পরিযায়ী জীবন

জসিম মল্লিক

জীবন এক ছোট্ট ভ্রমন

সেই অর্থে আমার কখনও কোনো উচ্চাশা ছিল না। শৈশবে যখন থেকে আমি পৃথিবীকে জানতে শুরু করেছি, আমার পারিপার্শ্ব, আমার পৃথিবী, আমার অবস্থান তখন থেকেই আমি বুঝতে পেরেছি আমার উচ্চাশা পোষন করার কোনো কারণ নাই। জীবন তার আপন নিয়মে চলবে। প্রাকৃতিক নিয়মে বেড়ে উঠতে থাকি আমি। এই পৃথিবীতে আসার পিছনে আমার কোনো ভূমিকা নাই। মানুষ পৃথিবীতে আসে দুঃখ কষ্ট, রোগ শোকে ভুগে গত হওয়ার জন্য। সুখ সাময়িক। এটাই জন্মের রহস্য। এটাই মানুষের নিয়তি। যতদিন বেঁচে থাকে একটা ছোট্ট জার্নি শুধু। সেই পথ চলায় অনেক কিছু থাকে। সাফল্য থাকে, ব্যার্থতা থাকে। পাওয়া থাকে, হারানো থাকে। আমি জন্মের পর থেকেই জানতাম আমার নিঃসঙ্গতা থাকবে, কাউকে না বোঝা থাকবে, আমাকে কারো বুঝতে না পারা থাকবে, নানা প্রতিকুলতা থাকবে, দুঃখ-কষ্ট, অভাব-অনটন, না পাওয়া থাকবে। অনেক লড়াই থাকবে। ভুল ভ্রান্তি থাকবে। পাপ থাকবে। অনুশোচনা থাকবে। প্রেম-ভালবাসা থাকবে, মায়া- মমতা থাকবে। অন্যের প্রতি আকৃষ্ট হওয়া থাকবে। আজও আমি কোনো উচ্চাশা পোষন করি না। তেমন কোনো প্রত্যাশা নাই। শুধু একটাই প্রত্যাশা সুস্থ্যভাবে এই পৃথিবী থেকে বিদায় নেওয়া।
এই দীর্ঘ চলার পথে যা কিছু পেয়েছি তার বেশিরভাগ অপ্রত্যাশিত। ভাগ্য সহায়তা করেছে। সংসার, সন্তান, বন্ধু তার সবই অচিন্তিনীয়ভাবে ঘটেছে। এতো কিছু ঘটার কথা কথা ছিল না। এতো আনুকল্য পাওয়ার কথা ছিল না। এতো বিস্তৃত পরিসর হওয়ার কথা ছিল না। কোনো পরিকল্পনা করে কিছু ঘটেনি আমার জীবনে। প্রকৃতি হাত ধরে আমাকে টেনে নিয়ে গেছে নানাভাবে।
আমি নিজেকে সৃষ্টিকর্তার করুনার কাছে সঁপে দিয়েছিলাম। আমি সবসময় বিশ্বাস করতাম একজন কেউ ক্ষমতাবান আছেন যার ইশারায় এই বিশ্বভ্রম্মান্ড পরিচালিত হয়। না হলে এতো সুচারুরুপে সব চলত না। রাতের পর দিন আসত না। শীতের পর গ্রীস্ম আসত না। এতো নিখুঁত হওয়া মানুষের পক্ষে সম্ভব না। আমি সেই অর্থে কঠিন ধার্মিক না হলেও আমার ঈশ্বর বিশ্বাসের জায়গাটায় কোনো খাঁদ নাই। যারা বিশ্বাস করে না তাদের প্রতিও আমার কোনো দ্বিধা নাই। সবাই একভাবে সৃষ্টি, সবাই মানুষ এই বিশ্বাস আমি নিজে নিজেই অর্জন করেছি। মানবতার চেয়ে বড় কোনো ধর্ম নাই এটা আমি কারো কাছ থেকে শিখিনি। তাই ধর্ম বর্ণ নির্ষিশেষে আমি মানুষকে ভালবাসি, সখ্যতা করি, বন্ধু ভেবে বুকে টেনে নেই। তারাও আমাকে বুকে টেনে নেয়।
আমার ভিতরে অনুশোচনা অনেক প্রবল। কৃতজ্ঞতাবোধ প্রবল। আমি জীবনে অনেক ভুল করেছি। আপাতদৃষ্টিতে সেই ভুলণ্ডলো অন্যের জন্য ক্ষতিকর না হলেও এসব আমাকে সবসময় পীড়া দেয়, বিষন্ন করে দেয়। আমি সামান্য মানুষ বলেই আমার ভুল হয়। এমন অনেক ভুল আছে যা জেনে শুনেই করেছি। সেইসব ভুল এখন অহর্নিশ আমাকে যন্ত্রণা দেয়। মানসিকভাবে বিপর্যস্তবোধ করে। আমি আমার ভুলণ্ডলো শোধরাতে চাই, অনুশোচনায় ভুগি এবং ভুলের জন্য ক্ষমাপ্রার্থী থাকি সবসময়। ক্ষমা চাইতে আমার একটুও খারাপ লাগে না। নিজেকে ছোট মনে হয় না। আমি আমার সন্তানদের কাছেও ক্ষমা চাই। আমি স্ত্রী, বন্ধু, আত্মীয়দের কাছেও ক্ষমা পাওয়ার জন্য অনুনয় করি।
বয়স বাড়ার সাথে সাথে নিজের মধ্যে পরিবর্তন হয়। নানা কার্যকারণ, ঘটনা, পরিস্থিতি মানুষকে বদলে দেয়। আমার ক্ষেত্রেও এমনটা হচ্ছে। আমি নিজেকে প্রকাশ করার চেষ্টা করি বলে এইসব কথা বলতে পারছি। বলতে পেরে নিজেকে কিছুটা হালকা করতে পারছি। তবে সব কথা বলা যায় না। সবারই এমন অনেক গোপনীয়তা আছে যা কাউকে বলা যায় না। লেখা যায় না।
আমি পৃথিবীর প্রতি মোহ ঘোচানোর চেষ্টা করছি। চাওয়া পাওয়াণ্ডলিকে ছোট করে আনতে চাচ্ছি। ঠিক শৈশবের দিনণ্ডলিতে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা যখন জীবনে কোনো আয়োজন ছিল না। দিনশেষে সবাইকেই এই পথ বেছে নিতে হয়। আমার এই বোধদয় হচ্ছে যে জীবন অতি তুচ্ছ। ছোট্ট একটা জার্নি মাত্র। চোখ মুদলেই সব কিছুর পরিসমাপ্তি। এক অনন্ত ঘুম। মহান ঘুম। এই কথা আমি সবসময়ই লিখি। এটা চরম সত্যি। চলার পথে আমাদের অনেক ভুল ভ্রান্তি থাকে, অন্যকে কষ্ট দেওয়া থাকে, সাফল্য আর ব্যর্থতা থাকে, রোগ শোক থাকে। কত মানুষ নানা কষ্টে ভুগছে, অসুস্থ্যতায় ভুগছে, অভাবে ভুগছে, বিনে চিকিৎসায় মারা যাচ্ছে। অনেকে চিকিৎসার অতীত। মানুষ আসলে অনেক অসহায়। মানুষ আসলে অনেক একলা। কেউ সফল, কেউবা ব্যর্থ এই যা তফাৎ।
সৃষ্টির রহস্য বোঝা সত্যিই কঠিন। মানুষ যতদিন বাঁচে ততদিনই আশা স্বপ্ন আর প্রত্যাশা থাকে। আমি মুখে কোনো উচ্চাশা নাই বলি ঠিকই, কিন্তু অবচেতনে স্বপ্ন লালন করি। স্বপ্ন দেখি একদিন দেশে ফিরে যাব। মা বাবা ভাই বোনের কবরের পাশে গিয়ে বসব। নিজেকে সুস্থ্য দেখতে চাই, অসুস্থ্যতায় ভুগতে চাই না। জানি জীবনে চাওয়ার মতো করে সবকিছু ঘটে না। সবকিছু মানুষের হাতে নাই। সব স্বপ্ন পূরণ হয় না। নিউইয়র্ক বইমেলায় যাওয়ার কথা ছিল। কিরন ভাইয়ের কাছে থাকার কথা ছিল। কিন্তু যাওয়া হলোনা। জীবন এমনই। রহস্যে ভরা। তাই বলে স্বপ্ন থাকবে না তা নয়। স্বপ্নই আমাদের বাঁচিয়ে রাখে। শুধু জীবন জার্নিটা সুন্দর হোক, স্বভাবিক হোক, ভালবাসার হোক, মায়া মমতার হোক, সুস্থ্য থাকার হোক- এই প্রত্যাশা।
আমরা দলবেঁধে ণ্ডলণ্ডল্লা খেতাম আমার পুরো জীবনটাই একটা লড়াই সংগ্রামের মধ্য দিয়ে কেটেছে। শৈশব কৈশোরে যে লড়াই শুরু হয়েছে তা আজও থামেনি। শৈশবের লড়াই ছিল স্কুলের গন্ডি পেরোনো। ভাল রেজাল্ট করা। রেজাল্ট ভাল না হলে বাবা মায়ের বকা খাওয়া। তারমধ্যেও একটা প্রচন্ড সারল্য ছিল, উচ্ছলতা ছিল, চ্যালেঞ্জ ছিল।
পাড়ার খেলার সাথী, স্কুলের বন্ধুরা মিলে সবকিছুই সুন্দর মনে হতো। তারপর কলেজ জীবন থেকে বিশ্ববিদ্যালয় জীবন। সেই জীবনও এতো মসৃণ ছিল না। কিন্তু কোনো অভিযোগ ছিল না। ক্যাম্পাস দিয়ে হাঁটলেই নিজেকে বীর মনে হতো। কখনও একলা মনে হয়নি। প্রতিটা শিক্ষার্থীই যেনো আমার বন্ধু। অনেক কিছু না থাকলেও সেসব নিয়ে মনে কোনো কষ্ট জাগেনি। এখনকারমতো এতো নিয়মতান্ত্রিক, যান্ত্রিক বা হিসাব নিকাশের ব্যাপার ছিল না। সামান্য অসুখ বিসুখে ডাক্তারের
কাছে যাওয়ার দরকার পরেনি তেমন। অসুখ এমনি এমনি ভাল হয়ে যেতো। শরীর সয়ে নিত পারত অনেক কিছুই। শরীরের নিজস্ব প্রতিরোধ ক্ষমতায় অনেক অসুখ সেরে যেতো। ছোটবেলার জ্ব,র কাশি, ফোঁড়া, ঘামাচি এণ্ডলো ভুগে ভুগে একসময় ভাল হয়ে হতো। ওষুধের কথা মনেই হতো না।
তারপর শুরু হলো সংসার জীবন। স্ত্রী সন্তান নিয়ে এক নতুন জীবনের আবাহন। সেটাও একটা লড়াই। অনন্ত লড়াই। লড়াই হলেও তারমধ্যে ছিল চ্যালেঞ্জ। সন্তানদের মানুষ করার চ্যালেঞ্জ, স্ত্রীকে সুখী করার চ্যালেঞ্জ। যতনা নিজের প্রতিষ্ঠার জন্য তারচেয়ে বেশি টিকে থাকার জন্য, পরিবারের নিরাপত্তার জন্য আমি সবকুটু ত্যাগ স্বীকার করতে রাজী ছিলাম সবসময়। তারমধ্যে সততা বা নিজের আত্মসম্মানের প্রতিও সচেতন থেকেছি। এক জীবনে প্রতিষ্ঠা, সাফল্য, স্বাচ্ছন্দ, ঈর্ষা, প্রতিহিংসা, প্রতিযোগিতা, ঘৃণা, ভুল করা, কষ্ট দেওয়া, কষ্ট পাওয়া থাকে আমাদের। অনেক ভুলও করেছি। ভুল থেকে শিখছি। সন্তানের জন্য, পরিবারের জন্য আমরা অনন্ত ত্যাগ করি। প্রাণপাত করি। সন্তানের সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য নিজেকে উজার করে দেই। সন্তানের কষ্টে মূহ্যমান হয়ে পড়ি। এটাই হয়ত ভালবাসা। পক্ষান্তরে সন্তান কিন্তু বাবা মায়ের কষ্টে সেভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে না। মা বাবা হওয়া এতো সহজ না। আমাদের সন্তানরা আবার যখন বাবা মা হবেন তখনও এমনটাই ঘটে। এটাই হয়ত পরম্পরা। চক্রাকার জীবন।
তবে শৈশব, কৈশোর,তারুণ্য, পরিণত এই বয়স বা প্রৌঢ়ত্ব আসবে তবে যেটাই হোক না কোনো পুরো জীবন নিয়ে আমার কোনো অনুশোচনা নাই। যা পেয়েছি তাতেই আমি সন্তুষ্ট। যা পাইনি তা নিয়ে কোনো অভিযোগ নেই। আসলে জীবনে চাওয়া পাওয়ার অঙ্কের হিসাব সহজে মেলেনা। সত্যি বলতে ওইভাবে আমার নির্দিষ্ট কিছু চাওয়ার ছিল না যা না পেয়ে আমি কষ্ট পেয়েছি। আমি মনে করি প্রত্যাশার চেয়েও আমি বেশি পেয়েছি এবং যা পাই আমি নিজেকে তারই যোগ্য মনে করি। সংসার, সন্তান, আত্মীয় ,বন্ধু ,পারিপার্শ্ব নিয়ে আমি সুখী। মানুষের সুখ আসলে মনে। সুখী হওয়া খুবই সহজ কাজ। সামান্য কিছুতেই আমি সুখী হতে পারি। জীবনের প্রতিটি অধ্যায়েই রয়েছে সুখের ঘটনা। কম থাক আর বেশি থাক সবটাই একটা অনুভব। জীবন থেকে সুখ আহরন করে নিতে হয়।
ছোটবেলার স্মৃতিণ্ডলো সবসময় আনন্দের। সব বড় শহরের যেমন একটা ল্যান্ডমার্ক থাকে যেমন প্যারিসের আইফেল টাওয়ার, নিউইয়র্কের স্টাচু অব লিবাটি, টরন্টোর সিএন টাওয়ার, লন্ডনের লন্ডন আই তেমনি বরিশালে আমাদের বাড়িটাকে সবাই এক নামে চিনত ’মল্লিক বাড়ির পুল’ বলে। সামান্য একটা কাঠের পুল সেটাই চেনা ছিল সবার। রিক্সাওয়ালারা একটানে নিয়ে আসত। সেই পুল দিয়ে আমরা ভরভরন্ত খালে ঝাপা ঝাপি করতাম। সাঁতার কাটতাম। আমাদের বড় পরিবার। চারটা বাড়ি মোট। অনেকণ্ডলো পুকুর আর ফলফলাদির গাছ, কবরস্থান, খেলার মাঠ। চারিদিকে সবুজ, বাশ ঝাড়, ঘন জঙ্গল। রাতে জোঁনাকি পোকারা উড়ে বেড়ায়, দুপুরে ঝিঁ ঝিঁ পোকারা ডাকছাড়ে একটানা। ঘুঘু ডাকে।
এসবের মধ্যে আমি ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকি। পুলের গোড়ায় একটা টং রেষ্টুরেন্ট ছিল। খুব সকালে সেখানে সবজী আর পরাটা ভাজা হতো। সেই পরাটা আর সবজীর মন আকুল করা স্বাদ ছিল। দুর থেকেই পরাটার ঘ্রাণ ছুটত। দুপুরের দিকে ভাজা হতো ণ্ডলণ্ডল্লা। আমরা দলবেঁধে সেই ণ্ডলণ্ডল্লা খেতাম আর খালে ঝাঁপ দিতাম। কোথায় হারিয়ে গেছে ণ্ডলণ্ডল্লাহ। ণ্ডলণ্ডল্লা খাইতে মন চায়..।
টরন্টো২৩ নভেম্বর ২০২১
হঠাৎ মধ্যদুপুরে
জীবনের বাঁকে বাঁকে অনেক রহস্য লুকিয়ে থাকে। সেই শৈশব থেকেই জীবনের নানা রহস্য উপলব্ধি করে আসছি। অনুভব করছি জীবনের প্রতি পদক্ষেপে রয়েছে সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম সব ঘটনা। প্রতিটি ঘটনা থেকেই কিছু শিখেছি। জীবনে কোনো অভিজ্ঞতাই মূল্যহীন নয়। জীবন দু’হাত ভরে যেমন দেয় তেমনি কেড়েও নেয়। দুটোই জীবনের অংশ। দুটোকেই সহজভাবে মেনে নেওয়াই জীবনের সৌন্দর্য্য। যদি সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্মাতাম তাহলে জীবনের কঠিনতম অধ্যায়ণ্ডলো হয়ত উপলব্ধি করতে পারতাম না। সেটা হয়নি বলেই জীবনকে চিনতে পেরেছি, জীবনের কঠিন বাঁক আর সামনের দুর্গম পথ চেনাতে সাহায্য করেছে।
আমি স্বীকার করি যে আমার বেড়ে ওঠা জীবনে অনেক লড়াই সংগ্রাম, না পাওয়া আর বঞ্চনা ছিল কিন্তু আবার এটাও ঠিক সেইসব ঘটনা আমার মনে কোনো মন্দ রেখাপাত করেনি, আমি আনন্দ নিয়ে পথ চলেছি। যা পাইনি তা নিয়ে কোনো অুনশোচনা হয়নি বা কাউকে দায়ী করিনি কখনও। সবই জীবনের অংশ। এখনও যা ঘটে জীবনে সবই সেই রহস্যের বাঁক। মাঝে মাঝে ভেঙ্গে পড়ি বটে আবার সেসব কাটিয়ে উঠে সোজা হয়ে দাঁড়াতে চেষ্টা করি। এ ব্যাপারে আমার কয়েকজন বন্ধু, আত্মীয় আমাকে সাহয্য করেছে। আমার স্ত্রী আমার সন্তানরাও আমার জন্য বিরাট অনুপ্রেরণা। বেঁচে থাকার টনিক।
এই বছরটা আমার জন্য খুবই ঘটনাবহুল বছর ছিল। বছরটা শুরু হয়েছিল দারুণভাবে। যদিও কোভিডের কারণে বন্ধীত্ব ঘোচেনি তা সত্বেও পরিকল্পনা সাজাতে কোনো সমস্যা হয়নি। কিন্তু ওই যে জীবনের রহস্য বোঝা যায় না। পরিকল্পনামতো সব ঘটে না। আগষ্ট মাসে আমার একটা সার্জারি হলো। সেটা থেকে সেরে উঠতে না উঠতেই হঠাৎ ঘার মাথা ব্যাথা শুরু হলো। ডাক্তার, হাসপাতাল ছুটাছুটি হলো যথেষ্ট। তারপর গত সপ্তাহে গরম চা পড়ে পা সেকেন্ড ডিগ্রী বার্ণ হয়েছে। কষ্টের ছিল সেইসব দিনণ্ডলি।
সেই কঠিন দিনণ্ডলোতে প্রতিদিন আমাকে সাহস যুগিয়েছেন অটোয়া থেকে রিটন ভাই, টরন্টোর আলম ভাই, সিনা, ঢাকা থেকে কালাম সহ আমার আত্মীয়রা, নিউয়র্কের সেলিনা আমার খারাপ সময়কে সহজ করে তোলার জন্য মেডিটেশন করাচ্ছেন প্রতিদিন। এই মানুষণ্ডলোর কথা আমি ভালবাসার সাথে স্মরণ করি। আমি মনে অনেক সাহস সঞ্চয় করেছি। আমার একটা উপন্যাস লেখার কথা ছিল আগামী বইমেলার জন্য কিন্তু সেটা সম্ভব হয়নি কিন্তু তা সত্বেও আমার দুটো বই প্রকাশিত হচ্ছে, এটা ভেবে আনন্দ পাচ্ছি আমি। এছাড়া নিউইয়র্ক বইমেলায় টিকিট কেটেও যেতে পারিনি, ডিসেম্বরের শেষে আমার বন্ধু মসিউর রহমান খোকনের কন্যার বিয়েতে ঢাকায় থাকতে চেয়েছিলাম কিন্তু সেটাও সম্ভব হবে না। এসব কোনো কিছু নিয়ে আমার মনে কোনো কষ্ট নেই। এমন অনেকবারই হয়েছে আমার জীবনে। সবারই হয়।
জীবনের দুঃখের ঘটনার সাথে আনন্দের ঘটনাও থাকে। সুখ বা দুঃখ হাত ধরাধরি করে চলে। সন্তানদের সাফল্যে আমি অনেক আনন্দ পাই। যে কারো সন্তানের সাফল্যের কথা শুনলে আমার মন আনন্দে নেচে উঠে। চোখে পানি চলে আসে। মনে হয় এরা সবাই আমার সন্তান। যখন আমার খারাপ সময় যাচ্ছিল তারমধ্যেই ভাল খবর হচ্ছে অর্ক এবং অরিত্রি দুজনেই নতুন চাকরিতে জয়েন করেছে। দুটোই ভাল চাকরি।
দু’জনেই তাদের চাকরি নিয়ে হ্যাপি বলে জানিয়েছে আমাকে। সন্তানের আনন্দ হচ্ছে বাবা মায়ের আনন্দ। ভাল মন্দ মিলিয়েই এই জীবন। একটা সময় ছিল যখন খারাপ কিছু ঘটলে সহজে মেনে নিতে পারতাম না, মনে গভীর রেখাপাত করত। সবসময় ভাবতাম কেনো এমন হলো! কেনো হবে এমন হবে আমার ক্ষেত্রে। এখন আর এ রকম মনে হয় না। এখন সব সহজভাবে মেনে নিতে পারি। একটা ছোট্ট ঘটনা বলে শেষ করছি এই লেখা।
গত সোমবার অরিত্রি আমার বাসা থেকে অফিসে গিয়েছে। উইনফোর্ড ড্রাইভে অরিত্রির অফিস। দশ বারো মিনিটের ড্রাইভ। এখন সপ্তাহে দুই বা তিনদিন অফিসে যেতে হয় আর বাকি দিনণ্ডলো হোম অফিস। দেড়টার দিকে অরিত্রি বাসায় হাজির। ঘটনা কি! এমনতো হওয়ার কথা না! জেসমিন তখন বাসায়। আমি আমার ঘরে কম্পিউটারে।
জেসমিন বলল, চলে আসলা যে!
অরিত্রি বলল, খিদা লেগেছে তাই এসেছি।
তোমার না অফিসে লাঞ্চ করার কথা!
না। বাসায় লাঞ্চ করব।
তারপর আমার ঘরে আসল। আমার সামনে দাঁড়াল। অরিত্রির মুখ দেখেই আমি বুঝেছি কিছু ঘটেছে। একটু অপরাধি হাসি মুখ তারমধ্যেই লুকিয়ে আছে খানিকটা উৎকন্ঠা।
বাবা, আমি গাড়ি একসিডেন্ট করেছি!
কোথায় একসিডেন্ট করলা!
গ্যারেজেই।
কিভাবে হলো!
সকালে যখন বের হচ্ছি তখন অফিসের ইমেইল দেখে রিপ্লাই দিতে গিয়েছি তখন গাড়ি পিলারে হিট করেছে!
ও মাই গড! তুমি কোনো ব্যাথা পাওনিতো আম্মু!
না। আমি ঠিক আছি। গাড়ি নিয়েইতো অফিসে গেছি।
থ্যাংকস গড যে কাউকে হিট করোনি বা কারো গাড়িতে লাগেনি।
অনেক ড্যামেজ হয়েছে গাড়ি।
ইটস ওকে। গাড়ি চালালে এমন হবেই। তবে আম্মু কখনও গাড়ি চালানোর সময় ফোন হাতে নিবানা। যত একসিডেন্ট হয় তার আশি ভাগ ফোনের জন্য হয়।
হ্যাঁ বাবা, আর এই ভুল হবে না।
কালকে অরিত্রি বলল, বাবা আমি হোন্ডা সিভিক ২০২২ মডেল অর্ডার দিয়েছে, ফুললি লোডেড গাড়ি।
টরন্টো ১০ ডিসেম্বর ২০২১