নীড়শিল্প ও সাহিত্যস্মৃতিতে অম্লান আরমানিটোলা মাঠ : পর্ব-১

স্মৃতিতে অম্লান আরমানিটোলা মাঠ : পর্ব-১

লিখেছেন ডঃ মোহম্মদ মাহবুব চৌধুরী, মন্ট্রিয়াল, কানাডা থেকে

পুরানো ঢাকার আরমানিটোলার একজন প্রাক্তন বাসিন্দা হিসেবে ঐতিহাসিক আরমানিটোলা মাঠ বা ময়দান আমার প্রানের সাথে মিশে আছে। আরমেনিয়ানদের স্মৃতিবিজড়িত আরমানিটোলা এলাকায় বৃটিশ আমলে নবাব স্যার সলিমুল্লাহর নিজস্ব উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত এই রিক্রিয়েশনাল গ্রাউন্ড ছিল স্বাধীনতা পূর্ব ও পরবর্তী জাতীয় রাজনৈতিক আন্দোলন এবং পুরান ঢাকাবাসীর খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের অন্যতম কেন্দ্রস্থল। এই মাঠের চৌহদ্দিতেই কেটেছে আমার শৈশব, কৈশর আর তারুন্যের সেই উচ্ছল দিনগুলো। খেলাধুলার প্রতি এক দুর্নিবার আকর্ষনে সকাল বিকাল যখনই সুযোগ পেতাম, ছুটে যেতাম প্রানের এই মাঠ চত্বরে-কখনো নিজে খেলতে, আবার কখনো শুধু খেলা দেখতে। শিশু-কিশোর-তরুন নানা বয়সী ফুটবল ও ক্রিকেট খেলোয়াড়ের পদচারনায় মুখরিত এই আরমানিটোলা মাঠেই জীবনে প্রথম ক্রিকেট খেলি এবং মাঠ সংলগ্ন আরমানিটোলা ক্লাবে টেবিল টেনিস খেলেই একসময় জাতীয় টেবিল টেনিসের বালক বিভাগের শিরোপা জিতি। আবার এই মাঠেই সন্ধ্যার পরে পাড়ার বন্ধুদের সাথে ঘন্টার পর ঘন্টা আড্ডা মেরে পার করি তারুন্যের ঐ মুখরিত দিনগুলো। শৈশব, কৈশর আর তারুন্যের নানা বর্নালী স্মৃতিতে ভাস্মর প্রানের এই আরমানিটোলা মাঠ!

# আরমানিটোলা মাঠের ইতিহাস:

ঢাকায় একসময় ব্যবসা উপলক্ষ্যে সপ্তদশ ও অষ্টদশ শতাব্দী জুড়ে আগমন ঘটেছিল অসংখ্য আরমেনীয় ব্যবসায়ীর আর আজকের আরমানিটোলায় ছিল এই আরমেনীয় ব্যবসায়ীদের প্রধান আবাসস্থল। কালের পরিক্রমায় ঢাকায় এখন আর কোন আরমেনিয়ান অবশিষ্ট না থাকলেও তাদের স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে এই এলাকার আরমেনিয়ান চার্চটি এখনো রয়ে গিয়েছে। এই চার্চ সংলগ্ন রাস্তাটি আর্মেনিয়ান স্ট্রিট এবং এলাকাটি এখনো আরমানিটোলা নামেই পরিচিত। বুড়িগঙ্গা নদীতীরস্থ মিটফোর্ড হসপিটালের উত্তর দিক হতে আরমেনিয়ান স্ট্রীট ধরে দুপাশে কেমিকেলসের দোকান পেরিয়ে, ঐতিহাসিক আরমেনিয়ান চার্চকে বামে রেখে ফটিক ভাইদের পুরানো বাড়ি, আমার টেবিল টেনিস গুরু মারুফ ভাইদের বাসা, মসজিদ আর বিখ্যাত সংগীত শিল্পি হ্যাপি আখন্দ ও লাকী আখন্দদের বাসা পেরিয়ে সামান্য একটু এগুলেই হাতের ডানে পড়তো চারদিকে হলুদ দেয়ালে ঘেরা ঐতিহাসিক আরমানিটোলা ময়দান বা মাঠ।

বর্তমানে মিটফোর্ড হাসপাতাল ও সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজের মালিকানাধীন এই আরমানিটোলা মাঠের ঐতিহাসিক গুরুত্ব অসাধারন। মোগল আমলে ঢাকার জনগনের চলাফেরার প্রধান বাহন ছিল ঘোড়া বা ঘোড়ার গাড়ি। শোনা যায় সেসময় ঘোড়ার আস্তাবল, ঘোড়ার গাড়ি, ঘোড়ার খাদ্য ইত্যাদি রাখা হত আজকের এই আরমানিটোলা মাঠের জায়গাটিতেই। পরবর্তীতে বৃটিশ আমলের শেষ দিকে বিংশ শতাব্দীর শুরুতে নবাব স্যার সলিমুল্লাহ মিটফোর্ড হাসপাতালের স্টাফ এবং রোগীদের শরীরচর্চা ও খেলাধুলার জন্য এই জায়গাটিকে একটি রিক্রিয়েশনাল গ্রাউন্ডে রূপান্তরিত করেন। তখন হতেই মাঠটি আরমানিটোলা মাঠ বা ময়দান নামে পরিচিতি লাভ করে। কালক্রমে মাঠটি আরমানিটোলা এলাকা ছাড়াও আশেপাশের মিটফোর্ড, বাদামতলি, বাবুবাজার, সৈয়দ হাসান আলি লেন, জিন্দাবাহার, আওলাদ হোসেন লেন, নয়াবাজার, বাগডাসা লেন, তাঁতিবাজার, বংশাল, সামসাবাদ, কসাইটুলি, মাহুৎটুলি, বেচারাম দেউড়ি, মৌলভিবাজার, ইমামগন্জ ও আগা নওয়াব দেউড়ির আপামর শিশু-কিশোর-তরুনের অন্যতম খেলার মাঠ এবং তৎকালীন সময়ে রাজনৈতিক কর্মকান্ডের অন্যতম কেন্দ্রস্থলে রূপান্তরিত হয়। উনিশ শতকের গোড়ায় মুসলিম লীগ ও পরবর্তিতে পাকিস্তান এবং বাংলাদেশ আমলে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলের অসংখ্য জনসভা অনুষ্ঠিত হয় এই আরমানিটোলা ময়দানে। ১৯৫৪ তে হক-ভাসানি-সোহরাওয়ার্দির যুক্তফ্রন্টের নির্বাচন হতে শুরু করে, আইয়ুব বিরোধী আন্দোলন-আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে ফাতেমা জিন্নাহর প্রেসিডেন্সিয়াল ইলেকশন, সত্তরের নির্বাচনসহ বাংলাদেশের স্বাধীনতা পূর্ববর্তী ও পরবর্তীকালে অসংখ্য রাজনৈতিক জনসভার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু ছিল এই আরমানিটোলা মাঠ। এই আরমানিটোলা মাঠেই জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অসংখ্য রাজনৈতিক জনসভায় ভাষণ দিয়েছিলেন। সত্তর এবং তিয়াত্তরের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু পুরানো ঢাকার এই কোতয়ালি আসন হতে দাঁড়িয়েই বিজয়ী হয়েছিলেন। পরবর্তীতে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান, হোসেইন মো: এরশাদ, ঢাকার সাবেক মেয়র হানিফসহ অনেক রাজনৈতিক নেতা এই মাঠে রাজনৈতিক জনসভা এবং জনসংযোগ করেছেন। এই মাঠেই আমি ১৯৮৫ সালে প্রেসিডেন্ট এরশাদের এক বিশাল জনসভা দেখি। এটাই আমার জীবনে দেখা প্রথম রাজনৈতিক জনসভা। পরবর্তীতে ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও ঢাকা সিটির মেয়র নির্বাচনের সময়ও অনেক রাজনৈতিক নেতার বক্তব্য শুনেছি এই মাঠে।

# আরমানিটোলা মাঠের চৌহদ্দি:

১৯৮৪ সালের শেষে নোয়াখালি হতে যখন ঢাকায় আসি নয়াবাজারে আব্বার কাগজের ব্যবসার সুবাদে আমাদের প্রথম ভাড়া বাসায় থাকার অভিজ্ঞতা হয় আরমানিটোলা মাঠের উত্তর-পূর্ব কোনা সংলগ্ন কেপি ঘোষ স্ট্রিটের উপরস্থ শাহাবুদ্দীন হাজির ছয়তলা বিল্ডিং এর দ্বিতীয় তলায়। আমি তখন ভর্তি হয়েছিলাম বাসার সংলগ্ন আহমেদ বাওয়ানী স্কুলে-তৃতীয় শ্রেনীতে। এ বাসাটিতেই আমরা ১৯৮৫ হতে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত তিন বছরের একটু বেশী সময় জুড়ে থেকেছিলাম। আমাদের বাসার জানালা দিয়ে সরাসরি আরমানিটোলা মাঠটা দেখা যেত। তখন ঢাকা শহরে উঁচু বিল্ডিং খুব একটা ছিলনা । তাই আমরা ছয়তলার ছাদে গেলে দক্ষিনে বুড়িগঙ্গা নদী, বাদামতলি ঘাট, মিটফোর্ড হাসপাতাল, নয়াবাজার কাগজ মার্কেট আর বাবুবাজার চাউলের আড়তসহ আরমানিটোলা মাঠের পুরোটাই দেখা যেত। বালুর এই মাঠটি এমনিতেই বেশ বড় ছিল কিন্তু শৈশবের ছোট চোখে সেটা যেন আরো বড় হয়ে ধরা পড়তো।

(১)

আরমানিটোলা মাঠের দক্ষিন-পশ্চিম কোনায় আরমেনিয়ান স্ট্রীটের শেষ মাথায় ছিল বিখ্যাত সংগীত শিল্পি লাকী আখন্দ ও হ্যাপি আখন্দদের পৈত্রিক নিবাস। হ্যাপি আখন্দ মারা যাবার পর উনার নামাজে জানাজা এই আরমানিটোলা মাঠেই হয়েছিল। আমি নিজেও ছোটবেলায় লাকী আখন্দকে মাঠ সংলগ্ন রাস্তায় হাঁটাচলা করতে দেখেছি।

মাঠের এই দক্ষিন-পশ্চিম কোনায় ছিল একসময়কার ঐতিহ্যবাহী ও ঢাকার অন্যতম পুরানো শাবিস্তান সিনেমা হল (পূর্বতন পিকচার হাউস) এবং তৎসংলগ্ন আয়ুর্বেদীয় ফার্মেসি-এপির গুদামঘর ও অফিস (এক সময়ের বিশিষ্ট আরমেনিয়ান ব্যবসায়ী নিকোলাস পোগজের বাসভবন-‘নিকি সাহেবের কুঠি’-যা সম্প্রতি ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে), বরেণ্য ফুটবল ও হকি খেলোয়াড় প্রতাপ হাজরাদের পুরানো বাড়ি। এই শাবিস্তান হলেই ক্লাস সেভেন-এইটে থাকতে আমি আর চাচাতো ভাই মিলন ছারপোকার কামড় খেয়েও কত মর্নিং আর ম্যাটিনি শো দেখেছি গুনে শেষ করা যাবেনা! টিকেট কাউন্টারের সামনে বিশাল গোঁফ আর বপুওয়ালা এক দশাসই চেহারার লোক ব্ল্যাকে টিকেট বিক্রি করতো। মারাত্মক ভয় লাগতো উনাকে! তাই সামান্য বেশী দাম দিয়ে হলেও উনার কাছ থেকেই তাড়াতাড়ি করে টিকেট কিনে কেউ দেখার আগেই হলের ভিতর ঢুকে যেতাম।কালের পরিক্রমায় শাবিস্তান সিনেমাহল উঠে গিয়েছে, প্রতাপ হাজরাদের সেই পুরানো বিল্ডিংটিও আর নেই-সেই জায়গায় এখন নতুন নতুন উঁচু বিল্ডিংয়ের সারি।

আরমানিটোলা মাঠের উত্তর-পশ্চিম কোনায় বেচারাম দেউড়ি যাবার মুখে ছিল মাহমুদ পারভেজদের ছোট একটি সিগারেটের দোকান, একটা ছোট ভাত-মাছের হোটেল আর একটা চুল কাটার সেলুন যার ঠিক পাশেই ছিল আরেকটা সিগারেটের দোকান। কিশোর ও তরুন বয়সে এই সেলুনে অনেকবার চুল কাটিয়েছি। এই সেলুটির পাশেই আরমানিটোলা কাঁটা বটগাছ-বেচারাম দেউড়িমুখী রাস্তার উপর ছিল রহমান লন্ড্রী যেখানে আমরা আমাদের ভাল জামা কাপড় লন্ড্রী আর ইস্ত্রি করাতাম। এই রহমান লন্ড্রী হতে সামনে কিছুদুর এগিয়ে হ্যাপি এক্স-রে ক্লিনিক, বাঘ বাড়ি ও জগন্নাথ হলের পুরানো হোষ্টেলটি পার হলেই আরমানিটোলা কাঁটা বটগাছের মোড়। এখান থেকে মিটফোর্ড যাবার মুখে পড়ত এক সময়ের ঢাকার প্রিমিয়ার হকি লীগ চ্যাম্পিয়ন ঊষা ক্লাব। কাঁটা বটগাছের উত্তর দিকের রাস্তাটি ধরেই বেচারাম দেউড়ির শুরু।

আরমানিটোলা মাঠের উত্তর-পশ্চিম কোনার চুল কাটার সেলুনটির পাশেই ছিল আনন্দময়ী গার্লস স্কুলের পুরানো বিল্ডিং- স্কুল ছুটির সময় যার আশেপাশে সৌন্দর্য্য দর্শনের প্রত্যাশায় অপেক্ষমান কিশোর-তরুনদের একটা বিশেষ ‘উদ্দেশ্যমুলক’ আনাগোনা চোখে পড়তো। স্কুলের ঠিক উল্টা দিকেই ছিল বিএনপির সাবেক মহাসচিব ও সংসদ সদস্য খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনের তিনতলা বাসভবন। মাঠের ভেতর বা বাইরে অনেক দুর হতে বিল্ডিংটার নাম- ‘সাহেরা ভিলা’ চোখে পড়তো। এই সাহেরা ভিলারই তিনতলার একটা ফ্ল্যাটে ১৯৮৫-৮৬ সালের দিকে আমার প্রাইমারি স্কুলের বন্ধু রুবেলরা থাকতো। ক্লাস থ্রি-ফোরের দিকে স্কুলের ক্লাস শেষে আমি প্রায়ই রুবেলদের বাসায় চলে যেতাম। ঐ বিল্ডিংএর নিচ তলায় একটু খালি জায়গায় আমি, রুবেল, ওর ছোট ভাই রাসেল আর খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনের ছোট ছেলে পবন মিলে ফুটবল খেলতাম। পবনের আম্মা ( যার নামে ছিল বিল্ডিংটির নাম), বড় ভাই ডাব্লু ভাই আর বোন পান্না আপার সাথে নিত্য দেখা হলেও আংকেলকে খুব একটা দেখতাম না। সাহেরা ভিলার সামান্য উত্তরে শরৎচন্দ্র চক্রবর্তী রোডের উপরস্থ একটা গোলাপী রংয়ের দোতলা বিল্ডিংয়ে ছিল এলাকার একমাত্র ইংলিশ মিডিয়াম কিন্ডারগারটেন-মেরি’স টিউটোরিয়াল (স্কুলটি পরে মাহুৎটুলিতে এবং আরো পরে বংশাল আর মাহুৎটুলির কোনায় বর্তমান অবস্থানে স্থানান্তরিত হয়) যেখানে আমার আম্মা সেই ১৯৮৭ সাল হতে ২০১৭ পর্যন্ত প্রায় ৩০ বছর শিক্ষকতা করেছেন।মেরি’স টিউটোরিয়ালের এই পুরানো বিল্ডিং হতে উত্তরদিকে সামান্য এগুলে হাতের ডানপাশে রাস্তা হতেই দেখা যেত এলাকার প্রভাবশালী আকবর শেঠের ছয়তলা বিল্ডিং-‘রেজিয়া নীড়’। আরেকটু উত্তরে বন্ধু সাইফুল, ঝিনু ভাইদের বাসা আর স্টার টেইলার্স পার হলেই হাতের বামে পড়তো আরমানিটোলা স্কুল মাঠ।এই আরমানিটোলা স্কুলের গেইটে তখন এক বা দুই টাকায় খুবই সুস্বাদু লেবু ও দইয়ের শরবত পাওয়া যেত। আর এই স্কুল গেইটের চটপটিওয়ালা মামার চটপটি আর ফুচকা ছিল আমার মতে সেই সময়ে পুরান ঢাকা তথা পুরা ঢাকা শহরের মধ্যেই সেরা!

(২)

অন্যদিকে, আরমানিটোলা মাঠের উত্তর-পশ্চিম কোনাস্থ সাহেরা ভিলা হতে পূর্বদিকে কয়েকটা ট্র্যান্সপোর্ট আর কেমিক্যালসের দোকান পেরুলেই হাতের বামে পড়তো মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের প্রথম অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট সৈয়দ নজরুল ইসলামের বোনের বাড়ি। মাঠের ভিতর থেকে এই বিশাল পুরানো বিল্ডিংটা চোখে পড়তো ( শৈশবে মাঠের আশেপাশে দেখা অনেক পুরানো বিল্ডিংয়ের মাঝে এটাই সম্ভবত এখনো পর্যন্ত ভগ্নদশায় টিকে আছে)। এই বাড়ির ছেলে অপু আর দীপু ভাইরা আরমানিটোলা মাঠে নিয়মিত খেলতে আসতেন। বাড়ির একেবারে সামনের দিকের বর্ধিত অংশে রাস্তা ঘেঁষে ছিল একটা টয়লেট যার বর্জ্য নিস্কাশন তখনো রাস্তা হতে দৃশ্যমান ছিল। পাশেই ছিল একটা কনফেকশনারি দোকান যেখানে ঐসময়ের দিকে আড়াই টাকা দিয়ে একটা চিকেন বারগার, এক টাকা দিয়ে একটা ক্রিম রোল, সোয়া এক টাকা দিয়ে একটি বাটারবন এবং আট আনায় সাদা রংয়ের একটা ছোট চিনির সন্দেশ কিনতে পাওয়া যেত। একটা কালো টিনের বাক্সের মত ওভেনে লাইট জ্বালিয়ে তিনকোনাকৃতির একটা মজার এবং মচমচে প্যাটিস বিক্রি হত। আমি প্রায়ই এই কনফেকশনারি থেকে এটা সেটা কিনে খেতাম। অপু ভাইদের পুরানো বাড়ির পাশেই ছিল সজীবদের মেরুন রংয়ের বিল্ডিং যা মাঠের ভিতর হতে আলাদাভাবে নজরে পড়তো। এই বাড়ির পরের গলিতেই আরমানিটোলা মাঠের ঠিক উত্তর-পূর্ব কোনায় সারি সারি ট্রান্সপোর্টের দোকান আর আমাদের বাড়িওয়ালার ক্রিসেন্ট শেইপের বিল্ডিং যার দোতলায় আমরা তখন ভাড়া থাকতাম। আমাদের বাসার ঠিক নিচেই ছিল এলাকার বিখ্যাত মায়াবী স্টুডিও যেখানে কালো করে শুকনামতন এক ভদ্রলোক ছবি তুলতেন। এলাকার প্রিয় বড় ভাই মুন্না ভাই একসময় এই মায়াবী স্টুডিওতেও কাজ করতেন। আমাদের বাসায় নিয়মিত দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকাটি রাখা হলেও বাসার নিচের ট্র্যান্সপোর্টের দোকানগুলোতে আমি সেই ছোটবেলা থেকেই দৈনিক বাংলা, সংবাদ, বাংলার বাণীসহ অন্যান্য দৈনিক পত্রিকা পড়তে যেতাম-মুলত নানাভাবে খেলার খবরগুলো পড়ার জন্য-খেলার ছবি দেখার জন্য। এভাবে বিভিন্ন পত্রিকায় ঢাকা ফুটবল লীগের খবর পড়তে পড়তে সেই ৮৫ সালের দিকেই আমি আবাহনী ক্রীড়া চক্রের (পরে আবাহনী লিমিটেড) বিশাল ফ্যান হয়ে উঠি। বাসার নিচের ইউনাইটেড এবং সোনার বাংলাসহ বিভিন্ন ট্র্যান্সপোর্টের মালিক/ম্যানেজার বিশেষ করে খলিল সাহেব এবং রফিক সাহেব আমাকে খুব আদর করতেন। মনে আছে একদিন রফিক সাহেবের অফিসে নিউজপেপার পড়ার সময় আবাহনীর তথা তৎকালীন বাংলাদেশ দলের কৃতি মিড-ফিল্ডার আশিষ ভদ্রের দেখা পাই। আমাদের বাসার ঠিক উল্টা পাশেই ছিল নিউ গভ: গার্লস স্কুলের পুরাতন বিল্ডিং (পরে ১৯৮৬-৮৭ সালের দিকে আরমানিটোলা স্কুল সংলগ্ন নতুন বিল্ডিংয়ে স্কুলটা স্থানান্তরিত হয়)। এই পুরানো স্কুলের গেইটে গরমের দিনে কসাইটুলির একজন শরবতওয়ালা বড় একটা অ্যালুমিনিয়ামের ডেকচিতে করে কমলা রংয়ের এক বরফ মেশানো শরবত বিক্রি করতেন আর কিছুক্ষন পরপর মুখ দিয়ে ‘ওয়ারোয়া-ওয়ারোয়া’ বলে হাঁক দিয়ে পথচারীদের দৃষ্টি আকর্ষন করতেন।এই পুরানো স্কুলেরই দক্ষিন-পূর্বদিকের একটি ছোট্ট মাঠে শীতকালে রাতের বেলায় লাইট জ্বালিয়ে হাম্মাদিয়া স্কুলের পাপ্পু ভাই, শিমুল ভাই এবং আরমানিটোলা জর্দাওয়ালা বাড়ির বড়ভাইরা ব্যাডমিন্টন খেলতেন। নিউ গভ: গার্লস স্কুল হতে কসাইটুলি যাবার পথে হাতের ডানে পড়তো পুরানো ঢাকার অন্যতম বিখ্যাত স্কুল-আহমেদ বাওয়ানী একাডেমি যেখানে আমি ক্লাস থ্রি হতে ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত পড়েছিলাম। আমার একেবারে বাসার সাথেই লাগোয়া ছিল স্কুলটি! স্কুল চলাকালীন সময়ে বাওয়ানী স্কুলের তিনটি গেইটেই আইসক্রিমওয়ালা, হজমি, ঝালমুরি, চটপটিওয়ালাদের ভিড় লেগে থাকতো। স্কুলের গেইটে কালো করে গোলগাল এক মামা কার্টে করে সিজন অনুযায়ী পেয়ারা, বরই, জাম, লটকন, পানিফল, শাক আলু, কাঁচা-মিঠা আম ও পাকা পেঁপে বিক্রি করতেন। এই মামার ফলগুলো খুবি ফ্রেশ থাকতো, বিশেষ করে, উনার টক-মিষ্টি গোল বরইগুলো ছিল ঐসময়ে বাজারের সেরা। বাওয়ানী স্কুলের মেয়েদের গেইটের উল্টাদিকে ছিল জুম্মন ভাইর কনফেকশনারি যেখানে সুন্দরীদের দেখার জন্য ‘ভ্রমর’দের ভিড় লেগেই থাকতো। প্রিয়জনকে দেখার জন্য অপেক্ষমান কেউ হয়তো কোল্ড ড্রিংকস খেত, আবার কেউ হয়তো ভাব নিয়ে সিগারেট ধরাতো। কসাইটুলিতে ঢুকার মুখে মসজিদের সাথে লাগানো একটা ছোট হোটেল ছিল যেখানে মজার মজার ডাল আর আলু-পুরি পাওয়া যেত। আহমেদ বাওয়ানী স্কুলের পিছনেই ছিল বাগডাসা, নয়াবাজার আর শ্রমজীবী হাসপাতাল সংলগ্ন হাম্মাদিয়া হাই স্কুল। এভাবে আরমানিটোলা মাঠের উত্তর দিকে পাঁচ পাঁচটি স্কুলের উপস্থিতিতে এলাকাটি সারাদিন ধরেই ছাত্র-ছাত্রীর পদচারনায় মুখরিত থাকতো। আর দিন-রাত ২৪ ঘন্টা ট্রান্সপোর্টের মাল লোডিং-আনলোডিংয়ে এলাকাটি বেশ সরগরম থাকতো।

(৩)

মাঠের দক্ষিন-পূর্ব কোনায় নয়াবাজার হতে বাবুবাজার পর্যন্ত বিস্তৃত নওয়াব ইউসুফ রোডের চওড়া রাস্তার ওপাড়ে জিন্দাবাহার ও সৈয়দ হাসান আলী লেনে ঢোকার সরু গলিমুখ-তার দুইপাশে সারি সারি কাগজের দোকান যা নয়াবাজার হতে বাবুবাজার চালের আড়ত পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। নওয়াব ইউসুফ রোড ধরে পূর্বদিকে অগ্রসর হলে বামে শ্রমজীবী হাসপাতাল, নয়াবাজার ডিআইটি মার্কেট সংলগ্ন কাঁচা বাজার, ফ্রেঞ্চ রোড, ইংলিশ রোড আর ডানে আওলাদ হোসেন লেন, বাসাবাড়ি লেন, তাঁতিবাজার পার হয়ে একে একে পড়ত নবাবপুর, ধোলাইখাল আর নারিন্দা। নয়াবাজার এলাকায় আওলাদ হোসেন লেনের উপরে ছিল করিমের বিখ্যাত মোরগ-পোলাওয়ের দোকান। ছোটবেলায় নয়াবাজারে আব্বার সাথে চুল কাটতে গেলে সকালের নাস্তা হিসেবে ম্যান্ডেটরি ছিল এই করিমের মোরগ-পোলাও যার এক প্লেটের দাম সেই ৮৫ সালের দিকে পড়তো মাত্র ১২ টাকা। লোভনীয় ফ্লেভার আর প্রচুর পরিমানে সুস্বাদু ঝোলের জন্য করিমের মোরগ-পোলাও ছিল আমার ভীষন প্রিয়।

ক্লাস সিক্সে উঠার পর আমরা আরমানিটোলা মাঠের কোনার বাসাটি ছেড়ে সৈয়দ হাসান আলী লেনের উপরস্থ মায়া মিষ্টান্ন ভান্ডারের তিনতলায় ভাড়াবাসায় উঠি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আগ পর্যন্ত এই বাসাতেই থাকি। মায়া মিষ্টান্নের দই, সকাল বেলার আলু ভাজি, বুটের ডাল আর লুচি অনেক মজার ছিল। এলাকার প্রভাবশালী বাবুল চেয়ারম্যান ও আবুল সাহেবদের বাড়ি ছিল এই সৈয়দ হাসান আলী লেনে। বাংলাদেশের বিখ্যাত ব্যবসায়ী বসুন্ধরা গ্রুপের মালিক আকবর সোবহান সাহেবও একসময় আমাদের এই গলিতেই থাকতেন। আমাদের মায়া মিষ্টান্নের বাসার ঠিক উল্টাদিকে ছিল আশিষদের বাসা। প্রকৃতপক্ষে, এটা ছিল আশিষদের নানার বাড়ি এবং ওরা তখন নানারবাড়িতেই থাকতো। এই পরিবারটি ছিল বেশ শিক্ষিত, সম্ভ্রান্ত, মার্জিত এবং সংস্কৃতিবান! আমি এবং আমার ছোটভাই রুমী প্রায়ই আশিষদের বাসায় গিয়ে ফুটবল, ক্রিকেট, ব্যাডমিন্টন, লুকোচুরি সহ নানারকম খেলা খেলতাম। আমাদের সাথে আমাদের বিল্ডিংয়ের দোতলার সেলিম ও শামীমও মাঝেমাঝে যোগ দিত। এই আশিষদের বাসায়ই নিয়মিতভাবে আমাদের নন্টে ফন্টে, বাঁটুল দি গ্রেট সহ ভারতীয় উন্নতমানের হোয়াইট প্রিন্ট কাগজে রঙ্গিন ছবিসহ পরিষ্কার প্রিন্টে ছাপানো রূপকথার বই, সুকুমার রায়ের বইসহ নানারকম গল্পের বই পড়া হয়! আশিষদের বাড়ির সাথেই লাগোয়া ছিল জিন্দাবাহারের দুলাল কমিশনার এবং একসময়ের বিখ্যাত চৌধুরী বাড়ি। আরমানিটোলা মাঠের দক্ষিন-পূর্ব কোনা হতে সৈয়দ হাসান আলী লেনে ঢুকার মুখে বড় রাস্তার উপরই একপাশে খোঁচা খোঁচা লালচে দাঁড়ির এক মামা কার্টে করে সিজন অনুযায়ী ছোট আকৃতির গোল কচি শশা, শাক আলু, পাকা পেঁপে, তরমুজ এবং পেয়ারা বিক্রি করতেন। আরমানিটোলা মাঠে খেলে ক্লান্ত হয়ে বাসায় ঢুকার আগে আমি প্রায়ই এখান থেকে শসা, পেঁপে বা তরমুজ খেয়ে একটু ঠান্ডা হয়ে বাসায় ঢুকতাম। এই মামাই শীতকালে একসময় আবার ভুট্টা বিক্রি করতেন। এক বাদামওয়ালা মামাও এখানে প্রায়ই বিকেল ও সন্ধ্যাবেলায় হালুতে ভাজা গরম গরম বাদাম, বুট, সীমের বিচি, মটর বিক্রি করতেন। সকালবেলায় এই জায়গাটাতেই লাল রংয়ের একটা কার্টে করে এক লোক ওজন করে বড় বড় বোম্বাইর শাহী পরটা বিক্রি করতেন। পরটার সাথে আবার সুজির হালুয়াও বিক্রি হত। এই শাহী পরটা দিয়ে অনেক সময়ই আমরা সকালের নাস্তা করতাম। শীতকালে দিনে ও বিকেলবেলায় এক মহিলা এখানে বসেই গরম গরম চিতই (অতিঝাল চাটনি সহযোগে) আর ভাঁপা পিঠা বিক্রি করতেন। সন্ধ্যার পরে একজন চটপটিওয়ালা কার্টে করে এখানে চটপটি ও ফুচকা বিক্রি করতেন। এই গলিমুখেই বড় রাস্তার উপর শীতকালে মহল্লার বড় ভাইরা লাইট জ্বালিয়ে কোর্ট কেটে ব্যাডমিন্টন খেলজেতেন।একটু টায়ার্ড হয়ে পড়লে বড় ভাইরা আবার পাশের আলী ভাই আর মোহম্মদ আলী ভাইর দোকান থেকে কোল্ড ড্রিঙ্কস কিংবা সিগারেট কিনে একটু হাল্কা বিশ্রাম নিয়ে আবার খেলতে নামতেন।

বাবুবাজারস্থ বুড়িগঙ্গা ব্রিজ তখনো হয়নি। আরমানিটোলা মাঠের ভেতর হতে দক্ষিন-পূর্ব দিকে তাকালে পরিষ্কার চোখে পড়তো-একতলা বা দোতলা জুড়ে সারি সারি কাগজের দোকান, জিন্দাবাহার কামরাঙ্গা মসজিদের গম্বুজ, জনতা ব্যাংকের পাঁচ তলা বিল্ডিং (যার উপর তলায় পাপ্পু ভাই আর বাপ্পি ভাইরা থাকতেন-উনারাই মালিক ছিলেন এই পাঁচ তলা বিল্ডিংয়ের), হেদায়েত ভবনের লাল উঁচু বিল্ডিং, প্রত্যাশী পেপার ( আমার আমেরিকা প্রবাসী বন্ধু খালেদ এই প্রতিষ্ঠানে এক সময় কাজ করতো-আমরা ওর খোঁজে ওখানে সরাসরি চলে যেতাম অথবা ও নিজেই মাঠে আমাদের সাথে দেখা করতে আসতো), সোনালী ব্যাংক এবং ঐ বিল্ডিংয়ের নিচতলায় আমার আব্বা-চাচাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান-আল হেলাল পেপার ডিপো। আব্বাদের দোকানের সামনেই রাস্তার উপর মেশিনে চেপে আখের রস বিক্রি করা হত। এক বা দুই টাকায় সামান্য বরফ মেশানো পরম প্রশান্তির এক গ্লাস আখের রস পাওয়া যেত।  গরমের সময় দোকানে গেলে জ্যাঠাকে বলে প্রায়ই কয়েক গ্লাস আখের রস খেয়ে তৃষ্ণা মেটাতাম।

আমাদের দোকানের সামান্য পশ্চিম দিক হতেই বাবুবাজার চাউলের আড়তের শুরু, একটু এগুলেই রাজধানী হোটেলের ছয় তলা বিল্ডিং যেখানে আমার আপন জ্যাঠা এখনো সপরিবারে থাকেন। খাবারের রেস্টুরেন্টটা ছিল দোতলায়-যেখানে ইন্টারমেডিয়েটে পড়ার সময় এলাকার বন্ধু-বান্ধবসহ সন্ধ্যার পরে অনেক আড্ডা দিয়েছি। আমাদের আড্ডার অনুসংগ ছিল নানরুটি, মুরগীর সুস্বাদু ঝাল ফ্রাই কিংবা মোগলাই, পুরি আর চা সমেত সন্ধ্যার নাস্তা। এই রাজধানী হোটেলের ঠিক সামনেই বাদামতলীমুখী রাস্তার উপর সন্ধ্যার পরে এক বয়স্ক দাঁড়িওয়ালা চাচা এক বা দুই টাকায় এক অসাধারন মজার হালিম বিক্রি করতেন। আমি আর চাচাতো ভাই মিলন প্রায়ই সন্ধ্যার পরে এই বুড়াচাচার হালিম কিনে খেতাম! এই বাদামতলী মুখী রাস্তার উপর একসময় হাতের বামে জনতা লাইব্রেরী, হাতের ডানে গ্লাসের মার্কেটের সাথেই ছিল ইসলামিক ফাউন্ডেশনের একটি বইবিক্রয় কেন্দ্র যেখান থেকে ছোটবেলায় হযরত মুসা (আ:), চার আউলিয়ার গল্প, ফকির মজনু শাহর উপর বই কিনে পড়েছিলাম। এই গ্লাসের মার্কেটের দোতলায় ছিল ‘পীয়্যান সোসাইটি’ নামে একটা রেকর্ডিং স্টুডিও যেখানে আমাদের ছোটবেলায় বাসার জন্য কয়েকটি ভারতীয় বাংলা গানের ক্যাসেটও রেকর্ড করানো হয়েছিল। গ্লাসের এই মার্কেট ধরে দক্ষিনে একটু এগুলেই হাতের ডানে পড়তো বাবুবাজার মাজার। বাবুবাজার চাউলের আড়ত হতে ইসলামপুর রোড পর্যন্ত বুড়িগঙ্গা নদীতীরমুখী এই রাস্তাটি একটি গ্লাসের মার্কেট দিয়ে বিভক্ত ছিল যা বুড়িগঙ্গা ব্রিজ করার কয়েক বছর আগে ভেঙ্গে ফেলে রাস্তাটিকে প্রশস্ত করা হয়েছিল। এই রাস্তা ধরে বাবুবাজার মোড়ে আসলে পূর্বে ইসলামপুর রোড ধরে বাংলাবাজার/সদরঘাট এবং পশ্চিমে মিটফোর্ড রোড ধরে মিটফোর্ড হসপিটাল, ঔষধ ও ক্রোকারিজের মার্কেট পার হয়ে ইমামগন্জ/চকবাজার যাওয়া যেত। বাবুবাজার চাউলের আড়ত হতে ইসলামপুর রোড পার হয়ে সোজা দক্ষিনে গেলে হাতের বামে বাদামতলী ঘাট আর সামান্য ডানে মিটফোর্ড হসপিটালের গা ঘেঁষে ছিল নদীর ওপারে যাবার জন্য একটা গুদারাঘাট। ব্রিজ হবার আগে এই গুদারাঘাট হতে একটা ডিঙি নৌকা ভাড়া করে আমি আর মিলন প্রায়ই নৌকায় ভ্রমন করে নদীর ওই পাড়ে (কেরানীগন্জের) নেমে গুলশান সিনেমা হল সংলগ্ন এলাকা ঘুরে আসতাম। নৌকাভ্রমনের আগে বাবুবাজার মোড় হতে আংগুর-আপেল, সিদ্ধ ডিম, বিরিয়ানি সহ নানারকম খাবার কিনে নৌকায় উঠে ভ্রমন করতে করতে খাবারগুলো খেতাম। নদীর পানি তখনো অনেক পরিষ্কার ছিল। কিন্তু সম্পূর্ন বর্জ্যমুক্ত ছিলনা। তাই পানিতে কিছু অপ্রীতিকর বস্তু দর্শন যে হতনা তা না। পরিষ্কার জায়গা দেখে ডিঙি নৌকার ধার ধরে পানিতে হাত দিয়ে আগাতে আমাদের দুজনেরই খুব ভালো লাগতো। এমনি কোনদিন নৌকা ভ্রমনের সময় উত্তেজনায় চাচাতো ভাই মিলন পানিতে সামান্য ডুবন্ত হলুদ রংয়ের লম্বাটে একটা বস্তুকে কলা ঠাউরে হাত দিয়ে ধরে বড় পস্তানো পস্তেছিল! ঘটনাটি ভেবে এখনো মনে মনে অনেক হাসি পায়!

(৪)

বাবুবাজার চাউলের আড়তের দিক হতে শাবিস্তান হল পর্যন্ত আরমানিটোলা মাঠের দক্ষিন-পশ্চিম বা দক্ষিন পাশ জুড়ে মাঠের গা ঘেঁষে ছিল ঢাকা ওয়াসার পানির পাম্পের সংরক্ষিত স্থান এবং এর উল্টা দিকে ছিল একটা বড় পানির ট্যাংক যা সম্ভবত এখন আর নেই। ওয়াসার সংরক্ষিত জায়গাটির পাশেই আরমানিটোলা মাঠের গা ঘেঁষে সরকারী গণগ্রন্থাগার। এই লাইব্রেরিতে ছোটবেলায় ছুটির দিনগুলোতে নানারকমের নিউজপেপার, ম্যাগাজিন এবং গল্পের বই পড়তাম। লাইব্রেরিতে বইয়ের কালেকশন খুব বেশী না থাকলেও একেবারে খারাপ ছিলনা। এখানে বসেই জাহানারা ইমামের ‘একাত্তরের দিনগুলো’ বইটি পড়েছিলাম বলে এখনো মনে আছে। লাইব্রেরির পাশেই আরমানিটোলা মাঠের গা ঘেঁষে ছিল বাংলাদেশ সরকারের সমাজসেবা অধিদপ্তরের হলুদ রংয়ের দোতলা বিল্ডিং। দোতলায় তখন টাইপরাইটিং, শর্টহ্যান্ড প্রশিক্ষন দেয়া হত-শুনেছি এখন সেখানে কম্পিউটার প্রশিক্ষন দেয়া হয়। এই বিল্ডিংয়ের নিচ তলায় ছিল আরমানিটোলা যুব সংঘের ক্লাবঘরটি যার ভিতরে একটা টেবিল টেনিস বোর্ড ছিল। এই ক্লাবেই আমার টেবিল টেনিস খেলার হাতে খড়ি-সে গল্পে একটু পরে আসছি। লাইব্রেরি ও ক্লাবের মাঝখানে একটা বাউন্ডারি ওয়াল ছিল এবং ওয়ালের মাঝামাঝি জায়গায় একটা পকেট গেইট ছিল যা পরে খুলে সেখানে একটা দেয়াল তুলে দেয়া হয়। ক্লাবের সিনিয়ররা বলতেন এক সময় নাকি আমাদের ক্লাব ও লাইব্রেরির মাঝে কোন দেয়াল ছিলনা। আরো শুনেছি যে এক সময় আরমানিটোলা মাঠ ও আমাদের ক্লাবের মাঝেও কোন বাউন্ডারি ওয়াল ছিলনা-মাঠ হতে সরাসরি ক্লাবে ঢুকা যেত। পরবর্তীতে মাঠ ও ক্লাবের মাঝে দেয়াল তোলা হলেও ক্লাব ও লাইব্রেরির মাঝামাঝি জায়গায় একটা লোহার গেইট ছিল যা দিয়ে আরমানিটোলা মাঠে প্রবেশ করা যেত। যাই হোক, ক্লাব ও মাঠের দেয়ালের মাঝের চত্বরটা অনেক গাছগাছালিতে ভরা ছিল। ওখানেই গরমের দিনে ক্লাবের কেয়ারটেকার জুম্মন ভাই বা উনার সহকারি বাচ্চুকে একটা টুলে বসে বিশ্রাম নিতে দেখতাম। আমরাও যখন ক্লাবে খেলতাম ঘর্মাক্ত শরীরে মাঝেমাঝে এখানে বসে একটু বাতাস খেতাম। বিকেলের দিকে এই ক্লাব চত্বরেই এলাকার গন্যমান্য ব্যক্তিরা-সমীর ভাই, টুটুন ভাই, ইকবাল ভাই, কারফু হাজি, বিল্লাল শাহদের কাঠের চেয়ারে বা টুলে আরাম করে বসে আয়েসে আলাপ-আলোচনা করতেন। বাইরে বসে কিছুক্ষন আড্ডা দেবার পর উনারা আবার ক্লাবের পিছনের দিকের ছোট একটা রুমে ঢুকে কার্ড খেলতে বসতেন। গভীর রাত পর্যন্ত উনাদের নানারকম খানাপিনা আর কার্ড খেলা চলতো ঐ ছোট্ট রুমটাতে। আমাদের তথা ছোটদের কোন প্রবেশাধিকার ছিলনা ঐ রুমে!

ক্লাবের মুল গেইট থেকে বের হয়ে সামান্য ডানে এগুলে ‘এপি’র বিল্ডিংয়ের উল্টাদিকেই পড়ত আরমানিটোলা মাঠে ঢুকার একমাত্র লোহার গেইট যা এখনো ঠিক আগের জায়গাতেই রয়েছে।এই লোহার গেইটের মুখে ছিল একটা রিকশা স্ট্যান্ড যেখানে রিকসা-সাইকেলের চাকায় হাওয়া দেয়া সহ ছোটখাটো রিপেয়ারেরও সুযোগ ছিল। বিকেলের দিকে ঐখানে একজন ঝালমুরিওয়ালা বসতেন। মাঠের এই ঝালমুরির মত কোন সুস্বাদু ঝালমুরি কোথাও খেয়েছি বলে মনে পড়েনা। প্রচুর পরিমানে ঘুঘনি, সামান্য মাংসের ঝোল, ছোট দুএকটা নারিকেলের টুকরা মেশানো এই স্টাইলে বানানো ঝালমুরি আমি আর কোথাও দেখিনি-মুরির সেই স্বাদ যেন এখনো মুখে লেগে আছে! একটা ছোট কাগজের ঠোংগায় পরিবেশিত এই ঝাল মুরির দাম পড়তো দুই টাকা যা সে সময়ের তুলনায় একটু বেশীই ছিল। আমার সদ্য প্রয়াত কাশেম মামা আশির দশকে যখনি আমাদের বাসায় আসতেন সাথে করে আরমানিটোলা মাঠের কোনার এই ঝাল মুরি আমাদের বাসার সবার জন্য নিয়ে আসতেন। উনাকে বাসার দরজায় দেখলেই টের পেতাম আজকে এই স্বাদের ঝাল মুরি খাওয়া হচ্ছে। ঝাল মুরির দোকানের উল্টাদিকে, মাঠের গেইটের অন্যপাশে একজন চটপটিওয়ালা বসতেন। উনার চটপটি-ফুচকার স্বাদও ছিল অতুলনীয়। সন্ধ্যার পর মাঠ খালি হবার কিছুপরও লাইট জ্বালিয়ে এই চটপটি-ঝালমুরি বিক্রি চলতো।

# আরমানিটোলা মাঠ চত্বর:

মাঠের দক্ষিন-পশ্চিমকোনাস্থ মুল গেইট পেরিয়ে ভেতরে ঢুকলে হাতের বামপাশে পড়তো একতলার একটি ছোট পাকা রুম যেখানে সম্ভবত সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ/মিটফোর্ড হাসপাতালের কোন কর্মচারি বাস করতেন। এই রুমটির সামনে বারান্দার মত একটু খালি জায়গা ছিল যেখানে ক্লাস ফোর-ফাইভের দিকে আমি প্রায়ই বসে থেকে বন্ধু রানা ও নবীদের ফুটবল খেলা দেখতাম। মাঠের উত্তর-পশ্চিম কোনায় ছিল একটা উন্মুক্ত পানির কল যেখানে খেলোয়াড়রা মুখ লাগিয়ে বা হাত গোল করে পানি নিয়ে তৃষ্ণা নিবারন করতো। খেলার পর হাত-পা ধোয়ার কাজও হত সেখানে। মাঠের গেইট হতে দক্ষিনদিকের দেয়াল ঘেঁষে সামান্য একটু পাকা পথ পেরুলেই শেষ মাথায় পড়ত একটা কলাপসিবল গেইট লাগানো বিশাল গ্যারেজ যার ভেতরে ধুলোয় মোড়া দুই একটা বড় বাস বা ট্রাক সবসময় দেখা যেত। সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজের নিজস্ব এই গ্যারেজের কলাপসিবল গেইটে সবসময় একটা বিশাল তালা ঝুলানো থাকতো বলে কখনো মনে চাইলেও ভেতরে ঢুকতে পারিনি। তখনো খুব একটা ভালো করে বুঝতামনা বাস বা ট্রাক কেন ওখানে ওভাবে পড়ে থাকতো আর কী উদ্দেশ্যেই এই বাসগুলো ব্যবহৃত হত।এক সময় সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজের কর্মচারিদের চলাচলের জন্য এই বিশাল গ্যারেজের পাশেই বাবুবাজারের দিক দিয়ে মাঠে ঢোকার ছোট একটা গেইট ছিল। জনসাধারনের জন্য উন্মুক্ত ছিলনা এই ছোট পকেট গেইটটি। মাঠের পূর্ব ও পশ্চিম প্রান্তে বড় ফুটবল ম্যাচের উপযোগী দুটি বড় গোলপোষ্ট ছিল। পূর্বদিকের গোলপোষ্টের পিছনে যে জায়গাটা অবশিষ্ট ছিল সেখানে ২২ গজ দৈর্ঘ্যের সিমেন্টের একটা সরু ক্রিকেট পিচ বানানো হয়েছিল – প্র্যাকটিসের জন্য। পিচের পূর্বদিকের ফাঁকা জায়গায় শীতকালে মাঝেমাঝে নাগরদোলা বসতো। আমার জীবনে নাগরদোলায় চড়ার অভিজ্ঞতা এখানেই বোধ হয় সবচেয়ে বেশী হয়। আট আনা বা এক টাকায় কয়েকটা চক্কর দেয়া যেত। নামার সময় পেটের মধ্যে একটা শূন্য শূন্য অনুভুতি হোত কিন্তু কোন এক নেশায় বারবার চড়তে ইচ্ছে হত। মনে আছে কলেজে পড়ার সময় একদিন বন্ধু ফরহাদের সাথে বাইরে কোথাও ভরপুর তরমুজ খেয়ে এই নাগরদোলায় চড়ে কয়েকটা চক্করের পর মাথা ঘুরে একেবারে হড়হড় করে বমি করে ফেলি। বমির সাথে লাল তরমুজের রস সব বেরিয়ে এসেছিল- এই ঘটনায় সত্যিই অনেকটা বিব্রত বোধ করেছিলাম!

আমাদের ছোটবেলাতেই বিশেষ করে ১৯৮৫-৮৬ সালের দিকে মাঠটি মুলত ঘাসবিহীন এক বালির মাঠে পরিনত হয়েছিল- উত্তর ও পশ্চিম দিকের দেয়াল ঘেঁষে কিছু জায়গায় অল্পবিস্তর ঘাসের অস্তিত্ব চোখে পড়লেও আমরা মোটামুটি ঘাসবিহীন অবস্থায়ই মাঠটি পেয়েছিলাম। এই মাঠে বালুর সাথে মাঝে মাঝে ছোট ছোট ইট বা পাথরের কনাও পায়ে বিঁধতো। তবুও এই বালুর মাঠটিই আশেপাশের স্কুল আর মহল্লার ছেলেপেলেদের পদচারনায় মুখরিত থাকতো সকাল-দুপুর-বিকাল! মাঠের দক্ষিন-পশ্চিম কোনায় মাঠে ঢোকার মুল গেইটটি থাকলেও এলাকার ছেলেপেলেরা সুবিধা অনুযায়ী মাঠের অন্যদিকের দিয়ে দেয়াল টপকিয়ে মাঠে প্রবেশ করতো। মাঠের দক্ষিন-পশ্চিমদিকের ওয়ালে উঁচু লোহার শিক আর অন্যদিকের ওয়ালের উপর ছোট ছোট কাঁচের টুকরার প্রতিবন্ধকতা থাকলেও দেয়াল টপকানোতে তা কখনো বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। কয়েকবছর পরে অতিউৎসাহী জনগন নিজেরাই মাঠের উত্তর-পূর্ব কোনার ওয়ালের নিচের দিকের একটা অংশ ভেঙ্গে ফেলে একটা বড়সড় ফোকর তৈরী করে। সেই ফোকর দিয়ে ছোটবেলায় আমি একেবারে বাসার সামনে থেকেই শর্টকাটে মাঠে প্রবেশ করতাম। বলাবাহুল্য, আরমানিটোলা মাঠের উত্তর,পশ্চিম, ও পূর্ব দিকের ওয়াল ঘেঁষে সবসময়ই ট্রান্সপোর্টের ট্রাকগুলো মাল লোডিং-আনলোডিং করার জন্য পার্ক করা থাকতো-তাই দেয়াল টপকানো অত সহজ ছিলনা। তবে কাগজ মার্কেট হতে বাবুবাজার চাউলের আড়ত পর্যন্ত বিস্তৃত মাঠের দক্ষিন-পূর্বের ওয়াল ঘেঁষে রাস্তা হতে একটু উঁচু ফুটপাতে অসংখ্য ঠেলাগাড়ি সারিবদ্ধভাবে বসানো থাকতো। ফলে এদিকের দেয়ালের উপর একটু লম্বা লম্বা শিক গাঁথা থাকলেও দুই শিকের মাঝখান দিয়ে আমার মত শুকনা-পাতলা মানুষের মাঠে ঢুকতে খুব একটা বেগ পেতে হতনা। আমাদের সৈয়দ হাসান আলী লেনের বাসা হতে মাঠে ঢুকতে আমি এই শর্টকাটটাই বেছে নিতাম। এই ঠেলাগাড়ির সারির মাঝখানে দিনের বেলায় একটা তেহারীর দোকান বসতো-দুপুর বেলা ক্ষুধা লাগলে মাঝে মাঝে এখান থেকে তেহারি কিনে খেতাম। বাবুবাজার চাউলের আড়তের দিকের মাঠের দেয়ালে অনেক সময় পাইল করে চাউলের বস্তা রাখা হত। এই জায়গাটা একটু অন্ধকার ছিল বিধায় চাউলের বস্তার পাইলের ফাঁকে সন্ধ্যার পরে মাদক ও নারী সংক্রান্ত কিছু অনৈতিক কর্মকান্ডও চোখে পড়তো। সন্ধ্যার পর মাঠের ঐ দিকটা যথাসম্ভব এড়িয়ে চলতাম।

# ফুটবল খেলার স্মৃতি:

()

আরমানিটোলা মাঠের পূর্ব ও পশ্চিম প্রান্তে দুটি বড় নেটবিহীন গোলপোষ্ট ছিল। অপেক্ষাকৃত সিনিয়র ভাইরা প্লেয়ার বেশী থাকলে এই বড় দুটো গোলপোষ্ট ব্যবহার করে পুরো মাঠজুড়েই ফুটবল খেলতো। অন্যদিকে, ছোট ছোট গ্রুপগুলো মাঠের বিভিন্ন এরিয়ায় স্যান্ডেল দিয়ে ছোট ছোট গোলপোষ্ট বানিয়ে ফুটবল ম্যাচ খেলতো। কোন কোন ছোট গ্রুপ আবার গোলরক্ষক বিহীন ব্যাকবারে খেলতেও পছন্দ করতো। এভাবে একই মাঠে ছোট-বড় অসংখ্য গ্রুপ একসাথে খেলার ফলে কোন গ্রুপের প্লেয়ারের বুলেটগতির কোন শটে কিংবা গায়ের ধাক্কায় অন্য কোন গ্রুপের প্লেয়ারের নাক, মুখ, বুক, পেট, কোমরে বা মাথায় আঘাত পাবার মত ঘটনা প্রায়ই ঘটতো। কোন কোন সময় আঘাতপ্রাপ্তের তাৎক্ষনিক রাগী প্রতিক্রিয়া হয়তো দেখা যেত কিন্তু খেলার আনন্দে ও উত্তেজনায় এই রাগ বা ব্যথা দীর্ঘস্থায়ী হতনা! অনেক সময় আবার নিশ্চিত গোল হবার মত কোন শট অন্য কোন গ্রুপের প্লেয়ারের পায়ে বা শরীরে লেগে দিকচ্যুত হয়ে পড়লে তাৎক্ষনিক প্রতিক্রিয়ায় কিন্চিত ‘গালি’ বর্ষনের মাধ্যমে ঐ শর্টকারীকে হতাশা ঝাড়তেও দেখতাম। এছাড়া স্যান্ডেলে বানানো গোলপোষ্টের দৈর্ঘ্য চুরি করে বাড়ানো-কমানো, একটু উঁচু বলে গোল দেয়া-না দেয়া, হ্যান্ডবল, পেনাল্টি বা ফাউল ইত্যাদি নিয়ে নিয়মিত বাদানুবাদ, তর্কাতর্কি, গালিগালাজ, এমনকী ছোটখাট হাতাহাতি বা মারামারির মত ঘটনাও প্রায় ঘটতো। তবে দুপক্ষেরই কারো কারো মধ্যস্ততায় সবকিছু ভুলে আবার খেলায় শুরু হত। ছুটির দিনে সকাল-দুপুর-বিকাল আর অন্য দিনগুলোতে সকালে আর বিকেল বেলায় আরমানিটোলা মাঠে তিল ধারনের জায়গা পাওয়া যেতনা। আমাদের দোতলা বাসার জানালা থেকে সরাসরি মাঠটা দেখা যেত। খেলার প্রতি টান থাকায় সকালবেলায় স্কুলের সময়টুকু বাদে দিনের বাকি সময়টা তাই বাসার জানালায় বসে নানা গ্রুপের খেলাধুলা দেখেই পার করতাম-ক্লাস ফোরে উঠার আগে মাঠে যাওয়ার পারমিশান পাইনি। তবে নিয়মিত দেখার ফলে মাঠের বেশীর ভাগ ছেলেপেলেরই চেহারা পরিচিত হয়ে গিয়েছিল-অনেকের নামও মুখস্ত হয়ে গিয়েছিল। যদিও তখনো পর্যন্ত তাদের সাথে সাক্ষাত বা পরিচয় পর্যন্ত ঘটেনি। এদের অনেকের নাম আমার এখনো মনে আছে!

()

ক্লাস ফোর থেকেই আস্তে আস্তে বিকেলের দিকে মাঠে গিয়ে খেলা দেখতে শুরু করি। তখনো পর্যন্ত আমার খেলাধুলা হত মুলত স্কুলের টিফিন পিরিয়ডে ক্লাসের বন্ধু-রুবেল, রানা, সুমন, ফয়সাল, এরশাদ, রিয়াজ, সাজ্জাদ, হোসেন পাপ্পু, সাখাওয়াত, জামাল, ইস্রাফিল, শাকিল, জাফরউল্লাহ, বুলবুলদের সাথে-টেনিস বল কিংবা ছোট আকৃতির রাবারের বলে ফুটবল খেলে। সে সময় ঢাকা ফুটবল লীগ বেশ জমজমাট ছিল বলে কখনো কখনো আমরা আবাহনী  ও মোহামেডান দুই দলে ভাগ হয়ে নিজেদের মধ্যে ফুটবল ম্যাচ খেলতাম। আরমানিটোলা মাঠে যাবার ব্যাপারে আমার অনেক আগে থেকেই আগ্রহ ছিল। তবে স্কুলের ঘনিষ্ট বন্ধু রানা যখন ওদের খেলা দেখতে মাঠে আসতে বলতো তখন উৎসাহ আরেকটু বেড়ে গেল। রানা তখন ইমামগন্জ এলাকায় থাকতো এবং বিকেলবেলা মিটফোর্ডের একটা বড় গ্রুপের সাথে আরমানিটোলা মাঠে ফুটবল খেলতে আসতো। এই গ্রুপটাতে মিটফোর্ড, নলগলা, বেচারাম দেউড়ি ও বাবুবাজার এলাকার সিনিয়র-জুনিয়র মিলিয়ে প্রায় ১০-১২ জনের মত প্লেয়ার ছিল। তাদের সাথে আবার অন্য পরিচয় সূত্রে কসাইটুলি, আরমানিটোলা আর জিন্দাবাহারের কিছু ছেলেপেলে যোগ হত। এই গ্রুপটা সাধারনত মাঠের মাঝখানে না খেলে দুই দলে ভাগ হয়ে মাঠের পশ্চিম দিকের গোলপোষ্টের পিছনে উত্তর ও দক্ষিন প্রান্তে আড়া আড়ি করে দুইটা গোলপোষ্ট বানিয়ে নিজেদের মধ্যে ফুটবল ম্যাচ খেলতো। আমি মুলত মাঠের ভিতরে গেইট সংলগ্ন রাস্তায় বা গেইটের সাথে লাগানো ছোট পাকা ঘরটার বারান্দায় দাঁড়িয়ে বা বসে ওদের খেলা দেখতাম। মাঠের পশ্চিম দিকের ঐ জায়গাটায় একটা ড্রেনের মত ছিল যা উপচে সুয়ারেজের হালকা বর্জ্য প্রায়ই বেরিয়ে আসতো। কোন কারনে ঐদিকে বল পড়লে কেউ বলটা তুলে মাঠের উত্তর-পশ্চিম কোনার পানির কলটাতে কোনরকমে পরিষ্কার করে ধুয়ে আবার খেলা শুরু করতো। কোন কোন সময় অপরিষ্কার বলটি মাঠের বালুতে সামান্য একটু মুছেই খেলা শুরু করে দিতো। খেলার মাঝে তৃষ্ণা পেলে কেউ কেউ আবার দৌড়ে গিয়ে পানির কলে মুখ ঠেকিয়ে কয়েক ঢোক পানি গিলে আবার খেলতে নেমে যেত। আমি তখনো এত কোলাহলের মধ্যে বা এত বেশী ছেলেপেলের সাথে খেলতে অভ্যস্ত ছিলাম না। তাই নিজে খেলায় অংশ না নিয়ে ওদের খেলা দেখেই সময় পার করতাম এবং আমার এই দর্শকের ভুমিকায়ও যথেষ্ট মজার ছিল। পুরান ঢাকার ছেলেপেলেদের রসবোধ খুব প্রখর আর কথায়ও থাকে এক অদ্ভুত যাদু! ঢাকাইয়া ভাষায় তাদের অমৃত বচন- সেটা গালি হোক, কাউকে কোন নিক নামে ডাকা হোক কিংবা হাস্য-রসে ভরা কোন কমেন্ট বা বুলিই হোক- আমার কাছে বেশ উপভোগ্য ছিল। খেলা দেখার পাশাপাশি ওদের নিজেদের মাঝে নানারকম দুষ্টুমি, শারীরি্ক অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে মজার মজার কমেন্ট ও বুলি চালাচালি শোনা এবং দেখা ছিল সত্যিই এক নির্মল বিনোদন! সাইড লাইনে দাঁড়িয়ে খেলার দেখার সাথে বাড়তি এই বিনোদন আমি ব্যাপকভাবে উপভোগ করতাম! এভাবে কয়েকদিন মাঠে যাবার ফলে রানাদের গ্রুপের সবারই আসল নাম, বুলি দেওয়া নাম, আত্মীয়তা আর রসবোধ সম্পর্কে একটা ভালো ধারনা হয়ে যায়। এই গ্রুপের মিলন ভাই-পারভেজ ভাই কিংবা শওকত ভাই-রিপনের কথার দ্বৈরথ, নানা অঙ্গভঙ্গি বা কমেন্টের মাধ্যমে ধারাবাহিকভাবে কারো সাথে মজা নেয়া-এগুলো দেখা বা শোনা ছিল সত্যিই এক মজার অভিজ্ঞতা! আজো মনে হয় কত সহজ-সরল ছিল সেই দিনগুলো! কত অল্পতেই সবাই তুষ্ট থাকতো! আর কত তুচ্ছ কথায় বা কমেন্টের মাধ্যমে জীবনের আনন্দ ও রস খুঁজে পেত! এই গ্রুপের সবাই মোটামুটি ভালো ফুটবল খেলতো। তবে মিলন ভাই, এনায়েত ভাই, সামাদ ভাই, বাবুল ভাই ও নবীর স্টাইল, স্কিল ও টেকনিক বেশ ভালো ছিল। সামাদ আর এনায়েত ভাই আমাদের একই স্কুলের বড় ভাই- তাই উনাদেরকে আগে থেকেই চিনতাম।

রানা ছিল আমার ছোটবেলার, প্রকৃতপক্ষে, ঢাকা জীবনের প্রথম বন্ধু! ওর সাথে আহমেদ বাওয়ানী স্কুলে ক্লাস থ্রি থেকে ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত প্রায় অবিচ্ছিন্ন ছিলাম। এরপর ক্লাস সিক্সে আমি গভ: ল্যাবরেটরি হাই স্কুলে এবং কিছুদিন পরে রানা নিজেও মীরপুরে চলে যাওয়ায় ওর সাথে যোগাযোগ কিছুটা ব্যাহত হয় কিন্তু পরবর্তীতে ক্লাস টেনের দিকে টেবিল টেনিস খেলার সুবাদে আমরা আবার বেশ কাছাকাছি আসি। এরপর আবার ভিন্ন কলেজ ও ইউনিভারসিটিতে ভিন্ন ডিপার্টমেন্টে পড়ার ওর সাথে যোগাযোগ একটু কমে যায় কিন্তু পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হইনি কখনো। রানা এখন সপরিবারে থাকে যুক্তরাষ্ট্রের ডালাসে-কয়েকবছর আগে অফিসের কাজে টেক্সাস গেলে ওর বাসায় গিয়েছিলাম দেখা করতে। ব্যস্ততার জন্য খুব নিয়মিত না হলেও যোগাযোগ এখনো অক্ষুন্ন আছে রানার সাথে। বন্ধু নবীর সাথে তখনো সেভাবে পরিচয় না হলেও বেশ কয়েক বছর পরে একসাথে টেবিল টেনিস খেলার সুবাদে ঘনিষ্টতা বাড়ে এবং পরবর্তীতে কৈশোর ও তারুন্যে দিন-রাত আড্ডা, গল্পের বই পড়া, সিনেমা দেখা, গান শোনা, ভ্রমনের মাধ্যমে যে এক প্রগাড় বন্ধুত্ব তৈরী হয় সেই বন্ধুত্ব এখনো অম্লান ও অক্ষুন্ন আছে!

মিটফোর্ডের এই গ্রুপে আমাদের স্কুলের সামাদ ভাই ছাড়াও আরেকজন সামাদ ছিল যে কিনা মাঠের গেইট সংলগ্ন তার বাবার রিকশা মেরামতের দোকানে কাজ করতো-অন্যসময়ে সম্ভবত রিকশাও চালাতো। কসাইটুলির মন্টুর চুল ছিল একটু খাড়া খাড়া। আমার মনে পড়ে ও খেলা শেষে আমাদের বাসার সামনে দিয়েই যেত আর বাওয়ানি স্কুলের সামনের ছোট্ট পুরির দোকান ডাল পুরি কিনে সেটা খেতে খেতে বাড়িতে যেত। কসাইটুলির কাদের ভাই, জুম্মন ভাইও খেলতেন এই গ্রুপটার সাথে। এছাড়া মিটফোর্ডের বাবু ভাই, জহির, ফয়সাল, ফরহাদসহ আরো অনেকের কথা এখনো বেশ মনে পড়ে। কয়েকজনের চেহারা মনে আছে কিন্ত বয়সের পরিক্রমায় নাম বিস্মৃত হয়েছি!

()

রানা-নবীদের মিটফোর্ডের এই গ্রুপটা ছাড়াও মিটফোর্ড, কসাইটুলি, বাগডাসা, সামসাবাদ হতে বিভিন্ন বয়সের অনেকগুলো গ্রুপ দলবেঁধে এই আরমানিটোলা মাঠে ফুটবল খেলতে আসতো। সে সময় ঢাকা ফুটবল লীগে আবাহনি ও মোহামেডানের দ্বৈরথ মাঠে খেলতে আসা গ্রুপেও সংক্রমিত হত-দুই দলের সাপোর্টাররা প্রায়ই আবাহনি ও মোহামেডান দুই দলে ভাগ হয়ে নিজেদের মাঝে ফুটবল ম্যাচ খেলতো। ৯০ এর বিশ্বকাপ ফুটবলের পর ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার সাপোর্টারদের মাঝেও এইভাবে ম্যাচ খেলার প্রবনতা দেখা যায়। বড়দের একটা গ্রুপের কথা মনে পড়ে যারা মাঠের বড় গোলপোষ্ট দুটো ব্যবহার করে পুরা মাঠ জুড়েই খেলতো। এই গ্রুপের খেলোয়াড়দের মধ্যে মিটফোর্ডের দীলিপ দা, নেপাল দা, বেচারাম দেউড়ির ওয়াজেদ ভাই, হেলাল ভাই, আপ্পি ভাই, আরমানিটোলার মুন্না ভাই, কসাইটুলির কাদের ভাই, ফয়সাল ভাই, মামুন ভাই, মাসুম ভাইর নাম-চেহারা বা খেলার স্টাইল এখনো চোখে ভাসে। বড়দের এই গ্রুপের সাথে মাঝে মাঝে বাওয়ানি স্কুলের বড় ভাই এনায়েত ভাই, সামাদ ভাই আর গনি ভাইকেও খেলতে দেখতাম। একটা জিনিস লক্ষ্য করার মত- মহল্লা কেন্দ্রিক এই গ্রুপগুলোতে ছোট-বড় নানা বয়সের খেলোয়াড়ের সন্মীলন ঘটতো! দলবেঁধে সবাই মাঠে খেলতে আসতো। খেলার আনন্দে বয়স কখনো বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি!

()

ক্লাস ফোরের শেষ দিকে মাঝে মাঝে আমাদের বিল্ডিংয়ের চারতলার দীপংকর ও পার্থের সাথে আরমানিটোলা মাঠে এসে ওদের নতুন কেনা ডিয়ার বল দিয়ে একজন আরেকজনের দিকে পাস দিয়ে বা শট করে টুকটাক ফুটবল খেলতে শুরু করি। কোন উন্নতমানের ফুটবলে পা চালানোর সেটাই ছিল প্রথম অভিজ্ঞতা। অনেকসময় তিনতলার কোয়েল, জুয়েল ভাই আর সোহেল ভাইদের সাথেও ফুটবল খেলতে আসতাম। তবে এসময় আবার ক্লাসের ঘনিষ্ট বন্ধু রুবেলদের চৌধুরী বাড়ির বাসায় যাতায়াত বাড়তে থাকে। রুবেলদের বিল্ডিংয়ের রিমন, রুসান, আসিফ, ইকবাল ভাই এবং একই পাড়ার মিজান, শহীদুলদের সাথে সময় কাটানো বা আড্ডা মারা বেড়ে যায়। এক পর্যায়ে ওদের বাসার নীচের খোলা জায়গায় দলবেধে ফুটবল ও ক্রিকেট খেলা শুরু হয়। মনে পড়ে কোন এক শুক্রবার সকাল বেলায় আমাদের এই চৌধুরী বাড়ির গ্রুপটা একেবারে আয়োজন করে জার্সি আর শর্টস পরে আরমানিটোলা মাঠে একটা শীল্ড ম্যাচ খেলতে আসে-রুবেলের ছোট ভাই রাসেলের বন্ধু-সেলিম, সাইফুলদের সাথে। ঐ ম্যাচে আমাদের দলের গোলকীপার ছিলাম আমি। আগের দিন বৃষ্টি হওয়ায় মাঠের এখানে সেখানে পানি জমে গিয়েছিল তাই পানিতে বলটা প্রায়ই আটকে যাচ্ছিল। মনে আছে খেলার আগে আমরা কয়েকদিন নিয়ম করে প্র্যাকটিসও করেছিলাম। কিন্তু দু্র্ভাগ্যক্রমে আমরা ম্যাচটা হেরে যাই। বলতে দ্বিধা নেই ওদের টিমটা আমাদের চাইতে বেটার ছিল-বিশেষ করে ওদের সেলিম আর সাইফুল সত্যিই অনেক ভালো খেলেছিল ঐ ম্যাচে।এভাবে ঘটা করে আরমানিটোলা মাঠে এসে ম্যাচ খেলার সেটাই ছিল প্রথম অভিজ্ঞতা! ম্যাচটির কথা এখনো বেশ মনে পড়ে। বলা বাহুল্য, আরমানিটোলা মাঠে সেই সময় কোন বিশেষ টুর্নামেন্ট ছাড়াও এধরনের ছোট-বড় অনেক শীল্ড ম্যাচ হত-ফুটবল এবং ক্রিকেট দু’খেলাতেই!

()

আরমানিটোলা মাঠে ঠিক এগারো জনের দল নিয়ে বড় কোন ফুটবল টুর্নামেন্ট সেভাবে না দেখলেও আশে পাশের মহল্লার ছোট ছোট দল নিয়ে সীমিত পরিসরের অনেক টুর্নামেন্ট হতে দেখেছি। বিশেষ করে কসাইটুলি, আরমানিটোলা, মিটফোর্ড এলাকার বিভিন্ন বয়সের ছেলেদের নানা উচ্চতার গ্রুপে বিন্যস্ত করে কয়েকটি টিম তৈরী করে একদিন বা দুই দিন ব্যাপি এই টুর্নামেন্টগুলোর আয়োজন করা হত। আমার বন্ধু নবী ছোটবেলা হতেই এধরনের অনেক টুর্নামেন্টে অংশ নিয়ে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছিল। এছাড়া বন্ধু সাইফুল বা সেলিমকেও এধরনের কিছু টুর্নামেন্ট খেলতে দেখেছি- আসলে মাঠের অনেক পরিচিত মুখকেই এই টুর্নামেন্টগুলোতে দেখা যেত। একেকটা টিমে মুলত তিন বা সর্বোচ্চ চারজন খেলোয়াড় থাকতো। দলগুলোর নাম সাধারনত এলাকার নামেই করা হত তবে আবাহনী, মোহামেডান বা ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা ইত্যাদি নামেও কখনো কখনো টিম করা হত। মুলত ব্যাকবারে এই খেলাগুলো হত অর্থাৎ ছোট দৈর্ঘ্য ও হাঁটু উচ্চতার গোলপোষ্টে কেউ দাঁড়িয়ে থাকলেও হাত দিয়ে বল ধরতে পারতোনা। মাঠের এরিয়া কম রেখে বাঁশ পুঁতে চারপাশে রঙ্গিন কাগজ সম্বলিত দড়ি দিয়ে ঘেরাও করে মাঠের সীমানা নির্ধারন করা হত। এই সীমানার চারদিকেই দর্শকরা ভিড় করে খেলা দেখতো। এক উৎসবমুখর পরিবেশে এই ছোট ছোট টুর্নামেন্টের খেলাগুলোর আয়োজন হত। কখনো কখনো মাইক ব্যবহার করে খেলার ধারাবর্ননা করা হত। দর্শকরা বিপুল উল্লাসধ্বনির মাধ্যমে নিজের পছন্দের দলকে সাপোর্ট দিয়ে যেত। খেলা দেখার পাশাপাশি কেউ কেউ বাদাম, চানাচুর, মুরিভর্তা খেয়ে আবার কেউবা আঁচার কিংবা আইসক্রিম খেয়ে উদর-পূর্তি ঘটাতো। দর্শকসারি হতে বিপুল হর্ষধ্বনির মাধ্যমে ব্যাপক হাততালি দেয়া আর সাথে বাদাম, চানাচুর ইত্যাদি খাবার কিনে খাওয়া ছিল সত্যিই সেই সময়ের এক নির্মল বিনোদন! স্বল্প দৈর্ঘ্যের এই ম্যাচগুলোতে ভীষন প্রতিদ্বন্দ্বিতা হত। গোলপোষ্ট ছোট ও নিচু বলে সহজে গোল হতে চাইতোনা। দুই বা এক গোলের ব্যবধানে জয় ছিল স্বাভাবিক। হাফ টাইমে ক্লান্ত খেলোয়াড়ের মুখে লেবুর টুকরা গুঁজে দেবার প্রচলন ছিল। যাই হোক, এই ছোট টুর্নামেন্টগুলোতে গ্রুপ, সেমিফাইনাল, ফাইনাল ম্যাচ শেষে বিজয়ী দলকে আকর্ষনীয় ট্রফি দেয়া হত।

()

কোন কোন সময় আরমানিটোলা মাঠে রাতের বেলায় লাইট জ্বালিয়ে তিন-চারজনের ছোট ছোট টিম নিয়ে ফুটবল টুর্নামেন্টের আয়োজন হতে দেখেছি। কলেজ জীবনে বাগডাসার ভুঁইয়াদের একটা টিমের খেলার কথা মনে পড়লে মনের অজান্তে এখনো হাসি চলে আসে। ভুঁইয়াদের টিমের গোলকীপার ছিল ‘ডোমে’ (আসলেই এই নামে ওকে ডাকা হত!)। এমনিতেই একটু গোবেচারা টাইপের ছিল কিন্তু খেলার দিন শক্তি সন্চয়ের জন্য সে সবাইকে দেখিয়ে উত্তেজক হিসেবে দুইটা ‘আলু বোখারা’ খেয়ে মাঠে নেমে পড়লো। ওই আলু বোখারাই যেন ডোমের জন্য একটা উত্তেজক ‘ড্রাগ’! খেয়াল করলাম আলু বোখারা খেয়ে ডোমে সম্পূর্ন এক নতুন মানুষে রূপান্তরিত হল! মাঠের যে কারো চেয়ে সে যেন একটু বেশীই উদ্দীপিত!! প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে গোলপোষ্টের সামনে লাফিয়ে লাফিয়ে তার এই উদ্দীপনার জানান দিচ্ছে- আলু বোখারার গোপন ফজিলত সবাইকে বুঝিয়ে দিচ্ছে! খেলার মাঠে প্রতিপক্ষের জন্য ডোমে এক হিমালয়সম ‘প্রতিরোধ’ হিসেবে আবির্ভুত হল। উপর-নীচ যেদিক দিয়েই বল আসে ক্ষিপ্রগতিতে হাত, পা, বুক, মাথা সবকিছু দিয়েই বল ঠেকিয়ে দিচ্ছে সে! সাইডলাইন থেকে সবাই আলুবোখারাখেকো ডোমের এই অতিমানবীয় পারফরমেন্সে হেসেই খুন! কারন স্বাভাবিক অবস্থায় ডোমেরতো এমন মুভমেন্ট ছিলনা কখনো! আবার উত্তেজক হিসেবে আলু বোখারারও এমন কোন ইফেক্ট জানা নাই যা কিনা ডোমের কর্মকান্ডে প্রকাশিত হচ্ছে! তো খেলার এক পর্যায়ে হঠাৎ করে খুব ক্লোজ থেকে প্রতিপক্ষের কেউ একজন সম্ভবত ঘন্টায় তিনশ মাইল বেগের একটা বুলেট শট করে বসলো ডোমের গোলপোষ্ট লক্ষ্য করে। স্বাভাবিক অবস্থায় বলটা গোলপোষ্টের উপর দিয়ে চলে যাবার কথা! কেউ হয়তো বলের গতি হতে নিজেকে বাঁচাতেই বেশী চেষ্টা করতো! কিন্তু ডোমে তো এক অন্য মানুষ আজ! তাই বলের গতিপথ হতে নিজেকে না সরিয়ে (কিংবা না পেরে) বিপুল উদ্দীপনায় লাফিয়ে উঠে হাত দিয়ে বলটা ঠেকাতে গিয়ে অগত্যা বলের গতির কাছে পরাস্ত হয়-ওর দুহাত ভেদ করে বলটা ডিরেক্ট ওর বুকে হিট করে! মাঠের বাইরে থেকে আমরা ধপ করে একটা আওয়াজ পেলাম! তাকিয়ে দেখলাম কিছু হল নাকি ডোমের! না, ওর মুখে কোন বিকার নেই।ভাবখানা এমন যে এধরনের ৫০-৬০ টা শট খেলেও কাবু হবেনা সে আজ! স্বাভাবিক অবস্থায় বুকে এমন একটা শট খেলে যে কারুরই লুটিয়ে পড়ার কথা কিন্তু আলু বোখারার অসাধারন ইফেক্ট ডোমেকে আজ হার মানতে দিবেনা! আমরা দেখলাম দানবীয় শটটি খেয়ে ডোমের শরীরটা সেকেন্ডের ভগ্নাংশ সময়ের জন্য একটু বেকায়দারকমভাবে স্থির হল-কিন্তু আলোর গতিতে সেই ধাক্কা সামলে ডোমে আবার দুই পায়ের উপর লাফিয়ে এনার্জি গেইন করার চেষ্টা করলো-বল প্রতিহত করলো! যেন কিছুই ঘটেনি একটু আগে! কিছুক্ষন পরে বল ক্লিয়ার হলে এই শক্তিশালী মানুষকে দেখলাম সমাবেশ থেকে লুকিয়ে একটু বুকে হাত দিয়ে টের পাবার চেষ্টা করছে কিছু হল কিনা। কিন্তু মাটিতেও বসলোনা, আবার কাউকে সাহায্যের জন্যও ডাকলো না। কেউ একজন মনে হয় ওর দিকে তাকিয়ে বললো খেলতে পারবি কিনা- কোন জবাব দিলনা। একটু পরে মনে হয় ডোমের নিজেরই সম্বিত ফিরে এলো। কিন্তু মুখের ভাবের কোন পরিবর্তন না এনে বা মাঠের কোথাও একটুও না বসে ভাইজান মোটামুটি এক দৌড়ে সাইড লাইনে চলে এল। খুব বেশী কাতর না দেখালেও খেলার প্রতি আর আগ্রহ দেখালোনা! আলু বোখারার ইফেক্ট বোধ হয় বুকে ঐ শটটা খেয়ে কেটে গিয়ে শক্তিশালী ডোমেকে আবার তার অরিজিনাল গোবেচারারূপে ফেরত আনলো! ও যে মোটামুটি নিরাপদ সেটা নিশ্চিত হবার পর ‘ডোমে’ এবং ডোমের উপর ‘আলু বোখারার জাদুকরী (সাময়িক) প্রতিক্রিয়া’র কথা ভেবে সবার উৎকন্ঠা নিমিষেই এক দমফাটা হাসিতে রূপান্তরিত হল! ঘটনাটা চিন্তা করলে মনের অজান্তে এখনো হাসি চলে আসে!

()

আমাদের এই আরমানিটোলা মাঠ হতে একসময় কিছু নামজাদা ফুটবল খেলোয়াড়ের আবির্ভাব ঘটে যাদের মধ্যে ৬০-৭০ দশকের দেশের অন্যতম কৃতি ফুটবল ও হকি খেলোয়াড় প্রতাপ শংকর হাজরার নাম বিশেষ প্রনিধানযোগ্য। তিনি ফুটবল ও হকি দুই খেলাতেই স্বাধীনতার আগ থেকেই জাতীয় পর্যায়ের ক্ষ্যাতিসম্পন্ন তারকা ছিলেন- ঢাকা মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবে খেলতেন এবং বাংলাদেশ জাতীয় দলেও প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন। উনাদের পৈতৃক ভিটি ছিল আরমানিটোলা মাঠের ঠিক পশ্চিম দিকে-শাবিস্তান সিনেমা হল আর এপি ফ্যাক্টরির ঠিক পাশে। উনাকে উনার খেলোয়াড়ী জীবনে না দেখলেও আরমানিটোলা মাঠে আমার টেবিল টেনিসের গুরু শ্রদ্ধেয় সমীর ভাইর সাথে দু-একবার কোন কোন টুর্নামেন্টের ফুটবল ম্যাচ পরিচালনা করতে দেখেছি। আরমানিটোলার সেসময়ের আরেকজন নামজাদা ফুটবলার ছিলেন বশির যিনি তৎকালীন ঢাকা ওয়ান্ডারার্স ও মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবে খেলতেন এবং পাকিস্তান ন্যাশনাল টিমেও ডাক পেয়েছিলেন। কাছাকাছি সময়ে ঢাকা ওয়ান্ডারার্স ক্লাবের গাউস এবং ইষ্ট-এন্ড ক্লাবের নামকরা খেলোয়াড় বেলালও ছিলেন এই আরমানিটোলারই সন্তান-এই আরমানিটোলা মাঠেরই কৃতি খেলোয়াড়! আমাদের কালে এসে কসাইটুলির ফারুক ভাইকে দেখেছি ঢাকা ওয়ান্ডারার্স ক্লাবে খেলতে। উনি খুব সুদর্শন ছিলেন তাই নানান রংয়ের জার্সি, শর্টস আর বুট পরে আরমানিটোলা মাঠের গোলপোষ্টের নিচে যখন গোলকিপিং প্র্যাকটিস করতেন- দৃষ্টিটা সত্যিই আটকে যেত উনার দিকে! আমার বন্ধু আবিদের বড়ভাই জাহিদ ভাইও অত্যন্ত প্রতিশ্রুতিশীল খেলোয়াড় ছিলেন যিনি দ্বিতীয় বিভাগ ফুটবল লীগে ঢাকা ওয়াসার হয়ে খেলতেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে ইনজুরির কারনে জাহিদ ভাই তাঁর ক্যারিয়ারকে দীর্ঘায়ীত করতে পারেননি। উনার ছোট ভাই ওয়াজেদ ভাইও তৃতীয় বিভাগ ফুটবল লীগে মুসলিম ফ্রেন্ডস এর হয়ে খেলতেন-শুনেছি এক পর্যায়ে উনি মুক্তিযোদ্ধা সংসদেও সুযোগ পেয়েছিলেন। আরমানিটোলা মাঠের আরো বেশ কয়েকজন প্রতিশ্রুতিশীল ফুটবল খেলোয়ার ছিলেন যাদের মধ্যে আলমগীর ভাই, আলী মনসুর ভাই, গোপাল দা, হানিফ ভাই, শাহীন ভাই অন্যতম। উনাদেরকে প্রায়ই জার্সি, শর্টস আর বুট পরে আরমানিটোলা মাঠে প্র্যাকটিস করতে দেখতাম। আলমগীর ভাইর শটে অনেক পাওয়ার ছিল। আলী মনসুর ভাই ধীরে ধীরে ক্যারিয়ারে উন্নতি করে নব্বইয়ের দশকে দেশের শীর্ষ স্থানীয় ক্লাব আবাহনী  লিমিটেডে রক্ষনভাগের দায়িত্ব কৃতিত্বের সাথে পালন করেন। গোপাল দা পরে নদীর ওপারে কেরানিগন্জে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন। আরমানিটোলা মাঠে ফুটবল প্র্যাকটিস শেষ করে উনারা প্রায়ই মাঠ সংলগ্ন আরমানিটোলা যুব সংঘের টেবিল টেনিস ক্লাব ঘরটিতে আসতেন। ঐসময়ের দিকে আমিও মোটামুটি সিরিয়াসলি টেবিল টেনিস খেলতাম। আমাদের প্র্যাকটিসের ফাঁকে উনাদের সাথে গল্প-গুজবের সময়টা ছিল সত্যিই অনেক উপভোগ্য! ৮৮ সালের দিকে কোন একটা ফুটবল টুর্নামেন্ট উদ্ভোধন করতে আরমানিটোলা মাঠে আসেন তৎকালীন জাতীয় ফুটবল দলের স্বনামধন্য খেলোয়াড় ইমতিয়াজ সুলতান জনি। উনাকে ৮৫ সালে হ্যাট্রিক শিরোপা জয়ী আবাহনী ক্রীড়া চক্রের অধিনায়ক ও ঢাকায় অনুষ্ঠিত সাফ গেমস ফুটবলের রানার-আপ বাংলাদেশ দলের অধিনায়ক হিসেবে দেখেছি। পরবর্তিতে উনি দীর্ঘদিন মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবেও খেলেছিলেন। যাই হোক, অল্প বয়সে এত বড় একজন ফুটবলারকে একেবারে সামনাসামনি দেখে খুবই রোমাঞ্চিত হয়েছিলাম সেদিন!

সর্বশেষ খবর

খালেদা জিয়ার সঙ্গে বিদেশ কারা যাচ্ছেন?

করোনাভাইরাসে আক্রান্ত বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে বিদেশ নিতে তার পরিবার সরকারের কাছে আবেদন করেছে। সরকার সেই আবেদনে ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছে। তবে এখনও আনুষ্ঠানিক অনুমোদন...

এসআইয়ের ড্রয়ার থেকে ঘুষের আড়াই লাখ টাকা বের করলেন এএসপি

ভুক্তভোগীর দেয়া খবরে নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী থানায় এসে এসআই মো. রেজাউল করিমের ড্রয়ার থেকে ঘুষের আড়াই লাখ টাকা বের করেন সহকারী পুলিশ সুপার (সোনাইমুড়ী সার্কেল)...

গঙ্গার পানির সঠিক হিস্যা পাচ্ছে না বাংলাদেশ

১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি মোতাবেক গঙ্গার পানির হিস্যা পেতে সমস্যা হচ্ছে বাংলাদেশের। পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তা ও গঙ্গা বেসিনের পানি বিশেষজ্ঞরা বিষয়টি দ্য...

সারারাত রিকশা চালিয়ে আয় ৬০০ টাকা, নিয়ে গেল পুলিশ

রোযা রেখে দিনের বেলায় রিকশা চালাতে পারেন না শামীম। তাই ইফতারের পর বের হন জীবিকার উদ্দেশ্যে। রাতে রিকশা চালিয়ে যা আয় হয় তাতে স্ত্রী,...

বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ হলেন অতিরিক্ত সচিব, সমালোচনার ঝড়

জামালপুরের বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম কোষাধ্যক্ষ হিসেবে চার বছরের জন্য নিয়োগ পেয়েছেন মোহাম্মদ আবদুল মাননান। তিনি পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন...

মাসিক আর্কাইভ