বিদ্যুৎ খাতে অবিশ্বাস্য অদক্ষতা ও অপচয়

লিখেছেন ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) পরপর ২০১৭ ও ২০১৮ সালের প্রতিবেদনে সিদ্ধিরগঞ্জের বিদ্যুৎকেন্দ্রটিকে বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল বলে আখ্যা দিয়েছিল। ২০১৮ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়, সিদ্ধিরগঞ্জ ৩৩৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে প্রতি কিলোওয়াটে ব্যয় ৯৬১ ডলার, যা বিশ্বে বর্তমান সময়ে নির্মিত একই ধরনের বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণ ব্যয়ের মধ্যে সর্বোচ্চ। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ব্যয় যুক্তরাষ্ট্রের ডমিনিয়ন ভার্জিনিয়া পাওয়ার প্ল্যান্টে, প্রতি কিলোওয়াটের জন্য ব্যয় হয়েছে ৯৫৫ ডলার। তৃতীয় সর্বোচ্চ ব্যয়বহুল বিদ্যুৎকেন্দ্র পাকিস্তানের ৭৪৭ মেগাওয়াট সিন্ধু ইলেকট্রিক পাওয়ার প্ল্যান্ট, যা কম্বাইন্ড সাইকেলের পাশাপাশি দ্বৈত জ্বালানিভিত্তিক, যার প্রতি কিলোওয়াটের খরচ ছিল ৮৫৪ ডলার।

আইএমইডির তথ্যমতে, ৫৬ শতাংশ তাপীয় দক্ষতায় নির্মিত হরিপুর ৪১২ মেগাওয়াট কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎকেন্দ্র আর ৫৮ শতাংশ তাপীয় দক্ষতার আশুগঞ্জ ৪৫০ মেগাওয়াট কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎকেন্দ্র দুটির তুলনায় সিদ্ধিরগঞ্জ বিদ্যুৎকেন্দ্রের ব্যয় অনেক বেশি হলেও কেন্দ্রটির তাপীয় দক্ষতা কম (সাড়ে ৫৩ শতাংশ)। হরিপুরে কিলোওয়াটপ্রতি ব্যয় হয় ৮৪৭ ডলার, আশুগঞ্জে ৬৩৭ ডলার। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আইসোলেক্সের ব্যর্থতায় স্যামসাং পাওয়ারকে দিয়ে কিছুটা ভিন্ন প্রেক্ষাপটে অত্যধিক ব্যয়ের পরও নির্ধারিত সময়ে উৎপাদন শুরু করতে পারেনি বিদ্যুৎকেন্দ্রটি।

এখানে কয়েকটি গুরুতর বিষয়ের পর্যলোচনা দরকার। এক. নিম্নমান ও আর্থিক সুনামের সংকটে থাকা ঠিকাদার আইসোলেক্সকে কাজ দেওয়ার প্রক্রিয়ায় দুর্নীতির সংশ্লিষ্টতা যাচাই করা জরুরি ছিল। আইসোলেক্সের কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের অনভিজ্ঞতা আদৌ বিবেচ্য ছিল কি না?

দুই. আর্থিক সংকট, ঋণ পরিশোধে ব্যর্থতা এবং ব্রাজিল, কেনিয়া ও রুয়ান্ডায় আইসোলেক্স কন্ট্রাক্ট হারালেও বাংলাদেশ কেন সেসব তথ্য আগে থেকেই আমলে নিয়ে দেউলিয়া এ ঠিকাদার পরিবর্তন করে ফেলেনি?

তিন. হরিপুর ও আশুগঞ্জে বৃহৎ পরিসরে কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের অভিজ্ঞতার পাশাপাশি সিদ্ধিরগঞ্জেও কেন শুরু থেকেই কম্বাইন্ড সাইকেল না করে সিঙ্গেল সাইকেল কেন্দ্র নির্মাণের চুক্তি করা হলো?

চার. কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে বিশ্বের শীর্ষ দুই সুনামধারী কোম্পানি মার্কিন জিই ও জার্মান সিমেন্সকে পাশ কাটিয়ে বাংলাদেশ কেন বারবার নিম্ন ও মধ্যমানের তৃতীয় পক্ষকে দিয়ে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের কাজ দিচ্ছে; যারা এই প্রযুক্তির স্বত্ব রাখে না। ঠিকাদারের কারিগরি অযোগ্যতা প্রসঙ্গে উল্লেখ্য যে ২০১৬ সালের ২২ ডিসেম্বরে আইসোলেক্স, এমনকি সিম্পল সাইকেল ইউনিটকেও চালুর চেষ্টায় ব্যর্থ হয় গ্যাস বুস্টারের টিউনিংয়ের সমস্যার কারণে। এই সমস্যা সমাধান না করেই আইসোলেক্স বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে যায় এবং পরবর্তী সময়ে নিজেদের আন্তর্জাতিকভাবে দেউলিয়া ঘোষণা করে। এখানে প্রশ্ন থেকে যায়, উচ্চ প্রযুক্তিগত প্রকল্পে কারিগরি স্বত্বধারী টেকনোলজি ভেন্ডরকে বিবেচনা না করে বাংলাদেশ কেন একের পর এক অযোগ্য তৃতীয় পক্ষকে কাজ দেয় এবং এর সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ দুর্নীতির সম্পর্ক আছে কি?

পাঁচ. উচ্চপ্রযুক্তিনির্ভর যেকোনো খাতের বড় প্রকল্প নির্মাণের কারিগরি নকশা পর্যালোচনা করার যোগ্যতা বাংলাদেশ কবে অর্জন করবে? বাংলাদেশ কি বিভিন্ন খাতের জন্য আলাদা করে পর্যাপ্তসংখ্যক একাডেমিক ও ইন্ডাস্ট্রিয়াল এক্সপার্ট তৈরির গুরুত্বকে উপলব্ধি করে? সড়ক, সেতু, রেল, বন্দর ও বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে কিলোমিটার বা ইউনিটপ্রতি বিশ্বের সবচেয়ে বেশি খরচ করার পরও কি বাংলাদেশে টেকনোলজি ট্রান্সফার হচ্ছে? চুক্তিগুলো কি টেকনোলজি ট্রান্সফারের অনুকূলে?

প্রকল্প পরিচালনার অদক্ষতা, কারিগরি অদূরদর্শিতা, নিম্নমানের ঠিকাদার নিয়োগের দুর্নীতিমনা ঝোঁক ও প্রকল্প বাস্তবায়নের অতি দীর্ঘসূত্রতার মতো অতি হীন বিষয়গুলোর পাশাপাশি সিদ্ধিরগঞ্জ বিদ্যুৎকেন্দ্র আরেকটি শোচনীয় আর্থিক অপব্যবস্থাপনার জানান দিয়ে গেছে। সেটি হচ্ছে, বৈদেশিক ঋণের গ্রেস পিরিয়ডের অপব্যবহার। সিদ্ধিরগঞ্জে ৩০০ মেগাওয়াটের গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে ২০০৮ সালে ৩৫ কোটি ডলার দিয়েছিল বিশ্বব্যাংক। নির্মাণে চুক্তি সই করা হয় ২০১২ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর। বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরুর কথা ছিল ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে। প্রথমে সিঙ্গেল সাইকেলে করার কথা থাকলেও পরে কম্বাইন্ড সাইকেলে রূপান্তরের জন্য বিশ্বব্যাংক প্রকল্পে অতিরিক্ত ১৭ কোটি ৭০ লাখ ডলার অর্থায়ন করে (তখনকার বিনিময় হার অনুযায়ী ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকার বেশি)। দশমিক ৭৫ শতাংশ সুদ হারে ৩৮ বছরে বাংলাদেশকে ঋণের অর্থ পরিশোধ করতে হবে, যেখানে গ্রেস পিরিয়ড ছিল ছয় বছর। অর্থাৎ বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে সুফল আসার আগেই বৈদেশিক ঋণের গ্রেস পিরিয়ড শেষ। কারিগরি পরিকল্পনা, চুক্তি ও ঠিকাদার নিয়োগ ও প্রকল্প বাস্তবায়নের এই ভয়াবহতা বাংলাদেশের আরও বহু প্রকল্পে দৃশ্যমান।

বিদ্যুৎ উৎপাদনে বর্তমান সরকারের দৃশ্যমান সাফল্য থাকলেও সেখানে আছে আরও বেশ কিছু কলঙ্ক, যা ভবিষ্যতে বর্তমান নেতৃত্বকে বিচারিক সংকটে ফেলার ঝুঁকি তৈরি করেছে। এ রকম তিনটি বিষয়ের একটি হচ্ছে চাহিদা না থাকা সত্ত্বেও বিশেষ গোষ্ঠীর স্বার্থে বারবার উচ্চমূল্যের কুইক রেন্টাল ও ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নবায়ন। দ্বিতীয়টি হচ্ছে, জ্বালানি খরচের বিপরীতে অদক্ষ বহুসংখ্যক ডিজেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের অনুমোদন—যেগুলো পিডিবির বোঝা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। তৃতীয়ত, দুর্নীতিগ্রস্ত প্রক্রিয়ায় তৃতীয় পক্ষের যাচাই–বাছাইহীন চুক্তিতে উৎপাদন না করেই বিশেষ বিশেষ কোম্পানিকে অতি উচ্চহারে ক্যাপাসিটি চার্জ দিয়ে যাওয়া। কয়েক বছর ধরে বেসরকারি খাতে নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের অনুমোদন দিয়ে যাচ্ছে সরকার। পাশাপাশি কয়েকটি মেয়াদোত্তীর্ণ রেন্টাল-কুইক রেন্টাল কেন্দ্রগুলোর চুক্তি নবায়ন করা হয়েছে। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বেসরকারি খাতের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ছে। আর এ বিদ্যুৎ কেনায় প্রতিবছর মোটা অঙ্কের ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করতে হচ্ছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে (পিডিবি)। গত ছয় বছরে পিডিবিকে ক্যাপাসিটি চার্জ গুনতে হয়েছে প্রায় ৩৫ হাজার ৪৮৩ কোটি ৯২ লাখ টাকা। এ ব্যয় বেসরকারি খাত থেকে বিদ্যুৎ কেনার প্রায় ৩৭ দশমিক ২২ শতাংশ, যদিও সরকারি উৎপাদনে এ ধরনের কোনো ব্যয় নেই।

দেশে এখন বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে প্রায় ১৯ হাজার মেগাওয়াট। কিন্তু চাহিদা না থাকায় গ্রীষ্মকালেই উৎপাদন করা হয়েছে সর্বোচ্চ সাড়ে ১২ হাজার মেগাওয়াট, সঞ্চালিত হয়েছে আরও কম। শীতে তা ৭ হাজারে নেমে যাওয়ার শঙ্কা করা হচ্ছে। এতে বিদ্যুতের উৎপাদন সক্ষমতার বড় অংশই অলস থাকছে। চাহিদা বিবেচনা না করে কোনো পরিকল্পনা ছাড়াই দুই বছর আগে বেসরকারি খাতে নতুন কয়েকটি ডিজেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের অনুমোদন দেওয়া হয়। এসব বিদ্যুৎকেন্দ্র বসিয়ে রেখে গুনতে হচ্ছে মোটা অঙ্কের ক্যাপাসিটি চার্জ। ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার (আইপিপি) নামক এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রের বোঝা টানতে হবে ১৫ বছর। ফলে বিদ্যুৎ খাতের বোঝা হয়ে উঠেছে এসব কেন্দ্র, যাদের কারও কারও ইউনিটপ্রতি বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যয় পড়ছে ৭৫ (অ্যাগ্রিকো পাওয়ার সলিউশন) থেকে ৮১ টাকা (প্যারামাউন্ট বিট্রাক এনার্জি)। এই ধারণা অমূলক নয় যে সংশ্লিষ্টদের দুর্নীতির চৌহদ্দিতে থেকেই অকারণে রাষ্ট্রের ৩৫ হাজার ৪৮৩ কোটি ৯২ লাখ টাকা গচ্ছা গেল, ভবিষ্যতে যা আরও বাড়বে।

বর্তমানে বিদ্যুৎ খাতের প্রধানতম আরেকটি সমস্যা হচ্ছে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সঙ্গে মানানসই বিদ্যুৎ সঞ্চালনের সক্ষমতা না থাকা এবং সঞ্চালনের সঙ্গে বিতরণ অবকাঠামোর ব্যাপক কারিগরি অক্ষমতা।

একদিকে নির্মাণে অতি উচ্চ খরচ হচ্ছে, অন্যদিকে প্রতারক ও দুর্নীতির ইন্টারফেসগুলো চুক্তির ফাঁকফোকরে লুটে নিচ্ছে, আরেক দিকে বিতরণ অবকাঠামোর অক্ষমতায় উৎপাদিত বিদ্যুতের পূর্ণ সুফল পাচ্ছে না দেশের গ্রামীণ ও শহুরে নাগরিক। সরকারি মাল এভাবে দরিয়ায় না ঢেলে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক কল্যাণ নিশ্চিত করতে সমন্বিত ও দুর্নীতিমুক্ত পদক্ষেপ নিতে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের সুদৃষ্টি কামনা করি।

লেখক: প্রকৌশলী