‘‘বাংলার সংগ্রাম : বিদ্রোহ ও বিপ্লবের ইতিহাস, ১৭৫৭ থেকে ১৯৪৭”

মাহবুবুর রব চৌধুরী, টরেন্টো

১৭৫৭’র পলাশী যুদ্ধ পরবর্তী বিদ্রোহ ও রক্তাক্ত বিপ্লব, বাংলার উদ্দীপ্ত, উজ্জীবিত দীর্ঘ দিনের ইতিহাস। পলাশী যুদ্ধের পর থেকেই যা দানা বেঁধে উঠেছিল। সংগ্রামী এ ইতিহাসের শুরুতেই যে নামটি উচ্চারিত হবে তিনি আর কেউ নন তিনি বাংলা, বিহার, উড়িষ্যার শেষ স্বাধীন নবাব।
নবাব সিরাজউদ্দৌলা ছিলেন স্বাধীন চেতা সংগ্রামী প্রকৃত জন দরদী, জনহিতৈষী, কল্যানকামী বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব। পলাশীর আম্রকাননে ষড়যন্ত্রমূলক যুদ্ধে তাকে পরাজিত করবার পর ইংরেজ এবং তাদের তাবেদার এদেশীয় ষড়যন্ত্রকারীরা ক্লাইভঃ মীর জাফর, জগৎ শেঠ, উমী চাঁদ, স্বরূপ চাঁদ, রায় দুর্লভ প্রমুখ। নিজেদের খল চরিত্র এবং কুৎসিত কাপুরুষিত ষড়যন্ত্র চাপা দিতে তারা পরিকল্পিতভাবে- তার বিরুদ্ধে ফরমায়েশি লেখক দ্বারা মিথ্যা প্রোপাগান্ডা ও মিথ্যা ইতিহাস রচনা করে তা বিভিন্ন ভাবে মানুষের মাঝে ছড়িয়েছে। যার কু-প্রভাব এখনো সবটুকু মুছে যায় নি।
অসত্য ও মিথ্যার বেড়াজাল ভেঙে সময় এসেছে সত্য প্রকাশের।
ইতিহাসের সত্য উদঘাটন করে নতুন প্রজন্মের সামনে তা তুলে ধরবার। জাতীয় স্বার্থেই তা প্রয়োজন। সত্য চিরকাল ইতিহাসের শক্তিশালী ভিত্তি। অতীত ইতিহাস ও ঐতিহ্য, জাতীয় সম্পদ এটি সমৃদ্ধ জাতী গঠনে সহায়ক। সচেতন, আত্ম মর্যাদাশীল, বলিষ্ঠ। স্বাধীনচেতা, কর্মমুখী, গতিশীল মানুষ তৈরিতে তা যোগায় বলিষ্ঠ অনুপ্রেরণা। ইতিহাস ছাড়া মানুষ সভ্য জগতের সভ্য জাতির অংশ নয়, শুধুমাত্র তারা হয়ে যায়, পরিচয় হীন এক জনসংখ্যা।
বাংলার ইতিহাসের বাঁকে বিভিন্ন পরতে পরতে ছড়িয়ে থাকা বিদ্রোহ ও বিপ্লবের কাহিনী ণ্ডলিকে আধারের বুকচিরে তুলে এনে উজ্জ্বল আলোয় ছড়িয়ে দেওয়াটা আজ তাই অনেক জরুরী। এ ভাবেই প্রজন্ম জানবে তাদের অতীতের ইতিহাস। বর্তমান, সাম্প্রতিক, নিকট ও দূরের সুষম সমন্বয়ের মাঝে গড়ে উঠবে নিজস্ব, স্বকীয়, ইতিহাস পাঠ। নিজস্ব ইতিহাসের গৌরব গাঁথাকে হৃদয় মাঝে স্থান দিয়ে, বর্তমানের চ্যালেঞ্জ ণ্ডল আমাদের অতিক্রম করতে হবে এবং বিশ্ব মাঝে মর্যাদার সাথে আত্ম সন্মান নিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হবে স্বাধীন ভাবে। এই পথে গড়ে তুলতে হবে ইস্পাত কঠিন জাতীয় ঐক্য। জাতীয় ইতিহাসই রাখতে পারে জাতীয় ঐক্য সৃষ্টিতে পজেটিভ ব্যাপক প্রভাব। ইতিহাস চর্চা তাই ণ্ডরুত্ব পূর্ন।
হারান স্বাধীনতা পুনঃ উদ্ধার ও বেনিয়া ইংরেজের শোষণ ও শাসনের হাত থেকে মুক্তির সংগ্রামে বাংলার হাজারও মানুষের রক্ত ঘাম এদেশের মাটির সাথে মিশে আছে। চির স্মরণীয় তারকাদের সেই মিছিল থেকে উজ্জ্বল ধ্রুব তারা সম কিছু মানুষের কথা ও কাহিনী এখানে আলোচ্য।
এই পর্বে মূলত তুলে ধরা হবে বাংলার বীর’- কাশিম মীর এর কথা।
একই সঙ্গে এখানে বাংলার কিছু স্মরণীয়, বরণীয় মানুষের পরিচিতি কাহিনী ও সংক্ষিপ্ত ভাবে তুলে ধরা হবে।
(এক) বাঙালি বীর, বীর কাশিম আলী মীর, (১৭২৩ থেকে ১৭৭৭ ) * জন্ম : ১৭২৩ সনে, মুর্শিদাবাদ। মৃত্যু: ৮ মে, ১৭৭৭ সনে- দিল্লী।
(দুই) বাংলার জন যুদ্ধের জনক মজনু শাহ বুরহান, (১৭৩৩ থেকে ১৭৮৮) * জন্ম : ১৭৩৩ সনে, মিরাট। মৃত্যু: ২৬ জানুয়ারি, ১৭৮৮ সনে-কানপুর জেলার মকানপুর। শাহ মাদার শরীফ দরগায়।
(তিন) সৈয়দ মীর নিসার আলী তিতুমীর, জন্ম- ১৭৮২ সালের ২৭শে জানুয়ারি’ পশ্চিমবঙ্গের ২৪ পরগণা জেলার বারাসত মহকুমার চাঁদপুর গ্রামে। মৃত্যু ১৯শে’ নভেম্বর ১৮৩১। মৃত্যু ভয়হীন বাংলার একক সিংহ’- এ দেশ, এ মাটির শ্রেষ্ঠ বীর যোদ্ধাদের অন্যতম বাঁশের কেল্লা খ্যাত। বিপ্লবী বাঙালি বীর- মীর নিসার আলী তিতুমীর।
(চার) ফরায়েজি আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা বিপ্লবী হাজী শরীয়ত উল্লাহ, (১৭৮১ থেকে ১৮৪০)। হাজী শরীয়তুল্লাহ ফরিদপুর জেলার মাদারীপুরের সামাইল গ্রামে ১৭৮১ সনে জন্মগ্রহণ করেন। ১৮৪০ সালের ২৮ নভেম্বর, ৫৯ বছর বয়সে তিনি ইন্তেকাল করেন। `Haji Shariatullah died at his native village Shamail in 1840 at the age of 59′
(পাঁচ) যশোরের বিপ্লবী মুন্সী মেহেরুল্লাহ, জন্ম: মোবারকগঞ্জ ঝিনাইদহ- কর্ম ক্ষেত্র যশোর।
যিনি খ্রিস্টান পাদ্রী মহলে- ওয়ান ম্যান ব্যান্ড-/ ওয়ান ম্যান ব্রিগেড, উপাধিতে, নামে পরিচিত ছিলেন। যশোরের কেন্দ্রস্থল দড়াটানা মোড়ে তার দর্জির দোকানে বসে তিনি দেখেছেন মিশনারিদের অপ তৎপরতা। প্রতিজ্ঞা করেছিলেন বাংলার মানুষের ধর্মীও স্বাধীনতা রক্ষার। গরিব দুঃখী সাধারণ মানুষের ত্রাণ কর্তা রূপে তিনি জীবনের সবটুকু দিয়ে তাদের পাশে দুঃসময়ে দাড়িয়ে ছিলেন। আদর্শ, নোবেল এ মানুষটির কথা জাতি কখন ও ভুলবে না। তিনি বলতেন আমি উচ্চ শিক্ষিত নই, ভালো বাংলাও জানি না তথাপি ক্রমে ক্রমে কয়েকখানি পুস্তক- প্রকাশ করিয়াছি, তদ্বারা সমাজের কতদূর উপকার সাধিত হইয়াছে বলিতে পারি না। তবে এই মাত্র জানি যে, এখন আমি খোদার ফজলে সমুদয় বঙ্গীয় মুসলমানের স্নেহ আকর্ষণ করিয়াছি। আমি দরিদ্র লোকের সন্তান হইলেও আমাকে আর কোন বিষয়ের অভাব অনুভব করিতে হয় না।
মুন্সী মেহেরুল্লাহ ও সারা বাংলায় বিদ্যুৎ বেগে ছুটে বেড়াতেন দেশের গরিব দরিদ্র মানুষকে পাদ্রীদের প্রলভোনের ধর্মান্তরিত রোধ করতে পাশে দাঁড়িয়ে যেতেন। তিনি ছিলেন সুবক্তা, সুলেখক, একজন সমাজ কর্মী এবং সমাজ সংস্কারক। কলকাতা কেন্দ্রিক সুশীল মহলে তিনি মুসলিম রাম মোহন হিসাবে পরিচিত ছিলেন। সেলফ মেড- আলোকিত এই মানুষটির জীবন ও কর্ম বিস্ময়কর। দেশ ও জাতিকে তার মূলবান অবদান অবশ্যই শ্রদ্ধা ভরে মনে রাখতে হবে।
তাঁর লিখিত পুস্তক সমূহের নাম :
*খ্রিষ্টীয় ধর্মের অসারতা
(প্রকাশকাল-১৮৮৬)
*মেহেরুল এছলাম (প্রকাশকাল-১৮৯৫)
*রদ্দে খিষ্টান ও দলিলোল এছলাম (প্রকাশকাল-১৮৯৫)
*জওয়াবোন্নাছারা (প্রকাশকাল-১৮৯৭)
*বিধবাগঞ্জনা ও বিষাদভাণ্ডার
(প্রকাশকাল-১৮৯৭)
*হিন্দু ধর্ম রহস্য ও দেবলীলা
(প্রকাশকাল-১৯০০)
*পন্দোনামা (প্রকাশকাল-১৯০৮)
*শ্লোকমালা (প্রকাশকাল-১৯১০)
*খ্রিষ্টান মুসলমান তর্কযুদ্ধ
(প্রকাশকাল জানা যায়নি)
*মানবজীবনের কর্তব্য
(রচনাকাল ১৩১১ বঙ্গাব্দ, অপ্রকাশিত)
এবার আবার ফিরে দেখি, ফিরে আসি মীর কাসেম আলী খান এর কথায়।
বাংলার বুকে যিনি প্রথম ইংরেজ বেনিয়া বিরোধী বিদ্রোহের পতাকা তুলেছিলেন তিনি বাংলার বীর- কাসিম আলী খান মীর।
স্বাধীনতা বিপ্লব ও বিদ্রোহের চেতনা ছিল তাঁর মজ্জাগত, স্বভাবগত। মীর কাসিম বাংলার ইতিহাসের বাঁকে হারানো এক বীরের উপখ্যান। পলাশীর যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে অতি অল্প সময়ের মাঝেই তিনি ইংরেজদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন।
তার কাছে দেশ ও দেশের মানুষের স্বার্থ ছিল সবার উপর, সর্ব প্রথম। বেনিয়া ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এদেশের শুল্কমুক্ত বাণিজ্যের যে অন্যায় আবদার ধরেছিল মোগল রাজকীয় পুরাতন এক ফরমান দস্তাখ এর কথা বলে। মীর কাসিম তা ছুড়ে ফেলেন। ইংরেজ চেয়েছিল অনেক সুবিধা নিতে।
অপরদিকে দেশীয় ব্যবসায়ীদেরকে দিতে হতো ৪০ % উচ্চ শুল্ক।
ইংরেজ তাদের একচেটিয়া মনোপলি ব্যবসা করবার জন্য বিভিন্ন ধরনের অনায্য অনৈতিক কাজে জড়িয়েছে। এদেশের বুকে তারাই প্রথম শুল্ক ফাঁকি সহ বিভিন্ন ধরনের জালিয়াতি প্রতারণা আর ঘুষ প্রথা ছড়িয়ে দেয়। যা আজও আমাদের মাঝে মহামারী হয়ে রয়ে গেছে। ইংরেজের এইরূপ কর্মকাণ্ডে মীর কাসিম তাদের এদেশ থেকে তাড়ানর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।
প্রথমে তিনি কোম্পানির ব্যবসাকেও শুল্ক ট্যাঙ্রে আওতায় আনবার চেষ্টা করেন। পরবর্তীতে দেশি ব্যবসাকে বাঁচাতে এবং ইংরেজের অনেয্য মনোপোলি ভেঙে ফেলতে তিনি দেশি ব্যবসায়ীদেরকেও শুল্ক মুক্ত করেদেন। এই ভাবে তিনি ইংরেজের স্বার্থের বিরুদ্ধে সরাসরি অবস্থান নেন ফলশ্রুতিতে যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে পড়ে।
বাংলা সহ সারা ইন্ডিয়া তে মীর কাসিমের মত ইংরেজদের বিরুদ্ধে এত ণ্ডলি বড় আকারের যুদ্ধের নেতৃত্ব আর কেউ দেননি। কেউ এতণ্ডলি উদ্দমী উদ্বেগ নেননি। ইংরেজ তখন তাকে বেঙ্গলি কানিং ফঙ্ নামে ডাকত।
তিনি মুর্শিদাবাদ, আজিমাবাদ পাটনা সুতি কটি উদয় নালা, মুঙ্গের এবং সর্বশেষে বঙ্ারের ইংরেজদের বিরুদ্ধে মরণপণ যুদ্ধ করেন।
বিরূপ সময় আভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্র সর্বোপরি ভাগ্যের ফেরে পড়ে তিনি পরাজিত হন সত্য তবে তিনি সফল ভাবেই বাংলার বুকে বিদ্রোহের আণ্ডন জ্বালিয়ে দেন।
কে ছিলেন এই ?
তিনি ছিলেন মীর জাফর আলী খান ও তার স্ত্রী শাহানা খানমের কন্যা ফাতিমা বেগম সাহেবার স্বামী। প্রভাবশালী সম্ভ্রান্ত নাজাফি বংশের সন্তান পিতা স্বনামধন্য মীর রাজি খান। তিনি ১৭২৩ সালে মুর্শিদাবাদে জন্মগ্রহণ করেন। এবং দীর্ঘ ১৪ বছর নিরুদ্দেশ থাকাকালীন অবস্থায় দিল্লির সন্নিকট কোটলায় ৮ই মে ১৭৭৭ সালে মৃত্যু মুখে পতিত হন। বঙ্ার যুদ্ধ শেষে তিনি ণ্ডপ্ত ঘাতক থেকে নিজেকে নিরাপদ রাখতেই নিরুদ্দেশ জীবন বেঁচে নেন। ১৭৬০ সালের ২০ অক্টোবর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আনুকূল্যে শশুর মীরজাফর আলী খানকে সরিয়ে তিনি হন বাংলার নবাব তার নবাবী স্থায়িত্ব পেয়েছিল মাত্র তিন বছর। জুলাই ১৭৬৩ সাল পর্যন্ত।
সাহস, সামর্থ্য, স্পৃহা, দূরদর্শিতা কোনোটারই অভাব ছিলো না নবা মীর কাসিম আলী খানের। দেশকে বিদেশীশাসন, শোষণ থেকে মুক্ত করার প্রথম স্বপ্নদ্রষ্টা তিনি। স্বাধীনতা পুনঃ উদ্ধার ও বেনিয়া ইংরেজের শোষণ ও শাসনের হাত থেকে জাতীয় মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাসে এই নাম ণ্ডলি এবং সংগ্রামী দিন ণ্ডলি চির দিন ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লিখা থাকবে জাতীয় প্রেরণার উৎস হয়ে।
মাহবুবুর রব চৌধুরী।
(সাবেক সভাপতি বাংলাদেশ এসোসিয়েশন টরন্টো। কনভেনর ২০০০, ফোবানা, কনভেনশন টরন্টো। )