মিস্টার বেগমপাড়া

মেজর জেনারেল ড. মো. সরোয়ার হোসেন (অব.)

বেগমপাড়ার নাম শুনলেই ছোট বেলায় শোনা আলী বাবা চল্লিশ চোর বা আরব্য রজনীর রহস্যে ঘেরা কোনো গল্পের কথা মনে পড়ে যায়। এই লেখায় খুব একটা রহস্য না থাকলেও বেগমপাড়া উপাখ্যান মগ, পর্তুগিজ জলদস্যু আর ইংরেজদের লুটে নেওয়া ধন সম্পদের সেই পৌরাণিক কাহিনির কোথায় যেন একটা মিল খুঁজে পাওয়া যায়। ভারতীয় চলচ্চিত্রকার রশ্মি লাম্বার Begumpura : The Wives Colony চলচ্চিত্রটি মূলত মধ্যপ্রাচ্যে চাকরিরত পাকিস্তান ও ভারতীয় চাকুরেদের কানাডায় বসবাসরত অভিবাসী রমণীদের অম্ল-মধুর জীবন নিয়ে নির্মিত। এদের প্রায় সবাই অন্টারিওর মিশিসাগার স্কয়ার ওয়ান ও সেরিডান মলের বিলাসবহুল উঁচু ভবনে জীবনযাপন করেন। উজ্জ্বল ভবিষ্যতের আশায় স্ত্রী-সন্তানাদি কানাডায় রেখে সংসারের কর্তাব্যক্তিরা মধ্যপ্রাচ্যে চাকরি করেন। এভাবেই বিশ্বায়ন আর অর্থনৈতিক প্রয়োজন অর্থ, জনবল আর নতুন নতুন ধারণা পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে পৌঁছে দিচ্ছে। কয়েক বছর ধরে কিছু বাংলাদেশি পরিবারও কানাডার বেগমপাড়ায় বসবাস শুরু করেছে। বিষয়টি সবার মনেই কমবেশি কৌতূহলের সৃষ্টি করেছে। নর্থ ইয়র্কের ইয়ঙ্গী ও শেফার্ড এলাকায় বসবাসকারী বাংলাদেশিরা সম্ভবত বেগমপাড়া থেকেই বেগমপাড়া নামটির ব্যবহার শুরু করেছে।

বাংলাদেশি অভিবাসীরা যে বিশ্বায়নের কারণে বেগমপাড়ায় যায়নি এটা অনুমান করা যায়। বিষয়টি তখনই নজরে এলো যখন কানাডার মূলধারার বাংলাদেশি প্রবাসীরা ৩০০ সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় রাস্তায় দাঁড়িয়ে বেগমপাড়াবাসীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সোচ্চার হলো। একটা সময় ছিল যখন বহির্দেশ থেকে জলদস্যু আর ইংরেজরা এসে আমাদের সম্পদ লুণ্ঠন করে নিয়ে গেছে। সময় বদলেছে এখন নিজের দেশের মানুষজনই দেশের সম্পদ বহির্দেশে দিয়ে আসছে। তবে সবাই তা করে না। ভেবে দেখুন লাখ লাখ প্রবাসী শ্রমিক ভাইদের কথা, যারা কত কষ্ট করে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা দেশে পাঠাচ্ছে। ওদের পাঠানো অর্থ দিয়েই আজ আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩৮.৮ বিলিয়ন ডলার (২০২০)। একই দেশের মানুষ কিন্তু চিন্তা আর চেতনায় কত আলাদা। কানাডার বেগমপাড়াই হোক বা সুইস ব্যাংকে অর্থ সঞ্চয় আর মালয়েশিয়ায় সেকেন্ড হোম নির্মাণ- এর সবগুলোই এক ধরনের দৈন্যতা। সম্পদ আমাদের এতটাই আপন হয়ে গেছে যে তা রক্ষা করতে আমরা আজ মাতৃভূমি ছাড়তেও কুণ্ঠাবোধ করি না। এই প্রবণতা আমাদের দুর্বল শাসন ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রকাশ। তবে সুইস ব্যাংকে যারা অর্থ জমা করেছেন এদের সবাই বাংলাদেশে বসবাসকারী তা নয়।

অনেক প্রবাসী বাংলাদেশিরাও অর্থ জমা করেন। তাই সুইস ব্যাংকের সমুদয় অর্থের দায় বাংলাদেশে অবস্থানকারী নাগরিকের দেওয়া যায় না। একটা বিষয় লক্ষণীয় যে, দেশের বাইরে অর্থ প্রেরণের এই প্রবণতা ১/১১ পরবর্তী সময়ে একটা ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে। এক-এগারোর সেনা সমর্থিত সরকার যতটা প্রত্যাশা নিয়ে এসেছিল সেভাবে তারা দেশবাসীর আকাক্সক্ষা পূরণ করতে পারেনি। তবে ওই সরকার সবাইকে একটা শিক্ষা দিয়ে গেছে যে, অনৈতিকভাবে অর্জিত সম্পদ দেশে জমিয়ে রাখা নিরাপদ নয়। আর এটাই বোধহয় দেশের বাইরে অর্থ নিয়ে যাওয়ার পেছনে বড় মন্ত্রক হিসেবে কাজ করছে।

 

কোনো বাংলাদেশি নাগরিক তার কষ্টার্জিত অর্থ দিয়ে উন্নত দেশে বসবাসের সিদ্ধান্ত নিলে তাতে সমস্যার কিছু নেই; যদি তা বৈধ উপায়ে অর্জন করে থাকেন। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক কোনো নাগরিককেই দেশের বাইরে ১০,০০০ (দশ হাজার) ডলারের বেশি নিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেয় না। এ থেকে স্পষ্টতই বোঝা যায়, কেন্দ্রীয় ব্যাংকও চায় না যে দেশের অর্থ বাইরে চলে যাক। তারপরও লাখ লাখ ডলার বিদেশে চলে যাচ্ছে। একটা নীতিমালা তৈরির সময় সার্বিক বিষয়গুলো বিবেচনায় না নিলে পরিস্থিতি এর চেয়ে ভালো হওয়ার সুযোগ নেই। দেশে সরকারি দফতরে একটা পিয়নের চাকরি পেতেও পুলিশ ভেরিফিকেশন লাগে। সরকারি সংস্থার সঙ্গে ব্যবসা করতে গেলেও প্রয়োজন নিরাপত্তা ছাড়পত্রের অথচ দেশের ব্যবসায়ী, আমলা ও রাজনৈতিক নেতৃস্থানীয়রা এভাবে দেশের বাইরে অর্থ নিয়ে যাবেন অথচ কিছুই লাগবে না। আর এর মধ্যে কেউ যে জঙ্গিবাদের অর্থ জোগানসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ তথ্যাদি বহির্দেশে বিক্রি করে দিচ্ছে না-এ নিশ্চয়তাই বা কে দেবে? গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ভূমিকাই বা কী? টরেন্টোর নর্থ ইউর্কে বসবাসকারী এমন প্রায় তিনশত পরিবার রয়েছে যাদের প্রত্যেকের ২.৫-৩ লাখ মিলিয়ন ডলার মূল্যের বাড়ি রয়েছে। জানা যায়, টরেন্টোর ইয়র্ক মিনিস্টার রোডে তথাকথিত এই বেগমপাড়ার একটি সদর দফতর রয়েছে। সেদিন একটা অনলাইন নিউজ পোর্টালে পড়লাম এক টেলিভিশন চ্যানেলের পরিচালক কানাডায় ৩.৫ মিলিয়ন ডলার মূল্যের বাড়ির মালিক। বেগমপাড়ায় বসবাসকারী প্রতিটি পরিবারের মাসিক খরচ গড়ে ৩০ হাজার কানাডিয়ান ডলার। যে বিষয়টি অবাক করেছে তা হলো অধিক সংখ্যায় সরকারি কর্মকর্তাদের বেগমপাড়ায় বসতি স্থাপনের তথ্যটি। দেশের বাইরে পাচার হয়ে যাওয়া সমুদয় অর্থের পরিমাণ নির্ণয় করা কঠিন কাজ। তবে যেহেতু মালয়েশিয়ায় সেকেন্ড হোম ও কানাডা বা পাশ্চাত্যের অন্য দেশগুলোতে বিনিয়োগকারী হিসেবে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন হয়। ওগুলোর সাহায্যে পাচার হয়ে যাওয়া অর্থের পরিমাণের বিষয়ে একটা ধারণা পাওয়া যেতে পারে। যতদূর জানা যায় কানাডায় বিনিয়োগকারী হিসেবে ১.২ মিলিয়ন ডলার প্রদান করলেই নাগরিকত্ব পাওয়া যায়। এই অর্থ কানাডার সরকারি তহবিলে বিনা সুদে পাঁচ বছরের জন্য রাখতে হবে। তারপর গ্রাহক তার অর্থ ফেরত নিতে পারবে। কানাডার পাশাপাশি মালয়েশিয়ান কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী চার হাজারেরও  অধিক বাংলাদেশি সেকেন্ড হোম প্রকল্পে নিবন্ধন করেছে। মালয়েশিয়ায় সেকেন্ড হোমে রেজিস্ট্রেশনে সংখ্যা বিচারে চীন প্রথম (১১,৮২০), দ্বিতীয় জাপান (৪,৬১৮) আর তৃতীয় বাংলাদেশ (৪,০১৮)। এ ছাড়া অন্য রাষ্ট্রগুলো যুক্তরাজ্য (২,৬০৮), দক্ষিণ কোরিয়া (২,০৬৯), সিঙ্গাপুর (১,৪২১), ইরান (১,৩৮১), তাইওয়ান (১,৩৪৭), পাকিস্তান (১,০১৭) ও ভারত (১,০০৮)। মালয়েশিয়ান ট্যুরিজম ও সংস্কৃতিমন্ত্রী দাতক সেরি নাজরি আজিজ স্বয়ং এ তথ্য প্রদান করেছেন। বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট দফতর বা সংস্থা কর্তৃক কোনো প্রকার জবাবদিহিতা ছাড়াই নাগরিকত্ব গ্রহণ ও অর্থ পাচার করার দায়ে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে। শুধু দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেই সীমিত আকারে সেকেন্ড হোমের ব্যাপারে তদন্ত হতে শুনেছি। তবে সাম্প্রতিককালে বেগমপাড়ার বাংলাদেশিদের বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের তথ্য সংগ্রহের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাতে হয়। একটা সামগ্রিক পর্যালোচনা ও তদন্ত এবং নীতিমালা হলে দেশের সম্পদ বাইরে চলে যেত না। এ বছরের জানুয়ারি মাসে পরিকল্পনামন্ত্রী বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ফোরামে বক্তব্য প্রদান শেষে এক প্রশ্নকর্তার জবাবে অর্থ পাচারের বিষয়ে বলেন, পাচারকৃত অর্থের পরিমাণ খুব বেশি নয়। দায়িত্বশীল পর্যায় থেকে অনুরূপ বক্তব্য না দেওয়াই ভালো। দায়িত্বশীল মহলের সচেতনতা দেশের অবস্থা পরিবর্তনে বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে। ২০১৯ এর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান উন্নয়নশীল দেশ হতে উন্নত দেশে পাচার হয়ে যাওয়ায় বিপুল অর্থের প্রসঙ্গটি উপস্থাপন করে এ বিষয়টিকে ধনী-দরিদ্রদের মধ্যে বেড়ে চলা পার্থক্যের জন্য দায়ী করেন। তিনি এ ব্যাপারে ধনী দেশগুলোর সহায়তা কামনা করেন। যে কোনো দেশের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলে তা সমস্যা সমাধানে ভূমিকা রাখে। ২০১৮ সালে পাকিস্তানি নাগরিকদের সুইস ব্যাংকে জমাকৃত অর্থের পরিমাণ ছিল ৭৪৫.২৭ মিলিয়ন সুইস ফ্রাংকস যা ২০১৯ সালে ৪৫% কমে দাঁড়িয়েছে ৪১০.২২ মিলিয়ন সুইস ফ্রাংকে। একইভাবে রাজনৈতিক সদিচ্ছাই পারে এ ধরনের অনিয়ম কমিয়ে আনতে। সুইস ব্যাংক অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে এই আমানত জমা রাখে এবং সুইস ব্যাংককে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় টেক্স হ্যাভেন বলা হয়ে থাকে।

সুইস ব্যাংকে গচ্ছিত অর্থ-কে কীভাবে অর্জন করেছে এ ব্যাপারে বাংলাদেশ সরকার আজ অবধি খতিয়ে দেখেনি। দেশের অনেক এজেন্সি রয়েছে যাদের উচিত অর্থনৈতিক নিরাপত্তা দৃষ্টিকোণ থেকে এগুলো তদন্ত করা। আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় বিভিন্ন দেশ তাদের নাগরিকদের সুইস ব্যাংকে গচ্ছিত অর্থের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করে থাকে। বাংলাদেশ ব্যাংকের Financial Intelligence Unit এ বিষয়ে বহির্দেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তথ্য বিনিময়ের মাধ্যমে মানি লন্ডারিংয়ের ব্যাপারে কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষমতা রাখে। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক এ বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণের ব্যাপারে খুব একটা আগ্রহ দেখায়নি। সুইস ন্যাশনাল ব্যাংক-২০১৯-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশি নাগরিকদের  জমাকৃত অর্থের পরিমাণ ৫,৩৬৭ কোটি টাকা। অথচ ঋণের অর্থ পরিশোধ করতে না পেরে কিছু দিন আগেও সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও মাগুরায় এক স্কুলশিক্ষক আত্মহত্যা করেছেন। একই দেশে মানুষের সামর্থ্য আর আর্থিক বৈষম্যের এই চিত্র সত্যিই খুব পীড়াদায়ক। বহির্দেশে অর্থ পাচার রোধে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণে ব্যর্থতার জন্য আজ বেশ কিছু ব্যাংক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিষয়টিকে যথাযথ গুরুত্ব প্রদান করত কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন। সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষেত্রে সরকারের ইমেজ সংকটের যেমন আশঙ্কা রয়েছে আবার এ কথা সত্যি যে সমুচিত ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে সরকারের ভাবমূর্তি উন্নয়নের সুযোগ কাজে লাগাতে হবে। কানাডা, মালয়েশিয়া বা সুইস ব্যাংকে জমাকৃত অর্থ উদ্ধার খুব কঠিন কিছু নয়। এসব দেশে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস ও হাইকমিশনগুলোকে তদন্তসাপেক্ষে তালিকা প্রস্তুত করতে বলা যেতে পারে। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট দূতাবাসে আইনজীবী, আয়কর ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের সংযুক্তির মাধ্যমে এদের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা যেতে পারে। তবে এর সবটাই নির্ভর করছে সরকারের সদিচ্ছার ওপর। সম্প্রতি এ বিষয়ে দু-একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ কথা বলা শুরু করেছেন, যা খুবই ভালো লক্ষণ। কথা বললেই সমস্যা  সমাধানের রাস্তা প্রশস্ত হবে।

লেখক : গবেষক, শিক্ষক ও সাবেক সেনা কর্মকর্তা।