্যন্ত- শুমারি অনুযায়ী, প্রকৃত তারতম্য হয়েছে ২২% – ৮.৫০% = ১৩.৫০ % অর্থাৎ ৭ টি শুমারি শেষে গড়ে প্রায় ২% করে।
বিষয়টি অনুধাবনে নিম্নে ১৯৫১ থেকে ২০১১ পর্যন্ত বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গ – ভারতে’ র- ৭টি- আদমশুমারি- চার্ট তুলে ধরা হল।
বিষয়টি বুঝতে এটি সহায়ক হবে ।
১৯৫১ সাল থেকে ২০১১ সাল- এই সময় কালে দশ বছর পর পর, নিয়ম মেনেই বাংলাদেশে ৭ টি সেন্সাস( আদমশুমারি )- হয়েছে।
শুধু মাত্র মহান মুক্তি যুদ্ধের বছর হওয়াতে ১৯৭১ এর পরিবর্তে তা ১৯৭৪ এ’ গণনা হয়।
১৯৫১ থেকে ২০১১ পর্যন্ত বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গ – ভারতে’ হিন্দু জনসংখ্যা’ র পরিসংখ্যান।
অ = বাংলাদেশের আদমশুমারি ও হিন্দু জনসংখ্যার শতকরা হার ।
১৯৫১ সালে ২২%
১৯৬১ সালে ১৮.৫%
১৯৭৪ সালে ১৩.৫%
১৯৮১ সালে ১২.১%
১৯৯১ সালে ১০.৫%
২০০১ সালে ৯.২%
২০১১ সালে ৮.৫%
এই ক্রমহ্রাসমান পরিসংখ্যান কে কিছু হিন্দু সংগঠন এবং তাদের প্রভাবিত সংগঠন বিষয়টিকে বাংলাদেশে- হিন্দু নির্যাতনের প্রমান হিসাবে তুলে ধরেন।
ই = নিম্নে আমরা ভারতের পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু জনসংখ্যার হারের পরিসংখ্যানটি দেখব গত ৭ টি শুমারি অনুসারে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে হিন্দু জনসংখ্যার হার ছিল_ এইরূপ।
১৯৫১ সালে ৭৮.৪৫%
১৯৬১ সালে ৭৮.৮০%
১৯৭১ সালে ৭৮.১১%
১৯৮১ সালে ৭৬.৯৬%
১৯৯১ সালে ৭৪.৭২%
২০০১ সালে ৭২.৪৭%
২০১১ সালে ৭০.৫৩%
উপরের দুই পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, ১৯৫১ সাল থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত ৬০ বছর সময়ের মধ্যে বাংলাদেশে হিন্দুদের সংখ্যা কমে ২২% থেকে ৮.৫% এ নেমে এসেছে। অন্যদিকে একই সময়ে পশ্চিমবঙ্গে হিন্দুদের জনসংখ্যা ৭৮.৪৫% থেকে ৭০.৫৩% এ নেমে এসেছে ।
পশ্চিমবঙ্গে হিন্দু জনসংখ্যা কেন কমে যাচ্ছে? কি কারনে? এ বিষয়টি’ পর্যলাচনা, বিশ্লেষণ প্রয়োজন । মুসলিম হিন্দু সম্প্রীতি রক্ষায়ও এটি সবার জানা থাকা জরুরি।
১৯৪৭ সনে পাকিস্তান – ভারত বিভক্তির পর তখন কার বাস্তবতায় নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক আবেগের কারনে ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে বড় ধরনের সীমান্ত ক্রসিং এর ঘটনা ঘটেছে। ২৪ বছর পর ১৯৭১ সনে স্বাধীনতা ও মুক্তি যুদ্ধ কালীন সময়ও বাংলাদেশ থেকে এক কোটি মানুষ সীমান্ত পার হয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন। স্বাধীনতার পর যারা সবাই নিজ নিজ ঘর বাড়ি তে ফিরে আসেন।
* পরবর্তীতে এই ধরনের ব্যাপক মাইগ্রেশন আর ঘটেনি।
তবে অর্থনৈতিক কারনে এবং উন্নত জীবনের আশায় এখন প্রায় ১১ মিলিয়ন বাংলাদেশী প্রবাস জীবন যাপন করছেন। এর একটি বড় অংশ ই সুযোগ পেলে স্থায়ী ভাবে ওই সব উন্নত দেশে থেকে যাবেন বলে ধারনা করা হয়। এটি একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়ারই অংশ। এটি কোন প্রকার অব্ভন্তরীন নির্যাতনের ফলশ্রূতি নয়।
বাংলাদেশের মানুষের সরল জীবন যাপনের মাঝেই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি র মূল চেতনা বহমান। ধর্ম, বর্ণ, আঞ্চলিকতার বিষাক্ত ছোবল থেকে নিজেদের কে মুক্ত রেখে হাজার বছর মানুষ পাশা পাশি শান্তি, সুখের জীবন যাপন করছে। বিভক্তি ও শাসন আমাদের সমাজে ইংরেজ বেনিয়াদের আমদানি করা- বিষ বৃক্ষ।
* বিভক্তির এই রেখায় ইংরেজ একদিকে মীর মার্দান – অন্য দিকে মীর জাফর। এই ভাবে বিভক্ত করেছে।
এই সূত্রেই ভাগ হয়ে গেছে – এক দিকে মোহন লাল অন্য দিকে উমি চাঁদ, আর জগৎ শেঠ। আর আজ একদিকে প্রিয়া সাহা, সিতাংশু অন্য দিকে- দেশ প্রেমিক আপামর হিন্দু সমাজ।
* সাম্প্রদায়িক তার বিপক্ষে দাঁড়ানটাই প্রকৃত দেশ প্রেমিকের লক্ষণ। সুশাসন, দুর্নীতি মুক্ত সমাজ ও প্রশাসন, অর্থ নৈতিক সুবিচার, সাম্য, এটি সবার জন্যই প্রয়োজন। সমাজ ও রাষ্ট্রে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠাই পারে দুর্বলকে প্রতি রক্ষা দিতে।
দুর্নীতি মুক্ত সিস্টেমের অভাবে , সুশাসন ও ন্যায় বিচার এর অভাবে মুসলিম , হিন্দু সহ সকল ধর্ম , বর্ন, অঞ্চলের মানুষই অত্যাচারী সবলের হাতে নির্যাতিত , প্রতারিত হয়ে চলেছে। সাম্প্রদায়িক ভিত্তিতে এর সমাধান কামনা – সাম্প্রদায়িক তারই আর এক রূপ। যেটি বাংলাদেশে হিন্দু সংগঠন -হিসাবে – বিশ্ব হিন্দু পরিষদ , হিন্দু ঔক্য জোট , নিম্ন বর্ন হিন্দু জোট , হিন্দু , বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঔক্য জোট এবং ইসকন ছাড়াও বিভিন্ন গ্রূপ বিভিন্ন ভাবে প্রচার করেছে।

*

মাঝে মধ্যে এদের কেউ কেউ আবার পৃথক নির্বাচনের কথা প্রচার করছে , জনৈক গোবিন্দ প্রামাণিক, এবিষয়টিকে শক্ত পোক্ত করতে ইউ- টিউব’ সহ ইলেক্ট্রনিক মিডিয়াতে তার বক্তব্য রেখেছেন। এখন থেকেই তারা হিন্দু জনসংখ্যার হার বৃদ্ধি করে দেখাবার লবি বিভিন্ন ভাবে প্রচার করেছে।

আগামীতে এটা আরো জোরদার হবে বলেই ধারণা। তুলনা মূলক ভাবে বিশ্বে মুসলিম শিশু জন্ম হার বেশি এটা স্বীকৃত।

৩০ মাইল স্পীডে ছুটে চলা একটি ঘোড়ার পক্ষে একই গতিতে চলে. -তার সামনে ছুটে চলা ৬০ মাইল স্পীডের ঘোড়াটিকে ছোয়া বা অতিক্রম করা বাস্তবে অসম্ভব,অবাস্তব। ২০২১ এ বাংলাদেশের -পরবর্তী সেন্সাসএ – যদি এইরূপ ঘটনা দেখান হয় তবে তা হবে এক নুতন কাহিনী। বাংলাদেশের অব্ভন্তরীন বিষয়ে হস্তক্ষেপের এটি হবে আর একটি
আগ্রাসী ক্ষেত্র।

ইতিমধ্যে আমাদের প্রতিটি ক্ষেত্রকেই বিতর্কিত করে ফেলা হয়েছে। । এত দিন পর্যন্ত আদমশুমারি ‘ এই আগ্রাসী হস্তক্ষেপের বাইরে ছিল -এবার হয়ত আর তা রক্ষা পাবেনা। ।ধারনা এটিও এবার বিতর্কিত হবে ।

*
মাহবুব রব চৌধুরী। – টরন্টো।