লতিফ-মিল্লাতকে যে কারণে দলীয় পদ থেকে অব্যাহতি

জেলার অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের জেরে পদ হারাতে হয়েছে সিরাজগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আব্দুল লতিফ বিশ্বাস ও ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হাবিবে মিল্লাত মুন্নাকে। গতকাল আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক বিপ্লব বড়ুয়া স্বাক্ষরিত একটি চিঠিতে তাদেরকে অব্যাহতি দেয়া হয়। দলের এ ধরনের সিদ্ধান্তে হতবিহ্বল হয়ে পড়েছেন দীর্ঘদিন জেলা আওয়ামী লীগের দায়িত্বে থাকা ওই দুই নেতা। তাদেরকে সরিয়ে জেলার সহ-সভাপতি কেএম হোসেন আলী হাসানকে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আব্দুস সামাদ তালুকদারকে ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। আওয়ামী লীগের দেয়া চিঠিতে বলা হয়, দলের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সভাপতি শেখ হাসিনার নির্দেশক্রমে সংগঠনের গঠনতন্ত্রের বিধি মোতাবেক সিরাজগঞ্জ জেলা শাখার সভাপতি আব্দুল লতিফ বিশ্বাস ও ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হাবিবে মিল্লাত মুন্নাকে স্বীয় পদ থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। ভারপ্রাপ্ত সহ-সভাপতি কেএম হোসেন আলী হাসান পরবর্তী কাউন্সিল না হওয়া পর্যন্ত ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আব্দুস সামাদ তালুকদারকে ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। তবে চিঠিতে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ বিশ্বাস ও জাতীয় সংসদ সদস্য হাবিবে মিল্লাত মুন্নাকে অব্যাহতি দেয়ার কোনো কারণ উল্লেখ করা হয়নি। স্থানীয় বেশ কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতার সঙ্গে কথা বললে তারা জানান, অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

তারা বলেন, দলের পদ-পদবি ভাগবাটোয়ারা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে দলের নেতাদের মধ্যে অসন্তোষ বিরাজ করছে। প্রত্যেকেই তাদের প্রভাব খাটিয়ে নিজ বলয়ের লোকজনকে দলের বিভিন্ন পদে বসাতে তৎপর। দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের কাছে এ নিয়ে সব সময় অভিযোগ জানানো হতো। বেশ কয়েকবার দলীয় কোন্দল মেটানোর চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু স্থানীয় নেতারা কেউ কাউকে ছাড় দিতে চাননি। এমনকি এক টেবিলে বসারও ইচ্ছা দেখাননি। তবে দলের এ সিদ্ধান্তে হতবাক ও হতবিহবল হয়ে পড়েছেন বলে জানিয়েছেন সাবেক মৎস্য ও প্রাণী সম্পদমন্ত্রী আব্দুল লতিফ বিশ্বাস। মানবজমিনকে তিনি বলেন, হঠাৎ করে কেন আমাকে বহিষ্কার করা হলো কিছু বুঝতে পারছি না। আসলে আমাদের নিয়ে অনেক ষড়যন্ত্র হচ্ছে। যেহেতু দলের সভাপতি আমাদের বহিষ্কার করেছেন সেহেতু কিছু বলার নেই। তবে এটুকু বিশ্বাস করি নেত্রীকে কেউ ভুল বুঝিয়েছেন। আমার বিষয়ে অপপ্রচার ও অসত্য তথ্য জানিয়ে নেত্রীকে ক্ষেপিয়ে তোলা হয়েছে। তিনি বলেন, আমি মন্ত্রী ছিলাম, দলে দীর্ঘদিন নেতৃত্ব দিচ্ছি। সেই আমাকে কোনো প্রকার কারণ দেখানোর নোটিশ ছাড়াই বহিষ্কার করা হলো। আমার ব্যাখ্যা পর্যন্ত জানতে চাওয়া হয়নি। তিনি বলেন, এটা নেত্রীর একার সিদ্ধান্ত হতে পারে না। তার পাশে থাকা উপদেষ্টা এইচটি ইমাম এটা করিয়েছেন। কারণ আগামী ৩০শে নভেম্বর উল্লাপাড়ায় দলের বর্ধিত সভা ডাকা হয়েছে। সেখানে উপদেষ্টার ছেলে সিরাজগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য তানভীর ইমামের নানা অনিয়ম ও দুর্নীতি তুলে ধরার পরিকল্পনা করেছি। ওই এমপি টাকার বিনিময়ে দলের পদ বিক্রি করেছেন। দলকে টিকিয়ে রাখতে এসব সত্য তুলে ধরতে চেয়েছি। কিন্তু বর্ধিত সভায় আমি যেন উপস্থিত থাকতে না পারি সে কারণে আগেভাগেই বহিষ্কারের মতো সিদ্ধান্ত নেয়া হলো। এইচটি ইমাম ছাড়া এতবড় কাজ কে করতে পারে? এদিকে দল থেকে বহিষ্কারের কোনো কারণ খুঁজে পাচ্ছেন না বলে জানিয়েছেন সিরাজগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক ও সিরাজগঞ্জ-২ আসনের এমপি হাবিবে মিল্লাত। অধ্যাপক ডা. হাবিবে মিল্লাত সাবেক মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেনের মেয়ের জামাই। মিল্লাত মানবজমিনকে বলেন, কেন অব্যাহতি দেয়া হয়েছে তার কোনো কারণ জানা নেই। আর এ নিয়ে বেশি মন্তব্যও করতে চাই না। তবে কারণ জানতে পারলে তিনি গণমাধ্যমকে জানাবেন বলে জানান। তৃণমূল রাজনীতি থেকে উঠে আসা আব্দুল লতিফ বিশ্বাস দুই বার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও পরে সিরাজগঞ্জ-৫ আসন থেকে ১৯৯৬ সালে প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০১ সালে একই আসনে নির্বাচন করে পরাজিত হলেও ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করার পর তিনি ২০০৯ সালের ২৪শে জানুয়ারি মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্ব পান এবং ২০১৩ সালের ২১শে নভেম্বর পর্যন্ত তিনি এ দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৪ সালে ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনে তিনি মনোনয়ন বঞ্চিত হন। দলীয় বা সরকারের কোনো দায়িত্ব না থাকলেও তিনি সকল দলীয় কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করে সিরাজগঞ্জের রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন। অন্যদিকে ডা. মো. হাবিবে মিল্লাত সিরাজগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য। এর আগে তিনি ২০১৪ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ থেকে সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন।