শন কনারি: দুধওয়ালা থেকে সেরা জেমস বন্ড

প্রখ্যাত স্কটল্যান্ডীয় অভিনেতা ও চলচ্চিত্র প্রযোজক স্যার থমাস শন কনারি আর নেই। ৯০ বছর বয়সে মারা গেলেন সর্বকালের সেরা এই জেমস বন্ড।

১৯৩০ সালের ২৫ আগস্ট স্কটল্যান্ডের এডিনবার্গে জন্মগ্রহণ করেন বন্ড নায়ক শন কনারি। তার বাবা ছিলেন একজন কারখানা শ্রমিক। পরে সে কাজ ছেড়ে তিনি লরি চালানো শুরু করেন। আর তার মা ছিলেন ধোপা। শন নিজেও তার কর্মজীবন শুরু করেন দুধওয়ালা হিসেবে। এডিনবার্গে তিনি ঘুরে ঘুরে দুধ বিক্রি করতেন। ১৯৪৬ সালে ১৬ বছর বয়সে ব্রিটেনের রয়েল নেভিতে যোগ দেন শন। কিন্তু ১৯ বছর বয়সে আলসারের কারণে তাকে নেভি থেকে চাকরিচ্যুত করা হয়। পরবর্তীতে বিভিন্ন সময়ে তিনি লরি চালক, শ্রমিক, এডিনবার্গ আর্ট কলেজের এক শিল্পীর মডেল ও কফিন বিক্রির কাজ করেছেন।

১৯৫১ সালে টাকার খোঁজে তিনি কিং’স থিয়েটারে যোগ দেন। এখানে তিনি ব্যাকস্টেজে অভিনেতাদের সাহায্য করতেন। এখানে কাজ করতে গিয়েই তিনি অভিনয়ের প্রতি আকৃষ্ট হন। শুরু হয় তার অভিনয় জীবন। ১৯৫৪ সালের দিকে ‘সাউথ প্যাসিফিক’ মিউজিক্যালে কাজের সুযোগ পান শন কনারি। এরপর ধীরে ধীরে থিয়েটারের প্রতি আগ্রহ বাড়ে শন কনারির। পাশাপাশি সুযোগ পান সিনেমায়। তবে সেটা এক্সট্রা আর্টিস্ট হিসেবে। ১৯৫৪ সালে ‘লাইলাক ইন দ্য স্প্রিং’-এ তিনি খুব ছোট একটি চরিত্রে অভিনয় করেন। শন কনারি উল্লেখযোগ্য চরিত্রে প্রথম অভিনয় করেন ১৯৫৭ সালে ‘নো রোড ব্যাক’ সিনেমায়। এতে তিনি একজন ছোট গ্যাংস্টারের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন। একই বছর তিনি কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয়েরও সুযোগ পান। সেটি ছিল বিবিসির টিভি সিরিজ ‘রিকুইম ফর অ্যা হেভিওয়েট’।

শন কনারি সবচেয়ে বেশি পরিচিত লাভ করেছেন ইয়ান ফ্লেমিংয়ের সৃষ্ট জেমস বন্ডের নাম ভূমিকায় বন্ড চলচ্চিত্রগুলোতে অভিনয়ের জন্য। ব্রিটিশ লেখক ইয়ান ফ্লেমিংয়ের সাড়া জাগানো গোয়েন্দা চরিত্র এই জেমস বন্ড। উপন্যাসে বন্ডকে দেখানো হয় রয়্যাল নেভির একজন কমান্ডার হিসেবে, পরে যাকে ব্রিটিশ সিক্রেট সার্ভিসের গোয়েন্দা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। জেমস বন্ডের কোড হচ্ছে ০০৭।

১৯৬১ সালে জেমস বন্ড সিরিজের প্রথম ছবির জন্য নির্বাচন করা হলো ‘ডক্টর নো’। আর বন্ড খুঁজে বের করার জন্য ‘ফাইন্ড জেমস বন্ড’ শিরোনামে একটি প্রতিযোগিতার আয়োজন করে বসলেন প্রযোজকেরা। সেই প্রতিযোগিতায় ২৮ বছর বয়সী পিটার অ্যান্থনি নামে এক মডেল জয়ী হলো। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেখা গেল, তাকে বন্ড চরিত্রের সঙ্গে ঠিক মানাচ্ছে না। সুতরাং, তাকেও বাদ দেয়া হলো। শেষমেশ প্রথম বন্ড হিসেবে শন কনারিকেই বেছে নেয়া হলো।

১৯৬২ সালের ১৬ই জানুয়ারি জামাইকায় শুরু হয়েছিল ‘ডক্টর নো’ ছবির শুটিং৷ তখন থেকেই ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা এমআইফাইভ’ এর সেরা এজেন্ট ‘জেমস বন্ড জিরো জিরো সেভেন’ অমর হয়ে রয়েছেন৷

১৯৬২ থেকে ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত শন কনারি মোট ৭টি বন্ড ছবিতে অভিনয় করেছেন। বন্ড চলচ্চিত্রের প্রথম পাঁচটি ছবির মূল চরিত্রে অভিনয় করেন। ছবিগুলো হলো- ড. নো (১৯৬২), ফ্রম রাশিয়া উইদ লাভ (১৯৬৩), গোল্ডফিঙ্গার (১৯৬৪), থাণ্ডারবল (১৯৬৫) এবং ইউ অনলি লাইভ টুয়াইস (১৯৬৭)। তারপর পুনরায় তিনি ডায়মন্ডস আর ফরএভার (১৯৭১) এবং নেভার সে নেভার এগেইন (১৯৮৩) ছবিতে বণ্ড হিসেবে পুনরায় অংশগ্রহণ করেন। বন্ড সিরিজের সাতটি চলচ্চিত্রই বাণিজ্যিকভাবে ব্যাপক সাফল্য লাভ করেছিল।

শন কনারির পর আরও অনেকেই জেমস বন্ড হয়েছেন, রজার মুর, জর্জ ল্যাজেনবি, টিমথি ডালটন, পিয়ার্স ব্রসন্যান ও হালে ড্যানিয়েল ক্রেইগ জেমস বন্ড’এর ভূমিকায় অভিনয় করেছেন৷ জেমস বন্ড সিরিজের নায়কদের মধ্যে সেরা কে? এই প্রশ্নের জবাবে ড্যানিয়েল ক্রেইগ এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘শন কনারিই সেরা বন্ড। জেমস বন্ড সিরিজের প্রথম ছবিতেই শন কনারি অভিনয় করেছিলেন বন্ড হিসেবে। আর তখন থেকেই তিনি অনবদ্য’ এবং তিনি নিজস্ব একটা ভাবমূর্তি তৈরি করতে পেরেছিলেন।’

জেমস বন্ড চরিত্র তাকে পরিচিতি এনে দিলেও এক সময় নিজের চরিত্রের উপর নিজেই বিরক্ত হয়ে পড়েন। জেমস বন্ড চরিত্রের বিরক্তি থেকে অন্য ধারার চলচ্চিত্রে মনোনিবেশ করেন শন কনারি। তার অভিনীত ‘দ্য ম্যান হু উড বি কিং’, ‘দ্য আনটাচেবল’, ‘দ্য রক’, ‘দ্য হান্ট ফর রেড অক্টোবর’, ‘দ্য নেম অব দ্য রোজ’, ‘মারনি’, ‘ফাইন্ডিং ফরেস্টার’, ‘দ্য লিগ অব এক্সট্রা অর্ডিনারি জেন্টেলম্যান’, ‘দ্য হিল’, ‘এনট্র্যাপমেন্ট’, ‘রবিন অ্যান্ড মারিয়ান’, ‘দ্য অফেন্স’, ‘দ্য উইন্ড অ্যান্ড দ্য লায়ন’, মেরিন, ইন্ডিয়ানা জোন্স অ্যান্ড দ্য লাস্ট ক্রুসেড, ড্রাগনহার্ট, ‘ফার্স্ট নাইট’ ও ‘দ্য রাশিয়া হাউস’ ইত্যাদি সিনেমা দারুণভাবে সফল হয়েছে।

ব্যক্তিগত জীবনে বহু নারীর সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়েছিলেন শন কনারি। ১৪ বছর বয়সে ভার্জিনিটি হারান শন কনারি। তিনি জানান, সে সময় একজন প্রাপ্ত বয়স্ক মহিলা তার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত হয়েছিলেন। ক্যারিয়ারের একেবারে শুরুর দিকে তিনি ক্যারল সোপেল নামের এক সুন্দরী নারীর সঙ্গে ডেট করেন। এরপর নির্মাতা জিল ক্র্যাগির মেয়ে জুলি হ্যামিল্টনের সঙ্গে সম্পর্কে জড়ান শন। তারপর শনের জীবনে আসেন জ্যাজ শিল্পী ম্যাক্সিন ড্যানিয়েলস। ১৯৬২ সালে কনারি বিয়ে করেন অভিনেত্রী ডায়ানে সিলেন্টোকে। তারা ১৯৭১ সাল থেকে তারা আলাদা থাকতে শুরু করেন এবং ১৯৭৩ সালে তারা বিচ্ছেদ করে ফেলেন। ১৯৭৫ সালে শন কনারি বিয়ে করেন মরোক্কান-ফ্রেন্স পেইন্টার মিশেলিন রকাব্রুনকে।

২০০৬ সালে অভিনয়কে বিদায় জানান শন কনারি। এরপর অবশ্য ২০১২ সালে তিনি আবারও ফিরে আসেন একজন ভয়েস অভিনেতা হিসেবে। সে বছর তিনি অ্যানিমেটেড সিনেমা ‘স্যার বিল্লি দ্য ভেট’-এ কণ্ঠ দেন।

অভিনয়ের স্বীকৃতিস্বরূপ বহু পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন শন কনারি। ১৯৮৮ সালে তিনি ‘দ্য আনটাচেবল’ সিনেমার জন্য শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব চরিত্রের অভিনেতা হিসেবে অস্কার লাভ করেন। এছাড়া তিনবার গোল্ডেন গ্লোব, দুইবার বাফটা-সহ অসংখ্য পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন।