নারী নির্যাতন মামলায় অর্থ পাচারকারী আওয়ামীলীগ নেতা রতন কানাডায় গ্রেফতার

অর্থ হাতিয়ে নিতে স্ত্রীকে তালাক, অগ্নিকাণ্ডে ক্ষয়ক্ষতি দেখিয়ে অর্থ লোপাটের চেষ্টাসহ বহু জালিয়াতি করে দেশ ছেড়ে কানাডায় পালিয়েছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুল হান্নান রতন। তবে শেষ রক্ষা হয়নি। নারী নির্যাতনের মামলায় বাংলাদেশি প্রবাসী ব্যবসায়ী আবদুল হান্নান রতনকে গ্রেফতার করেছে টরন্টো পুলিশ। 
স্থানীয় সময় সোমবার (৭ ফেব্রুয়ারি) তাকে গ্রেফতার করা হয় বলে টরন্টো পুলিশের মুখপাত্র কনস্টেবল ডেভিড হপকিনসন গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, ২০২১ সালের একটি অভিযোগের প্রেক্ষিতে গ্রেফতারি পরোয়ানা থাকায় পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে।
জানা গেছে, ব্যবসায়ী আবদুল হান্নান রতনের সাবেক স্ত্রী ফারজানা সোনিয়ার দায়ের করা মামলায় তার নামে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়েছিলো।
দেশ থেকে বিপুল অর্থ পাচারের অভিযুক্ত হওয়ার পর নিজের স্ত্রীর সঙ্গেও অভিনব জালিয়াতি চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুল হান্নান রতনের বিরুদ্ধে। ভুয়া তালাকনামা বানিয়ে স্ত্রীকে পাওনাদি থেকে ঠকানোর চেষ্টা করেছেন তিনি।
২০২০ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর ঢাকার চীফ ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে এমন অভিযোগে মামলা (ধারা- ১৯৮/৪৬৫/৪৬৮/৪৭১/১০৯) দায়ের করেছেন আব্দুল হান্নান রতনের স্ত্রী ফারজানা রতন সোনিয়া। এতে রতনের প্রতারণায় সহায়তার অভিযোগে আরেক ব্যক্তিকেও আসামী করা হয়েছে।
বিবাদী আব্দুল হান্নান রতন ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় সরাইলের বগাইর এলাকার তোরাব আলীর ছেলে। অপর আসামীর নাম সাদেক উল্লাহ ভুঁইয়া। তবে তার বিস্তারিত পরিচয় জানা যায়নি। অপরদিকে বাদী ফারজানা রতন সোনিয়া ব্রাহ্মনবাড়িয়া জেলার সদর উপজেলার পাইকপারা টেংকেরপার এলাকার ইকবাল হোসেনের মেয়ে।
মামলা সূত্রে জানা যায়, ১৯৯৮ সালের ৬ সেপ্টেম্বর ৬ লাখ টাকা দেনমোহরানায় বিবাদীর ও বাদীর বিয়ে হয়। বিয়ের পর থেকেই বাদীকে বিভিন্নভাবে নির্যাতন করে আসছিলেন বিবাদী। এরইমধ্যে তাদের এক ছেলে ও এক মেয়ের জন্ম হয়। এতে সামাজিক মর্যাদা ও সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে সংসার করে আসছিলেন বাদী। পরে তাদের ছেলে কানাডার টরেন্টোতে পড়তে গেলে সেখানেই তারা বাস করতে শুরু করেন। সম্প্রতি নির্যাতনের মাত্রা বেড়ে গেলে ২০২১ সালের ৭ জানুয়ারি আব্দুল হান্নান রতনকে তালাক দিতে কানাডার আদালতে আবেদন করেন তিনি। তালাকের কাগজপত্র পেয়ে অভিযুক্ত রতন কাজী সাদিক উল্লাহর সহায়তায় আগেই (১৫ জুলাই ২০১৭)  স্ত্রী সোনিয়াকে তালাক দেয়া হয়েছে এমন তালাকনামা তৈরি করে কানাডার আদালতে জমা দেয়। পরে এ বিষয়ে খোঁজ নিলে দেখা যায় যে কাজীর নামে এই তালাকনামা তৈরি করা হয়েছে তা সঠিক নয়। বিষয়টি জানতে পেরে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে থানায় প্রতারণার মামলা দায়ের করা হয়।
জানা যায়, স্ত্রীকে নির্যাতনের মাত্রা বেড়ে গেলে কানাডায় তালাকের আবেদন করা হয়। নিয়ম অনুসারে সেখানে তালাক হলে সম্পত্তির একটি অংশ স্ত্রীর হয়ে যাবে এ কারণে পূর্বে তালাক হয়েছে এমন ভুয়া কাগজ তৈরি করার উদ্যোগ গ্রহণ করেন এই রাজনৈতিক নেতা। যেখানে ১৯৯৮ সালে বিয়ের পর থেকে ২১ ডিসেম্বর ২০১৯ পর্যন্ত একসঙ্গেই ছিলেন ভুক্তভোগী ও অভিযুক্ত।
এদিকে রতনের পাঠানো তালাকনামাটির ব্যাপারে জানা যায়, ১৭ নভেম্বর ২০১৬ সুন্দরবন কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে রতন ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় স্ত্রী সোনিয়া ইসলাম রতনের বাসায় একটি তালাকনামা পাঠান। যার সিরিয়াল নাম্বার ৮ দিয়ে শুরু এবং ডকুমেন্ট চার্জ ৩০ টাকা দেখানো হয়েছে। পরে সুন্দরবন কুরিয়ারে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০১৬ সালে প্রতিষ্ঠানটির ডকুমেন্টস চার্জ ছিল ১৫ থেকে ২০ টাকা আর তখন সিরিয়াল নাম্বার ছিল ২ থেকে ৩। এ থেকে জানা যায়, ২০২০ সালের একটি বই জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে সংগ্রহ করে তালাকনামা ২০১৬ সালে কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে পাঠানো হয়েছে বলে দেখানোর চেষ্টা করছে এই আব্দুল হান্নান রতন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ব্যবসার কথা বলে আব্দুল হান্নান রতন ১৯৯৯ সালে সোনালী ব্যাংকের স্থানীয় কার্যালয় থেকে চার কোটি ১২ লাখ টাকা ঋণ নেন। এর খুব সামান্য অংশ দিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া বিসিকে একটি কারখানা নির্মাণ করেন। পরে ২০০১ সালে চলতি মূলধন ঋণ নেন আরও তিন কোটি টাকা। এ টাকা হাতে আসার কিছুদিন পর ২০০২ সালে বিসিকের ওই কারখানায় রহস্যজনক আগুন লাগে। 
সোনালী ব্যাংকের এক তদন্তে দেখা যায়, অগ্নিকাণ্ডে ক্ষয়ক্ষতির বিবরণ সত্যি নয়। পরে ২০০৭ সালে নিজের শাশুড়ি ও মামাকে ভাইবোন দেখিয়ে নিউ শ্রাবণ এগ্রো ফুড খুলে বেনামি ঋণ নেন আরও ৪ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। পাচারের টাকায় কানাডার টরন্টোতে ২০১৭ সালে তিনটি বাড়ি ও একটি রেস্তোরাঁর মালিক হয়েছেন।