বিপ্লবী শের আলি আফ্রিদি খান ও ক্ষুদিরাম এর কাহিনী

মাহবুবুর রব চৌধুরী, টরেন্টো

দেশের জন্য যৌবনেই জীবন দিয়েছিলেন শের আলী আফ্রিদি খান। ইংরেজ বিরোধী শীর্ষস্থানীয় নেতা মৌলানা জাফর থানেশ্বরী সহ অন্যান্য কয়েকজন বিপ্লবীকে ধরিয়ে দেওয়া ও পুলিশের পক্ষে ণ্ডপ্তচরবৃত্তির জন্য তিনি একজনকে হত্যা করেছেন এই অপরাধে ১৮৬৭ সালে পেশোয়ারে গ্রেপ্তার হন। বিচারে তার মৃত্যুদন্ড হয়। কলকাতা হাইকোর্ট বয়সের কারনে আপিলে তাকে যাবজ্জীবন দ্বীপান্তরে দন্ডিত করেন।
মোগল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরের নেতৃত্বে ১৮৫৭ সালের মহা বিদ্রোহ, সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রামের রেশ তখনও রয়ে গেছে। দেশের অবস্থা টালমাটাল।
১৮৬৯ সালে শের আলীকে আন্দামানে পাঠান হয়। তখন তাঁর বয়স ২৫ বছর। ছিলেন মাঝারি গড়ন, উচ্চতা ৫ ফুট ১০ ইঞ্চি। আন্দামান কে তখন কুখ্যাত কালাপানির দেশ নামেই লোকে জানত।
এই আন্দামানের পোর্ট ব্লেয়ার হোপ টাউন অঞ্চলের পানিঘাটায় জেলে বন্দি ছিলেন শের আলি। ব্যক্তি জীবনে তিনি ছিলেন সহজ, সরল, সাদা মাটা দয়ালু এবং ধর্ম ভীরু একজন মানুষ।
জেলে থাকা কালিন সময়- সেখানে মজুরি হিসাবে সামান্য যে পয়সা পেতেন প্রায় সবটাই সহযোগী বন্দীদের মধ্যে তিনি বিলি করে দিতেন। তার অন্যের প্রতি মমতা, ভালবাসার অনুভূতি ছিল প্রখর। এটি ছিল তার সহজাত স্বভাব। এর ফলে বন্দীদের মধ্যে তিনি ছিলেন প্রচন্ড জনপ্রিয়।
আন্দামানে বন্ধী থাকা অবস্থাতেও দিন রাত তার ছিল একই চিন্তা। দেশ এবং দেশের আজাদী। ইংরেজের হাত থেকে দেশের মুক্তি। বিপদজনক নির্জন দ্বীপে নির্বাসন অবস্থায় থেকেও সেই একই চিন্তা। বিদেশী শাসন এবং তাদের অন্যায় অত্যাচারের বদলা নেওয়া । কিভাবে দেশ ও দেশবাসীকে করা যায় ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্তি।
আবার জেলে বসেও শুনতে পেতেন এদেশেরই কিছু মানুষের মুখে ইংরেজ বন্দনা। ইংরেজের করা উন্নয়ন রাস্তা-ঘাট, রেল পথ ব্রিজ, স্কুল-কলেজ, ইংরেজি সাহিত্যের সৃষ্টি শীল নাটক, নভেল, গান-বাজনা, ছন্দময় প্রেম, প্রীতি রেনেসাঁর কথা। ভাবতেন কথা সত্য- তবে ১৭৫৭ থেকে ১৮৫৭ এই একশো বছরে স্বাধীন আমরাও তো রেনেসাঁ, রাস্তা আর রেল নিজ অর্থে করতে পারতাম। যারা তাজ মহল গড়তে পারে তারা কেন এক শত বছর অন্ধ থাকবে ! ইংরেজ সৃষ্ট বাংলার মহা দুর্ভিক্ষ ১৭৬৯ সালের ‘ছিয়াত্তরের মন্বন্তর’। (১৭৬৯ সালের কথা যা বাংলা ক্যালেন্ডারে ১১৭৬ বঙ্গাব্দ) ইংরেজের অনৈতিক অর্থ লিপ্সা ও অর্থ পাচারের যোগান দিতে বাংলার এক বৃহৎ অংশ মানুষ এই মন্বন্তরে মৃত্যু শিকার হয়েছিল। স্বাধীনতা সংগ্রামী অজুহাতে শত সহস্র মানুষকে নির্দয়, নির্মম ভাবে জেল, জুলুম, নির্যাতন ও হত্যা করেছিল যারা। তারা আবার নিজ স্বার্থেই বপন করেছে এদেশে ডিভাইড এন্ড রুলের বিষ বৃক্ষ। ব্যথিত হতেন ভেবে কেন মানুষ ভুলতে পারে এই সব কথা। ভাবতেন আর খুঁজতেন পরিত্রানের পথ? কি ভাবে তা অর্জন সম্ভব? কি ভাবে দেশের মানুষকে আবারো আন্দোলন সংগ্রামে করা যায় উদ্বুদ্ধ। নুতন উদ্দম উৎসাহে জাগ্রত করে তোলা যায় জাতিকে। এই ছিল তার সার্বক্ষণিক ভাবনায়। ১৮৭২ সালে ৮ই ফেব্রুয়ারী তার সামনে এরূপ একটি সুযোগ উপস্থিত হয়। বড় লাট লর্ড মেয়ো সেদিন এসে ছিলেন আন্দামান পরিদর্শনে। ১৮৭২ সনের ৮ই ফেব্রুয়ারি বিকেলে লর্ড মেয়ো যখন হ্যারিয়েট’ এলাকায় দ্বীপের সানসেট পয়েন্টে দেহরক্ষী বেষ্টিত হয়ে সূর্যাস্ত দেখবার আনন্দ এনজয় করছিলেন। এমন সময় অতর্কিতে ঝাঁপিতে পরে শের আলি তাকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করেন। শের আলি আফ্রিদি খান ওসময় সেখানে পরিচ্ছন্ন কর্মে একজন কয়েদি কর্মী হিসাবে কর্মরত ছিলেন। কাজ করছিলেন। হাতে ছিল শাবল লুকান ছিল ছুরি। ভারতে ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে শের আলি খানই এক মাত্র ব্যক্তি যিনি ভারতের একজন কর্মরত গভর্নর-জেনারেলকে হত্যা করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তার ভাবনায় ছিল এদেশের মানুষের রক্ত ও হত্যার বদলা। শোষণ এবং দুঃশাসনের অবসান, তীব্র প্রতিবাদ। আর স্বাধীনতার প্রেরণা।
শের আলি আফ্রিদি খান খাইবারপাসের জামরুদ গ্রামে জন্মগ্রহণকরেন। তার এই ঘটনা – এই হত্যা, ভারতে ব্রিটিশ শাসনের ভিত্তি নাড়িয়ে দেয়। ভারতে কর্মরত ইংরেজ মানসিক ভাবে ভিতর দিক থেকে অনেকটা দুর্বল হয়ে পরে ।
এইরূপ অন্য একটি ঘটনায় বিহারের মোজাফ্ফরপুর জেলার ম্যাজিস্ট্রেট কাম কালেক্টর কিংসফোর্ড কে মারতে যেয়ে কলকাতার ক্ষুদিরাম বসু অল্পের জন্য ব্যর্থ হন।
ক্ষুদিরাম জন্ম গ্রহণ করেন মেদিনীপুর জেলার হাবিবপুর গ্রামে ৩রা ডিসেনম্বর ১৮৮৯ সালে। ১১ই অগাস্ট ১৯০৮ সালে মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল মাত্র ১৮ বছর। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আর স্বদেশী আন্দোলনের নেতারা ক্ষুদিরামের মতো স্কুলের ছাত্রদেরও প্রভাবিত করে ছিলেন। এই আন্দলনে অংশ নিতে। পড়াশোনা ছেড়ে সত্যেন বসুর নেতৃত্বে অনুশীলন এবং যুগান্তর নামের ণ্ডপ্ত সমিতিতে ক্ষুদিরামও যোগ দেন।
সেখানে শরীরচর্চার সাথে সাথে নৈতিক ও রাজনৈতিক শিক্ষা পেতে শুরু করেন। এ সময়ে পিস্তল চালনাতেও তাঁর হাতেখড়ি হয়। বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের অংশ হিসেবে তাদের কাজ ছিল ইংল্যান্ডে উৎপাদিত কাপড় পোড়ানো, দেশের মানুষকে দেশি বস্ত্র ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করাও ইংল্যান্ড থেকে আমদানিকৃত লবণ বোঝাই নৌকা ডোবান। পরবর্তীতে তাকে এবং প্রফুল্ল চাকীকে সংগঠনের পক্ষ থেকে বিহারের মোজাফ্ফরপুর জেলার ম্যাজিস্ট্রেট কিংসফোর্ড কে হত্যার মিশন দেওয়া হয়। কিংসফোর্ড ম্যাজিস্ট্রেট থাকা কালে বিচারের সময় অনেক বিপ্লবী কে কঠোর শাস্তি দেন। তার ওই কর্মের জন্য তাকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
মিশন পরিচালনা কালে ক্ষুদিরাম ধরা পড়েন। বিচারে ক্ষুদিরাম এর ফাসিঁ হয়। তখন গানে লিখায় ক্ষুদিরাম সারা ভারতে ব্যাপক পরিচিতি পান। যে পরিচিতি শের আলি আফ্রিদি খান কখনও পাননি।
ইংরেজ বিরোধী স্বাধীনতা কামি লায়ন হার্ট শের আলি আফ্রিদি খান ও ক্ষুদিরাম এর প্রতি শ্রদ্ধা ও সালাম।