তাজা ঈমানের কারণে ম্যালকম এক্স (Malcom X) আমার যে অনুরোধ রাখেননি

ড. আহমদ তুতুনজী

ইস্তাম্বুল থেকে ফিরে ফজল মুহাম্মদ

আন্তর্জাতিক ইসলামী থিংক ট্যাংক ড. আহমদ তুতুনজী একান্ত সাক্ষাতকারে বলেছেন “সদ্য হজ্ব ফেরত ম্যালকম এক্স (Malcom X) তাঁর তাজা ঈমানের কারনে আমার যে অনুরোধ রাখেননি।” ম্যালকম এক্স (Malcom X) ছিলেন আমেরিকান কালো মুসলিম নেতা। তাঁর মুসলিম নাম হাজী মালিক শাহবাজ। তিনি ১৯৬৪ সালের এপ্রিলে পবিত্র হজ্জ্ব পালনে মক্কা গমন করেন। তাঁর বৈমাত্রীয় বোন Ella Little Collins এর আর্থিক সহযোগিতায় তিনি হজ্জ্ব সম্পন্ন করেন।
১৯৬০ থেকে ১৯৬৩ সাল পর্যন্ত ম্যালকম এক্স আমেরিকান কালো মুসলিমদের বৃহৎ সংগঠন নেশন অব ইসলামের দ্বিতীয় কমান্ডার ইন-চীফ ছিলেন। ১৯৬৪ সালে তিনি নেশন অব ইসলাম ত্যাগ করেন এবং পরিপূর্ণ সুন্নী মুসলিম হয়ে উঠেন। আলীজাহ মুহাম্মদের নেশন অব ইসলামের তিনি অসাধারণ পপুলার বক্তা ছিলেন।
১৯৬৪ সালের সেপ্টেম্বরে হজ্জ্ব থেকে ফিরে আসেন- এক নতুন ম্যালকম এক্স এক নয়া হাজী মালিক শাহাবাজ। ইসলামের সাম্য, ভাতৃত্ব, বর্ণগোত্রহীন সাদা-কালো মানুষের লাখো ইহরাম পোষাকের মিছিল তাঁর অন্তরে ঈমানের পরশ লাগে। পবিত্র মক্কায় হাজীদের আন্তর্জার্তিক মিলন মেলায় ম্যালকম এক্স এর জীবনের মোড় ঘুরে যায়। তিনি ইসলামের বিশ্বজনীন ভাতৃত্ববোধের গূঢ় স্বাদ আস্বাদন করেন।
হজ্জ্ব থেকে ফিরে আসা ম্যালকম এক্স (Malcom X) তথা হাজী মালিক শাহবাজ আমেরিকায় শুরু করেন এক নতুন অধ্যায়। তিনি তাঁর পূর্বের সংগঠন নেশন অব ইসলামের ভুলণ্ডলোর সমালোচনা শুরু করেন। পরিণামে তাঁর সাবেক সংগঠনের লোকেরা তাঁর প্রতি চরম ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে। দিনে দিনে অবস্থা যখন ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে তখন আমি এবং আমার বন্ধু আহমদ সাদিক উসমান (আমরা উভয় তখন মার্কিন যুক্তরাষ্টে অধ্যয়নরত এবং গঝঅ এর ছাত্র নেতা ছিলাম) ব্যক্তিগতভাবে ম্যালকম এক্স এর সাথে সাক্ষাত করি।

আপনি ২২/২৩ মিলিয়ন কালো মানুষকে দাওয়াত দিন
আমরা তাঁকে বুঝানোর চেষ্ট করি, আপনি হজ্জ্ব পালন করে ইসলামের পরিপূর্ণ ভাতৃত্বর ধারনা নিয়ে এসেছেন। এটা ভালো কথা। আপনি মেহেরবাণী করে আপনার পূর্বসূরী আলিজাহ মুহাম্মদ ও তার অনুসারী নেশন অব ইসলামের সমালোচনা বন্ধ করুন। নেশন অব ইসলামে এক মিলিয়ন কালো মুসলিম রয়েছে। আপনি তাদের বাদ দিয়ে আমেরিকান অবশিষ্ট ২২ মিলিয়ন (বেসরকারি হিসাবে ৩০ মিলিয়ন) কালো মানুষের কাছে ইসলামের সঠিক দাওয়াত পৌঁছে দিন। আপনি যদি তা না করেন তাহলে নেশন অব ইসলামের লোকেরা আপনার বিপুল জনপ্রিয়তায় আপনাকে হত্যাও করতে পারে।

আমার ঈমান এটা অনুমোদন করেনা।
ম্যালকম এক্স আমাদের ঐ অনুরোধ রাখেননি। জবাবে তিনি বলেছেন, “আলীজাহ মুহাম্মদের নেশন অব ইসলামে এক মিলিয়ন কালো মুসলিম রয়েছে। আমার ডাকে ঐখানে প্রায় অর্ধেক (৫ লাখ) কালো মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেছেন। তাঁরা ভুল ইসলামের দাওয়াত পেয়েছেন, সেটা আমারই কারণে। তাদের ভুল সংশোধন না করা পর্যন্ত আমি থামব না। পিছু হটবো না। আমার ঈমান আমাকে এটা করার অনুমতি দেয়না।”

১৯৬৫ সালে প্রকাশ্য মিটিং এ ম্যালকম এক্স নিহত হন।
ম্যালকম এক্স তাঁর সিদ্ধান্তে অটল থাকেন। পরিনামে যা হবার তাই ঘটেছে। আমরা তাঁর সাথে সাক্ষাতের মাত্র ৪ দিন পর চার জন বন্দুকধারী আততায়ী ১৯৬৫ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ম্যালকম এক্স’কে হত্যা করে। ঐদিন ঐ সময়ে তিনি নিউইয়র্কের ম্যানহাটনের এক অডিটরিয়ামে বক্তব্য রাখছিলেন।
আমরা ম্যালকম এক্স’কে হিকমাহ বা কৌশল অবলম্বন করতে বলেছিলাম। কিন্তু তিনি তাঁর সদ্য হজ্জ্ব ফেরত তরতাজা ঈমানের কারণে আমাদের অনুরোধ রাখেননি।

কাবায় কালো মানুষের পেছনে সাদা মানুষের সিজদাহ
ম্যালকম এক্স তাঁর হজ্জ্ব অভিজ্ঞতায় আমাদের বলেছেন, যখন তিনি সাদা কাপড়ের ইহরামের পোষাকে আচ্ছাদিত হলেন, তখন তাঁর ভেতরের সব ময়লা দূর হয়ে যায়। তাঁর অন্তর ধবধবে সাদা। আর বায়তুল্লাহর চারপাশে লাখো বনি আদম স্বেত কাপড়ের ইহরামে তাওয়াফ করছেন, সা’ঈ করছেন। আরাফায় ও মিনায় সাদা ইহরামে সাদা পোষাকের মিছিল চলছেতো চলছেই। সবাই একই কাতারে। তিনি আবেগ আপ্লুত হয়ে বলেন। যখন আমি কা’বার চত্বরে সালাত আদায় করি তখন আমি দেখি কালো মানুষের পায়ের নিকটে পেছনের সারির সাদা মানুষণ্ডলো রাব্বুল আলামিনের দরবারে সিজদাহ করছে। এটা ছিল আমার জীবনের কল্পনাতীত ঘটনা যা আমার জন্মভূমি আমেরিকায় নেই। কা’বার চত্বরে আমীর-ফকির, রাজা-প্রজা, ধনী-গরিব সবাই একই কাতারে। সকলেই মাটিতে কপাল রেখে এক ও অদ্বিতীয় লা-শরীক আল্লাহ সুবহানু তায়ালার আনুগত্য করছে। সবাই লাব্বাইক ধ্বনীতে তাঁর বড়ত্ব ঘোষণা করছে। কারও প্রতি কারো হিংসা নেই, বিদ্বেষ নেই, ক্ষোভ নেই, সবাই সমান, সবারই অন্তর সাদা, সবাই সাদা দাঁত খুলে হাঁসছেন। আর তাদের রবের বড়ত্ব-আল্লাহু আকবার ধ্বনীতে মুখরিত করে দলে দলে ছুটছেন। এমন অভিজ্ঞতা আর আবেগ নিয়েই তিনি আমেরিকায় ফিরে আসেন। শুরু হয় নতুন অধ্যায়। যে অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে তাঁর শাহাদাতের মধ্যদিয়ে।

ইদরাক পাবলিক ইউনিয়নের দাওয়াত
ইদরাক পাবলিক ইউনিয়নের দাওয়াতে আমি (লেখক) গত ১ অক্টোবর ২০১৯ ইস্তাম্বুল গমন করি। ঐখানে আমি CIS দেশ সমূহের International Islamic Intellectual Thout in The CIS Country: Past, Present and The Way Forward শীর্ষক সম্মেলনে অতিথি হিসাবে কানাডা থেকে যোগদান করি। CIS সম্মেলনের উদ্বোধনী বক্তব্যে রাখের ড. আহমদ তুতুনজী। আর সমাপনী বক্তব্য রাখেন প্রফেসর ড. উমর হাসান কাসুলি। সেক্রেটারী জেনারেল, ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইনস্টিটিউট অব থট, ভার্জিনিয়া, ইউএসএ (IIIT)। ড. আহমদ তুতুনজী পেশাগতভাবে একজন পেট্রোলিয়াম ইঞ্জিনিয়ার। কিন্তু তাঁর বর্ণাঢ্য কর্মময় জীবনে তিনি আজ মুসলিম গবেষকদের কাছে একজন চলমান থিংক ট্যাংকার।

গবেষকদের কাছে একজন চলমান থিংক ট্যাংক…
ড. আহমদ তুতুনজী ১৯৫৮ সালে Full Scholarship নিয়ে ইংল্যান্ড গমন করেন। ঐ সময়ে তিনি মাত্র ১৭ বছর বয়সের যুবক মাত্র। ১৯৬৩ সালে ড. আহমদ তুতুনজী Birmingham University থেকে ডিসটিংশনসহ গ্রাজুয়েট ডিগ্রী লাভ করেন এবং পরবর্তী সময়ে Award & Full Scholarship সহ Pennsalvania State University, USA তে Master ও Ph.D এর জন্য ১৯৬৩ সালে ভর্তি হন। ড. আহমদ তুতুনজী ১৯৭০ সালে পেট্রোলিয়াম ইঞ্জিনিয়ারিং-এ Ph.D অর্জন করেন।

ইউরোপ-আমেরিকায় ড. তুতুনজী একজন প্রথম সারির নেতা
১৯৬০ এর দশকে সারা বিশ্বে যখন ছাত্র তরুনদের মাঝে কমিউনিজম আর নাস্তিক্যবাদের জোয়ার বইছে ঐ সময়ে স্রোতের বিপরীত যে সব মুসলিম ছাত্র/যুবক ইউরোপ আমেরিকাতে মুসলিম ছাত্র সংগঠন/যুব সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেছেন তাদের মধ্যে প্রথম সারির একজন হলেন ড. আহমদ তুতুনজী। তাঁর সাথে পড়াশুনা করেছেন আমেরিকাসহ বিভিন্ন দেশে সংগঠন করেছেন এমন অনেক যুবক পরবর্তীতে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট হয়েছেন, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট হয়েছেন। আরব দুনিয়া, মালেশিয়া আর আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে দেশে রাষ্ট্রীয় মন্ত্রী পরিষদসহ বহু উচ্চ পদে আসীন হয়েছেন।
সম্মেলনের শুরুতে তিনি আমাকে কনফারেন্স হলে বুকে জড়িয়ে ধরলেন এবং খাছ বাংলায় বললেন ‘কেমন আছেন’ কানাডার মেহমান? এখানে উল্লেখ্য যে, আশির দশকের শেষের দিকে ড. আহমদ তুতুনজীর সাথে ঢাকায় কয়েকটি কনফারেন্সে আমার সাথে পরিচয় হয়েছিল।
এবারের ইস্তাম্বুল সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পর আমি যখন ড. আহমদ তুতুনজীর কাছে সাক্ষাতপ্রার্থী হলাম উনি হাসি মুখে কবুল করলেন এবং আমাকে ৩ ও ৫ অক্টোবর দু’দিনে মোট ৩ ঘন্টা সময় দিলেন। আজকের এই স্মৃতিচারণ মূলক সাক্ষাতকার তাঁর দেয়া ঐ তিন ঘন্টা সময়ের ফসল।
এটা মূলত ড. আহমদ তুতুনজীর জীবনের ঘটে যাওয়া কিছু স্মৃতিচারণ। যেহেতু তিনি পাঁচ বছর ইংল্যান্ড এবং প্রায় ২৫ বছর মার্কিন যুক্তরাষ্টে ছিলেন, সেই হিসেবে পশ্চিমা দুনিয়ার ভেতর-বাহিরের রূপ ড. আহমদ তুতুনজীর ভালভাবেই জানা-শুনা রয়েছে।
পশ্চিমা দুনিয়ায় যারা ইসলামের দাওয়াতী কাজে তৎপর এবং যারা একান্তভাবে ইসলামী দাওয়াহ গবেষণা কাজে আগ্রহী শুধুমাত্র তাদের জন্যই আজকের এই স্মৃতিচারণ মূলক লেখা।

ড. তুতুনজী থিংক ট্যাংকারদের থিংক-ট্যাংক
ড. আহমদ তুতুনজী একজন সফল ইঞ্জিনিয়ার। একজন অসাধারণ সফল সংগঠক এবং সফল থিংক ট্যাংকদের থিংক ট্যাংক। তিন ঘন্টাব্যাপী স্মৃতিচারণমূলক এবং একই সাথে উপদেশমূলক যেসব কথাবার্তা ড. তুতুনজী বলেছেন- তা এখানে বর্ণনার চেষ্টা করবো ইনশা-আল্লাহ।
আমার ইস্তাম্বুল সফর সময়ে আমি বেশ কয়েকটি বিষয়ে ড. আহমদ তুতুনজীর সাথে মত বিনিময় করি। ড. আহমদ তুতুনজীর উদ্দেশ্যে আমার প্রথম প্রশ্নছিল মুসলিম ছাত্র/তরুন সমাজের প্রতি এই সময়ে আপনার কি উপদেশ?

জবাবে ড. আহমদ তুতুনজী বলেন, আমাদের যুবক-যবতীদের ইসলাম শিখতে হবে। সময়, জায়গা আর পরিবেশে মুসলিমদের কি করা উচিত, সেটার অগ্রাধিকার দিতে হবে। একজন আমেরিকান মুসলিম যুবক আর একজন আফ্রিকান মুসলিম যুবক তাদের অবস্থান থেকে মুসলিম সোসাইটিকে কি দিতে পারে? আর কি দিতে পারেনা? এটা নির্ধারণ করতে হবে এবং বাস্তবের সাথে সমন্বয় রেখে কাজের কৌশল অবলম্বন করতে হবে। আর এই কাজ কখনোই একা একা করার চিন্তা বা চেষ্টা করা যাবে না। কোন একক ব্যক্তি নিজেকে যতই যোগ্য মনে করুক না কেন! একজন হলে, আরেক মিলে দুইজন। আর দুইজন হলে মিলে চার জন। এভাবে (১+১=২), (২+২=৪)… এই সংখ্যা-ণ্ডনিতক Policy নিয়ে দাওয়াহ নেটওয়ার্ক বাড়াতে হবে। দাওয়াহর কাজ করতে হবেদলবদ্ধভাবে। নিয়মিত Group Study করতে হবে। পড়ার গতি Reading Speed বাড়াতে হবে। এই পর্যায়ে ড. আহমদ তুতুনজী স্মৃতিচারণ করে বলেন, ১৯৫৮ সালে আমি ১৭ বছর বয়সে ইংল্যান্ড গমন করি। আমার প্রফেসর আমার Reading Speed Test নিলেন।

Reading Speed বাড়াতে হবে।
প্রফেসর প্রথমেই দেখলেন, আমার Reading Speed কেমন? অধ্যাপক তিন পৃষ্ঠা তিন মিনিটে পড়ে শেষ করলেন। আর আমার লাগলো সময়ে ১২ মিনিট। সুতরাং এত কম Reading Speed Level দিয়ে উচ্চ শিক্ষা/ গবেষণাতে অগ্রসর হওয়া কঠিন। আমার প্রফেসর বললেন, তোমার Reading Speed তার মতোবাড়াতে হবে। কতদিন সময় লাগবে তোমার? জবাবে বললাম, স্যার আমাকে ছয়মাস সময় দিন।” আলহামদুলিল্লাহ আমি ৫ মাসের মধ্যেই কাংখিত Reading Speed লেভেল-এ পৌঁছে গেলাম।

আমার জীবনের আজকের সময়টি যেন উত্তম হয়…
প্রতিদিনই নতুন কিছু শিখতে হবে। মুসলিম সমাজ বা রাষ্ট্রের জন্য পজিটিভ কিছু করতে হবে। আমার চারিপাশে যারা আছেন, যাদের সাথে আমার বসবাস, দৈনিন্দিন আদান-প্রদান, তাদের সমস্যার প্রতি নজর দিতে হবে। আমার জীবনের গতকালের চেয়েআগামীকালের দিনটি যেন ভাল হয়, সেই পরিকল্পনা আজকের দিনের শেষে নিতে হবে।
তিনি আক্ষেপ করে বলেন, আমার জীবনের অভিজ্ঞাতায় দেখেছি, আমরা যারা দাওয়াহ বা সংগঠনের কাজে বেশী ব্যস্ত থাকি। আমরা আমাদের নিজ ঘরে পজিটিভ কাজ করিনা। এটা রাসুল (সা:) এর সুন্নত নয়। মহানবী (সা:) বাইরের জগতে যেমন অন্য মানুষের কাছে উত্তম আচরণ করেছেন, তেমনি তিনি তাঁর নিজ ঘরেও সর্বত্তোমকাজ করেছেন।

ভাল কাজ করাটা মন্দ কাজের সর্বোত্তম জবাব
আমাদের চার পাশের বা প্রতিবেশী যদি কেউ কষ্ট দেয় তার প্রতিউত্তর- উত্তম কাজ দিয়ে করতে হবে। এখানেও রাসূল (সা:) এর জীবন থেকে নেয়া শিক্ষা যুবকেরা গ্রহণ করতে পারে। এক বুড়ী রাসূলে পাক (সা:) চলাচলের পথে কাটা বা ময়লা রেখে দিতো। রাসূল (সা:) প্রতিনিয়ত ঐ ময়লা (কাঁটা) নিজ হাতে সাফ করতেন। একদিন নবী (সা:) দেখলেন-উনার চলাফেরার পথে কোন ময়লা (কাঁটা) নেই। তখন মহানবী (সা:) পেরেশান হয়ে গেলেন। তিনি ঐ বুড়ীর খোঁজে বের হলেন। গিয়ে দেখলেন বুড়ী অসুস্থ্য। নবী (সা:) এর মহানুভবতায় ঐ বুড়ী সাথে সাথে কালেমা পড়ে ইসলাম গ্রহণ করলেন।

আশাবাদী হয়ে কাজ করা…
যুবকদের উচিত Optimistic বা আশাবাদী হয়ে দাওয়াহ কাজ করা। কোন নেগেটিভ কথার জবাব না দেওয়া। যেমন ইসলামে বহু বিবাহ এর অনুমোদন আছে। আমরা এর সামাজিক কল্যাণের কথাই বলবো। বিরুদ্ধ নারীবাদীদের নেগেটিভ কথার জবাব দেবনা।

৯ জন শিয়া ও ৮ জন সুন্নী ছাত্র
১৯৬৩ সালে আমি যখন যুক্তরাষ্ট্রে গমন করি-তখন আমি পেনসেলভেনিয়া অঙ্গরাজ্যে ছিলাম। সেখানে মাত্র ৭টি সুন্নী মসিজিদ ছিল। একদিন দেখলাম আমাদের এক মসজিদে এক সুন্নী ছাত্র আরেক শিয়া ছাত্রকে কাফের বলে গালি-গালাজ করছে। আবার শিয়া ছাত্রও সুন্নী ছাত্রকে পাল্টা গালি-গালাজ করছে। আমি তখন এগিয়ে গেলাম এবং দু’জনকেই ধমক দিলাম। এক জনকে বললাম, তুমি সুন্নী ইসলামকে কি বুঝ আগে বলো। তারপর শিয়া ছাত্রকে গালি দাও। আর ঐ শিয়া ছাত্রকে বললাম বললাম, তুমি শিয়া ইসলাম কতটুকু জান? কেন সুন্নীকে গালি দিচ্ছ? তখন উভয় ছাত্র চুপ হয়ে যায়। আমি তখন তাদের নিয়ে বসি এবং তাদের আমি বিষয় নির্ধারণ করে দেই। আগামী সপ্তাহে অমুক দিন, অমুক সময়ে তুমি ‘সুন্নী ইসলাম কি’ এই বিষয়ে একটি বক্তব্য দিবে লিখিত আকারে। আবার অপর দিকে শিয়া ছাত্রকে বললাম তুমিও ‘শিয়া ইসলাম কি’ তার উপরও একটি লেখা রেডি করে নিয়ে আসবে। আমরা স্টাডি সার্কেল করবো কোনটা সুন্নী ইসলাম আর কোনটা শিয়া ইসলাম- এই বিষয়ে।

আমাদের স্টাডি সার্কেল মতভেদ দূর করে।
আমরা শিয়া-সুন্নী ছাত্রদের মাঝে এভাবে কাজ শুরু করলাম। ঐ সময়ে পেনসেলভেনিয়াতে সর্বমোট ১৭ জন মুসলিম ছাত্র ছিল। তার মধ্যে ৯ জন শিয়া এবং ৮ জন সুন্নী। আমাদের ঐ সময়ের চলমান স্টাডি সার্কেল এর মাধ্যমে মুসলিম ছাত্র সমাজের নিকট শিয়া-সুন্নী বিরোধ/ঝগড়া দূর করে ফেললাম।

মুসলিম ছাত্র সংগঠন।
আমরা ছাত্র জীবনে ইংল্যান্ড ও আমেরিকায় মুসলিম ছাত্র সংগঠন গড়ে তুলি। ১৯৬০ সালে Muslim Students Society of UK & Ireland (MSS) গঠন করি। ১৯৬১ সালে United Muslim Student Organization of Europe (UMSO) প্রতিষ্ঠা করি। এবং ১৯৬৩ সালে আমি যে বছর ইংল্যান্ড থেকে বিদায় হই ঐ বছর The Federation of Islamic Student Society in UK & Ireland (FOSIS) প্রতিষ্ঠা করা হয়। একই বছর আমি আমেরিকা এসে Muslim Students Association of USA & Canada (MSA) প্রতিষ্ঠা করি। ১৯৬৪ সালে আমি MSA এর জন্য নিউজ লেটার The Horizon প্রকাশ শুরু করি।

বাদশাহ ফয়সালের দাওয়াতে হজ্জ্বে গমন।
১৯৬৫ সালে আমি MSA প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হই এবং বাদশাহ ফয়সালের দাওয়াতে ঐ বছর হজ্জ্ব পালনে মক্কা গমন করি। আমি অনেকটা আনন্দে কেঁদে ফেলি। আমি এক আরব ইরাকী ছাত্র যুবক। আর আজ আমেরিকান মুসলিম ছাত্র সমাজের নেতা হয়ে মক্কা যাচ্ছি- হজ্জ্ব পালন করতে! তারপর বাদশাহ ফয়সাল আমাদের ডাকলেন। সারা বিশ্বের মুসলিম নেতাদের সামনে তিনি ‘অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কনফারেন্স (OIC)’ এর প্রতিষ্ঠার ঘোষণা করেন। সেখানে আমি মাওলানা সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী (র.) কে প্রথম দেখি। উনি আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। সে এক অনন্য অনুভূতি। আবেগ আপ্লুত মন-মনন আমার। মাওলানা মওদূদীর ব্যক্তিত্ববোধ আমাকে প্রচন্ড ভাবে নাড়া দেয়। আর তখনই আমি সিদ্ধান্ত নেই আমৃত্যু আমি দাওয়াহ কাজে যুক্ত থাকবো ইনশাআল্লাহ।

মুত্তাকী হবার সদর দরজা
আমি এক আরব যুবক। তাফহীমুল কোরআনের ফাতিহার তাফসীর পড়লাম। ‘ইয়া-কানা-বুদু অ-ইয়া-কানাচ তাঈন’ এর ব্যাখ্যায় আমার চোখ খুলে গেল। তারপর আমি সূরা বাকারা শুরু করলাম। আমি যখন পড়লাম ‘হুদাললিল মুত্তাকিন’। তখন আমার চোখ থেকে পানি ঝড়তে লাগলো। আমি কোরআনিক চাবি পেয়ে গেলাম। আমি মেনে নিলাম আমার মুত্তাকী হওয়া ছাড়া এই আল কোরআনের থেকে কিছু পাবনা। আমি শুরু করলাম কিভাবে মুত্তাকী হওয়া যায়। আমি পরের আয়াত ণ্ডলোতে পেয়ে গেলাম মুত্তাকী হতে হলে ৬টি শর্ত পালন করতে হবে। আমি এখনো ঐ ছয় শর্ত পালন ও লালন করার চেষ্টা করছি। মুসলিম তরুনদেরকে মাল্টি ডায়মেনশন বা বহুমুখী পদের যোগ্যতা অর্জন করতে হবে। পশ্চিমা জগতে যারা ওহীর নলেজ বিশ্বাস করেনা, ঐ নলেজ আমাদের কাজের মাধ্যমে দেখাতে হবে। বক্তৃতা অনেক করা যায়, কিন্তু বাস্তবে কাজের উদাহরণ মানুষকে আকৃষ্ট করে বেশী।

এক যোগ এক দুই নয়, এক যোগ এক এগারো।
ড. আহমেদ তুতুনজী তাঁর স্মৃতিচারণ মূলক সাক্ষাতকারে আরো বলেন, গণিতের নিয়ম অনুযায়ী ১+১=২ হয়। কিন্তু আমার জীবনের কাজের গতি, গণিতের হিসাব থেকে আলাদা। আমি মনে করি ১+১=১১ জন, ১+১+১=১১১ জন। কোরআনে আছে, তোমরা যদি মুমিন হও তাহলে তোমরা ১ জন ১০ জনের সমান। সেই হিসাবে আমরা তিন ইঞ্জিনিয়ার ছাত্র বন্ধু ড.আহমেদ তুতুনজী, ড.হিসাম আত-তালীব, ড.জামাল বারজীনিজ এই তিনজন ১১১ জনের শক্তি এবং যোগ্যতা নিয়ে কাজ করেছি আমেরিকার ময়দানে। আমাদের সাথে পরে যোগদেন ড. আব্দুল হামিদ আবু সোলায়মান যিনি অন্য ফ্যাকাল্টির ছিলেন। ড. আব্দুল হামিদ আবু সোলায়মান মালেয়েশিয়াতে International Islamic University of Malaysia (IIUM) ইউনিভার্সিটি প্রতিষ্ঠা করে মুসলিম বিশ্বে অনন্য নজীর স্থাপন করেছেন।
আমরা চারজন প্রচন্ড টীম স্পীরিট নিয়ে আমাদের কাজ বাস্তবায়নের জন্য প্রচেষ্টা চালিয়ে যাই। ১৯৬০ দশকের শেষে আমরা আমেরিকার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের MSA এর শাখা-প্রশাখা গড়ে তুলি। ১৯৬৩ সাল থেকে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত আমাদের কাজের গতি পূর্বের তুলনায় ১০% হারে বৃদ্ধি পায়।

বাজেট দুইশত ডলার থেকে দুই মিলিয়ন ডলার।
১৯৬৩ সালে আমরা ৭/৮ জনছাত্র MSA এর অধীনে আমেরিকায় কাজ শুরু করি। আমাদের বার্ষিক বাজেট ছিল মাত্র দুই শত ডলার। ১৯৬৪ সালে ঈদ কার্ড ছাপিয়ে বিক্রী করি এবং আমাদের তহবিল দুই হাজার ডলারে উন্নীত হয়। ১৯৬৫ সালে MSA বার্ষিক আয় হয় বিশ হাজার ডলার। ১৯৬৬ সালে সামার ছুটিতে আমরা সকল আরব ছাত্রদের বলি, তোমরা সবাই নিজ নিজ দেশে ছুটিতে যাচ্ছ, আমরা MSA পক্ষ থেকে আবেদন জানাচ্ছি শুধুমাত্র তোমাদের নিকট আত্নীয়দের কাছে গিয়ে বলবে যে, আমরা MSA আমেরিকার অধীনে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে দাওয়াতী কাজ করে যাচ্ছি। আমাদের সাহায্য দরকার। ঐ বছর আমাদের বার্ষিক আয় হয় দুই লক্ষ ডলার।
১৯৬৭ সালে সারা আমেরিকাতে গঝঅ এর বার্ষিক কনভেনশন করার দাওয়াত পৌঁছানো হয়। ঐ বছর প্রায় ৫০/৬০ হাজার মুসলিম-অমুসলিম আমাদের বার্ষিক কনভেনশন ভিজিট করে। আমাদের বার্ষিক বাজেট উন্নীত হয় দুই মিলিয়ন ডলারে। আমি যখন ছাত্র ছিলাম তখন অর্থাৎ ১৯৬৩ সালে আমেরিকাতে ৭টি সুন্নী মসজিদ ছিল। আর এখন নাকি আমেরিকাতে প্রায় তিন হাজার মসজিদ রয়েছে।

এক ঈদে ১১ বার খুতবাহ প্রদান।
আমার জীবনে একবার এক ঈদের দিনে আমেরিকাতে ১১ বার খুতবা দিয়েছি এবং ঈদের এক দিনে ১১টি জামায়াতে ইমামতি করেছি। আরেক দিনের কথা মনে আছে। একবার এক জুমআর দিনে ৫ বার খুতবা দিয়েছি এবং ৫টি জামায়াতে ইমামতি করেছি। ড.তুতুনজীকে প্রশ্ন করলাম, এই ঘটনা কত সালের। উনি বললেন ১৯৮৮/৮৯ সালের দিকের ঘটনা।

IIFSO ১ম সেক্রেটারী জেনারেল
ড. আহমদ তুতুনজী আজ বিশ্বের ইসলামী ছাত্র ও যুব আন্দোলনের নেতা-কর্মীদের মুখে মুখে উচ্চারিত একটি নাম, একটি প্রতিষ্ঠান। ১৯৬৯ সালে তিনি এবং তাঁর একান্ত আস্থাভাজন কয়েকজন সহযোগিসহ প্রতিষ্ঠা করেন The International Islamic Federation of Students Organizations (IIFSO)। ড. আহমদ তুতুনজী IIFSO এর প্রথম সেক্রেটারী জেনারেল নির্বাচিত হন। এবং তিনি খুব কম বয়সেই ৪০টি ইসলামী বই, বিশ্বের ১০০ টি ভাষায় অনুবাদ করার ব্যবস্থা করেন এবং তা প্রকাশও করেন। বিভিন্ন দেশে দাওয়াহ কাজে ঐ সমস্ত বই বিতরণ করা হয়।
ড. আহমদ তুতুনজী দাওয়াহ কাজে পাঁচটি মহাদেশের হাজার হাজার ছাত্র-যুবককে ইসলামী দাওয়াহ ক্যাম্পে সমবেত করতে সক্ষম হন। ছাত্র জীবন শেষে তিনি বিশ্ব যুব সংগঠন (WAMY) এর ডিপুটি সেক্রেটারী নিযুক্ত হন। দাওয়াহ ও সংগঠনের কাজে ড. আহমদ তুতুনজী ১৮৬ টি দেশ সফর করেছেন। কোন কোন দেশে ড. আহমদ তুতুনজী বিশেরও অধিকবার ভ্রমন করেছেন।

১২ দিনে ১১টি রাষ্ট্র সফর করেছেন, খরচ মাত্র ২০ ডলার।
ড. আহমেদ তুতুনজী তাঁর আরেক স্মৃতিচারণ ঘটনা আমাকে এভাবে বললেন, ১৯৮৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন এর পতন ঘটে। মধ্য এশিয়ায় ছয়টি মুসলিম প্রজাতন্ত্রের জন্ম হয়। ৭০ বছর কমিউনিস্ট শাসনে ঐ অঞ্চলে মুক্তভাবে কেউ সফর করতে পারেনি। আমি তখন সিদ্ধান্ত নেই ঐসব নয়া রাষ্টে সফর করবো। আমি আমার ইচ্ছা সউদী আরবের আল-রাজী ব্যাংকের মালিক সোলায়মান আল-রাজীকে বললাম। আমার কথা শুনে উনিও আগ্রহী হলেন। তখন আমি এবং সোলায়মান আল-রাজী মধ্য এশিয়ার সদ্য স্বাধীনতা প্রাপ্ত ছয়টি মুসলিম দেশসহ ঐ অঞ্চলের ১১টি নয়া রাষ্ট সফর করি। ঐ সময়ে যেখানেই আমরা গিয়েছি সেখানেই আমরা উচ্চ মানের আথিতেয়তা পেয়েছি। মেহেমানদারীসহ সকল সম্মান পেয়েছি। বার দিনের সফরে আমাদের পকেট থেকে খরচ হয়েছে মাত্র ২০ ডলার। সেখানকার মুসলমানরা আমাদের একটি পয়সাও খরচ করতে দেয়নি।

একশো ছাত্র IIUM তে
সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনে মধ্য এশিয়ার মুসলিম (চলবে…..)