পরিযায়ী জীবন (২)

জসিম মল্লিক

[পূর্ব প্রকাশের পর]

আমি কোনো কিছুর অংশ হতে পারিনি

মাঝে মাঝে নিজেকে একদম চিনতে পারিনা। খুব অচেনা একজন হয়ে যাই। তখন মনে প্রশ্ন জাগে কে আমি! কেনো আমি! আমার অস্তিত্বের দাবী কি! শৈশব থেকেই এই প্রশ্ন আমাকে তাড়িয়ে বেড়াত। যেখানেই যাই না কেনো, যত দূরেই থাকিনা কেনো হোক সেটা টরন্টো, নিউইয়র্ক, টোকিও, সিডনি, প্যারিস, লন্ডন, ঢাকা বা বরিশাল এই আত্মজিজ্ঞাসা পিছু ছাড়ে না আমার। এতো কোলাহলের মধ্যেও আমি মানুষ নিয়ে চর্চা করি। কে কবে কি বলেছিল, কে কথা দিয়ে কথা রাখেনি, কে কষ্ট দিয়েছিল, কে স্বপ্ন দেখিয়েছিল এইসব ভাবি এবং সবাইকে ক্ষমা করে দেই প্রতিনিয়ত। নিজেকে খুউব নির্ভার লাগে তখন। আমিও ক্ষমা চাই। ঠিক এই রকম মুহূর্তে আমি আরো একা হয়ে যাই। আমার যা করার কথা ছিল তা করিনি। যা বলার কথা ছিল তা বলিনি। আমি নিজেকে একজায়গায় জড়ো করতে পারিনি। যখন কেউ ভালবাসার কথা বলে তখন আমার মনে কৌতুহল জাগে কেনো ভালবাসা! কোথায় থাকে ভালবাসা!! ভালবাসার স্বরুপটা কি! প্রেমিক-প্রেমিকা, বন্ধু, ভাই-বোন, সন্তান, স্বামী-স্ত্রী সব সম্পর্কের মধ্যেই একটা শূন্যতা আছে। কোনো একটা সম্পর্কই নিরবচ্ছিন্ন সুখের না। আমি নিজেও সঠিকভাবে সম্পর্ক রচনা করতে পারিনি। আমার মধ্যেও একটা অসম্পূর্নতা রয়েছে। সংসার আসলে কি! স্বামী স্ত্রীর সম্পর্কই বা কি। স্বামী স্ত্রী মানেই কি একটা ওয়ার জোন! এন্ডলেস যুদ্ধ! এর মধ্যে ভালবাসা কোথায় লুকিয়ে থাকে! ভালবাসা যদি নাই থাকবে তাহলে সম্পর্ক টিকে থাকে কিভাবে! এই রহস্য সহজে উন্মোচিত হয় না!
আমি মানুষের কথায় সবসময় মুগ্ধ হই। আমি সহজেই মুগ্ধ হতে পারি। এটা আমার স্বভাবের অংশ। আমি যেমন সহজে মুগ্ধ হতে পারি তেমনি বিস্মিতও হতে পারি। সামান্য অবহেলা আমাকে বদলে দিতে পারে। সামান্য ভালবাসাও। আমি ক্রমশঃ বদলে যেতে থাকি। তখন মানুষ সম্পর্কে আমার সংশয় জাগে। নিজের সম্পর্কেও। আমি আসলে কেউ না। আমি মানুষ সম্পর্কে গভীরভাবে চিন্তা করি। মানুষ জানার কৌতুহল জাগে। কে আপন, কে পর বুঝতে পারি না সবসময়। স্বার্থের সংঘাত দেখা দিলেই আপন মুহূর্তে পর হয়ে যায়। যাদের ভালবাসা দিয়েছিলাম তারাও কেমন বদলে যায়। আবার অনেক দূরের মানুষ কাছে আসে, আপন হয়, যেখানে কোনো স্বার্থ নাই, চাওয়া পাওয়া নাই, সংঘাত নাই। প্রতিদিনের এইসব ঘটনা, জাগতিক সব ঘটনাবলী আমাকে ক্রমশঃ একলা করে দেয়। আমি কোনো কিছুর অংশ হতে পারিনি।
আলগা চাকচিক্যের কাছে মানুষ বিভ্রান্ত। মানুষ পরাস্ত!
একসাথে অনেক সম্পর্ক গড়া যায় না। একসাথে অনেক সম্পর্ক তৈরী করতে যাওয়াটা ভুল। যারা করে তারা ভুল করে। একসাথে অনেক বন্ধুত্বও করা যায় না। যারা করে তারা ভুল করে। একসাথে অনেকের সাথে সম্পর্ক করতে গেলে কোনো একটা সম্পর্ককেই ণ্ডরুত্ব দেওয়া যায় না। একসাথে অনেক বন্ধু বানাতে গেলে কেউই প্রকৃত বন্ধু হয়ে উঠে না। কাউকেই ণ্ডরুত্ব দেওয়া হয় না। সোশ্যাল মিডিয়ার আবির্ভাব হওয়ার পর থেকে মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্কের ণ্ডরুত্ব কমে গেছে, বন্ধুত্ব ণ্ডরুত্ব হারিয়েছে। গভীর হচ্ছে না কোনো সম্পর্কই। প্রতিটা সম্পর্ক আলগা হয়ে গেছে।
এমনকি যে সম্পর্কণ্ডলো একসময় গভীর ছিল তাও ণ্ডরুত্ব হারিয়েছে। আবার একটা সম্পর্ক তৈরী হতে না হতেই অন্য অনেকের ভীড়ে সেটা তলিয়ে যাচ্ছে। অদেখা মানুষের আকর্ষনে চেনা মানুষ হারিয়ে যাচ্ছে। মানুষ সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না সে কি করবে। কোথায় যাবে। কার কাছে যাবে। কাকে আপন করবে, কাকে দূরে সরিয়ে দেবে। সবকিছু এতো উন্মুক্ত হয়ে গেছে যে আব্রু রক্ষা করাই কঠিন হয়ে গেছে। আলগা চাকচিক্যের কাছে মানুষ বিভ্রান্ত। মানুষ পরাস্ত।
বাইরের অচেনা জগতের কাছে ঘরের চেনা জগতও দূরে সরে যাচ্ছে ক্রমশঃ। ঘরেও মানুষ নিঃসঙ্গ হয়ে যাচ্ছে, একলা হয়ে যাচ্ছে। যে যার মতো ভুবন তৈরী করে নিচ্ছে। সন্তান তার জগত নিয়ে ব্যস্ত, স্ত্রী বা স্বামী নিজ নিজ জগতে ডুবে থাকতে চাইছে। আপাতদৃষ্টিতে এতে কোনো দোষ না থাকলেও সংসারের যে একটা শক্ত বন্ধন ছিল, একসাথে হওয়ার, এক টেবিলে বসার যে একটা কালচার ছিল সেটা অনেকাংশে শিথিল হয়ে গেছে।
মানুষ ক্রমশঃ একাকী হয়ে যেতে চাইছে। মানুষের সাথে মানুষের বন্ধনের যে আকাংখা, গাঢ় একটা সম্পর্ক তৈরীর যে অনুভব সেটা হারাতে বসেছে। আমি নিজেও একসময় খুউব সোশ্যাল মিডিয়ায় বুঁদ হয়েছিলাম। আমি মনে করতাম আমার অনেক বন্ধু দরকার, অনেকের সাথে সম্পর্ক দরকার। কেনো এমন মনে হতো তা জানি না। কিন্তু এখন আমি অনুভব করছি আমার ধারণা ভুল ছিল। মরিচিকার পিছনে ছুটেছি। সময়ের অপচয় হয়েছে যথেষ্ট।
আমি এখন নিজেকে সম্বোরন করার চেষ্টা করছি। সোশ্যাল মিডিয়ার চিত্তাকর্ষক বা ভার্চুয়াল চাকচিক্য আমাকে আর টানে না আগের মতো। ভুল সম্পর্ক, ভুল বন্ধুত্ব বা ভুল মানুষের কাছ থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করছি। এসব করতে গিয়ে আমার যারা সত্যিকার বন্ধু ছিল,পরীক্ষিত বন্ধু, আমার যারা আত্মীয় তাদের কাছ থেকে দূরে সরে গেছি। তারাও আমাকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে। তবে সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে আমি কিছু অসাধারণ মানুষ পেয়েছি বন্ধু হিশাবে। সুতরাং সবটাই অর্থহীন নয়।
তাই যা পেয়েছি তাই নিয়ে আমি সন্তুষ্ট। অনেক মানুষকে নিরীক্ষা করার ইচ্ছা আমার নাই। যাদের সাথে একসময় উঠা বসা করেছি, যারা একসময় আমার সুখে দুঃখের সাথী ছিল, একটা সিগারেট ভাগ করে খেয়েছি, একটা জামা ভাগাভাগি করে পড়েছি, একপ্লেটে খেয়েছি, বিছানা শেয়ার করেছি, এক কাপ চাও ভাগাভাগি করেছি, যাদের সাথে বুকে বুক লাগিয়েছি, হৃদয়ের স্পন্দন শুনেছি তাদের কাছ থেকে দূরে সরে গেছি। এজন্য দায়ী আমার যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা, এজন্য দায়ী সোশ্যাল মিডিয়া। এখন শিকড়ে ফেরার আকুতি আমার।
মানুষ চলে যায় কিন্তু তার সবকিছু পড়ে থাকে
আমি আমার নিজের ঘর আর লেখার টেবিলের চারপাশ দেখে অস্থিরবোধ করি মাঝে মাঝে। এতোকিছু দরকার হয় জীবনে! চোখ বুলালেই দেখতে পাই শাদা বিছানা, টেবিল লাইট, বুক শেলফে থরে থরে বই। হরেক রকম ওষুধ। ডায়াবেটিস মেডিকেশন , প্রেসার মেডিকেশন, নানা ধরনের সাপ্লিমেন্টারি ওষুধ, ভিটামিন বি কমপ্লেক্স, ভিটামিন ডি ও ক্যালসিয়াম, ভিটামিন সি, ওমেগা থ্রী ফিশ জেল, চোখের স্বাস্থ্য পরিচর্জার জন্য ভিটাল্যাক্স, হাইলো বা আই ড্রপ লুব্রিক্যান্ট, ওয়াইপস আই ল্যাশ ক্লিনজার, প্রেসারের মেশিন, ব্লাড সুগার মাপার সরঞ্জাম, বিভিন্ন ধরণের ডিভাইস যেমন ফুট ম্যাসেজ, নেক আর শোল্ডার ম্যাসেজ, স্যালোনপাস, লাকোটা, রাব, ভলটারিন, ডা: হো’র ডিভাইস ইত্যাদি।
এছাড়া জীম বাইক, এক্সারসাইজের সরঞ্জাম, চশমার লেন্স ক্লিনিং ওয়াইপস, লিকুইড, আফটার শেভিং, বডি লোশন, পারফিউম, ডেক্সটপ, প্রিন্টার, হার্ডড্রাইভ, ইন্টারনেটের রাউটার, টেলিভিশন, অডিও, ফোন, চার্জার, হেডফোন, কলম, কাগজ, স্কচ টেপ, স্টাপলার, এনভেলাপ, হেলথকার্ড, ডেবিট কার্ড, ক্রেডিট কার্ড, ডাইভিং লাইসেন্স, বিভিন্ন স্টোর কার্ড, পয়েন্টস কার্ড, সিএএএর মেম্বার কার্ড, গাড়ির চাবি, ঘরের চাবি, খাতাপত্র, প্রচুর বিল এবং আরো অনেক কিছুৃ।
অথচ আমার মা যতদিন বেঁচে ছিলেন সামান্য কিছু আসবাব দিয়ে পুরো জীবন পার করেছেন। একটা স্যুটকেসের মধ্যে বন্দী ছিল মায়ের সারা জীবন। মায়ের স্বপ্ন, ভাবিষ্যত, দান খয়রাত, আশা আকাংঙ্খা সবকিছু। অল্প কয়েকটা, শাড়ি, ব্লাউজ, গরমের শাল, কিছু খুচরা টাকা, সামান্য কিছু জুয়েলারি। মা ফেন্সি শাড়ি বা জুয়েলারি পড়তে চাইতেন না। কিন্তু মায়ের বৈধ্যবের বেশ আমার ছিল অপছন্দ। মাকে আমি শাড়ি, জুয়েলারি কিনে দিতাম। বেশিরভাগ মা অন্যদের দিয়ে দিতেন। আমি জানি মা এণ্ডলো দিয়ে দেবেন। তাই মা’কে কখনও এসব নিয়ে প্রশ্ন করতাম না। যতবার বাড়িতে গেছি মায়ের জন্য শাড়ি নিয়ে গিয়েছি। মায়ের সেই বিছানা, সেই প্রিন্টেড বেডশিট, সেই বালিশ, সেই ধুলো পড়া স্যুটকেস, পানের সরঞ্জাম, পাশের টেবিলটায় লাল টেবিলক্লথ, ঘরের জানালার ধারে সেই শরিফা গাছটা(আতা ফল) আজও আছে। শুধু মা নাই। মানুষ চলে যায় কিন্তু তার সবকিছু পড়ে থাকে।
আমার নিজের কৈশোর জীবনেও কোনোকিছুর দরকার হয়নি। ছিলও না কিছু, জানতামও না। একটা পড়ার টেবিল, দুইটা জামা, দুইটা প্যান্ট, কিছু গোপনীয় জিনিস, ঘুড়ির সরঞ্জাম, চারাখেলার জন্য সিগারেটের কাগজ, একটা টেনিস বল, মার্বেল, গাড়ির রিং দিয়েই দিব্যি চলে গেছে। এমনকি কলেজ, বিশ্বাবিদ্যালয় জীবনেও সামান্য কিছু জিনিসপত্র দিয়ে পার করেছি দিন। একটা সুটকেস, কিছু গল্পের বই, কিছু প্রেমের চিঠি, লেখার খাম, বিচিত্রা পত্রিকা, আর মুখস্থ্য করার জন্য নোট ছিল সম্বল হল জীবনে। সংসার শুরু হওয়ার পর থেকেই এবং যত বয়স বাড়ছে তত গ্যাজেটস বাড়ছে জীবনে, ওষুধের সংখ্যা বাড়ছে। মাঝে মাঝে এসব দেখে পেরেশান হয়ে যাই। মনে মনে ভাবি, ছি! এতোকিছুর কোনো দরকার নাই। জীবনের আয়োজন যত সংক্ষিপ্ত করা যায় ততই ভাল।
লেখার আনন্দ, লেখকের আনন্দ
লেখালেখি ব্যাপারটা এখনও আমার কাছে শখের পর্যায়ে রয়ে গেছে। এমনটাই থাকবে। আমি লিখি আমার যখন লিখতে ইচ্ছা করে তখন। লেখালেখি নিয়ে আমি কোনো চাপ নিতে পারি না। ফরমায়েসি লেখাও আমি লিখি না। কেউ লেখার ব্যাপারে ডিক্টেড করলে তার জন্য লিখা থেকে বিরত থাকি। লেখালেখি কোনো পরীক্ষার হলে বসা না! লেখালেখি হচ্ছে আনন্দের একটা উপকরন। লিখে সম্মানী পেতে ভাল লাগে আমার। বই লিখে রয়্যালটি পেতেও ভাল লাগে। নর্থ আমেরিকার অনেক পত্রিকা আছে যারা ফ্রী লেখা চায়। যারা ফ্রী লেখা চায় তাদের যা মন চায় দিয়ে দেই। তারাও কিছু বলতে পারে না। যারা লেখার সম্মানী দেয় তারা মাঝে মাঝে তাদের চাহিদার কথা বলে। চাহিদা পূরন করতে না পারলে লেখা বন্ধ থাকে আমার তরফ থেকেই। লেখালেখি নিয়ে আমার কোনো দৌড়ঝাপ নাই। একটা লেখার জন্য দশটা বই খুলে বসি না আমি। আমি অন্যের বই থেকে সহজে কিছু কোট করি না। শুধু মাঝে মাঝে কবিতার লাইন ব্যবহার করি। যদিও আমি নিজে কোনোদিন কবিতা লিখব বলে মনে হয় না।
মনের আনন্দের জন্য লিখি আমি। লেখা আছে বলে নিজেকে আমার কখনও একলা মনে হয় না। লেখার হরফের সাথে আমি সখ্য গড়ে তুলি। লেখার চরিত্রদের সাথে কথা বলি। হাসি, কাঁদি, অভিমান করি। মানুষের সাথে আমি এণ্ডলো করতে পারি না। মানুষের কাছে হাসি, কান্না, অভিমানের কোনো ভ্যালু নাই। আমার শৈশবকালটা ছিল অদ্ভুৎ এক আলো আঁধারিতে ভরা। এক-একদিন সন্ধ্যেবেলা আমার খুব মন খারাপ লাগত। এমন এক-একটা বিকেল বেলা আছে যখন সূর্য ডুবে যাওয়ার সময়ে অন্ততঃ একটা মায়াবী অপার্থিব আলো এসে পড়তো উঠোনে। আকাশের রং যেত পালটে। সমস্ত বাড়িটায় কেমন এক আলো আঁধারির সৃষ্টি হত। হঠাৎ হঠাৎ আমার বহুজনের মাধ্যে হারিয়ে যাওয়া আমাকে অনুভব করতাম। টের পেতাম আমার আলাদা একা এক ’আমি’ আছে। সেই সব বিষন্ন বিকেলে আমার মাঝে মাঝে মায়ের কাছে যেতে ইচ্ছে হত। প্রায়ই পশ্চিমের ঘরে মাকে খুঁজতে গিয়ে পেতাম না। সারা বাড়ি খুঁজে মাকে হয়ত পেতাম বড় ঘরের পাটাতনের সিঁড়ির তলায় গামলায় চাল মেপে তুলছে। আমি অবোধ দুর্জ্ঞেও এক বিষন্নতা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্যই যে মায়ের কাছে গেছি তা মা বুঝত না।
আমি তখনই সিদ্ধান্ত নিলাম আমি লিখব। আমার যে একটা ভুতুরে আমি আছে, কল্পনার জগত আছে, বই পড়ে আমার সেই জগতটা আরো জীবন্ত হয়ে উঠে। আমি লিখতে চাই কিন্তু কিভাবে লিখতে হয় তা জানি না। কিভাবে বাক্য গঠন করতে হয়, শুদ্ধ বানান, ভাষাজ্ঞান থাকা দরকার সেসব আমার নাই। পাঠ্য বইয়ের গল্পণ্ডলো খুব মন দিয়ে পড়তাম। লেখার ব্যাকরন নিয়ে আমি মাথা ঘামাই না। লেখা পড়তে ভাল লাগলেই হলো। হৃদয়কে স্পর্শ করলেই হলো। আমি পড়তে খুব ভালবাসি। লেখার চেয়েও পড়ার আগ্রহ আমার বেশি। আমার সংগ্রহে এতো অপঠিত বই আছে যে সেসব কবে শেষ করব জানিনা। মনে হচ্ছে আর একবার জন্ম নিতে হবে। স্কুল কলেজে পড়ার সময় থেকেই আমি প্রচুর চিঠি লিখতাম। আমার অনেক পেনফ্রেন্ড ছিল। চমৎকার সব চিঠি আসত আমার কাছে। আমিও রিপ্লাই দিতাম প্রতিটা চিঠির। পত্রিকায় চিঠিপত্র লিখতাম। পত্রলেখক হিসাবে আমার একটা খ্যাতি হয়েছিল। চিঠি লিখতে লিখতেই আমার গল্প উপন্যাস লেখার প্রতি আগ্রহ তৈরী হয়। পরবর্তীকালে অনেক স্মৃতিকথাও লিখেছি। এজন্য ফেসুবকের প্রতি কৃতজ্ঞ। সেইসব পত্রবন্ধুদের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ যারা আমার কল্পনার জগতটাকে উস্কে দিয়ে দিয়েছিলেন।
লেখা নিয়ে কখনও সাহিত্য সম্পাদকের কাছে যাইনি। লেখা ছাপানোর জন্য অনুরোধ করিনি। সত্যি বলতে কি আমি সাহিত্য সম্পাদকদের খুব বেশি চিনিও না। আমার যে এতো বই প্রকাশিত হয়েছে আমি কখনও আমার বই নিয়ে কোনো লেখকের দরজায় ধর্ণা দেইনি। বলিনি ভাই আমার লেখাটা একটু পড়বেন। কারণ লেখা পড়ে যখনই কেউ বলবেন কিছুতো হয়নি বা অনেক ভুল ধরবেন তখন আমার মন ভেঙ্গে যাবে। নিজের লেখা নিয়ে তাই কথা বলতে আমার লজ্জা লাগে। লেখকদের মধ্যে গ্রুপিংয়ের কথাও শোনা যায়। আমার কোনো গ্রুপ নাই। ওসব একদম পারি না আমি। শুধু ভাল লিখতে পারা বা পাঠক প্রিয় হওয়াই একজন লেখকের একমাত্র যোগ্যতা না। তার আরো অনেক যোগ্যতা থাকতে হয়। কেউ আমার বই কিনলে আমি মহা খুশী। লেখা পড়লে খুশী হই। উৎসাহ বেড়ে যায়। আমি আমার আনন্দের জন্য লিখি। সবশেষে একটা গোপন কথা বলি, লেখকরা আমার কাছে এখনও এক স্বপ্ন। আমি বরিশাল ছেড়ে ঢাকা এসেছিলাম লেখকদের কাছ থেকে দেখব বলৃে।

টরন্টো ৩ অক্টোবর ২০২২