ইংরেজদের সাজানো রেঙ্গুনে

রেঙ্গুন শহরের ভোরটা যেন ঠিক ২০১৭ সালের ভোর নয়। ইংরেজদের নকশা করা শহরের জনমানবশূন্য রাস্তার লাইটপোস্টে তখনও বাতি জ্বলছে, আধো-অন্ধকারে ভেসে আসছে সুলে প্যাগোডার ঘণ্টাধ্বনি, ঝাড়ুদার রাস্তা পরিষ্কার করছে, ইংরেজ আমলের নকশাকৃত বিল্ডিংয়ের বারান্দায় দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছিলো আমি যেন সেই একশ বছর আগে সব্যসাচী মল্লিকের রেঙ্গুন শহরে এসেছি। এখন অবশ্য এই শহরকে কেউ রেঙ্গুন নামে ডাকে না। ১৯৮৮ সালে এককেন্দ্রিক সরকারের বিরুদ্ধে যে জাগরণ আন্দোলন হয়েছিল, তারপরের বছর ১৯৮৯ সালে সামরিক জান্তা সরকার পাল্টে ফেলে দেশের নাম, শহরের নাম- বার্মা হয়ে যায় মিয়ানমার আর রেঙ্গুন হয়ে যায় ইয়াঙ্গুন এবং তারা পালটে ফেলে নাগরিকত্ব কার্ডের রঙ। তো, আমি যে সব্যসাচী মল্লিকের কথা বলছি, তিনিও ইংরেজদের রেঙ্গুন শহরে ঘাঁটি গেঁড়ে বসেছিলেন ভারতবর্ষ হতে ইংরেজদের তাড়াবার জন্য। তার নামের মতোই তিনি ছিলেন সকল কাজে পারদর্শী- ডাক্তারি, মাস্টারি, ইঞ্জিনিয়ারিং কি পারতেন না তিনি! শরৎচন্দ্রের পথের দাবী উপন্যাসে সব্যসাচী মল্লিকের কর্মকাণ্ড পড়ার সময় তাকে মনে হয়েছিল বাঙালির জেমস বন্ড। পার্থক্য একটাই, জেমস বন্ডের মতো তার নারীর প্রতি কোন ছোঁকছোঁক ভাব ছিল না। বরং সকল দু’নম্বরী ব্যবসার নেত্রী সুমিত্রাকে তিনি রূপান্তরিত করেছিলেন দেশমুক্তির নেত্রী হিসেবে। তবে বইটা পড়লে বোঝা যায় শরৎচন্দ্রের বুকের পাটা ছিল বটে! ইংরেজ মুল্লুকে বাস করে তাদেরই তাড়াবার প্রয়োজনীয়তা এবং কলাকৌশল নিয়ে বই লিখে ফেললেন! উলটো ইংরেজরা ভয় পেয়ে নিষিদ্ধ করেছিল সেই বই। আবার সুমিত্রার মত শক্তিশালী নারী চরিত্রকে দাঁড় করিয়ে ফেললন গোঁড়ামিপূর্ণ সমাজে বসে। বারান্দায় দাঁড়িয়ে শিহরণ জাগছিল ভেবে, এই পথেই নানা ছদ্মবেশে ঘুরে বেড়িয়েছে শরৎচন্দ্রের উপন্যাসের নায়ক। এখানেই দৃঢ়তার সাথে দেশমুক্তির কাজ করে গেছে সুমিত্রা।
হাঁটতে-হাঁটতে সুলে প্যাগোডার দিকে যাই। মন্দিরের সামনের রাস্তায় ঝাঁক বেঁধে ঘুরছে কবুতর, সাথে কাকও উড়ছে কা কা করে। গেরুয়া কাপড় পরিহিত বৌদ্ধ ভান্তেরা মন্দির থেকে বের হচ্ছেন মুষ্টিভিক্ষার জন্য। কাছেই ভ্যানে করে চা বিক্রেতা তার সরঞ্জাম সহকারে ভ্যান নিয়ে এক কোনায় বসবার আয়োজন করছে। চা বিক্রেতার চেহারায় বাঙালিয়ানার ছাপ। এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করতেই বলল, সে ভারতীয়। মিয়ানমারে তার কয়েক পুরুষের বাস। চা বিক্রেতাকে ছাড়িয়ে এগিয়ে যাই রাস্তা ধরে। পথের দু’ধারের সাদা বিল্ডিংগুলোর বেশীরভাগের নকশাই ইংরেজ আমলের। মনে হয় যেন কোন এক ভিক্টোরিয়ান শহরে এসে পড়েছি।
সকালেই দেখতে গেলাম বিখ্যাত ‘স্যে ডাগোন প্যাগোডা’। এখানেই রাখা আছে ৪ জন বৌদ্ধের বিভিন্ন নিদর্শন, বিশেষত গৌতম বুদ্ধের মাথার চুল সংরক্ষিত আছে। এই প্যাগোডা সিঙ্গুত্তারা পাহাড়ে। কথিত আছে, এই পাহাড়ে থাকত এক বিশাল বড় শতপদী বৃশ্চিক। আঞ্চলিক ভাষায় একে বলা হয় চ্যালা। সেই চ্যালা একবার একটা গোটা হাতি খেয়ে ফেলেছিল। সেই পাহাড়েই এই মন্দির, ভাবতে গা শিরশির করে। এই মন্দিরের অন্যতম আরেকটি বৈশিষ্ট্য হল এটি প্রায় ২৫০০ বছর আছে নির্মিত এবং ৯৯ মিটার লম্বা মন্দিরের প্রতিটি ইট মোড়ানো হয়েছে সোনা দিয়ে, মন্দিরের চূড়ায় আছে ৭৬ ক্যারেট বা ১৫ গ্রাম ওজনের একটি সত্যিকারের হীরা। এছাড়া আরও প্রায় ৫,৪৪৮ টি বিভিন্ন আকারের হীরা এবং ২৩১৭ টি রুবি পাথর ব্যাবহার করা হয়েছে এর নকশায়। মন্দিরের প্রধান ভিত্তির পরে যে সোপান আছে সেখানে বৌদ্ধ সন্ন্যাসী এবং পুরুষ ব্যতিত নারীদের প্রবেশ নিষিদ্ধ।
হোস্টেলে সকালে খেতে দিল বার্মিজ বিখ্যাত হাতে তৈরি নুডুলস। এখানকার কর্মচারীরা খুবই বন্ধুসুলভ। ওদের কাছে জানতে চাইলাম কীভাবে বাগান নামের শহরে যাব। ওরা জানালো যেহেতু এখন ছুটির বার্মিজ নতুন বছরের উৎসবের সময়, তাই ট্রেনের টিকেট পাওয়া যাবে না। রাতের বাসে করে যাওয়াটাই উত্তম হবে এবং আজকে রাতেই শেষ বাস যাবে। মাথায় কিছুটা বাজ পড়ার মতো অবস্থা। আমার রুমে উঠেছে এক চব্বিশ-পঁচিশ বছরের এক জাপানি মেয়ে ‘মিকা’। ভাঙ্গা-ভাঙ্গা ইংরেজিতে কথা বলে। সেও যাবে বাগান শহরে। মিকা এইবারই প্রথম দেশের বাইরে একা ঘুরতে এসেছে। দু’জনে মিলে ঠিক করলাম একসাথে যাব। আমি বাংলাদেশের মেয়ে, ঈদের আগের রাতে ঢাকা থেকে যদি চট্টগ্রাম আসার ব্যবস্থা করতে পারি, তবে রেঙ্গুন শহরেও কিছু না কিছু ব্যাবস্থা করে ফেলতে পারব, এই অভয় নিজেকে এবং মিকাকে দিয়ে, শুরু করলাম আমাদের টিকেট কেনার অভিযান। চলে গেলাম ট্রেন স্টেশানে। সেখানেও দালালমত লোকদের ধরলাম। এদের বেশিরভাগই ভারতীয় বংশোদ্ভূত। কিন্তু, সবাই ট্রেনের টিকেট বাদ দিয়ে বাসের টিকেট বিক্রি করছে। টিকেটের আসল দামের কয়েকগুন দাম হাঁকাচ্ছে। ট্রেনের টিকেট পাব না নিশ্চিত হয়ে গেলাম বাস কাউন্টারে। এখানেও দালালের ছড়াছড়ি। দালালেরা আমাকে খুব একটা পাত্তা দিচ্ছিল না। ওদের মূল টার্গেট ছিল মিকা। আমি কোন দোকানীর সাথে আলাপ করার ফাঁকে, মিকার কাছে প্রায় তিনগুণ দামে টিকেট বিক্রি করে ফেলেছিল এক দালাল। অবস্থা সুবিধার নয় বুঝতে পেরে মিকাকে নিয়ে বেরিয়ে এলাম দালালের খপ্পর থেকে। ট্রেন স্টেশান এবং বাস কাউন্টারগুলো প্রায় কাছাকাছি। আমরা আবার ফিরে গেলাম ট্রেন স্টেশানে একটু ঘুরে দেখবার জন্য। সেখানেই এক দোকানদারের সাথে আলাপ করে জানা গেল অনতিদূরে একটা বাসের আসল কাউন্টার। কিন্তু সেটার শাটার বন্ধ, পাশের পান-বিড়ির দোকানে কথা বললে টিকেট পাওয়া যাবে। এই ফাঁকে বলে রাখি মিয়ানমারের জাতিধর্ম নির্বিশেষে সকল মানুষ পান খায়। পান খেয়ে খেয়ে এদের সবার দাঁতের রঙ বদলে গেছে। তো সেই দোকানে গিয়ে আমরা করুণভাবে তাদের দয়া চাইতে লাগলাম দুটো টিকিটের জন্য, এবং শেষপর্যন্ত তারা দয়াস্বরূপ আমাদের দুটি টিকেট দিল আমাদের বাজেটের ভেতর। কিন্তু বাসের টিকেটগুলো ঠিক টিকেটের মত না, কেবল ছোট্ট কাগজের স্লিপ। মিকার জন্য এসবই নতুন অভিজ্ঞতা, এবং সে বাংলাদেশ নিয়ে আগ্রহী হয়ে গুগোল করা শুরু করে দিল।
দুপুরে আমরা হোস্টেলের কাছে পথের ধারের ভাসমান মার্কেটে গেলাম। দোকানীদের বেশীরভাগই হয় বাংলাদেশী না হয় ভারতীয় অথবা পাকিস্তানী। কেউ আছে কয়েক পুরুষ ধরে, কেউবা আছে কয়েক বছর ধরে, কেউ পেয়েছে নাগরিকত্বের গোলাপি কার্ড, কেউ পেয়েছে নীল কার্ড আবার কেউ পেয়েছে সবুজ কার্ড। এইসব নানা রঙের কার্ড নিয়ে আলাপ করব অন্যকোন দিন। তবে যারা কয়েক পুরুষ ধরে বাস করছে, তাদের প্রায় কেউই পূর্বপুরুষের ভাষা জানে না। সুলে প্যাগোডার পাশের এই এলাকায় জুম্মার আজানের শব্দ ভেসে এলে আশেপাশে চমকে তাকালাম। খেয়াল করে দেখলাম লম্বা টানা বিল্ডিংগুলোর ভেতরে মসজিদ আছে , বাইরে থেকে দেখে অবশ্য বোঝার উপায় নেই। একটু ঘুরতেই দেখালাম প্রায় সব গলিতেই একটা করে মসজিদ রয়েছে এই এলাকায়। কয়েকজন দোকানদারকে একটু অবাক হয়েই জিজ্ঞেস করলাম মুসলিম হিসেবে কোন অসুবিধা হয় কিনা, কেননা রোহিঙ্গা শরণার্থী নিয়ে কাজ করার সুবাদে জানা ছিল রাখাইন স্টেটে মাইক তো দূরে থাক জোরে আজান দিতে পারে না অনেক গ্রামে। আর ২০১২ সালে দাঙ্গার পর তো অনেক মসজিদ বন্ধ করেই দিয়েছে। কিন্তু, রেঙ্গুনের মুসলিমদের ধর্মচর্চা নিয়ে তেমন কোন সমস্যা হয় না বলেই জানালো যাদের সাথে কথা বলেছি সকলে। এই এলাকায় হিন্দুদের শিব মন্দিরের দেখাও পেলাম আমরা। থমির পাশাপাশি বোরখা এবং শাড়ি-সিঁদুর পরা আবার সেলয়ার-কামিজ পরা নারীর দেখা পেলাম। পুরুষদের মধ্যে দাঁড়ি-টুপি পরা দোকানদার, পথচারীও দেখা গেল।
মিকা এবং আমি ব্যাগ রেখে বেরিয়ে পরলাম শহর হেঁটে দেখতে। উৎসব উপলক্ষ্যে শহর খুব ফাঁকা। ইংরেজদের করে যাওয়া শহর ঘুরে বেড়াতে বেশ ভাল লাগছিল। মনের ভেতর আবার একটু আশঙ্কাও হচ্ছিল, বাংলাদেশের মতো বাসের এক টিকেট দশজনকে বিক্রি করেনি তো? রাতের আগে কিছুই জানা যাবে না। যদি টিকেটগুলো ভুয়া হয় তখন?  রূপা দত্ত (শরণার্থী, নারীবিদ এবং একজন নারী ভ্রমণকারীর গল্প)