একাত্তরের গণহত্যা জাতিসংঘের স্বীকৃতির দাবীতে মন্ট্রিয়লে মানব বন্ধন

লিখেছেন গোপেন দেব

পঞ্চাশোর্ধ রোকেয়া বেগম একজন কর্মজীবি মহিলা। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পরিশ্রমের কাজ। দুপুরে এক ঘন্টার লাঞ্চ ব্রেক পান তিনি। লাঞ্চ না করেই মানব বন্ধনে ছুটে এসেছিলেন রোকেয়া। যে মানব বন্ধনটি গত ১৪ অক্টোবর শুক্রবার দুপুরে অনুষ্ঠিত হয়েছিল মন্ট্রিয়লের ব্যস্ততম বাণিজ্যিক এলাকা ম্যাকগিলের সেন্ট ক্যাথরিন সড়কে। এখানের প্রবাসী বাঙালিরা হাতে হাত ধরে মিলিত হয়েছিলেন বাংলাদেশে একাত্তরের গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির দাবি নিয়ে। রোকেয়া বেগমের মতো সেখানে এসেছিলেন আরো বহু কর্মজীবি নরনারী কাজের ব্রেকে অথবা কাজ থেকে ছুটি নিয়ে। রোকেয়া বললেন, “এসেছি প্রাণের তাগিদে, এসেছি দায়িত্ববোধে তাড়িত হয়ে”। রোকেয়া তাঁর নিকট আত্মীয় চারজনকে হারিয়েছেন একাত্তরে। পাকিস্তানী সেনাদের হাতে তাঁর নিরীহ, নিরপরাধ আত্মীয়রা নিহত হন।


দীপালী সরকারও এসেছিলেন মানব বন্ধনে। তিনি ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করছেন। জানালেন, এমন একটি বিষয়ে মানব বন্ধন হচ্ছে সেটিতে অংশ নিতে না পারলে মানসিক কষ্টে থাকতে হতো তাঁকে। দীপালীর বাপ, কাকা, জেটা সহ পরিবারের নারী, শিশু আট জনকে স্থানীয় রাজাকারদের সহায়তায় পাক বাহিনী লাইন ধরে গুলি করে হত্যা করে। একই দিনে তাঁদের গ্রামের ৬৫ জনকে এলাকার মাঠে দাঁড় করিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে পাক সেনারা।
মানব বন্ধনে আসা প্রবাসী কমিউনিটি নেতা দীপক ধর অপু স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় হারিয়েছেন তাঁর পরিবারের অনেককে। তিনি বলেন, নিরপরাধ এই শহীদ স্বজনদের জন্যে এখনও বেঁচে থাকা স্বজনদের আকুতি শেষ হয়নি।
কর্মসূচিতে যোগ দেয়া অনেকেই এরকম কষ্টের কথা উচ্চারণ করেন। একাত্তরে পাক বাহিনীর ভয়াবহ নৃশংসতার স্মৃতি রোমন্থন করেন এবং মুক্তিযুদ্ধে পাক বাহিনীর এই নির্মম হত্যাকান্ড জাতিসংঘ কর্তৃক এখনও গণহত্যা হিসেবে স্বীকৃতি না পাওয়ায় বিস্ময় প্রকাশ করেন।
মানব বন্ধন আয়োজনের সাথে নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত মুক্তিযুদ্ধের গবেষক, বাংলা একাডেমির পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক তাজুল মোহাম্মদ জানান, আমরা একাত্তর, প্রজন্ম একাত্তর ও বাংলাদেশ সাপোর্ট গ্রুপ- এই তিনটি সংগঠনের উদ্যোগে কর্মসূচিটি পালিত হয়। তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের পঞ্চাশ বছর পার হয়ে গেলেও এটি গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিটি আদায় করা যায়নি। তবে আশার কথা, এবার জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশন বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে নিয়েছে। তাদের আগামি অধিবেশনের আলোচ্য সূচির শুরুর দিকেই এটি স্থান পেয়েছে বলে জানান তিনি।


মানব বন্ধনে আসা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শিশির ভট্টাচার্য্য বলেন, জাতিসংঘ এমনিতেই এটিকে গণহত্যা হিসেবে স্বীকৃতি দেবে না। এজন্যে জাতিসংঘ সহ বিশ্বের ক্ষমতাশীল নেতৃত্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করাতে হবে সুস্পষ্টভাবে। দালিলিক প্রমাণ ও নথিপত্রসহ বুদ্ধিবৃত্তিক প্রচারণা ও চাপ অব্যাহত রাখতে হবে।
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ভাইস চ্যান্সেলর, বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা ড. সৈয়দ শাখাওয়াত হোসেন বলেন, একাত্তরে বাংলাদেশে পরিকল্পিতভাবে, ঠান্ডা মাথায় নৃশংসভাবে নিরীহ তিরিশ লাখ বাঙালিকে হত্যা করে পাক বাহিনী। এই বিভৎস ঘটনা বিশ্বের অন্যতম এক গণহত্যা।
ড. সৈয়দ শাখাওয়াত হোসেন ছাড়াও মন্ট্রিয়লে মানব বন্ধন কর্মসূচি আয়োজনের অন্যতম সংগঠক বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা মেজর(অব.) দিদার আতাউর হোসেন, ড. শোয়েব সাঈদ ও ড. রুমানা নাহিদ সোবহান বলেন, গণহত্যা হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ে বিশ্বের সকল স্থান থেকে বাংলাদেশের সকলকে একযোগে নিরবিচ্ছিন্নভাবে কাজ করে যেতে হবে। এজন্যে দেশে ও প্রবাসে আমাদের নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও দেশাত্মবোধে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। তাঁরা ঠান্ডা আবহাওয়া ও কর্মদিবসেও এই কর্মসূচিতে অংশগ্রহন করেছেন যাঁরা তাঁদের সকলকে ধন্যবাদ জানান।
মানব বন্ধনে বক্তব্য রাখেন মুক্তিযোদ্ধা ড. সৈয়দ সাখাওয়াত হোসেন, মুক্তিযোদ্ধা দিদার আতাউর হোসেন, ড. শোয়েব সাঈদ, ড. রুমানা নাহিদ সোবাহান, তাজুল মোহাম্মদ, রনজিত মজুমদার, অলোক চৌধুরী, শামীমা কালাম, আব্দুল গনি, মুক্তিযোদ্ধা গোলাম মুহিবুর রহমান, মুক্তিযোদ্ধা রাজ্জাক হাওলাদার, সৈয়দ রহমতুল্লাহ, দীপক ধর অপু, ড. শিশির ভট্টাচার্য।


উল্লেখ্য, একই দাবীতে বিশ্বের বিভিন্ন শহরে বাংলাদেশীরা মানব বন্ধন কর্মসূচি পালন করে আসছেন। মন্ট্রিয়লে দুপুর ১২ টা থেকে দেড় ঘন্টা ব্যাপী ডাইন টাউনের হাডসন বে ভবন সংলগ্ন সড়কটি মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ঋদ্ধ নানা বয়সের বহু সংখ্যকপ্রবাসী বাংলাদেশি নরনারীর স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহনে মুখরিত ছিল। কনকনে শীতের মধ্যেও দেশমাতৃকার টানে উজ্জীবিত হয়ে এতে যেমন যোগ দিয়েছিলেন আশি-উর্ধ্ব বয়সী বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ এডভোকেট ফনিন্দ্র কুমার ভট্টাচার্য্য, তেমনি মা বাবার সাথে এতে যোগ দিতে এসেছিল আট বছর বয়সের নাহিদও। তাঁদের হাতে কিংবা গলায় ছিল দাবী আদায়ের লেখা সম্বলিত প্লেকার্ড, ব্যানার, পোস্টার। উচ্চারণে ছিল দাবী আদায়ের শ্লোগান। মূলধারার লোকজনও এ সময় বিষয়টি জেনে দাবীর সাথে সংহতি প্রকাশ করেন।