গান শোনা সেকাল-একাল

লিখেছেন ডঃ মোহম্মদ মাহবুব চৌধুরী, মন্ট্রিয়াল, কানাডা থেকে

শিল্পকলা বা আর্টের প্রতি মানুষের আকর্ষণ সহজাত। মানবমনের সূক্ষ্ম সুন্দর অনুভূতিকে নাড়া দিতে পারার অদ্ভুত সক্ষমতাই শিল্পের অনন্য শক্তি যাতে প্রভাবিত হয় বলেই কেউ নিজে সরাসরি নতুন শিল্প সৃষ্টিতে উদ্বুদ্ধ হয়, আবার কেউ সৃষ্ট শিল্পের সৌন্দর্য একান্ত নিজের মত করে অনুধাবন করার মাঝেই অপার আনন্দ খুঁজে পায়। আমি মূলত এই দ্বিতীয়গোত্রের মানুষ- নিজের একাডেমিক ও প্রফেশনাল জীবনের ব্যস্ততার মাঝেও সবসময় শখ ছিল আলাদাভাবে সময় করে পছন্দের কিছু শিল্পকর্মকে একান্ত নিজের মত করে উপভোগ করার।

ছোটবেলায় স্ট্যাম্প, ভিউকার্ড, বিদেশি কয়েন কেনা বা সংগ্রহের পাশাপাশি গল্পের বই, কমিকস, ম্যাগাজিন কিনে বা সংগ্রহ করে পড়ার মত নানা ধরনের শখ ছিল। কিছু কিছু শখ এখন আর আগের মত নেই বা থাকলেও আগের মাত্রায় নেই। একসময় মনভরে টেবিল টেনিস, ক্রিকেট খেলেছি-টেবিল টেনিসে ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ডও ছিল কিন্তু একাডেমিক বা প্রফেশনাল কারণে খেলাধুলার সে শখ অনেকদিন হলো মেটাতে পারছিনা। গল্পের বই পড়ার ধরনে একটু পরিবর্তন এলেও অন্যতম প্রিয় শখ হিসেবে সেটা এখনো টিকে আছে।

তবে শিল্পকলার যে শাখাটিকে সেই স্কুল জীবন হতে আজো পর্যন্ত এক অনন্য ভালোবাসায় দেহ-মন-সত্তা দিয়ে উপভোগ করছি তা হলো গান বা মিউজিক। না, আমি কোন ধরনের গান গাইনা বা কোন ইন্সট্রুমেন্টও বাজাইনা। আমার পরম ভালো লাগার বা আবেগের জায়গাটা আসলে শুধুই মিউজিক বা গান শোনায়-দেশি,বিদেশি গান বা ইনস্ট্রুমেন্টাল যাই হোক না কেন!মানব মনের একান্ত গহীনে বা হৃদয়ের অন্ত:স্থলে জমে থাকা সূক্ষ্ম আনন্দ, সুখ, দু:খ, বেদনা, অভিমান বা ক্ষোভের অনুভূতিকে জাগিয়ে তুলে এক অনিন্দ্য সুন্দর ছন্দে আপন কল্পনার রাজ্যে দেহ-মনকে ভাসিয়ে নেবার মত ঐন্দ্রজালিক ক্ষমতা সংগীতের মত আর কোন শিল্পে বোধ হয় নাই! একান্ত নিভৃতে বা বন্ধু সংসর্গে পছন্দের কোন সুন্দর সুর বা গান আমাকে দেয় নিজের সেই একান্ত কাল্পনিক জগতে অবাধ বিচরণের অবারিত সুযোগ।

সময়ের বিবর্তনে টেকনোলজির ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে, জীবনের নানাধাপ পেরিয়ে শিক্ষাজীবন শেষে কর্মজীবনেরও বেশ কয়েক বছর পার হলো। সংসার হয়েছে, ব্যস্ততাও বেড়েছে। কিন্তু মিউজিকের প্রতি কৈশোর তারুণ্যের সেই উচ্ছলতা, অনুরাগ, টান বা ভালোবাসায় বিন্দুমাত্র ভাটা পড়েনি আজো! সেই আবেগের জায়গা থেকেই কয়েকটি কিস্তিতে আমাদের শৈশব, কৈশোর আর তারুণ্যের গান সংগ্রহ, রেকর্ডিং বা শোনার কিছু স্মৃতি শেয়ার করতে চাই।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভূতপূর্ব উৎকর্ষে নিজের পছন্দমত গান শোনার পাশাপাশি নতুন কোন মিউজিকের খোঁজ পাবার ব্যবস্থা তো এখন অনেকটাই হাতের মুঠোয়। অনলাইনভিত্তিক বিভিন্ন সোর্স হতে নিমিষেই পছন্দমত গান ডাউনলোড করে ল্যাপটপে বাজিয়ে কিংবা স্মার্টফোনে ‘স্পটিফাই’ বা ‘অ্যাপল মিউজিক’ অ্যাপ ব্যবহার করে আঙুলের এক চাপেই বিশ্বের নানান প্রান্তের নানান সংস্কৃতির মিউজিকের সাথে পরিচিতি ঘটছে। ইউটিউবের মাধ্যমে অডিও গানের পাশাপাশি পছন্দের আর্টিস্টের মিউজিক ভিডিও বা লাইভ পারফরমেন্সও দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু ৮০ ও ৯০’র দশকে ঢাকা শহরে আমাদের স্কুল-কলেজ ও ইউনিভার্সিটি জীবনে বিষয়টি অত সহজ ছিলনা। ইন্টারনেট ছিলনা, ল্যাপটপ বা স্মার্টফোনও ছিলোনা। গানের উৎস ছিল সীমিত এবং শোনার মাধ্যমও ছিলো ভিন্ন।

গান শোনার নানা মাধ্যম:
আমরা যারা আশি-নব্বইর দশকে শৈশব, কৈশোর আর তারুণ্যের দিনগুলো পেরিয়ে এখনো গান শুনছি তাদের মোটামুটি বেশ কয়েকটি মাধ্যমে গান শোনার অভিজ্ঞতা হয়েছে- রেডিওতে ওয়ার্ল্ড মিউজিক শোনার বাইরে ক্যাসেট বা সিডি প্লেয়ারে কম্প্যাক্ট ক্যাসেট, সিডি চালিয়ে যেমন গান শোনা হয়েছে তেমনি হালের কম্পিউটার, ল্যাপটপ, স্মার্টফোন, আইপড , mp3 প্লেয়ারে mp3 ও অন্যান্য ডিজিটাল ফরমেটের গান, কিংবা অতি সাম্প্রতিক সময়ে অ্যামাজনের ‘অ্যালেক্সা’ বা ‘গুগল প্লেয়ার’ এ শুধু মৌখিকভাবে নির্দেশ দিয়েই অনলাইন মিউজিক লাইব্রেরি হতে সরাসরি গান শুনতে পারছি। আমাদের সময়ের গান শোনার দুটি প্রধান ও জনপ্রিয় মাধ্যম-কম্প্যাক্ট ক্যাসেট ও সিডি এখনতো মোটামুটি উঠেই গিয়েছে।

৮০’র দশকে স্কুল জীবনে যখন গান শোনা শুরু করি আমাদের গান শোনার মাধ্যম ছিল মূলত ক্যাসেট ও ক্যাসেট প্লেয়ার। এই কম্প্যাক্ট ক্যাসেট-ক্যাসেট প্লেয়ার টেকনোলজি বিশ্বে চালু হয় ১৯৬৪ সালের দিকে। ১৯৬২ সালে ফিলিপ্স কোম্পানি বাণিজ্যিকভাবে প্রথম কম্প্যাক্ট ক্যাসেট বাজারে ছাড়ে মূলত অডিও ষ্টোর বা রেকর্ড করার মাধ্যম হিসেবে। আর ক্যাসেটে অডিও রেকর্ডিং এর জন্য প্রথম হোম রেকর্ডার বাজারে আসে ১৯৬৪ সালে, যুক্তরাষ্ট্রে। মূলত হোম অডিও রেকর্ডিং বা সাংবাদিকদের ব্যবহারের জন্য কম্প্যাক্ট ক্যাসেটের প্রচলন শুরু হলেও ভালো রেকর্ডিং কোয়ালিটির জন্য পরবর্তীতে মিউজিক ইন্ডাস্ট্রিতেও মাধ্যমটি খুব দ্রুতই জনপ্রিয়তা লাভ করে। ক্যাসেট ফরমেটে প্রথম মিউজিক অ্যালবাম বাজারে আসে ১৯৬৬ সালে-প্রথম শিল্পীদের মধ্যে জনি ম্যাথিস, আর্থা কিট ও নিনা সিমন অন্যতম।

বলে রাখা ভালো, উনিশ শতকের গোড়ার দিক হতে শুরু করে কম্প্যাক্ট ক্যাসেট আসার আগ পর্যন্ত গান শোনা হত মূলত রেডিওতে অথবা ‘গ্রামোফোন’ এ বড় বড় ডিস্কের ‘রেকর্ড’ চালিয়ে। ‘গ্রামোফোন’ মূলত আমেরিকান বিজ্ঞানী টমাস আলভা এডিসনের ১৮৭৭ সালে উদ্ভাবিত ‘ফনোগ্রাফ’ যন্ত্রেরই উন্নততর সংস্করণ যা কিনা ১৮৮০’র দশকজুড়ে আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেলের ভোল্টা ল্যাবরেটরিতে ফনোগ্রাফের উপর চালিত গবেষণার ফসল এবং ‘গ্রামোফোন’ ট্রেডমার্কে পরিচিতি পায় ১৮৮৭ সাল হতে। গ্রামোফোনে অডিও শোনার জন্য শুরুর দিকে মোমের প্রলেপ দেয়া কার্ডবোর্ড বা শক্ত মোমের ‘সিলিন্ডার রেকর্ড’ ব্যবহৃত হলেও ১৯১২ সালের মধ্যেই তা প্রতিস্থাপিত হয় ‘শেলাক’ এর তৈরি ‘ডিস্ক রেকর্ড’ দিয়ে। পরবর্তীতে, ১৯৪০ সালের দিকে পলি ভাইনাইল ক্লোরাইডের ( যে কারণে ভাইনাইল রেকর্ড নামটি এসেছে) বড় বড় ‘ডিস্ক রেকর্ড’ এর আবির্ভাব ঘটে যা মিউজিক ইন্ডাস্ট্রিতে অন্যতম অ্যানালগ রেকর্ডিং মিডিয়া হিসেবে এখনো টিকে আছে। যাই হোক, বাজারে দীর্ঘ সময় জুড়ে থাকলেও এই গ্রামোফোন আর বড় বড় দামি ডিস্ক-রেকর্ডগুলো শুধুমাত্র এলিট শ্রেণির ড্রয়িং রুমেই শোভা পেত। অন্যদিকে, কম্প্যাক্ট ক্যাসেটের ছোট আকৃতি, দীর্ঘস্থায়িত্ব, স্বল্পখরচ ইত্যাদি নানা সুবিধার পাশাপাশি গান শোনা, রেকর্ডিং/রি-রেকর্ডিং সহজ বন্দোবস্ত থাকায় খুব দ্রুতই তা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে যায় এবং পরবর্তী ৩০-৩৫ বছর ধরে গান শোনা বা রেকর্ড করার প্রধান মাধ্যম হিসেবে সদর্পে টিকে থাকে। স্বাভাবিকভাবেই ৮০ এবং ৯০’র দশকে আমাদের শৈশব, কৈশোর ও তারুণ্যের সেই উচ্ছল দিনগুলোতে এই ক্যাসেট ও ক্যাসেট প্লেয়ার ছিল গান শোনা বা রেকর্ডিং করার প্রধান মাধ্যম! প্রযুক্তির ক্রমাগত উন্নয়নে আশির দশকের শুরুতে বাজারে আসে নতুন কমপ্যাক্ট ডিস্ক (সিডি) ও সিডি প্লেয়ার টেকনোলজি যার জনপ্রিয়তা বা প্রসার ঘটে মূলত আশির দশকের শেষ দিকে এসে। সিডিতে আন-কমপ্রেসড ডিজিটাল ফরমেটে রেকর্ড করা গানে ব্যাকগ্রাউন্ড নয়েস অনেকটাই কমে যাওয়ায় সাউন্ড কোয়ালিটি স্বভাবতই কম্প্যাক্ট ক্যাসেট বা গ্রামোফোন রেকর্ডের অ্যানালগ সাউন্ডের চেয়ে অনেক বেশি ভাল ছিল এবং গান শোনার অভিজ্ঞতাও ছিল বেশ আকর্ষণীয়। কিন্তু শুরুর দিকে সিডি রেকর্ড বা প্লেয়ারের দাম ক্যাসেট-ক্যাসেট প্লেয়ারের তুলনায় অনেক বেশি পড়তো বলে নব্বই দশকের মাঝামাঝি সময় পর্যন্তও ঢাকা শহরের হাতে গোনা কয়েকটি রেকর্ডিং স্টুডিওতেই কেবল সিডি রেকর্ড বা প্লেয়ারগুলো দেখা যেত-মূলত সিডি হতে ক্যাসেটে গান রেকর্ডিং করার জন্য। এই রেকর্ডিং স্টুডিওর মধ্যে এলিফ্যান্ট রোডের রেইনবো, সুর বিচিত্রা, রিদম এর নাম উল্লেখযোগ্য যেখানে মূলত ইংরেজি বা বিদেশি ব্যান্ড বা শিল্পীর সিডি কালেকশন দেখা যেত এবং আমরা সেখান থেকেই স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে ব্ল্যাংক ক্যাসেটে ইংরেজি গান বা ইন্সট্রুমেন্টাল রেকর্ড করাতাম। তবে শহরের কিছু অভিজাত পরিবারে সিডি ও ক্যাসেট-দুই মাধ্যমেই গান শোনার উপযোগী সনি, পাইওনিয়ার, আকাই বা কেনউডের দামি ডেকসেটগুলো দেখা যেত। অন্যদিকে, সাধারণ মানুষ তখনো গান শুনতো মূলত ক্যাসেটপ্লেয়ারে-ক্যাসেট বাজিয়েই। যাই হোক, সিডির প্রসারের সাথে সাথে গান শোনার প্রধান মাধ্যম হিসেবে কম্প্যাক্ট ক্যাসেটের প্রায় ত্রিশ বছরের একচেটিয়া আধিপত্য আস্তে আস্তে খর্ব হতে থাকে। এর মাঝে, ৯০’র দশকের মাঝামাঝি সময়ে, শহুরে মধ্যবিত্ত পরিবারে কম্পিউটারের ব্যবহার বাড়তে শুরু করে এবং প্রায় একই সময় নতুন কমপ্রেসড মিউজিক ফরমেটের (mp3 ) উদ্ভবের ফলে গান শোনার আরেকটি নতুন মাধ্যমের আবির্ভাব ঘটে। পারসোনাল ডেক্সটপ কম্পিউটারে উইনঅ্যাম্প, জেট অডিও বা মিউজিকম্যাচ জুকবক্স ইত্যাদি মিউজিক অ্যাপ ব্যবহার করে বা আলাদাভাবে, ছোট আকৃতির mp3 প্লেয়ারে, বা আইপডে নিজের পছন্দের প্লে-লিস্ট অনুযায়ী অসংখ্য গান এক সাথে শোনার সুবিধায় পুরাতন কমপ্যাক্ট ক্যাসেটের ব্যবহার ব্যাপকভাবে কমতে থাকে এবং এই মিলেনিয়ামের প্রথম দশকের মধ্যেই ক্যাসেট বা ক্যাসেট প্লেয়ারে গান শোনার চল একেবারেই চলে যায়। ক্যাসেটে শেষ উল্লেখযোগ্য মিউজিক অ্যালবাম রিলিজ হয় ২০০৯ সালে- জেডা কিস এর ‘দ্য লাস্ট কিস’! কালের সাক্ষী হিসেবে এক সময়ের তুমুল জনপ্রিয় ও বহুল ব্যবহৃত এই ক্যাসেট-ক্যাসেট প্লেয়ার টেকনোলজির বিলীন হয়ে যাওয়াটা চোখের সামনেই দেখেছি! গান শোনার একটা সুন্দর স্মৃতিময় মাধ্যমের পরিসমাপ্তি! এ প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের অনেকের ধারনাই নেই এই ক্যাসেট বা ক্যাসেট প্লেয়ার আসলে কী ছিল।

ক্যাসেটে গান শোনা: গান রেকর্ডিং ও ক্যাসেট প্লেয়ার
১. রিল-টু-রিল টেপ, রিভারসিবল টেপ, কম্প্যাক্ট ক্যাসেট:
প্রথম রিল-টু-রিল রেকর্ডিং টেপ আবিষ্কৃত হয় ১৯৩২ সালে। কিন্তু এ টেপ ছিল অনেক বড় এবং সহজে বহন করা যেতনা। তাই শুধুমাত্র প্রফেশনাল রেকর্ডিং স্টুডিও বা রেডিও স্টেশনেই এর ব্যবহার ছিল। এরপর আরসিএ (RCA) ১৯৫৮ সালে প্রথম রিভার্সিবল টেপ বাজারে ছাড়ে যার আকার ছিল অনেকটা ভিডিও ক্যাসেটের কাছাকাছি এবং যা কখনোই জনপ্রিয়তা পায়নি। আর প্রথম কম্প্যাক্ট ক্যাসেট বাজারে ছাড়ে ফিলিপ্স-১৯৬২ সালে। টেকনোলজি লাইসেন্সিং এর জন্য ফিলিপ্সের এই কম্প্যাক্ট ক্যাসেটের মাপ বা কনফিগারেশনই পরবর্তীতে সকল কমপ্যাক্ট ক্যাসেটের স্ট্যান্ডার্ড মাপ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। সহজে বহনযোগ্য, সংরক্ষণযোগ্য, রেকর্ডিং-রিরেকর্ডিং এর সুবিধা থাকায় খুব তাড়াতাড়িই কম্প্যাক্ট ক্যাসেটের ব্যাপক প্রসার ঘটে।

কমপ্যাক্ট ক্যাসেট টেকনোলজিতে একটা আয়তাকার (৪ ইঞ্চি x ২.৫ ইঞ্চি x ০.৫ ইঞ্চি) প্লাস্টিকের ক্যাসেটের ভিতরে পুলি-পিন সহকারে বসানো দুটি প্লাস্টিকের রিল বা চাকার উপর রোল করে রাখা গাড় খয়েরি রংয়ের চিকন পাতলা ম্যাগনেটিক টেপ বা ফিতায় মিউজিক রেকর্ড করা হতো। এই ফিতায় পলিয়েষ্টার-টাইপ প্লাস্টিকের একটা বেইসের উপর ম্যাগনেটিক ফেরিক অক্সাইডের অসংখ্য ক্ষুদ্রকনার (লোহার মরিচার উপাদান) একটা পাতলা প্রলেপ দেয়া থাকতো। এই চুম্বকীয় ফেরিক অক্সাইড কণাগুলো রেকর্ডিং এর সময় রেকর্ডারের ‘হেড’ হতে নির্গত চুম্বক শক্তির প্রভাবে শব্দ তরঙ্গ অনুযায়ী বিভিন্ন ভাবে বিন্যস্ত হয়ে ঐ মিউজিকটাকে স্টোর বা রেকর্ড করত। এই রেকর্ড করা ক্যাসেটকে ক্যাসেট প্লেয়ারে বসিয়ে ‘প্লে’ করলে ফিতাটি ঘুরা শুরু করতো এবং প্লেয়ারের ‘হেড’ এর নিচ দিয়ে যাবার সময় ফিতায় ম্যাগনেটিকালি সংরক্ষিত সেই গান বা মিউজিক শব্দ আকারে বের হয়ে আসতো। কম্প্যাক্ট ক্যাসেটগুলোত মূলত ৬০ বা ৯০ মিনিটের হত অর্থাৎ একেক সাইডে ৩০ বা ৪৫ মিনিট ধরে গান শোনা বা রেকর্ড করা যেত। ৬০ মিনিটের একটি ক্যাসেটে গানের দৈর্ঘ্য অনুযায়ী ১২-১৬ টা গান আর ৯০ মিনিটের ক্যাসেটে ১৮-২২ টা গান আঁটতো। অনেক সময় ক্যাসেটের শেষে কিছু জায়গা খালি থাকলে দেশি বা বিদেশি কোন ইনষ্ট্রুমেন্টাল ফিলার হিসেবে দেয়া হত। প্লাস্টিকের এই আয়তাকার ক্যাসেটগুলো আবার বইয়ের মত সাইড দিয়ে খোলা যায় এমন আরেকটি শক্ত প্লাস্টিকের বক্সে সুরক্ষিত থাকতো।

২. কম্প্যাক্ট ক্যাসেটের বাণিজ্যিক রূপ: 

গান শোনা বা রেকর্ডিং মাধ্যম হিসেবে কম্প্যাক্ট ক্যাসেট মূলত দুইভাবে পাওয়া যেত: প্রি-রেকর্ডেড গানের ক্যাসেট: কোন রেকর্ডিং কোম্পানি বাণিজ্যিকভাবে নরমাল বা সস্তা কোন ক্যাসেটে নিজেদের পছন্দমত বা মার্কেটের চাহিদা অনুযায়ী কোন নির্দিষ্ট শিল্পীর একক/মিক্সড গান বা সিনেমার গান রেকর্ড করে দোকানে দোকানে খুচরা বিক্রির ব্যবস্থা করতো। এই প্রি-রেকর্ডেড ক্যাসেটগুলো মূলত ৬০ মিনিটের হত এবং ক্যাসেটের বক্সের ভেতরে মোটা কাগজের কভারে শিল্পীর নাম, ছবি, ও দুইসাইডের গানের লিস্ট দেয়া থাকতো। আমাদের সময় মোটামুটি পাড়া বা মহল্লার খুচরা ক্যাসেটের দোকানে ২৫-৩৫ টাকায় দেশি প্রোডাকশনের বাংলা, হিন্দি, উর্দু বা ইংরেজি গানের প্রি-রেকর্ডেড ক্যাসেট পাওয়া যেত। পুরান ঢাকার পাটুয়াটুলি বা ঢাকা স্টেডিয়াম মার্কেটে পাইকারি এবং খুচরা দুইভাবেই এই ক্যাসেটগুলো বিক্রি হত। ঢাকা নিউমার্কেটে দেশয় ক্যাসেটের পাশাপাশি বিদেশি প্রি-রেকর্ডেড ক্যাসেটও খুচরায় পাওয়া যেত। এই বিদেশী প্রি-রেকর্ডেড ক্যাসেটগুলো প্রস্তুতকারী দেশ বা ফিতার কোয়ালিটি অনুযায়ী মোটামুটি ৪০-৬০ টাকার মধ্যে পাওয়া যেত। নিজ হতে রেকর্ডিং করার কোন ঝামেলা না থাকায় এবং খরচও কম পড়তো বলে সাধারণ শ্রোতারা দোকান হতে এই প্রি-রেকর্ডেড ক্যাসেট কিনেই তাদের গান শোনার চাহিদা পূরণ করতো।যাই হোক, এই প্রি-রেকর্ডেড ক্যাসেটগুলোর টেপ বা ফিতা এবং সাউন্ড কোয়ালিটি অতটা ভালো ছিলোনা, স্থায়িত্বও ছিল কম। তাছাড়া প্রি-রেকর্ডেড ক্যাসেটের সব গানও সবসময় ভালো হতোনা! আমি নিজেও একেবারে শুরুর দিকে বাংলাদেশী ও ভারতীয় বিভিন্ন শিল্পী, ব্যান্ড, ইংরেজি পপ বা বিলবোর্ড হিট মিক্সড গানের কিছু প্রি-রেকর্ডেড ক্যাসেট কিনে শুনতাম। কিন্তু ভালো করে গান শোনা শুরু করার পর দেশি ‘সারগাম’ কোম্পানির কিছু বাংলা ব্যান্ড বা শিল্পীর, HMV’র নির্দিষ্ট কিছু ভারতীয় শিল্পীর ক্যাসেট, থাইল্যান্ডের কিছু প্লাস্টিক প্যাক ইংরেজি গানের ক্যাসেট বা দেশি প্যাসিফিক কোম্পানির কিছু মিক্সড ইংরেজি গানের ক্যাসেটের বাইরে দোকান হতে প্রি-রেকর্ডেড ক্যাসেট খুব একটা কেনা হতনা। অবশ্য বিদেশ থেকে আনা কোন প্রি-রেকর্ডেড ক্যাসেট উপহার পেলে নিজের গান শোনার পরিধি বা ক্যাসেটের সংগ্রহ বৃদ্ধির জন্য তা গ্রহণ করতেও কার্পণ্য করতাম না।

রেকর্ডেবল ব্ল্যাংক ক্যাসেট: কম্প্যাক্ট ক্যাসেটের এধরনের ব্যবহারে শ্রোতা নিজেই নিজের পছন্দমত কোন শিল্পীর গান সিলেক্ট করে ভালো কোন রেকর্ডিং সেন্টারে বাজার হতে কেনা পছন্দের কোন ব্ল্যাংক ক্যাসেটে রেকর্ড করে গান শোনার শখ পূরণ করতো। গান বাছাই করার স্বাধীনতা, ক্যাসেটের কোয়ালিটি এবং রেকর্ডিং এর মান ভালো হবার সুযোগ থাকায় অতি সংগীতপ্রিয় মানুষ সাধারণত ভালো কোয়ালিটির কোন ব্ল্যাংক ক্যাসেটে নিজের পছন্দমত গান রেকর্ড করে শুনতে পছন্দ করতো।স্বাভাবিকভাবেই, নিজের পছন্দে রেকর্ড করা ক্যাসেটের গান শোনার অভিজ্ঞতা প্রি-রেকর্ডেড রেডিমেড ক্যাসেটের তুলনায় অনেক বেশি রোমাঞ্চকর ও আকর্ষণীয় ছিল। ক্যাসেটের টাইপ, রেকর্ডিং এর মান বা ক্যাসেট প্লেয়ারের কোয়ালিটি অনুযায়ী মিউজিক আউটপুটের সামান্য হেরফেরও সহজে বোঝা যেত এবং ক্যাসেটের স্থায়িত্বও বেশি হত।

৩. কম্প্যাক্ট ক্যাসেটের টাইপ বা ধরন: আমাদের সময় ক্যাসেটের ফিতার ম্যাগনেটিক উপাদানের উপর ভিত্তি করে মোটামুটি চার ধরনের বা কোয়ালিটির ব্ল্যাংক ক্যাসেট পাওয়া যেত যা সম্পর্কে সাধারণ সংগীত শ্রোতাদের খুব একটা ধারনা ছিলনা:

টাইপ-0 ক্যাসেট- একেবারে প্রাথমিক যুগের টাইপ-0 ক্যাসেটের ফিতায় সাধারণ ফেরিক অক্সাইড কণার (লোহার যৌগ, মরিচার উপাদান) প্রলেপ থাকতো আমাদের সময় এসে যার ব্যবহার একেবারে উঠে গিয়েছিলো।

টাইপ-1 (নরমাল বায়াস) ক্যাসেটে আরেকটু উন্নততর স্ট্যান্ডার্ড ফেরিক অক্সাইড কণা ব্যবহার করা হত। বাজারে রেকর্ডিং এর জন্য প্রাপ্ত বেশির ভাগ ব্ল্যাংক ক্যাসেটই ছিলো এই টাইপ-1 বা ‘নরমাল’ ক্যাসেট। দোকান থেকে কেনা প্রি-রেকর্ডেড নরমাল ক্যাসেটগুলোর ফিতা বা সাউন্ড কোয়ালিটি অতটা ভালো হতোনা বলে আমি মোটামুটি ব্ল্যাংক ক্যাসেট কিনে ভালো কোন রেকর্ডিং সেন্টারে নিজের পছন্দের গান রেকর্ড করাতাম। আমাদের সময়ে ঢাকায় তথা সারা দেশেই সবচেয়ে ভালো কোয়ালিটির যে নরমাল বা টাইপ-1 বিদেশি ব্ল্যাংক ক্যাসেট পাওয়া যেত তার মধ্যে জাপানি TDK-D90, D60, A-90, A-60, M-90, SONY-CHF90, CHF60, HF90, HF60, MAXELL UR90, UR60, UL90, LN90, FUJI DR90, DR60, UR90, UR60 ইত্যাদি ছিলো উল্লেখযোগ্য। সাধারণ ইংরেজি গান বা অতি পছন্দের বাংলা গান রেকর্ডিং এর জন্য আমি এই টাইপ-1 বা নরমাল ব্ল্যাংক ক্যাসেটগুলোই বেশি কিনতাম। ৬০ মিনিটের একটা ব্ল্যাংক ক্যাসেট ৪৫-৫৫ টাকায় আর ৯০ মিনিটের ক্যাসেট ৬০-৭০টাকার মধ্যে পাওয়া যেত। মাঝে মাঝে ৯০-১০০ টাকার মধ্যে TDK D বা SONY HF এর ১২০ মিনিটের ক্যাসেটও পাওয়া যেত। এই দীর্ঘ ক্যাসেটগুলোতে মোটামুটি ২৪-২৮ টি গান আঁটলেও ফিতা পাতলা থাকায় ছিঁড়ে যাবার সম্ভাবনা বেশি থাকতো। তাই এই ক্যাসেটগুলা আমি খুব একটা কিনতাম না। একটু পুরানো আমলের টাইপ-1 ক্যাসেটের প্লাস্টিক বডিতে সাধারণত ক্যাসেটের নাম বা লেবেল বিশিষ্ট ষ্টিকার লাগানো থাকলেও আমাদের সময় নতুন ক্যাসেটগুলোতে স্টিকার পেপারের লেবেল খুব একটা চোখে পড়তোনা। TDK D বা SONY HF ক্যাসেটগুলোর বডি আমরা মোটামুটি ট্রান্সপারেন্ট প্লাস্টিকেরই দেখেছি-বাইরে থেকে ক্যাসেটের ফিতা, রিল আর পুলিগুলা পরিষ্কার দেখা যেত। একটু দ্বিতীয় সারির বিদেশি টাইপ-1 বা নরমাল ব্ল্যাংক ক্যাসেটের মধ্যে SONY EF90, EF60, কোরিয়ান GOLD STAR HR60, BF60 এবং MEDIA-60 বেশ পপুলার ছিল এবং মোটামুটি ৩৫-৪৫ টাকার মধ্যে পাওয়া যেত। GOLD STAR HR60’র কালো ডিজাইন বা BF60’র হালকা সবুজ কালারফুল ডিজাইন এক সময় খুব ভালো লাগতো বলে গান শোনার শুরুর দিকে কিছু ইংরেজি গান ঐ ক্যাসেটগুলিতে রেকর্ড করিয়েছিলাম। কালেভদ্রে SONY EF ক্যাসেটেও দুই-একটা ইংলিশ অ্যালবাম রেকর্ড করানো হয়েছিল। শুরুতে কয়েকটা MEDIA-60 ক্যাসেটও কিনেছিলাম-মূলত ভারতীয় বাংলা বা রবীন্দ্র সংগীত রেকর্ড করানোর জন্য।এই টাইপ-1 নরমাল বিদেশি ক্যাসেটগুলো ঢাকা নিউমার্কেট, ইসলামপুরের পাটুয়াটুলি বা ঢাকা স্টেডিয়াম মার্কেট হতেই কিনতে হতো-আর কোথাও ওভাবে পাওয়া যেতনা। TDK, SONY, GOLD STAR বা MEDIA ক্যাসেটগুলো মোটামুটি উপরের সবগুলো মার্কেটেই পাওয়া যেত। তবে MAXELL বা FUJI ক্যাসেটগুলো নিউমার্কেট বা স্টেডিয়াম মার্কেট ছাড়া খুব একটা পাওয়া যেতনা। তখনকার দিনে শহরের ফুজি ফটোস্টুডিওগুলোতেও ফুজি ক্যাসেট পাওয়া যেত। নিউমার্কেট বা ঢাকা স্টেডিয়ামের কয়েকটা দোকানে মাঝে মাঝে আনকমন HITACHI, FUJI, SANYO, DENNON, PHILLIPS, MEMOREX, SKC, JVC বা BASF এর ৬০ বা ৯০ মিনিটের টাইপ-1 বা নরমাল ব্ল্যাংক ক্যাসেট দেখা যেত। এধরনের কোন ক্যাসেট নজরে আসলে সংগে সংগেই কিনে ফেলতাম, নিজের কালেকশন বাড়ানোর জন্য। আমার কালেকশনে সাধারণ ৬০ বা ৯০ মিনিটের ক্যাসেটের বাইরে ৪৬ মিনিটের SKC, ৭৪ মিনিটের MAXELL, ৮০ মিনিটের TDK SA সহ ১০০ ও ১২০ মিনিটের বেশ কয়েকটি খুবি রেয়ার ডিজাইনের ক্যাসেট ছিল। এই আনকমন কয়েকটি ক্যাসেটের মালিক হতে পেরে তখন বেশ গর্বও হত।আমাদের সময়ে (৮০’র দশকের শেষে) বিদেশি ব্ল্যাংক ক্যাসেটের বাইরে ১৫-২৫ টাকায় সানফ্লাওয়ার, স্যাফায়ার নামের কিছু সস্তা দেশি নরমাল ব্ল্যাংক ক্যাসেট পাওয়া যেত। ‘স্যাফায়ার’ ক্যাসেটটার কোয়ালিটি বিদেশি দ্বিতীয় সারির নরমাল ক্যাসেটের কাছাকাছি ছিল। আমি এরকম দুই-তিনটা স্যাফায়ার ক্যাসেটে পুরানো দিনের পছন্দের কিছু বাংলা সিনেমা ও ব্যান্ডের গান রেকর্ড করেছিলাম।

টাইপ-2 বা ক্রোম ক্যাসেটগুলোর ফিতাতে সাধারণত ফেরিক অক্সাইডের সাথে ক্রোমিয়াম অক্সাইড কণা মিশ্রিত থাকতো বলে এগুলো ‘ক্রোম’ ক্যাসেট নামেও পরিচিত ছিল। এই ক্যাসেটগুলোর ফিতা, রেকর্ডেড গানের সাউন্ড কোয়ালিটি এবং স্থায়িত্ব টাইপ-1 নরমাল ক্যাসেটের তুলনায় অনেক বেশি ভালো ছিল, ডিজাইনও ছিল বেশ আকর্ষণীয়। ডার্ক ব্ল্যাক বা গ্রে কালারের উন্নতমানের মজবুত প্লাস্টিক বডিতে গাঢ় খয়েরি রংয়ের উন্নতমানের ফিতার সাথে আকর্ষনীয় ডিজাইন ও প্যাকেজিং-এই ক্যাসেটগুলোর চেহারায় সত্যিই একটা ভারিক্কি ভাব এনে দিত। ক্যাসেটের দামও অনেক বেশি পড়তো বিধায় বাজারে পাওয়া কোন প্রি-রেকর্ডেড ক্যাসেটে এই টাইপ-2 বা ‘ক্রোম’ ফিতা ব্যবহার করা হতোনা আর সাধারন শ্রোতাদেরও এই ‘ক্রোম’ ক্যাসেট সম্পর্কে বিশেষ ধারনা ছিলনা। ঢাকা নিউমার্কেট বা স্টেডিয়ামের নির্দিষ্ট কয়েকটি দোকানেই কেবল এই ‘ক্রোম’ ক্যাসেটগুলো বিক্রি হতো-অতি উৎসাহি সংগীতপ্রেমিক বা প্রফেশনালদের জন্য, মুলত হাই কোয়ালিটি মিউজিক বা মাস্টার ক্যাসেট রেকর্ড করার জন্য। আমাদের সময়ে ঢাকায় যে টাইপ-2 বা ক্রোম ক্যাসেটগুলো পাওয়া যেত তার মধ্যে TDKSA60, SA90, SA-X100, MAXELL XLII60, XLII90, XLII-S90, SONY ESII90, WALKMAN100, UX90, FUJI DRII ছিল উল্লেখযোগ্য-একেকটি ক্যাসেটের দাম পড়তো প্রায় ১২০-১৬০ টাকার মত। আমার কলেজ ও ইউনিভার্সিটি জীবনের টিউশনি করে উপার্জিত আয়ের একটা বড় অংশই ব্যয় করেছি এজাতীয় দামি আর আনকমন ব্ল্যাংক ক্যাসেট কেনার খাতে-শুধু নিজের অতিপ্রিয় শখটি মেটাবার জন্য। আর আমার শখের এই ব্ল্যাংক ক্যাসেটগুলো ব্যবহৃত হত মুলত সিডি হতে স্পেশাল কোন ইংলিশ অ্যালবাম বা স্পেশাল আর্টিষ্টের বেষ্ট কালেকশন রেকর্ড করতে-কখনো শুধু নিজের জন্য, আবার কখনো বিশেষ কাউকে উপহার দেবার জন্যে! মুলত ভালো কোয়ালিটির রেকর্ডিং ও সাউন্ড শোনার জন্য আমার নিজের কালেকশনের পিংক ফ্লয়েড, লেড জেপলিন, ব্ল্যাক স্যাবাথ, ডিপ পার্পল, ইউরিয়া হিপ, ডায়ার স্ট্রেইটস, মার্ক নফলার, ব্রুস স্প্রিংস্টিন, ক্রিস রিয়া, সানটানা, বব মার্লি, ডোর্স, স্করপিওনস, আয়রন মেইডেন, জুডাস প্রিষ্ট, ডিও, রেইনবো, গানস এন রোজেস, ড্রিম থিয়েটার, মেটালিকা, মেগাডেথ, এসিডিসি, মাল্মস্টিন, প্যানটেরা, সেপালচুরা, নির্ভানা, ইয়ানি, কিটারো, এনিগমা, ভ্যানজেলিস, এনিয়া, সিক্রেট গার্ডেন, জাঁ মিশেল জারি বা রবার্ট মাইলসের বেশির ভাগ অ্যালবাম সহ নিজের অতি পছন্দের ‘বেষ্ট অফ’ হেভি মেটাল, হার্ড রক, সফ্ট মেটাল/রক, অল্টারনেটিভ বা সেন্টিমেন্টাল গান এই টাইপ-2 ‘ক্রোম’ বা টাইপ-4 ‘মেটাল’ ক্যাসেটে এলিফ্যান্ট রোডের সেই বিখ্যাত রেইনবো, সুরবিচিত্রা বা রিদমে রেকর্ড করিয়ে শুনতাম।

টাইপ-4 বা মেটাল ক্যাসেটের (টাইপ-3 বলে কোন ক্যাসেটের অস্তিত্ব ছিলনা-কেন ছিলনা এখনো জানিনা) ফিতায় মেটাল অক্সাইডের পরিবর্তে ম্যাগনেটিক মেটাল বা ধাতবকণা ব্যবহার করা হত। এই মেটাল ক্যাসেটের ফিতা বা রেকর্ডেড মিউজিকের সাউন্ড কোয়ালিটি এবং স্থায়ীত্ব টাইপ-2 ‘ক্রোম’ ক্যাসেটের চেয়েও ভালো হত। ‘ক্রোম’ ক্যাসেটের মত ‘মেটাল’ ক্যাসেটের ডিজাইন ও প্যাকেজিংও ছিল ভীষন আকর্ষণীয়, কিন্তু দাম পড়তো অনেক বেশি- সহজে খুঁজে পাওয়া যেতনা বা পেলেও অ্যাফোর্ড করা কঠিন ছিল। আমার কালেকশনে SONY METAL XR90, MAXELL MX90, TDK MA90’র মত কয়েকটি রেয়ার টাইপ-4 মেটাল ক্যাসেট ছিল যা মুলত কেনা হয়েছিল নিজের সংগ্রহ সমৃদ্ধ করার পাশাপাশি স্পেশাল কোন ইংলিশ ব্যান্ড বা আর্টিষ্ট এর গান বা অ্যালবাম রেকর্ড করার জন্য।

আমার সবসময়ই একটু আনকমন ও ভালো কোয়ালিটির ক্যাসেটের প্রতি ঝোঁক ছিল। মনের এই শখ পুরন করতে নিউমার্কেটের ভিতরে সোনালী ব্যাংকের কাছে কোনার একটা ক্যাসেটের দোকানে আর স্টেডিয়াম মার্কেটেরও কয়েকটি চেনা দোকানে সময়ে অসময়ে ঢুঁ মারতাম। আমার বন্ধুদের মধ্যে অনেকে গান শুনলেও ভারসেটাইল ইংরেজি গানের শ্রোতা আর আনকমন ক্যাসেটের কালেক্টর হিসেবে যে দুজনের ছবি মানস পটে ভেসে উঠে তারা হল আমার স্কুল ও কলেজের দুই ঘনিষ্ট বন্ধু- তানভির ও ফাহিম। দুইজনেই গান শুনতে অনেক পছন্দ করতো আর আমার মত ওরাওএধরনের আনকমন ব্ল্যাংক ক্যাসেট কালেক্ট করতো। তানভিরের ব্ল্যাংক ক্যাসেটের অন্যতম উৎস ছিল ওর শাহীন মামা যিনি আমেরিকা থেকে ওর কাছে প্রচুর টাইপ-2 আর টাইপ-4 ক্যাসেট পাঠাতেন-রীতিমত ঈর্ষা করার মত কালেকশন ছিল ওর কাছে! তবে মাঝেমধ্যে আমি ওর মামার পাঠানো ক্যাসেটেও ভাগ বসাতাম। ফাহিমের ইংরেজি গান বা ইন্সট্রুমেন্টাল শোনার রেন্জ ছিল বেশ বড় আর আনকমন ক্যাসেটের কালেকশনও ছিল বিশাল। আমরা সবাইই এলিফ্যান্ট রোডের সেই বিখ্যাত রেকর্ডিং স্টুডিও- রেইনবো, সুর বিচিত্রা বা রিদম থেকে ইংরেজি বা বিদেশি শিল্পির গান রেকর্ড করাতাম। গান রেকর্ড করা বা রেকর্ডেড ক্যাসেট শেয়ার করা নিয়ে আমাদের অনেক মজার স্মৃতি আছে-সে গল্প না হয় আরেকদিন।

যাই হোক অডিও ক্যাসেট এর দোকান হতে একটি ব্ল্যাংক ক্যাসেট কিনে নিজের পছন্দের গান সিলেক্ট করে রেকর্ডিং সেন্টারে রেকর্ডিং করতে দিয়ে সেই রেকর্ডেড ক্যাসেট হাতে পেতে কয়েকদিন হতে কয়েক সপ্তাহ, এমনকক কয়েক মাস পর্যন্ত লেগে যেত! দীর্ঘ সময় নিয়ে এতগুলো স্টেপ মেনে চলে গান শোনার আগ্রহ বা ধৈর্য সাধারন সংগীতপ্রেমিকদের খুব একটা থাকতোনা। কিন্তু আমার কাছে এই আনকমন ক্যাসেট কিনে পছন্দের ইংরেজি গান বা ইন্সট্রুমেন্টাল সিলেকশন করে রেইনবো বা সুরবিচিত্রায় গান রেকর্ডিং শেষে ক্যাসেট হাতে পাবার পুরো প্রক্রিয়াটিই ছিল পরম উ্ৎসাহ, আনন্দ ও ভালোবাসার বিষয়-আমার একান্ত আগ্রহ ও পছন্দের জায়গা। স্মৃতির দরজায় এই অসম্ভব সুন্দর মুহুর্তগুলো নিরবে কড়া নেড়ে যায়-মাঝেমাঝেই। বড় নষ্টালজিক হয়ে পড়ি তখন!

৪. ক্যাসেট প্লেয়ার/ডেক:
এখন আসি ক্যাসেট প্লেয়ারের কথায়। আগেই বলেছি , প্রথম ক্যাসেট প্লেয়ার বাজারে আসে যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৬৪ সালে-মুলত বাসায় অডিও/ডিকটেশন রেকর্ডিং বা সাংবাদিকদের ব্যবহারের জন্য। এরপর সত্তর-আশি-নব্বই দশক জুড়ে গান শোনা এবং রেকর্ডিং জন্য কার ডেক সহ সনি, ন্যাশনাল, ফিলিপ্স, আকাই, আরসিএ, তোশিবা, শার্প কেম্পানির নানা ধরনের ক্যাসেট প্লেয়ার বা ডেক বাজারে আসে। সনি কোম্পানি ১৯৭৯ সালে প্রথম কম্প্যাক্ট সাইজের পোর্টেবল ক্যাসেট প্লেয়ার ‘সনি ওয়াকম্যান’ বাজারে ছাড়ে-ক্যাসেট প্লেয়ারের এই টাইপটা সনির ব্রান্ড নেইম ‘ওয়াকম্যান’ নামেই পরিচিতি লাভ করে এবং ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়।

৮০’র দশকে বাংলাদেশের বেশিরভাগ মধ্যবিত্ত পরিবারের প্রথম ক্যাসেট প্লেয়ার হিসেবে ‘ন্যাশনাল’ কোম্পানির এক স্পিকারওয়ালা একটা ক্যাসেট প্লেয়ার দেখা যেতো। দাম পড়তো মনে হয় ১০০০-১৫০০ টাকার মত। এই সেটগুলোতে ‘মনো’সাউন্ড পাওয়া যেত কিন্তু ‘স্টেরিও’ সাউন্ড পাওয়া যেতনা। ১৯৮৪ সালের দিকে আমি যখন ক্লাস টুতে পড়ি আব্বা আমাদের মাইজদির বাসার জন্য প্রথম এরকমই একটা এক স্পিকারওয়ালা ন্যাশনাল প্যানাসনিক টুইন-ওয়ান (রেডিও+ ক্যাসেট প্লেয়ার) কিনে আনেন যা আমার কলেজ জীবনের শেষ পর্যন্ত পর্যন্ত বেশ ভালোভাবেই ফাংশনাল ছিল। এই ন্যাশনাল প্যানাসনিকেরই দুই স্পিকারওয়ালা আরেকটা ক্যাসেট প্লেয়ার সাধারন মধ্যবিত্তের বাসায় দেখা যেত-যার দাম পড়তো ২০০০-২৫০০ টাকার মত। আমার কাবা খালার বিয়ের পর খালুও এরকম একটা ক্যাসেট প্লেয়ার কিনে আনেন যাতে ছোটবেলায় বাংলা, হিন্দি, ইংরেজি অনেক গানই শোনা হয়েছিল। ন্যাশনালের এ টেপ-রেকর্ডার গুলোতে ইন্টিগ্রেটেড স্পিকার থাকলেও ইকুয়ালাইজার থাকতোনা। আর বেস বা ট্রেবল, বিশেষ করে বেস সাউন্ড বুঝাই যেতনা। তবুও সাধারন শ্রোতার গান শোনার চাহিদা মেটানোর জন্য এই প্লেয়ারগুলো মোটামুটি যথেষ্টই ছিল। ন্যাশনাল প্যানাসনিক ছাড়াও সনি, ফিলিপ্স বা শার্প এর নরমাল কিছু ক্যাসেট প্লেয়ার ২৫০০-৩৫০০ টাকার মধ্যে পাওয়া যেতো। ৮০’র দশকের শেষ নাগাদ একটু চ্যাপ্টা বা রেডিওর মত ডিজাইনের ছোটবড় অসংখ্য পোর্টেবল টেপ রেকর্ডার বাজারে আসে। মোটামুটি ১০০০-২০০০ টাকার মধ্যে কাজ চালানোর মত এধরনের একটা ক্যাসেট প্লেয়ার পাওয়া যেত বলে সাধারন মানুষের মাঝে আরো ব্যাপকভাবে ক্যাসেটপ্লেয়ার ব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি হয়।আর মোটামুটি ৪০০০-৫০০০ টাকা খরচ করতে পারলে ন্যাশনাল,সনি বা ফিলিপ্স এর ইকুয়ালাইজার সমৃদ্ধ ভালো ক্যাসেট প্লেয়ারও কিনতে পারা যেত। সাহানা আপার বিয়ের সময় র্যাংগসের সনির একটা দুই স্পিকার ও ইকুয়ালাইজার বিশিষ্ট ক্যাসেট উপহার পেয়েছিলেন। সাউন্ড আউটপুট ভালো ছিল বলে ঐ ক্যাসেটপ্লেয়ারেও অনেকদিন গান শোনা হয়। ক্যাসেটপ্লেয়ারের কোন কোন মডেলে আবার একই সাথে দুইটা ক্যাসেট চালানোর ব্যবস্থা থাকতো বলে এক ক্যাসেট হতে আরেকটি ক্যাসেটে সরাসরি রেকর্ডিং করারও সুযোগ থাকতো। আমার বন্ধু ফরহাদের ন্যাশনাল কোম্পানির এরকম একটা টেপ রেকর্ডার/প্লেয়ার ছিল যাতে কলেজ জীবনে আমি আমার রেইনবো হতে রেকর্ড করা ক্যাসেট হতে ফরহাদ, সাজেদ আর রমিমের জন্য বেশ কয়েকটা সিলেক্টেড গানের ক্যাসেট রেকর্ড করে দেই। আমাদের পুরান ঢাকার বাসার কাছেই ফরহাদের বাসা ছিল বলে কলেজ জীবনে ওর বাসায়ও অনেক গান শোনা হয়। সাধারন ‘ন্যাশনাল প্যানাসনিক’ বা অন্যান্য ব্র্যান্ডের মোটামুটি কম দামের ক্যাসেটপ্লেয়ারগুলো দেশের জেলাশহর বা উপজেলা সদরেই কিনতে পারা যেত। ঢাকার স্টেডিয়াম মার্কেট, নবাবপুর, পাটুয়াটুলি, নিউমার্কেট বা গুলশান মার্কেটে এধরনের ক্যাসেট প্লেয়ারের বেশ কয়েকটি বড় দোকান ছিল।

মোটামুটি সামর্থ্যবান সংগীতপ্রেমিকদের বাসায় সনি, আকাই, তোশিবা বা শার্প কোম্পানির উফার/সাব-উফার সমৃদ্ধ ক্যাসেট প্লেয়ার/ডেকসেট দেখা যেত যা মোটামুটি ৮০০০-১০০০০ টাকার মধ্যে পাওয়া যেত। এই ডেকসেটগুলোর সাউন্ড কোয়ালিটি ছিল অসাধারন-ট্রেবল এবং বেইজ সাউন্ড বেশ পরিষ্কার শোনা যেত আবার কন্ট্রোলও করা যেত। আমার স্কুল বন্ধু তানভিরের আজিমপুরের বাসায় সনির এরকম একটা ডেকসেট ছিল যার উডেন স্পিকারে সাউন্ড আউটপুট ছিল সত্যিই চমৎকার।এছাড়া সামর্থ্যবান কিছু সংগীতপ্রেমীর বাসায় দামি পাওয়ারফুল কেনউড বা পাইয়োনিয়ার এর মাল্টিপল ডেকসেট দেখা যেত যেগুলোর দাম সেই ৮০-৯০ এর দশকেই ৪০-৬০ হাজার টাকার মত পড়তো। সাউন্ড কোয়ালিটি বিশেষ করে বেজ সাউন্ড, লেভেল, উফার/স্পিকার আউটপুট, ডিজাইন বা আউটলুক সব মিলিয়ে এই মাল্টিপল ডেকসেটগুলো ছিল সত্যিকার মিউজিক লাভারদের ড্রিম মিউজিক বা সাউন্ড সিষ্টেম। এই উন্নত মানের সনি, আকাই, তোশিবা, কেনউড বা পাইওনিয়ারের মাল্টিপল ডেকসেটগুলো কেবল ঢাকার স্টেডিয়াম বা গুলশান মার্কেটে পাওয়া যেত। এছাড়া কয়েকটি জায়গায় র্যাংগস এর বড় শোরুম ছিল যেখানে সনির বিভিন্ন মডেলের ক্যাসেট প্লেয়ার বা ডেকসেট পাওয়া যেত।

‘৮৫ তে পুরান ঢাকায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করার করার পর একটা জিনিস লক্ষ্য করেছিলাম যে ইয়ং ছেলেপেলেরা যে কোন ছুটির দিন-শুক্রবার, ঈদ, পূজা বা অন্যান্য উৎসবের দিনে মহল্লার মোড়ের দোকানে বা নিজ বাসার সামনের রাস্তার উপর অথবা বিল্ডিং এর ছাদে বড় বড় ডেকসেট চালিয়ে জোরে জোরে হিন্দি সিনেমার বা বাংলা ব্যান্ডের গান শুনতো। পরে আবিষ্কার করি, স্থানীয় কোন ইলেকট্রিকাল দোকানে, নবাবপুর বা পাটুয়াটুলিতে বিভিন্ন পার্টস আলাদা আলাদাভাবে জোড়া লাগিয়ে বা কাষ্টোমাইজ করে ক্রেতার চাহিদা অনুযায়ি এই ডেকসেটগুলো বানানো হতো এবং মোটামুটি একটা রিজনেবল প্রাইসের (৫-৭ হাজার টাকার মত) মধ্যেই কিনতে পারা যেত। এধরনের কাস্টোমাইজ্ড ডেকসেটের স্থায়ীত্ব খুব ভালো না হলেও সাউন্ড কোয়ালিটি ছিল চমৎকার।

গান শোনার জন্য আরেকধরনের প্লেয়ারের কথা না বললেই নয়! ৯০ দশকের শুরুতে ঢাকার বাজারে ‘পোর্টেবল ওয়াকম্যান’ আসলে সাধারন ক্যাসেট প্লেয়ারের চেয়ে আরো গভীরভাবে গান শোনার সুযোগ তৈরি হয়। সম্ভবত আমার মেট্রিক পরীক্ষার পরে আমেরিকা থেকে আমার মামা সনির ‘সনি ওয়াকম্যান’ নামে একটা ওয়াকম্যান পাঠিয়েছিল। এরপরেও মামার কাছ থেকে সনি বা RCA কোম্পানির আরো কয়েকটা ওয়াকম্যান উপহার পেয়েছিলাম। মামার পাঠানো ওয়াকম্যানগুলোর কয়েকটি ছিল শুধুমাত্র AA ব্যাটারি চালিত আবার কয়েকটা বাসার ইলেকট্রিসিটিতেও চলতো। ওযাকম্যানগুলোর সাউন্ড আউটপুট খুবি ভালো হওয়ায় আমি বাসায় বা বাইরে যেখানেই সুযোগ পেতাম কানে হেডফোন লাগিয়ে এই ওয়াকম্যানে ছাড়া রেইনবো বা সুর বিচিত্রায় থেকে রেকর্ড করা ইংরেজি গান বা অ্যালবামগুলা শুনতাম। একান্ত নিজের মত করে গানকে উপভোগ করার জন্য আমি আসলে ওয়াকম্যানে গান শুনতেই বেশি পছন্দ করতাম। আবার ওয়াকম্যানের সাইজ একটা ক্যাসেটের সাইজের কাছাকাছি ছিল বলে পকেটে নিয়েও ঘুরতে পারতাম। ফলে ঘরে-বাইরে সবজায়গায় মোটামুটি গান শোনার মধ্যেই থাকা হত। রিকশায় করে কোথায় যাবার সময় পথে বা ট্রিপে বাসে, ট্রেনে বা লন্চে করে কোন বড় ট্রিপে যাবার সময় আমার এক অত্যাবশ্যক সংগি হিসেবে সবসময় সাথে থাকতো- এই ওয়াকম্যান। দশ টাকায় একজোড়া দেশি 555 বা সানলাইট পেন্সিল ব্যাটারি ( AA) কিনে টানা ৩/৩.৫ ঘন্টার মত গান শুনতে পারতাম। বাসায় অনেক সময় বিদেশ হতে পাঠানো Duracell বা Energizer ব্যাটারি থাকতো। ঐগুলো ইউজ করলে টানা ৪-৫ ঘন্টা পর্যন্ত গান শোনা যেত। তবুও বারবার ব্যাটারি কিনার ঝামেলা এড়ানোর জন্য একটা সময় ‘মেমোরেক্স’ এর দুইজোড়া রিচার্জেবল ব্যাটারি আর ব্যাটারি চার্জারও কিনেছিলাম।প্রথমদিকে ভালো কোয়ালিটির একটা ওয়াকম্যান ১০০০-২০০০ টাকার মধ্যে পাওয়া যেত! তবে ৯০ দশকের মাঝামাঝি সময় হতে মার্কেটে আরো অনেক কোয়ালিটির ‘ওয়াকম্যান’ আসতে শুরু করে এবং মোটামুটি ৪০০-৫০০ টাকার মধ্যেই কাজ চালানোর মানের একটা ওয়াকম্যান কেনার সুযোগ হয়!

৯০ দশকের শুরুতে সিডি টেকনোলজি আসার পর সনি, তোশিবা বা আইওয়ার মত উন্নতমানের কোম্পানিগুলো সিডি-টেপ রেকর্ডার সম্বলিত ডুয়াল ডেক-সিষ্টেম বাজারে ছাড়ে- রিমোট কন্ট্রোল সুবিধাসহ। কলেজ লাইফের শুরুতে বন্ধু সুজন আর জাহাংগিরের বাসায় সিডি এবং ক্যাসেট চালানোর সক্ষমতাবিশিষ্ট SONY কোম্পানির দুটো নতুন ডেকসেট কেনা হয়। ইন্টারে পড়ার পুরাটা সময় এমনকি ইউনিভার্সিটিতে লাইফের শুরুতেও কত দিন আর রাত যে তানভির, ফাহিম, সুজন, জাহাংগির বা ফরহাদের বাসায় আড্ডা মেরেছি বা গান শুনেছি, তার ইয়ত্তা নেই। আমরা বন্ধুরা সবাইই মোটামুটি গান শুনতে পছ্ন্দ করতাম বলে যে কোন আড্ডা, পড়ালেখা আর কার্ড খেলার অন্যতম অনুসংগ ছিল এই গান শোনা-কখনো সিডি ছেড়ে পিংক ফ্লয়েড, ডায়ার স্ট্রেইটস, মেটালিকা বা ইগলসের কোন গান, আবার কখনো ক্যাসেট ছেড়ে কোন ইংরেজি বা বাংলা ব্যান্ডের গান বা ইন্সট্রুমেন্টাল ট্র্যাক শুনে। অন্যদিকে আমাদের বাসায় মিজান ভাইয়া আমার বিশ্ববিদ্যালয় দ্বিতীয় বর্ষে পড়াকালিন সময়ে SONY’র 5-CD চেন্জার বিশিষ্ট ক্যাসেট-সিডি ডুয়াল ডেক কিনে আনেন, তখনকার সময়ে যার দাম পড়েছিল প্রায় ২০ হাজার টাকার মত। নব্বই দশকের শেষদিকে গান শোনার মাধ্যম ক্যাসেট প্লেয়ার হতে বাসার ডেস্কটপ কম্পিউটার বা ছোট mp3 প্লেয়ারে শিফ্ট করলেও উন্নত মানের সাউন্ড কোয়ালিটি পাবার জন্য, বিশেষ করে এই ডেকের সাথে সংযুক্ত উফার সিষ্টেমের অসাধারন সাউন্ড আউটপুটের লোভে প্রায়ই কোন সিডি বা রেইনবো-রিদম – সুরবিচিত্রায় রেকর্ড করা ভালো ক্যাসেটগুলা আমাদের ঐ ডেকসেটে চালিয়ে মন ভরে গান শুনতাম।২০০৬ সালে উচ্চশিক্ষার্থে কানাডা চলে আসার আগ পর্যন্ত গান শোনার জন্য এই বন্দোবস্তটাই চালু রেখেছিলাম।

৫. ক্যাসেট-ক্যাসেটপ্লেয়ারের নানা দুর্গতি:
ক্যাসেট আর ক্যাসেট প্লেয়ারে গান শোনার কথা বলতে গিয়ে দুই একটা ছোটখাট দুর্গতির কথা না বললেই নয়: মোটামুটি সব ধরনের ক্যাসেট প্লেয়ারেই ‘ইজেক্ট’, ‘প্লে’, ‘রিউইন্ড’, ‘ফরওয়ার্ড’ আর ‘রেকর্ড’ বাটনের অপশন থাকতো। সাধারন ক্যাসেট প্লেয়ারে এক সাইডের ফিতা শেষ হয়ে গেলে ‘ইজেক্ট’ বাটন চেপে ক্যাসেটটা বের করে আবার উল্টা সাইড হতে গান শোনা শুরু করা হত। একটা ঝামেলা হতো যে ‘রিউয়িন্ড’ বা ‘ফরওয়ার্ড’ বাটন চেপে ফিতা টেনে আগে বা পিছিয়ে কোন গান শোনা গেলেও অনেক সময়ই নির্দিষ্ট জায়গায় পৌছানো সম্ভব হতনা। আমরা বাইরে থেকে দুইটা রিলে জড়ানো ফিতার তুলনামুলক পরিমান দেখে সম্ভাব্য গানের জায়গাটার একটা এস্টিমেট করতাম। কয়েকবার এরকম করতে করতে একটা ধারনা হয়ে যেত কোথায় পছন্দের গানটা পাওয়া যাবে। কোন কোন সময় অনুমান মিলে গেলেও বেশীর ভাগ সময়ই কংক্ষিত জায়গাটা একটুর জন্য মিস করতাম- মেজাজটা তখন একটু খারাপ হয়ে যেত। তখন কী আর করা! অপছন্দের গানটার শেষ পার্ট কিছুটা ইচ্ছার বিরুদ্ধেই শুনে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতাম কখন আমার কাংক্ষিত গানটি শুরু হবে ক্যাসেটে!

আবার মাঝে মাঝে এমন হতো যে ক্যাসেটের সব ফিতা একদিকে আছে কিন্তু যে গান আমার শুনতে ইচছা করছে সেটি ক্যাসেটের ঠিক অন্য সাইডে, প্লেয়ারের ‘রিউইন্ড’ বা ‘ফরওয়ার্ড’ বাটনও ঠিকমত কাজ করছেনা। এই সময় কী আর করা! ক্যাসেটের একটা রিল বা চাকার মধ্যে একটা কলম বা পেনসিল ঢুকিয়ে হাতের আংগুল দিয়ে পেনসিলটাকে ঘুরিয়ে বা পেন্সিলটাকে খুব বেশি নড়াচড়া না করে ক্যাসেটটাকেই ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ফিতাটাকে কাংক্ষিত অবস্থানে নিয়ে আসতাম। পেনসিল ঢুকানো চাকার বা রিলে যদি ফিতা কম থাকতো তবে শুরুর দিকে ঐ রিলটায় ফিতা জড়াতে একটু সময় লাগতো, কিন্তু অর্ধেকের বেশি ফিতা জড়ানো হয়ে গেলে ঐ রিল ঘুরানোর কাজটা অনেক সহজ হয়ে যেতো-চাকা তাড়াতাড়ি ঘুরানোর সাথে সাথে এক ধরনের আত্মিক সুখও অনুভব করতাম। কলম বা পেন্সিল ঘুরিয়ে এভাবে ক্যাসেটের রিলে ফিতা জড়ানোর কাজ কতবার যে করেছি জীবনে তার কোন ইয়ত্তা নেই! তবে বলা ভালো যে দামি ক্যাসেট প্লেয়ার বা ডেক সেটে এখনকার যুগের মত একটা গান স্কিপ করে শোনার ব্যবস্থাও থাকতো।তখন কাজটা অনেক সহজ হয়ে যেত!

রেকর্ড করার জন্য প্রায় সব ধরনের টেপ রেকর্ডারেই বা ক্যাসেট প্লেয়ারেই লাল রংয়ের বা বিশেষভাবে মার্ক করা একটা ‘রেকর্ডিং ‘বাটন থাকতো যা প্লেয়ারের ফাংশনাল বাটনগুলোর মধ্যে সবচাইতে শেষে থাকতো। তবে অনেক সময় ‘প্লে’ বাটনের ঠিক পাশেই বা ‘প্লে’ বাটনের মধ্যেই আলাদা করে ছোট লাল একটা ‘রেকর্ডিং’ বাটন থাকতো। কোন গান বা শব্দ রেকর্ড করতে হলে ‘প্লে’আর ‘রেকর্ডিং’ বাটন একসাথে চাপ দিলেই রেকর্ডিং শুরু হয়ে যেত। ক্যাসেট প্লেয়ারের নরমাল ‘হেড’ এর পাশেই আরেকটা ‘ইরেজ’ হেড থাকতো-রেকর্ডিং এর জন্য ‘রেকর্ডিং’ বাটনে চাপ দিলে যা ডিজাইন অনুযায়ি উপরে উঠে বা নিচে নেমে ক্যাসেটের ফিতাকে টাচ করতো। এই ‘ইরেজ’ হেড’ রেকর্ডিং এর সময় ঐ ফিতায় আগে কোন কিছু রেকর্ড থাকলে সেটাকে মুছে ফেলতো। অনেক সময় এক্সিডেন্টালি ‘রেকর্ডিং’ বাটনে চাপ পড়া হতে রক্ষা পাবার জন্য ক্যাসেটের নিচের দিকে চারকোনা দুইটা আলগা প্লাষ্টিক ভেংগে ফেলা হত-তখন চাপ পড়লেও ‘রেকর্ড’ বাটনটা আর কাজ করতোনা ঐ ক্যাসেটটার জন্য। ঐ ক্যাসেটেই আবার রি-রেকর্ড করার দরকার পড়লে ঠেকার কাজ হিসেবে ঐ প্লাষ্টিক খুলে পড়া ছোট দুটো ছিদ্র বা ফাঁকা অংশ ছোট কাগজের টুকরা দিয়ে গুঁজে দিতাম।

বড় অঘটন ঘটতো ক্যাসেটের গান চলার সময় কোন কারণে কোন একটা রিল ঘুরা বন্ধ হয়ে গেলে! সেটা চাকা বা কোন পুলি জ্যাম হয়ে যাবার কারণে অথবা প্লেয়ারের কোন ত্রুটির কারণেই হোক না কেন! কিন্তু এই জ্যাম হয়ে যাওয়া চাকার পাশাপাশি ক্যাসেটের অন্য রিল বা চাকাটি যদি এসময় ঘুরতে থাকতো তবে হত আরেকটা বিপদ! ক্যাসেটের ভিতরেই ফিতায় প্যাঁচ লেগে যেতো অথবা ফিতা বের হয়ে ক্যাসেট প্লেয়ারের হেড সংলগ্ন রোলার এর সাথে লাগোয়া চিকন মেটালের একটা দন্ডের (ক্যাপস্টান) মধ্যে শক্তভাবে আটকে আরো বড় প্যাঁচ লেগে যেতো। নগদে ক্যাসেট প্লেয়ারটি বন্ধ না করতে পারলে এমন জট পাকিয়ে যেত যে কসরত করেও ফিতাটাকে আর টেনে বের করা সম্ভব হতনা।উপরন্তু টানাটানি করে বের করতে গিয়ে অনেক সময় ফিতাটাই ছিঁড়ে যেতো। এই ছিঁড়া ফিতা জোড়া লাগানো ছিল প্রচণ্ড সুক্ষ্ম একটা কাজ- পাতলা ট্রান্সপারেন্ট স্কচটেপ কেচি বা ব্লেইড দিয়ে ফিতার প্রস্থের সমান করে কেটে অতি সাবধানতার সাথে এর আঠালো অংশে ছেঁড়া ফিতার দুই প্রান্তকে বসিয়ে জোড়া লাগানো হতো। সেই সাথে নিশ্চিত করতে হত জোড়া দেয়া অংশে যাতে কোন গ্যাপ না থাকে বা স্কচটেপের আঠালো অংশ ফিতার বাইরে এসে না পড়ে। কপাল খারাপ হলে ফিতার প্যাঁচ খাওয়া জায়গার কিছুটা অংশ একেবারেই কেটে ফেলতে হতো আর ফিতার কাটা অংশের সাথে হারিয়ে যেত ঐ অংশের গান!

আবার অনেক সময় এক রিল হতে আরেক রিলে যাবার পথে কোন জায়গায় ফিতাটি উল্টে গিয়ে কোন একটা রিলে উল্টাভাবে প্যাঁচানো শুরু করতো। এই উল্টাপ্যাঁচ বা ক্যাসেটের ভিতরের অন্য কোন প্যাঁচ ঠিক করার জন্য ক্যাসেটটির স্ক্রুগুলো খুলে একদিকের প্লাষ্টিক বডি পুরাটা খুলে হাতে ধরে ফিতার উল্টানো সাইড বা অন্যান্য প্যাঁচ কে ঠিক করতে হত। পুরা কাজটিই ছিল ভীষন ডেলিকেট! স্ক্রু খুলে ক্যাসেটের একদিকের প্লাষ্টিক বডিটা খোলার সাথে সাথেই ক্যাসেটের ভিতরের ছোট ছোট আলগা রোলারগুলো তার অরিজিনাল জায়গা থেকে সরে যেত। এছাড়া চিকন রিলটা হাতে নিয়ে ফিতা ঠিক করতে গেলে অসাবধানতায় হাত হতে পড়ে গিয়ে পুরা ফিতাটাই চাকা হতে বের হয়ে এসে আরেকটা বাড়তি ঝামেলা তৈরি করতো। পুরা ফিতাটাকেই তখন সাবধানতার সাথে রিলে পেঁচিয়ে এবং লুজ রোলার গুলোর উপর দিয়ে সাবধানতার সাথে তার আগের জায়গায় বসিয়ে ক্যাসেটটাকে ঠিক করতে হত!

যাই হোক, উপরের এই দুর্গতি গুলো ঘটতো মুলত পুরানো ক্যাসেটে বা অপেক্ষাকৃত খারাপ কোয়ালিটিসম্পন্ন ক্যাসেটের ফিতা কিংবা ত্রুটিপূর্ণ ক্যাসেটপ্লেয়ার ব্যবহারের কারণে-যে ভোগান্তি আমাদের সময়ে কম-বেশি সবাইকেই পোহাতে হয়েছে! কিন্তু গান শোনার অপার্থিব আনন্দে এই ছোটখাট দুর্গতিগুলো কখনো মাথাব্যথা হয়ে দাঁড়ায়নি- আর আমার ক্ষেত্রেতো নয়ই! কালের পরিক্রমায় ক্যাসেট প্লেয়ারে গান শোনার চল এখন চলে গেছে! কিন্তু সোনালী দিনের এ মধুর স্মৃতিগুলো হৃদয়ের দরজায় কড়া নেড়ে যায় এখনো-প্রতিনিয়ত!

লেখক : ডঃ মোহম্মদ মাহবুব চৌধুরী কানাডার অটোয়াস্থ কার্লটন বিশ্ববিদ্যালয় হতে রসায়নে পিএইচডি সম্পন্ন করে বর্তমানে একটি মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানী-NXP Semiconductor Inc. এ External Quality Engineer হিসেবে কর্মরত আছেন। এর আগে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এর রসায়ন বিভাগ হতে বিএসসি (সম্মান) এবং এমএসসি সম্পন্ন করে প্রায় তিন বছর শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগে শিক্ষকতা করেন।