চাই ‘সম্প্রীতি যুক্ত ও সাম্প্রদায়িকতা’ মুক্ত বাংলাদেশ

মাহবুবুর রব চৌধুরী, টরেন্টো

আধুনিক সভ্য দেশ সাম্প্রদায়িকতা এবং উগ্রতা মুক্ত দেশ। উন্নত দেশে সাধারণত রাস্তা ঘাটে যেমন নোংরা, আবর্জনা দেখা যায় না, তেমনি প্রকাশ্যে সাম্প্রদায়িকতা আর উগ্রতার নোংরামিও দেখা যায় না।
সম্প্রীতি এবং সাম্প্রদায়িকতা এক সাথে চলে না চলতে পারে না। প্রত্যাশার বাংলাদেশ সব সময়ই একটি গণতান্ত্রিক আধুনিক সভ্য নিরাপদ নির্ভেজাল সাম্প্রদায়িকতা’ মুক্ত দেশ।
সাম্প্রদায়িকতা একটি ব্যাধি। সামাজিক ক্যান্সার। আমাদের আশা দেশ হবে সাম্প্রদায়িকতা মুক্ত, সহিংসতা মুক্ত, শান্তি পূর্ন সহিষ্ণু, নিরাপদ একটি গণতান্ত্রিক দেশ। হবে প্রাচ্যের সুইজারল্যান্ড। বিশ্ব রোল মডেল। অভিষ্ঠ এই লক্ষ অর্জন এখনও সম্ভব। সব সময়ই তা সম্ভব। যদি থাকে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা আর ওই লক্ষ অর্জনে সুনির্দিষ্ট একটি রোড ম্যাপ।
বক্তব্যটি পরিষ্কার। তবে নানা চক্রে, কূট মার প্যাচে বিষয়টি অকারণ কঠিন হয়ে উঠেছে ।
রাষ্ট্র ও সমাজ থেকে অন্যায় অত্যাচার, জুলুম দূর করে সহিষ্ণু গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ হিসাবে গড়ে উঠা সম্ভব। প্রয়োজন শুধু, এই পরিবেশ সৃষ্টি ও বাস্তবায়ন। এদেশের পরিবেশ প্রকৃতির নিজস্বতায় এমন কিছু আছে যা তাকে-নেগেটিভ বা পজেটিভ দুদিকেই সব সম্ভবের দেশে রূপান্তরিত করতে পারে।
মিডিয়াতে সংখ্যা লঘু নির্যাতন সংক্রান্ত বক্তব্য প্রায়শই এসে থাকে। এই ঘটনা ণ্ডলির পশ্চাতে থাকে বিভিন্ন কারন ও উদ্দেশ্যে। গোড়াতেই ঘটনা ঘটবার পিছে মূল কারন নিরপেক্ষ ভাবে উদঘাটন করে, পিছনের কালো হাত ভেঙে দিলে এবং সময়ে সুষ্ঠ ব্যবস্থা নিলে এটি বন্দ হতে বাধ্য। লিপ সার্ভিসে কাজ হয় না। হবেও না।
সাম্প্রদায়িকতা অসভ্যতার অপর নাম। এটি জংলী বর্বরতা। কোন সভ্য দেশে তা চলতে পারেনা। তা যেকোন ফর্মে আর কোন প্রকার অজুহাত তুলেই হোক না কেন!
অত্যাচারী গোষ্ঠীর মনস্তত্বে থাকে দেশের দুর্বল শ্রেণী ও সংখ্যা লঘু সম্প্রদায় এ দুটি বিষয় মাথায় রেখে-এবং দুর্বলের এই- দুর্বলতাকে চিহ্নিত করেই অপ শক্তি তাদের অপকর্মের প্ল্যান নিয়ে মাঠে নামে। এই দুঃষ কর্ম করতে কেন এবং কি ভাবে তারা সাহস পায়? কাদের মদদে! বিষয়টি ণ্ডরুত্বের সাথে দেখতে হবে। এবং উপযুক্ত বেব্যস্থা নিতে হবে।
সবল দুর্বৃত্ত শ্রেণীর হাতে দেশে-সংখ্যা লঘু এবং সংখ্যা ণ্ডরু উভয় সম্প্রদায়ের দুর্বল শ্রেণী নির্যাতিত হন। এবিষয়ে হিন্দু মুসলিম কোন প্রকার বাছ বিচার নাই।
তাদের হাতে সংখ্যা লঘু এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে নির্যাতনের থেকে মুসলিম বিরুদ্ধে নির্যাতনও কম সংগঠিত হয়না। এবং হচ্ছে না।। দেশে দুর্বৃত্তদের হাতে সব সম্প্রদায়ের দুর্বল, সাধারণ মানুষই নির্মম ভাবে অত্যাচারিত হচ্ছেন। এ বিষয়টিও সত্য। এ কথা বলবার অর্থ এই নয় মুসলমান অত্যাচারিত হচ্ছে বলে হিন্দুদের উপর অত্যাচার নির্যাতন করা হালাল হয়ে গেল। বলবার মূল উদ্দেশ্য দেশের সব সম্প্রদায়, সব ধর্ম মতের দুর্বল মানুষের উপরই অন্যায়, অত্যাচার, নির্যাতন সবল দুর্বৃত্তদের হাতে ঘটে চলেছে। এই সত্যের স্বীকৃতি সহ মূল অন্যায়, অত্যাচারের বিষয়টি সার্বিক ভাবে সমাধানের ব্যবস্থা করা। খণ্ডিত ভাবে নয়। দেশে সামগ্রিক ভাবে মানব অধিকার প্রতিষ্ঠা করা।
সত্যিকার সমাধান পেতে অত্যাচার এবং নির্যাতন বন্ধে সব ক্ষেত্রেই সমান ভাবে নজর দিতে হবে। সে অনুযায়ী সার্বিক দৃষ্টি কোন থেকে ব্যবস্থা নিতে হবে। এটি সুশাসন আর আইনের শাসনের কথা। তাই প্রথমেই বিষয়টি স্বীকৃত হতে হবে। সত্যিকার ন্যায় প্রতিষ্ঠা ও নেয্য তার জন্যেই এটি প্রয়োজন। অতঃপর সংখ্যা লঘু এবং সংখ্যা ণ্ডরু বিষয়টি আসতে পারে। এবং শুধু মাত্র তখনি সংখ্যালঘু – ফাইলটি প্রয়োজনের নিরিখে অগ্রাধিকার পেতে পারে। সততার দৃষ্টান্ত রাখতে।
সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে বড় ধরনের প্রতিরোধ এবং প্রতিষেধক সুশাসন এবং সত্যিকার গণতন্ত্র। সভ্য চিন্তা চেতনা
দুই : দেশে নাগরিক ও মানবিক অধিকারের মূল ভিত্তি যেন হয় সর্বজনীন সুশাসন। আধুনিক রাষ্ট্রের উপযোগী আইন। কোন ক্ষেত্রেই বিশেষ কোটারি চিন্তা নয়। নাগরিক অধিকারের ভিত্তিতেই সমস্যার সমাধান চাওয়া এবং পাওয়া।
এই নীতি প্রতিষ্ঠা করতে এবং দেশের সব ধরনের অপকর্ম, কূ-কর্মের সাথে জড়িতদের দমনে প্রয়োজন সত্যিকার সুনীতি ও সুশাসন। আইনের শাসন। দুর্নীতি মুক্ত সিস্টেম এবং দুর্নীতি মুক্ত প্রশাসন।
সাম্প্রদায়িকতা সমাজে প্লান্টেড। যার শুরু হয়ে ছিল ঔপনেবেশিক ইংরেজ আমলে। তাদের নিজস্ব ভূরাজনীতির স্বার্থে। আজও ওয়ার্ল্ড অর্ডার নিয়ন্ত্রনের নামে নিজ স্বার্থে নিজ প্রয়োজনে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে পুরাতন আফিম, নীল ও সাম্প্রদায়িকতা চাষের মত নুতন নুতন অনেক কিছুই উদ্ভাবন হচ্ছে এবং তার হচ্ছে চাষ। উত্তর থেকে দক্ষিণ, পূর্ব থেকে পশ্চিম গোলার্ধের সবখানেই একই চিত্র।
এ নিয়ে বিশ্ব জুড়ে দুর্বল পক্ষের আছে ক্ষোভ। বিশ্ব মুসলিম মনেও পড়েছে এর প্রভাব। উঠেছে ক্ষোভ। এ ইতিহাস লম্বা।
মুসলিম মানসে আবছা ছায়া হয়ে যাওয়া সুদূর অতীতের ত্রুসেড এর ইতিহাস বাদ দিলেও’। এরপরও এসে যায় চোখ মেলতেই সম্প্রতির কালের জ্বলন্ত ইরাক, সিরিয়া, লিবিয়া, আফগানিস্তান। সঙ্গে প্যালেস্টাইন, চেসনিয়ান, বসনিয়ান, কাশ্মীরি, ভারতীয় চিত্র এবং চীনের জিনজিয়াং এর ইউঘুরি মুসলিম সহ বার্মার রাখাইন এর রোহিঙ্গা এবং আরো অনেক বিষয়। এইসব শক্তি ধর দেশ এবং রাষ্ট্রর গণতন্ত্রের প্রবক্তাদের হাতেই- ১৯৫৩ সনে, ইরানে মোসাদ্দেক সরকার উৎখাত, মিশরের মুরসি, আলজেরিয়ায় নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকারকে ক্ষমতায় যেতে না দিয়ে গণ রায় ধূলিস্যাৎ। বাংলাদেশে ১৯৭৫ সালের রক্তাক্ত ক্যু-সম্প্রতির ইমরান খানের পতন সবই একই সূত্রে গাঁথা। সারা বিশ্বের সব দুর্বল শ্রেণীর মনেই জ্বলছে বিক্ষোভের আণ্ডনি ধারা।
সমস্যা হয় তখনিই যখন অত্যাচারিতের মন মানস ও সুযোগ পেলে জেগে উঠে অত্যাচারী হবার খায়েস। ইসরায়েল তার একটি উদাহরণ। তারপরও চোখে দেখা চিত্র আর গলিত লাভার নদী মনে না ধরে এবং মনে না রেখেই হতে হবে বিশ্ব মডেল।
বাংলাদেশের বর্তমান পরিবেশ, পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে কুসংস্কার যুক্ত অল্প ও অর্ধ শিক্ষিত, ইসলামের ভুল বেখ্যাকারীদেরকে এবং সাধারণ মুসলিম সমাজকে সচেতন করা এবং তাদের সামনে প্রকৃত ইসলামের আদর্শ, ঐতিহ্য, কৃষ্টি, কালচার ইতিহাস তুলে ধরা। একটি বিশেষ ণ্ডরুত্বপূর্ণ প্রয়োজনীয় কাজ। জন স্বার্থেই এটি জরুরি। এজন্য প্রয়োজন দেশে একটি আন্তর্জাতিক মানের ইসলামিক কৃষ্টি কালচার ইউনিভার্সিটি স্থাপন।
আর প্রয়োজন বলা দেশের হিন্দু সমাজও এদেশের অন্যান্য সম্প্রদায়ের মত উন্নয়ন কর্ম কান্ডে পজেটিভ অবদান রাখছেন। সবার পজেটিভ দিক ণ্ডলি তুলে ধরা জরুরি। এ পথে এ ভাবেই গড়ে উঠবে দেশে আস্থা, বিশ্বাস ও সহমর্মিতার ভিত্তি।
এক সময়ে হিন্দু সমাজের এক অংশে ছোঁয়া ছুইর কিছু বিষয় ছিল সত্য। এখন তা খুব একটা নজরে আসে না। তবে কিছু মানুষ এখনও ইসলাম আরবের ধর্ম, মরুর ধর্ম, মুসলিম বহিরাগত, মুসলমান এদেশে নিম্ন হিন্দু শ্রেণী থেকে আসা ইত্যাদি নেগেটিভ কথা সুযোগ মত বলে থাকেন। এরূপ কথা বাত্রা এক কথায় বর্ণবাদী ও সাম্প্রদায়িকতার দোষে দুষ্ট। যা কিনা সাম্প্রদায়িকতা রুখতে নেগেটিভ প্রভাব ফেলে। কোন ভাবেই তা পজেটিভ অবদান রাখতে পারে না। এসব কথা বর্ণবাদী ও সাম্প্রদায়িক।
মুসলিম ধর্ম মতে সব মানুষই আদম সন্তান। তাই মানুষ মাত্রেই ভাই ভাই। মুসলিম স্কলার, চিন্তাবিদ মনে করেন ভারতে ৭০ হাজার বছর পূর্বে যখন আফ্রিকা থেকে দ্রাবিড়রা আসে তখনও এ অঞ্চল বিরান ভূমি ছিল না! দ্রাবিড়রা এদেশে এক উন্নত সভ্য মানব ণ্ডষ্টির দেখা পেয়েছিলেন। ধারনা করা হয় এরা ছিলেন সাবিয়ান।
এখানে তখন সাবিয়ানদের বসবাস ছিলো। যারা ছিল মুসলিম, ক্রিষ্টান, ইহুদিদের পূর্ব সুরি। শ্রীলংকাতে অনেকে দাবি করেন সেখানে পাওয়া গেছে আদম পদ চিহ্ন। মুসলিম বিশ্বাস মতে আল্লাহ পাক এমন কোন জনপদ নেই যেখানে মেসেঞ্জার পাঠাননি।
একই ভাবে মুসলিম বিশ্বাসে মতে মৃত্যু পর বিচারের মালিক একমাত্র আল্লাহ পাক। মানুষের জাজ করবার চূড়ান্ত ক্ষমতা নাই। ইসলামে সাম্প্রদায়িকতা নিষিদ্ধ। নির্যাতন, নিষ্পেষন, অশান্তি, দাঙ্গা, ফাসাদের স্থান ইসলামে নাই। ইসলাম শান্তির ধর্ম। এই সব বাণী একজন মুসলমান কে অসাম্প্রদায়িক হতেই শিক্ষা দেয়।
অশান্তি সৃষ্টি কারিরা ইসলামের না এবং সভ্য আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজেরও কেউ না এই বাস্তবতাকে স্বীকার করে, জেনে এবং মেনেই দেশের সংখ্যা গরিষ্ঠ মুসলিম সম্প্রদায়কে সাম্প্রদায়িতা নির্মূলে অগ্রসর হতে হবে।
স্বার্থানেষী মহল দেশের ধর্মীয় সংখ্যা লঘুদের ভিন্ন উদ্দেশ্যে ব্যবহার করবার বা হাতিয়ার বানানর সুযোগ যাতে নিতে না পারে সেদিকেও লক্ষ্য রাখতে হবে এই অপতৎপরতা প্রতিরোধের জন্য সর্বচ্চ সতর্ক এবং সচেষ্ট থাকাও প্রয়োজন।
এই ক্ষেত্রে মুসলমান, হিন্দু বা সংখ্যা লঘু, সংখ্যা ণ্ডরু এই বিভাজন না করে সমস্যাটির সার্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে সমাধান চাইতে হবে।
অন্যথায় বিষয়টি দীর্ঘ সূত্রীতার পথে তুলে দেওয়াও হতে পারে। ক্ষেত্রে বিশেষ তা উদ্দেশ মূলক ভাবেই হয়ত করা হতে পারে। মূল কথা বিষয়টি হতে বিভাজন নয়, ঐক্য মতে। সাম্প্রদায়িকতা রোধ পলিসিতে, আওয়াজ উঠতে হবে সমস্বরে একই সাথে। ণ্ডরুত্বপূর্ণ প্রয়োজনীয় মূল বক্তব্য এটিই।
মাহবুবুর রব চৌধুরী -টরন্টো, কানাডা
(আহবায়ক-২০০০- উত্তর আমেরিকা বাংলাদেশ সম্মেলন ফোবানা টরন্টো- কানাডা। )