মজনু শাহ বুরহান বাংলায় ব্রিটিশ বিরোধী জন যুদ্ধের জনক

 

মাহবুবুর রব চৌধুরী, টরেন্টো

মজনু শাহ বুরহান বাংলায় প্রথম ব্রিটিশ বিরোধী জন যুদ্ধের নায়ক। সিংহ হৃদয় বুরহান মজনু শাহ ছিলেন প্রচন্ড সাহসী ও প্রখর দূর দৃষ্টি সম্পন্ন দেশ প্রেমিক এক ব্যক্তিত্ব। ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজ উদ দৌল্লাহকে ক্ষমতাচ্যুত করা এবং তাকে হত্যা করে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য ছিনিয়ে নেওয়াকে কখনোই তিনি মন থেকে মেনে নেননি এবং মেনে নিতে পারেন নি। নিষ্ঠুর, নির্দয় ভাবে নবাব সিরাজ উদ দৌল্লাহকে হত্যা হৃদয় বিদারক এই ঘটনাটি তার মনে গভীর ভাবে রেখাপাত করে। এর বিচার, আর বাংলার স্বাধীনতা পুনঃ উদ্ধারের সংকল্প থেকেই তিনি ইংরেজ বিরোধী সশস্ত্র গণআন্দোলন শুরু করেন এবং তুলে নেন নিজ হাতে অস্ত্র। আমৃত্যু তিনি ইংরেজ মুক্ত স্বাধীন বাংলা পুনঃ প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম করেছেন। এবং জীবদ্দশায় ইংরেজকে আঘাত হানার কোন সুযোগই ছেড়ে দেননি।
পলাশীর আম্র কাননে ১৭৫৭ সনের ২৩ সে জুন মঞ্চস্থ হয়েছিল এক বিশ্বাস ঘাতকতা ও প্রহসনের যুদ্ধ। জগৎ শেঠ, উমি চাঁদ, রায় দুর্লভ প্রমুখ কুচক্রী মহলের দিবানিশি প্ররোরচনা এবং ইংরেজ ষড়যন্ত্রের ফাঁদে পা রেখে নবাব সেনাপতি মীর জাফর আলী খান সেদিন তাদের সাথে নেচেছিলেন। যুদ্ধ শেষে পূর্ব পরিকল্পনা অনুসারে মীর জাফর আলী খান ইংরেজের সাথে আপোষ করেই বাংলার মসনদে অধিষ্ঠ হন। তার ক্ষমতার মেয়াদ ছিল ১৯ শে অক্টোবর ১৭৬০ পর্যন্ত। তিন বছর।
পরবর্তীতে ২০ শে’ অক্টোবর ১৭৬০ ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন মীর জাফর আলী খানের জামাতা মীর কাশিম। তিনি ‘৭ ই জুলাই ১৭৬৪ পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিলেন।
ক্ষমতায় এসে এক পর্যায়ে মীর কাসেম ইস্ট ইন্ডিয়ান কোম্পানি কে সাইজ করতে মনস্থ করেন। তিনি ইংরেজের অনেয্য বিনা শুল্কের ব্যবসা বন্দে তাদের বাণিজ্যের উপর ৯ % শুল্ক আরোপ করেন। বেনিয়া ইংরেজ অজুহাত দেখায় তাদের নিকট বাংলায় বিনা শুল্কে বাণিজ্যের দিল্লির পারমিশন আছে। (এটি ছিল তাদের দিল্লি থেকে পাওয়া মেয়াদ উত্তীর্ন একটি সমঝোতা’ -পত্র। কোন চুক্তি নয়, এটি ছিল একটি দাস্তাখ) ইংরেজ ওই কাগজের, দাখাস্ত এর নিজ মন গড়া একটি অর্থ – দাঁড় করিয়ে আবদার ধরেছিলো ছিল তারা নবাব কে কোন শুল্ক দেবে না। নবাব মীর কাশিম উপায় না পেয়ে – দেশি ব্যবসায়ীদের থেকে খাজনা নেওয়া স্থগিত করে দেন।
এতে ইংরেজ স্থানীয় দেশি বিজিনেসের সাথে নুতন প্রতিযোগিতার মুখে পড়ে যায়। এবং তাদের বাংলায় ট্যাক্স ফ্রি – রম রমা মাংকি বিজিনেসে কিছুটা ঢিলা পড়ে। মীর কাশিমের উপর তারা প্রচন্ড ক্ষিপ্ত হয়। মীর কাসিমও তখন ইংরেজ কে শায়েস্তা করতে এবং বাংলা ছাড়া করতে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেন।
ফলশ্রুতিতে মীর কাশিমের সাথে ইংরাজদের কয়েকটি যুদ্ধ হয়। এই যুদ্ধে মীর কাশিম ইংরেজ বিতাড়নের কাঙ্খিত ফল লাভে ব্যর্থ হন। ওই সময়কার পারিপার্শ্বিক অবস্থা, পরিস্থিতিও মীর কাশিমের পক্ষে ছিলোনা। এটি মীর কাশিমকে সাহায্য করেনি।
(Mir Qasim was defeated during the Battle of Murshidabad, Battle of Gherain, the Battle of Udhwa nala.-1761. (The Battle of Udhuanal–1761) and finaly The Battle of Buxar (1764). Mir Qasim invaded the Company offices in Patna in 1763, killing several Europeans. Mir Qasim allied with Shuja-ud-Daula of Avadh and Shah Alam II, the incumbent Mughal emperor against the British. However, He was defeated in the Battle of Buxar in 1764.Mir Qasim also launched a brief invasion of Nepal in 1763 during the reign of Prithvi Narayan Shah . )
এইরূপ বিশৃঙ্খল ঘোলাটে পরিস্থিতির মাঝে মিরাটে- “মুসলিম বিশ্ব ইতিহাসের অনুরাগী এক ছাত্র”, সম্ভ্রান্ত, শিক্ষিত, সচ্ছল মুসলিম পরিবারের সন্তান মজনু শাহ বুরহান বাংলাকে নিয়ে বাংলার মুসলিম ভবিষ্যৎ নিয়ে অলক্ষে, নীরবে, নিভৃতে – নিজস্ব এক চিন্তা, ভাবনা, পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হন। ইতিহাসের এই ছাত্রই বাংলার বুকে পরবর্তীতে হয়ে উঠেন ইংরেজ বিরোধী রণনীতি ও রাজনীতির নুতন শিক্ষক।
জন্ম মেওয়াতে- মিরাটে হলেও ( Mewat is a historical region of Haryana and Rajasthan states in northwestern India.) বাংলা ছিল তার সংগ্রাম স্বপ্ন এবং বিপ্লবের মূলকর্ম ক্ষেত্র। বাংলাকে ভালবেসে বাংলার মানুষকে সাথে নিয়েই তিনি তার জীবন সংকল্প।
বাংলার স্বাধীনতা উদ্ধারের জন্য বাংলার পথে প্রান্তে, মাঠে ঘটে, জল ডোবা, বন জঙ্গলে পদচারনা করেছেন। দিনাজপুর, রংপুর, বণ্ডড়া, পাবনা, রাজশাহী,ময়মনসিং ছিল তার আন্দোলনের মূল প্রাণ কেন্দ্র।
১৭৩৩ সনে তার জন্ম সময়কালে ওই একই বছর একই সময় ১৭৩৩ সনে মুর্শিদাবাদের নবাব মহলে জন্ম হয় নবাব সিরাজুদ্দৌলাহর। ইতিহাসের সংযোগ আর জগৎ সংসারের ধারা বড় বিচিত্র।
মজনু শাহ বুরহান বাবা, মা পারিবারিক পরশ, স্বাচ্ছন্দ ত্যাগ করে সুদূর বাংলায় যেয়ে বাংলার মানুষের পাশে দাঁড়াতে মনস্থ করেন। লক্ষ ছিল বাংলার মানুষের মুক্তি, কল্যাণ ও স্বাধীনতা। এই পথে মায়ের দোয়া এবং সুফী সৈয়দ বদিউদ্দিন কুতুব শাহ – মাদার কে আধ্যাত্মিক ণ্ডরু মেনে। নিজেকে নুতন রূপে ঢেলে সাজান।
তার জন্মস্থান নিয়ে তখন বাংলাদেশে লোক মুখে অনেক কথা প্রচারিত ছিল। অনেকে মনে করেন এই প্রচারের পিছনে তারও নিরাপত্তা জনিত কারনে ইন্ধন থাকতে পারে। প্রচারিত ছিল তিনি ভারতের মধ্যপ্রদেশের গোয়ালিয়র জেলার মানুষ। কেউ বলতেন তিনি উত্তর প্রদেশর মানুষ। অনেকে বলতেন রাজস্থা , হরিয়ানার মিরাটের। কেউ মনে করতেন মেওয়াত, বিহার অথবা বাংলার বণ্ডড়া, ফরিদপুর, বা দিনাজপুর অঞ্চলের মানুষ। তিনি চোস্ত উর্দুর সাথে বণ্ডড়া, দিনাজপুর, রাজশাহীর আঞ্চলিক বাংলায় ফ্লুয়েন্টলি কথা বলতে পারতেন তৎকালীন ইংরেজ শাসক ও তার ইন্টেলিজেন্স বিভাগ কে ধোঁকা দিতে – তিনি নিজেই এই রূপ একটি বিব্ভ্রান্তির সৃষ্টি করে রেখেছিলেন। তার চোস্ত উর্দু এবং আঞ্চলিক বাঙ্লা বলার ধরন বিবভ্রান্তি ছড়াতে সহায়ক হয়েছিল।
সুফী সৈয়দ বদিউদ্দিন কুতুব শাহ – মাদার ছিলেন তখনকার একজন উঁচু মনের উঁচু মাপের সুফী সাধক। এবং আধ্যাত্মিক ণ্ডরু। সুফী দর্শনের মানবতাবাদী উদার দিকণ্ডলি ধর্মীয় সীমান্ত গন্ডি ছাড়িয়ে মুসলিম, হিন্দু সহ অন্যান্য অমুসলিম সম্প্রদায়ের সাধারণ মানুষের মাঝেও বিভিন্ন ভাবে পজেটিভ প্রভাব ফেলেছিল। উত্তর প্রদেশের রাজ্ স্থান, হরিয়ানায় মিরাট, কানপুর, ফরিদাবাদ, ফিরোজপুর, নূহ, এই শহর ণ্ডলিতে তখন মুসলিম, হিন্দু নির্বিশেষে সাধারণ মানুষের মাঝে সুফিবাদের প্রভাব ছিল। বিষয়টি- মজনু শাহ বুরহানকে মুসলিম- এবং হিন্দু জনতার শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করে সংগ্রামে নতুন দিক নির্দেশনা দেখায়। ব্রিটিশ বিরোধী সংগ্রামে সুফিবাদ আশীর্বাদ রূপে কাজ করে। মজনু শাহ বুরহান বিষয়টি সফলতার সাথেই এ সংগ্রামের সাথে যুক্ত করে নেন। বিপ্লবি মজনু শাহ বুরহান ১৭৬৪ সালে’ বঙ্ার’- এ ইংরেজদের বিরুদ্ধে মীর কাশিমের-সর্ব শেষ যুদ্ধে তার অনুসারীদের নিয়ে যোগ দেন।
সেই থেকে শুরু বাংলায় বিপ্লবি উত্তঙ্গ উদ্দাম আন্দলনের অগ্নি স্ফুলিঙ্গ। শুরু স্বাধীনতা উদ্ধারের সংগ্রাম।
এবং আন্দোলন, সংগ্রামের নুতন কৌশল, নুতন পথ, নুতন ধারা। বনে জঙ্গলে এবং জনপদে লুকিয়ে থেকে হিট এন্ড রান গেরিলা যুদ্ধ কৌশল বাংলায় সর্ব প্রথম মজনু শাহ বোরহানই ইন্ট্রুডিউস করেন। বেনিয়া ইংরেজ এবং তার দেশীয় চেলারা, এই জন যুদ্ধকে উপহাস করতে চেয়েছে। কিন্তু কখনও উপেক্ষা করতে পারেনি।
স্বাধীনতা উদ্ধারের এই সংগ্রামে তিনি প্রকাশ্য ও গেরিলা যুদ্ধে পঞ্চাশ হাজারেরও অধিক সংখ্যক অনুসারীকে নিয়ে সারা বাংলায় বহু সফল অভিযান পরিচালনা করেন। এসব অভিযানে তিনি কোম্পানির কুঠি, রাজস্ব অফিস ও স্থাপনা দখল করেন, কোম্পানির শাসকদের তাঁবেদার জমিদারদের কাচারি দখল করেন করেন এবং অতর্কিত আক্রমনে অনেক বার কোম্পানি সৈন্য বাহিনীকে পরাজিত ও পর্যুদস্ত করেন। এসব যুদ্ধে বিপুল সংখ্যক ইংরেজ সৈন্য ও কর্মচারী নিহত হয়। মজনু শাহের সাংগঠনিক দক্ষতা ও দূরদর্শিতা ইংরেজদের ডিভাইড এন্ড রুল এবং হাজারো অপপ্রচারকে সম্পূর্ণ ভাবে অকার্যকর করে
দেন।
হিন্দু মুসলিমদের ঐক্য অক্ষুন্ন রেখে ইংরেজ শাসন বিরোধী তাঁর সুদীর্ঘ সংগ্রামের অখন্ডতা জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত অটুট ভাবে ধরে রাখতে তিনি পেরেছিলেন।
১৭৬০ সাল থেকে বিপ্লবি মজনু শাহ বুরহানের বিপ্লবী জীবনের শুরু -১৭৮৬ সালের ৮ ডিসেম্বর ময়মনসিংহে র্কালেশ্বর এলাকায় লেফটেন্যান্ট ব্রেনানের বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধটি ছিল তার জীবনের শেষ যুদ্ধ। প্রচন্ড রক্ত ক্ষয়ী এই যুদ্ধে ণ্ডরুতর ভাবে আহত হওয়া পর্যন্ত দীর্ঘ ছাবিবশ বছর তিনি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিরুদ্ধে অবিরাম যুদ্ধে লিপ্ত ছিলেন। নিরাপত্তা ও চিকিৎসা সুবিধার জন্য তার অনুসারীরা তাকে আহত অবস্থায় অতি গোপনে আরো কয়েক জন অনুসারী সহ কানপুর জেলার মকানপুরে শাহ মাদারের দরগায় নিয়ে যান। ১৭৮৮ সালের ২৬ জানুয়ারি তিনি এই দরগায়তেই মৃত্যুবরণ করেন।
তার মৃত্যুর পর তার ভাগ্নে মুসা শাহ আন্দলনের নেতৃত্ব দেন। তার পর অনুসারীরা পর্যায় ক্রমে – চেরাগ আলী শাহ, সোবহান শাহ, মাদার বকস, করিম শাহ প্রমুখ বিপ্লবী নেতা আন্দলনের নেতৃত্ব দেন। ইংরেজদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত জয় ছিনিয়ে আনতে না পারলেও,, জীবন বাজি রেখে তারা চেষ্টা চালিয়েছিলেন।
এই জন যুদ্ধ আন্দলনের বিশেষ তাৎপর্য পূর্ন কিছু দিক হল ,
১. শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সারা দেশের সর্ব শ্রেণীর মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন পাওয়া।
২. ইংরেজের সাম্প্রদায়িক বিভেদ এবং মুসলিম বিরোধী সব ধরনের অপপ্রচারের কার্য ক্ষমতা নিষ্ক্রিয় করে রাখা
৩. পরাধীনতার গ্লানি এবং হতাশা মুক্তিতে কার্যকর অবদান রাখা।
৪. জাতীয় জীবনে প্রেরণা ও উদ্দীপনা ফিরিয়ে আনা।
৫. ইংরেজের মনবলে দারুন ভাবে আঘাত হানা। এবং তাদের আরামের ঘুম এ বিচ্ছেদ টেনে দেওয়া।
১৭৫৭ থেকে ১৯৪৭ পরাধীনতার ১৯০ বছর। মজনু শাহ বুরহানের জন যুদ্ধ ১৭৫৭’ র তিন বছরের মাঝেই বাংলার মাটিতে প্রতিরোধের মাথা তুলে দাঁড়ায়। তিনি নিজেই ১৭৬০ থেকে ১৭৮৬ পর্যন্ত -দীর্ঘ ২৬ বছর বিপ্লবী জন যুদ্ধে নেতৃত্ব দেন। পরবর্তী নেতৃত্বও তিনি বিকশিত হবার পথ তৈরী করে যান। এই ধারাবাকতায় ইতিহাসের সোনালী পাতায় উঠে আসেন। ফরায়েজি আন্দোলন এবং প্রতিষ্ঠাতা হাজী শরীয়ত উল্লাহ ও যিনি বাংলাদেশের মাদারীপুর জন্মগ্রহণ করেন। ১৮৪০ সালের ২৮ নভেম্বর তিনি ইন্তেকাল করেন মাওলানা সাইয়েদ নিসার আলী তিতুমীর (১৭৮২-১৮৩১) প্রমুখ।
এমনকি ১৮৫৭’ র সিপাহী বিদ্রোহ তথা স্বাধীনতা যুদ্ধেও এই জন যুদ্ধ একটি অনুপ্রেরণার প্রচ্ছন্ন, অপ্রকাশিত ছায়া রেখা ছিল।
বাংলার অগ্নি বিপ্লবের এই ইতিহাসটি ফকির মজনু শাহ এর ফকির বিদ্রোহ নামেই সমধিক প্রচারিত। পরিচিত !!!
মাহবুবুর রব চৌধুরী – টরন্টো।