রেইনট্রি হোটেলে আলোচিত ‘ধর্ষণ’ মামলায় সাফাতসহ সবাই খালাস

ঢাকার বনানীর রেইনট্রি হোটেলে চার বছর আগে দুই তরুণীকে ধর্ষণের আলোচিত মামলার রায়ে আপন জুয়েলার্সের মালিকের ছেলে সাফাত আহমেদসহ পাঁচ আসামির সবাইকে খালাস দিয়েছে আদালত

ঢাকার ৭ নম্বর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক বেগম মোছা. কামরুন্নাহার বৃহস্পতিবার দুপুরে এ রায় ঘোষণা করেন।

রায়ের পর্যবেক্ষণে তিনি বলেন, “ঘটনার ৩৮ দিন পর মামলা হল, চিকিৎসক মেডিক্যাল রিপোর্টে ধর্ষণের আলামত পাননি মর্মে মতামত দিলেন, ভুক্তভোগীদের পরিধেয় কাপড়ে কোনো পুরুষের সিমেন্সের কনা পাওয়া যায় নাই…। তারপরও তদন্ত চার্জশিট দাখিল করে আদালতের পাবলিক টাইম নষ্ট করেছেন।

“এতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ রেইপ কেসের বিচার ব্যাহত হয়েছে। তিনি অন্য কোনো পক্ষ কর্তৃক প্রভাবিত হয়ে এই চার্জশিট দিয়ে মামলাটি বিচারের জন্য পাঠিয়েছেন। আজকের দিনসহ এই মামলায় ৯৪ কার্যদিবস ব্যয় হয়েছে।”

৭২ ঘণ্টার পর মেডিকেল পরীক্ষা করা হলে যে ধর্ষণের আলামত পাওয়া যায় না, সে কথা তুলে ধরে বিচারক পুলিশকে ওই সময়ের পরে কোনো মামলা না নিতে বলেছেন।

মামলায় প্রধান আসামি সাফাত আহমেদ আপন জুয়েলার্সের মালিক দিলদার আহমেদের ছেলে। বাকি আসামিরা হলেন সাফাতের বন্ধু সাদমান সাকিফ ও নাঈম আশরাফ ওরফে এইচএম হালিম, সাফাতের দেহরক্ষী রহমত আলী ও গাড়িচালক বিল্লাল।

পাঁচ আসামির সবাই রায়ের সময় আদালতে উপস্থিতি ছিলেন। রায় শেষে বেরিয়ে যাওয়ার সময় তাদের সবাইকে উৎফুল্ল দেখা যায়।

তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আফরোজা ফারহানা আহমেদ অরেঞ্জ বলেন, “আমরা আদালতে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করেছি এ মামলার বিচারে। আদালত ঘটনা এবং নথিপত্রের চুলচেরা বিশ্লেষণ করে মামলার রায় দিয়েছেন। মামলার সত্যায়িত কপি পাওয়ার পরে আমরা কী করব, সেই সিদ্ধান্ত নিব।”

অন্যদিকে আসামিপক্ষের অন্যতম আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল বলেন, “সাক্ষ্যপ্রমাণ এখানে হাজির করার পরও মেডিকেলে রিপোর্ট, ডিএনএ রিপোর্ট, ২২ জনের সাক্ষী, ঘটনাস্থল, ২২ ধারায় বাদীর জবানবন্দি এবং সব কিছুর আলোকে এটা মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। এবং মাননীয় আদালত চূড়ান্তভাবে খালাস প্রদান করেছেন। আমরা আনন্দিত।”

এ মামলায় আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছিলেন আসামী সাফাত আহমেদ ও নাঈম আশরাফ। ‘জোর করে’ ওই জবানবন্দি আদায় করা হয় বলে পরে অভিযোগ করেন আসামীপক্ষের আইনজীবীরা।

১৬৪ ধারায় জবানবন্দি আদায়ের ’প্রচলিত নিয়ম’ পরিবর্তনেরও দাবি জানিয়েছেন আইনজীবী কাজল।

তিনি বলেন, “এই মামলায় যে ১৬৪ ধারার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি হল, এটা জোর করে নেওয়া হয়েছে। আমাদের দেশের প্রচলিত নিয়মগুলো বাতিল হয়ে যাওয়া উচিত। পুলিশ যে প্রচলিত নিয়মগুলো ব্যবহার করে সেগুলো বাতিল হয়ে যাওয়া ‍উচিত।”তরুণীদের অভিযোগ অনুযায়ী, এই রেইনট্রি হোটেলেই ঘটে ধর্ষণের ঘটনা। ফাইল ছবি

তরুণীদের অভিযোগ অনুযায়ী, এই রেইনট্রি হোটেলেই ঘটে ধর্ষণের ঘটনা। ফাইল ছবি২০১৭ সালের ২৮ মার্চ বনানীর রেইনট্রি হোটেলে সাফাতের জন্মদিনের অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানিয়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই দুই ছাত্রীকে ধর্ষণ করা হয় বলে অভিযোগ করা হয় এ মামলায়।

ঘটনার এক মাসের বেশি সময় পর ৬ মে বনানী থানায় মামলাটি করেন এক তরুণী। তার অভিযোগ ছিল, ওই হোটেলে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে তাকেসহ তার বন্ধুকে রাতভর আটকে রেখে সাফাত ও নাঈম ধর্ষণ করেন। অন্য তিনজন তাতে সহায়তা করেন।

মামলার মধ্য দিয়ে বিষয়টি সামনে এলে সারা দেশে ব্যাপক আলোচনা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। আসামিদের গ্রেপ্তারের দাবিতে রাজপথে মানববন্ধনের মত কর্মসূচিও পালন করে বিভিন্ন সংগঠন। 

মামলা হওয়ার কয়েকদিনের মধ্যে ১১ মে সিলেট থেকে সাফাতকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার সঙ্গে গ্রেপ্তার হন সাদমানও। অন্য আসামিদেরও এর মধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়।

ওই ঘটনায় তুমুল আলোচনার মধ্যে আপন জুয়েলার্সের বিভিন্ন শাখায় চলে শুল্ক গোয়েন্দাদের অভিযান। বেআইনি সোনা পাওয়ায় দিলদারের বিরুদ্ধে মামলাও হয়।

ধর্ষণের মামলা হওয়ার পরের মাসেই ৭ জুন তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশের উইমেন সাপোর্ট অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন ডিভিশনের (ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টার) পরিদর্শক ইসমত আরা এমি আদালতে আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করেন।

এক মাসে তদন্ত শেষের পর পরের মাসেই আদালতে অভিযোগ গঠন হয়। ওই বছরের ১৩ জুলাই অভিযোগ গঠনের পর শুরু হয় সাক্ষ্যগ্রহণ।

রাষ্ট্রপক্ষে এ মামলা পরিচালনা করেন অ্যাডভোকেট আফরোজা ফারহানা আহমেদ অরেঞ্জ, বাদীর নিজস্ব আইনজীবী হিসেবে ছিলেন ফারুক আহাম্মদ।

  

  রায়ের আগে আদালতে সাফাত আহমেদ

রায়ের আগে আদালতে সাফাত আহমেদএ মামলায় ৪৭ জন সাক্ষীর মধ্যে ২২ জনের সাক্ষ্য শোনে আদালত। তবে ঘটনার দীর্ঘদিন পর ডাক্তারি পরীক্ষায় ধর্ষণের আলামত না মেলা এবং গুরুত্বপূর্ণ দুই সাক্ষী আহমেদ শাহরিয়ার ও ফারিয়া মাহবুব পিয়াসার অনুপস্থিতি যে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে, তা যুক্তিতর্কের পর রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামি পক্ষের আইনজীবীদের কথায় তা উঠে আসে।  

মামলার বিবরণ অনুযায়ী, অভিযোগকারী তরুণীদের বন্ধু শাহরিয়ার ঘটনার দিন রেইনট্রি হোটেলে ছিলেন। তাকে মারধর করে বের করে দেওয়া হয়।

আর মামলা দায়েরের সময় এক তরুণীর সঙ্গে ছিলেন পিয়াসা, যিনি ছিলেন সাফাত আহমেদের সাবেক স্ত্রী।

সাফাতের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠার কয়েক মাস আগেই পিয়াসার সঙ্গে তার বিচ্ছেদ হয়। এরপর ফারিয়া আর তার সাবেক শ্বশুর দিলদারের মধ্যে পাল্টাপাল্টি মামলাও হয়েছিল।

মডেল পিয়াসা সম্প্রতি মাদকের মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে এখন কারাগারে রয়েছেন।

এ দুই সাক্ষীর না আসা প্রসঙ্গে আসামি নাঈম আশরাফের আইনজীবী খায়রুল ইসলাম লিটন যুক্তিতর্কে বলেছিলেন, “যদি ঘটনা সত্য হত, তাহলে তারা সাক্ষ্য দিতে আসতেন।

“আসামি সাফাত ও অন্যরা ব্যবসায়িক অসুস্থ প্রতিদ্বন্দ্বিতা অথবা সাফাতের সাবেক স্ত্রী পিয়াসার ষড়যন্ত্রের শিকার।”

ডাক্তারি পরীক্ষায় ধর্ষণের আলামত না পাওয়ার কথাও বলেন আসামি পক্ষের আইনজীবী। চিকিৎসকের সেই সনদ বিচারকের গোচরেও আনেন তিনি।

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা বলেন, সাক্ষ্য দিতে বারবার সমন পাঠানো হলেও শাহরিয়ার ও পিয়াসা আদালতে আসেননি।

সাফাত আহমেদ গ্রেপ্তার হওয়ার পর আপন জুয়েলার্সে অভিযানে শুল্ক গোয়েন্দারা। ফাইল ছবিযুক্তিতর্ক শুনানিতে বিচারকের প্রশ্নে বাদী ও রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা বলেছিলেন, লকডাউনের আগে গত জানুয়ারিতে তিনবার সমন পাঠানো হয় পিয়াসা ও শাহরিয়ারকে। মোবাইল ফোনে এসএমএসও পাঠানো হয়। কিন্তু তারা সাক্ষ্য দিতে আসেনি।

গত ২৯ অগাস্ট আত্মপক্ষ শুনানিতে আসামিরা নিজেদের নির্দোষ দাবি করে ন্যায়বিচার চেয়েছিলেন। সে সময় তারা সবাই জামিনে ছিলেন। যুক্তিতর্ক শেষে গত ৩ অক্টোবর জামিন বাতিল করে কারাগারে পাঠানো হয়।

সেদিন এ মামলার রায়ের জন্য ১২ অক্টোবর দিন রেখেছিল আদালত। কিন্তু রায় প্রস্তুত না হওয়ায় তা পিছিয়ে ২৭ অক্টোবর নতুন তারিখ রাখা হয়।

প্রবীণ আইনজীবী আব্দুল বাসেত মজুমদারের মৃত্যুতে ১২ অক্টোবর নিম্ন আদালতের কার্যক্রম বন্ধ থাকায় রায় ফের পিছিয়ে যায়। সেদিনই রায়ের জন্য ১১ নভেম্বর দিন রাখে আদালত।

দুই দফা পিছিয়ে বৃহস্পতিবার সকালে পাঁচ আসামিকে রায়ের জন্য কারাগার থেকে আদালতে নিয়ে আসা হয়। আদালত পাড়ায় নেওয়া হয় বাড়তি নিরাপত্তা।

রায়ে বিচারক বলেন, রেইনট্রি হোটেলে ধর্ষণের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। ‘উভয়পক্ষের সম্মতিতে শারীরিক সম্পর্ক’ ঘটেছে। ধর্ষণের অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি।