শান্তিরক্ষা মিশনে র‌্যাব সদস্যদের নিষিদ্ধের দাবি জানিয়েছে ১২টি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা

মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ এনে বাংলাদেশের র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) সদস্যদের জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশন থেকে নিষিদ্ধ করার দাবি জানিয়েছে ১২টি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা। গত বছরের ৮ ডিসেম্বর জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রম বিভাগের আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল জ্যঁ পিয়েরে লেকরোইক্সের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে এ দাবি জানায় সংস্থাগুলো। আজ বৃহস্পতিবার হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ওয়েবসাইটে চিঠিটি প্রকাশ করা হয়েছে। 

এতে র‌্যাবের বিরুদ্ধে নির্যাতন, বিচারবহির্ভুত হত্যা, গুমসহ বিভিন্ন ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ করা হয়েছে। চিঠিতে বলা হয়, আমরা (স্বাক্ষরকারী ১২টি মানবাধিকার সংগঠন) গুরুতর উদ্বেগের সঙ্গে জানাচ্ছি যে, জাতিসংঘে নিয়োজিত প্রতিনিধিদের মানবাধিকার পর্যবেক্ষণের উদ্দেশ্য নিয়ে ২০১২ সালে যে নীতিমালা (দ্য হিউম্যান রাইটস স্ক্রিনিং পলিসি) গ্রহণ করা হয়েছিল, বাংলাদেশী প্রতিনিধিদের ক্ষেত্রে তা যথাযথভাবে প্রয়োগ করা হয়নি। বাংলাদেশে যারা মারাত্মকভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছেন, দেশটির পক্ষ থেকে তাদেরকেই জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মিশনে পাঠানো হয়েছে। 

বিশেষত, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, নির্যাতন ও গুমসহ বিভিন্ন অনিয়মের বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও র‌্যাব সদস্যদের জাতিসংঘের বিভিন্ন মিশনে দায়িত্ব পালনের জন্য পাঠানো হয়। ২০০৪ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকেই একের পর এক অভিযোগ উঠেছে এ বাহিনীর বিরুদ্ধে। 

জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে অন্যতম সৈন্য ও পুলিশ সদস্য প্রেরণকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশের নাম উল্লেখ করে চিঠিতে বলা হয়, ২০২০ সালে দেশটি সর্বোচ্চ সামরিক সদস্য পাঠিয়েছে। সে বছর বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর ৬ হাজার ৭৩১ জন সদস্য বিভিন্ন মিশনে নিয়োজিত ছিলেন। ২০২১ সালের মার্চে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাই কমিশনার মিশেল ব্যাচেলেট জানান, র‌্যাবের বিরুদ্ধে নির্যাতন ও অসদাচরণের অভিযোগ দীর্ঘমেয়াদি উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। 

চিঠিতে মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, এ পর্যন্ত র‌্যাবের যেসব সদস্য জাতিসংঘের বিভিন্ন মিশনে নিয়োজিত ছিলেন, তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে আমরা জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রম বিভাগের প্রতি জোর দাবি জানাচ্ছি। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে কাউকে নিয়োগ দেয়ার আগে একটি যাচাই পদ্ধতি চালু করা উচিত, যেখানে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম, নির্যাতন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অন্যান্য অভিযোগ তদন্ত করে দেখা হবে।

চিঠিতে আরো বলা হয়, ২০১৯ সালে বাংলাদেশ জাতিসংঘের নির্যাতনবিরোধী কনভেনশনের বাধ্যবাধকতা কতটুকু প্রতিপালন করেছে, সেটির পর্যালোচনা করেছে সংশ্লিষ্ট কমিটি। নির্যাতন বিরোধী কমিটি জাতিসংঘের যথযথ নির্দেশনা মেনে একটি স্বাধীন বাছাই প্রক্রিয়ার সুপারিশ করে। এ প্রক্রিয়ার উদ্দেশ্য সামরিক ও পুলিশ সদস্যদের শান্তিরক্ষা মিশনে প্রেরণের জন্য বাছাই করা। পাশাপাশি এটি নিশ্চিত করা যে, যেসব ব্যক্তি বা ইউনিট মিশনের জন্য নির্বাচিত হবেন, তাদের কেউই নির্যাতন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম ও অন্য যেকোনো মারাত্মক মানবাধিকার লঙ্ঘনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। 

এক প্রতিবেদনে ওই কমিটি জানায়, র‌্যাবের এমন অনেক সদস্যই জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে দায়িত্ব পালনের জন্য নিয়োজিত ছিলেন। পরবর্তীতে বাছাই প্রক্রিয়ার জন্য তারাই মনোনীত হয়েছেন। যেসব পুলিশ ও সামরিক সদস্যের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে তাদের ওপর জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা আরোপে করতে যথাযথ পদক্ষেপ নেয়ার দাবি জানিয়েছে সংস্থাগুলো। 

চিঠিতে স্বাক্ষর করেছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, এশিয়ান ফেডারেশন অ্যাগেইনস্ট ইন-ভলান্টারি ডিসঅ্যাপিয়ারেন্স (এএফএডি), এশিয়ান ফোরাম ফর হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (ফোরাম এশিয়া), এশিয়ান হিউম্যান রাইটস কমিশন, এশিয়ান নেটওয়ার্ক ফর ফ্রি ইলেকশনস (এএনএফআরইএল), ক্যাপিটাল পানিশমেন্ট জাস্টিস প্রজেক্ট, ওয়াল্ড অ্যালায়েন্স ফর সিটিজেন পার্টিসিপেশন, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন ফর হিউম্যান রাইটস, রবার্ট এফ কেনেডি হিউম্যান রাইটস, দ্য অ্যাডভোকেটস ফর হিউম্যান রাইটস, ওয়ার্ল্ড অর্গানাইজেশন অ্যাগেইনস্ট টর্চার (ওএমসিটি)।

প্রসঙ্গত, এর আগে গত ১০ ডিসেম্বরে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে র‌্যাবের সাবেক ও বর্তমান সাত কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয় যুক্তরাষ্ট্র।