দুই অপরাধী ভাইয়ের নিরাপদ আশ্রয়

খন্দকার মোহতেশাম বাবরের সহায়তায় ফরিদপুরের সাবেক আ. লীগ নেতা বরকত ও তার ভাই রুবেলের অবৈধ আয় আড়াই হাজার কোটি টাকা: সিআইডি

  • শরিফুল ইসলাম

ফরিদপুর আওয়ামী লীগের সাবেক নেতা সাজ্জাদ হোসেন ওরফে বরকত ও তার ভাই ইমতিয়াজ হাসান ওরফে রুবেল জ্ঞাত আয়ের উৎসের বাইরে অবৈধ উপায়ে দুই হাজার ৫৩৫ কোটি ১১ লাখ টাকা আয় করেছেন বলে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) তদন্তে পাওয়া গেছে।

সিআইডির তদন্ত প্রতিবেদনের তথ্যমতে, সাবেক মন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেনের ভাই খন্দকার মোহতেশাম বাবরসহ অর্থপাচার মামলায় অভিযুক্ত আরও অন্তত আট জনের আশ্রয় ও সহায়তায় তারা এই বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ গড়ে তুলেছেন।

অবৈধভাবে অর্জিত এই বিপুল সম্পদের মধ্যে কেবল নয় কোটি ৭৫ লাখ টাকা ফরিদপুর আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক বরকত ও তার ভাই ফরিদপুর প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি রুবেলের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে রয়েছে।

বাকি দুই হাজার ৫২৫ কোটিরও বেশি অর্থ তারা বিদেশে পাচার করেছেন বলে গতকাল ঢাকার একটি আদালতে ১০ অভিযুক্তের বিরুদ্ধে দেওয়া প্রতিবেদনে বলেছে সিআইডি। গত বছরের জুনে রাজধানীর কাফরুল থানায় অর্থপাচারের মামলাটি দায়ের করা হয়েছিল।

ফরিদপুর আওয়ামী লীগের বর্তমান সহ-সভাপতি বাবরকে অভিযোগপত্রে পলাতক আসামি হিসেবে দেখানো হয়েছে।

সিআইডির তদন্তে আরও দেখা গেছে, দলিল অনুযায়ী এই দুই ভাইয়ের নামে ৩৯২ কোটি ৭৬ লাখ টাকা মূল্যের পাঁচ হাজার ৩৮৮ বিঘা জমি রয়েছে।

সিআইডির তদন্ত কর্মকর্তারা বলছেন, ২০০৮ সালের নির্বাচনের সময় আওয়ামী লীগের এক শীর্ষ নেতার সংস্পর্শে যাওয়ার পর থেকেই অবৈধভাবে বিপুল পরিমাণ সম্পদ গড়েছেন এই দুই ভাই।

মামলায় অভিযুক্ত অন্যান্যরা হলেন— খন্দকার মোশাররফের সহকারী ব্যক্তিগত সচিব ও ফরিদপুর জেলা যুবলীগের সাবেক আহ্বায়ক এএইচএম ফুয়াদ, ফরিদপুর শহর যুবলীগের সাবেক সভাপতি খন্দকার নাজমুল ইসলাম লেভি, ফরিদপুর নগর শাখা যুবলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আশিকুর রহমান ফারহান, ফরিদপুর জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক ফাহাদ বিন ওয়াজেদ ফাহিন ওরফে ফাহিম, ফরিদপুর শহর যুবলীগের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক কামরুল হাসান ডেভিড, জেলা যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক মোহাম্মদ আলী মিনার এবং ফরিদপুর শহর যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক তারিকুল ইসলাম ওরফে নাসিম।

তাদের মধ্যে বরকত, রুবেল, লেভি ও ফারহান বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। গ্রেপ্তারের পর বরকতকে আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।

অভিযোগপত্রে সিআইডি বলেছে, তারা বরকত ও রুবেলের আরও ৪২ সহযোগীর নাম জানতে পেরেছে এবং তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত এখনো চলমান। তাদের মধ্যে একজন মারা গেছেন।

নাক প্রকাশে অনিচ্ছুক সিআইডির এক কর্মকর্তা বলেন, ‘অর্থপাচারের সঙ্গে তাদের সংশ্লিষ্টতা প্রমাণের যথেষ্ট তথ্য-উপাত্ত পেলে আমরা আরেকটি পরিপূরক অভিযোগপত্র জমা দেবো।’

সিআইডি সূত্র জানিয়েছে, আদালতে জমা দেওয়া অভিযোগপত্রটি ৭২ পৃষ্ঠার এবং এর সঙ্গে সাড়ে চার হাজার পৃষ্ঠার সংশ্লিষ্ট নথি রয়েছে।

দ্য ডেইলি স্টারের আদালত-বিষয়ক প্রতিবেদক জানান, অভিযোগপত্রে বাবরকে পলাতক আসামি হিসেবে দেখানো হয়েছে। একইভাবে ফুয়াদ, ফাহিম, ডেভিড, মিনার ও নাসিমকেও অভিযোগপত্রে পলাতক আসামি হিসেবে দেখানো হয়েছে।

আদালত সূত্র জানায়, বরকত, রুবেল, ফারহান ও লেভি ম্যাজিস্ট্রেটদের কাছে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেওয়ার পর বাবর এবং ওই পাঁচ জনের নাম পলাতক আসামির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা (আইও) সিআইডির সহকারী পুলিশ কমিশনার উত্তম কুমার বিশ্বাস ঢাকা মহানগর মুখ্য হাকিমের আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন।

একইসঙ্গে অর্থপাচারের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা না থাকায় এই মামলার আরও ১০ আসামি, যাদেরকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে, তাদেরকে অব্যাহতি দেওয়ার জন্যে আদালতে আবেদন করেছেন তদন্তকারী কর্মকর্তা।

গত বছরের ৮ অক্টোবর বরকত ও রুবেলসহ পাঁচ অভিযুক্তের ৮৮টি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেন ঢাকার একটি আদালত। গত ২৫ ফেব্রুয়ারি এই দুই ভাইয়ের পাঁচ হাজার ৭০৬ বিঘা স্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত, ১৮৮টি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ও ৫৫টি বাহন জব্দ করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেন একই আদালত।

গত বছরের ১৬ মে ফরিদপুর শহরের গোয়ালচামট এলাকায় সুবল চন্দ্রের বাড়িতে হামলার অভিযোগে ৭ জুন বরকত ও রুবেলসহ নয় জনকে শহরের বিভিন্ন জায়গা থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

একই বছরের ২৬ জুন দুই ভাইয়ের বিরুদ্ধে অর্থপাচারের অভিযোগ এনে সিআইডির পরিদর্শক এসএম মিরাজ আল মাহমুদ বাদী হয়ে রাজধানীর কাফরুল থানায় মামলা দায়ের করেন।

মামলার বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ২০১০ সাল থেকেই কারসাজির মাধ্যমে বিভিন্ন সরকারি দপ্তর থেকে কাজ নিয়ে বিশাল পরিমাণ এই অবৈধ সম্পদ তারা গড়েছেন। তারা মাদক চোরাকারবার ও জমি দখলের সঙ্গেও জড়িত। তারা দুই জন ২৩টি বাস, কয়েকটি ট্রাক ও প্রাইভেটকারের মালিক হয়েছেন।

সিআইডির তদন্তকারী কর্মকর্তারা বলছেন, ২০০৮ সালের আগে বরকত ও রুবেলের কার্যত কোনো স্থাবর বা অস্থাবর সম্পত্তি ছিল না। ২০০৯ সালে তারা আওয়ামী লীগে যোগ দেন এবং জাতীয় নির্বাচনের সময় তারা খন্দকার মোশাররফের জন্যে কাজ করেন। মোশাররফ মন্ত্রী হওয়ার পর এই দুই ভাই তার বিশ্বাস অর্জন করেছিলেন বলেও তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

মোহতেশাম ও ফুয়াদের সঙ্গে তারা এক ধরনের যোগসূত্র স্থাপন করেছিলেন। একটি অবৈধ সিন্ডিকেটের মাধ্যমে তারা সড়ক ও জনপথ, গণপূর্ত, এলজিইডি মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য বিভাগ, বিআরটিএ, পৌরসভা, জেলা পরিষদ, পানি উন্নয়ন বোর্ড ও মেডিকেল কলেজগুলোর সমস্ত দরপত্র নিয়ন্ত্রণ করতেন। অবৈধভাবে তারা বিভিন্ন হাটসহ জেলা ভূমি নিবন্ধকের কার্যালয় থেকে কমিশন নিতেন এবং চাঁদা নিতেন পরিবহন খাত থেকেও।

তদন্তকারী কর্মকর্তারা বলেছেন, এসব অবৈধ অর্থ দিয়ে তারা জোরপূর্বক সাধারণ মানুষের কাছ থেকে নামমাত্র মূল্যে জমি কিনে নিতেন। এরপর তারা ৩৭৫ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছেন এবং প্লটভিত্তিক এসব জমির অতিরিক্ত মূল্য নির্ধারণ করেন।

অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, ২০১৭ থেকে ২০২০ সালের মধ্যবর্তী সময়ে শুধু এলজিইডি থেকেই ৮১২ কোটি টাকা মূল্যের ৪৭৫টি প্রকল্পের কাজ পেয়েছেন বরকত ও রুবেল। চারটি ব্যবসায়িক ফার্মের বিপরীতে নয়টি ব্যাংকের ১৮৮টি অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে তারা ২০৪ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছেন।

তদন্তকারীরা বলছেন, একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি জাহিদুর রহমান ওরফে খোকন রাজাকার এই দুই ভাইয়ের মামা এবং আবুল কালাম আজাদ ওরফে বাচ্চু রাজাকার তাদের খালু।

১৯৯৪ সালে ফরিদপুর আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক মহিউদ্দিন খোকন হত্যা মামলায় এই দুই ভাইকে আসামি করা হয়েছিল এবং এরপরেও তারা আওয়ামী লীগে যোগ দিতে পেরেছেন।

গতকাল রাতে টেলিফোনে যোগাযোগ করা হলে খন্দকার মোশাররফ হোসেন প্রশ্ন করেন, কোনো নথিতে সই না করে ও কোনো কিছুর সঙ্গে জড়িত না থাকা সত্ত্বেও কেন তার ভাই বাবরকে অভিযুক্ত করা হয়েছে?

‘বরকত ও রুবেল ছাড়া বাকিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ পুলিশ প্রমাণ করতে পারবে না বলে মনে হচ্ছে। তাদের বিরুদ্ধে কী প্রমাণ আনবে। তারা তো এগুলোর সঙ্গে জড়িত না। মানে আমি যেটা বুঝতেছি। কারণ, ওই কাজে অ্যালটমেন্ট করারও কোনো দায়-দায়িত্ব তাদের ছিল না, কাজ উঠানোরও দায়-দায়িত্ব ছিল না। ওদের (বরকত-রুবেল) সঙ্গে হয়তো তাদের বন্ধুত্ব থাকতে পারে। কিন্তু, তাতে কি আসামি করা যায়? যাই হোক সেটা পুলিশ জানে’, বলেন তিনি।

২০০৯ সাল ও পরবর্তী সময়ে আপনার সংস্পর্শে এসেই কি বরকত ও রুবেল প্রভাবশালী হয়ে উঠেছে?, জানতে চাইলে খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ প্রথমবারের মতো ফরিদপুর সদর আসন পেয়েছিল। যদি সমর্থক না বাড়ে ও আরও বেশি লোক দলে যোগ না দেয়, তাহলে কি আসন পাওয়া যায়?’

বরকত ও রুবেলের মামা-খালু যুদ্ধাপরাধী, এ বিষয়টি উল্লেখ করলে তিনি বলেন, ‘তাদের মামা-খালু রাজাকার হলে কি তারা আওয়ামী লীগ করতে পারবে না? এইটা কোনো কথা না। লোক না বাড়ালে কি নির্বাচনে জেতা চায়?’

দুই ভাই কীভাবে এই বিপুল পরিমাণ সম্পদের মালিক হয়েছেন, জানতে চাইলে এই সংসদ সদস্য বলেন, ‘এ বিষয়ে আমার কোনো ধারণা নেই।’