পাকিস্তানি সাংবাদিক নকভীর অশ্রুসিক্ত বয়ানে ১৯৭১

লিখেছেন ফারজানা তাসনিম পিংকি

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও এর প্রেক্ষাপট, সামাজিক ও রাজনৈতিক ঘটনাবলী বিশ্লেষণ করলে তিনটি পক্ষের কথা জানা যায়। পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও ভারত। বাংলাদেশ নিয়ে লেখা হয়েছে, হচ্ছে, হবে। ভারতীয় নীতিনির্ধারকদের ব্যাপারে বিস্তারিত লিখেছেন শাহরিয়ার কবির। তাহলে পাকিস্তানি নীতিনির্ধারকেরা ’৭১ নিয়ে কী ভেবেছিলেন?

সে প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে ১৯৯৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ সপ্তাহে পাকিস্তানে যান ইতিহাসবিদ, সাহিত্যিক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন, ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেডের (ইউপিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহিউদ্দিন আহমেদ এবং গবেষক, লেখক ও সাংবাদিক আফসান চৌধুরী। ‘সেই সব পাকিস্তানী’ শীর্ষক বইটিতে সেই ভ্রমণ কাহিনীর উপজীব্য হিসেবে মানুষের সাক্ষাৎকার তুলে ধরেন মুনতাসীর মামুন। বইটিতে বাংলাদেশ অর্থাৎ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে গণহত্যার জন্য যাকে সবচেয়ে বেশি দায়ী করা হয় সেই জুলফিকার আলী ভুট্টোর কিছু ঘনিষ্ঠ সহচর, পূর্ব পাকিস্তানে গণহত্যায় সরাসরি জড়িত কতিপয় জেনারেল ও তাদের ঘনিষ্ঠ সহকর্মী প্রাক্তন সিভিল অফিসার, বুদ্ধিজীবী, গবেষক, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-ছাত্র, রাজনৈতিক কর্মী, মানবাধিকার কর্মী, সাংবাদিকদের সাক্ষাৎকার উপস্থাপন করা হয়েছে। তাদেরই একজন মোহাম্মদ বাকীর নকভী, এম বি নকভী নামেই যিনি বেশি পরিচিত।

Image: bdnews24.com

নকভী পাকিস্তানের প্রথম সারির সাংবাদিকদের একজন ছিলেন। ঢাকার মর্নিং নিউজে কাজ করেছেন। শহীদুল্লাহ কায়সার, জহুর আহমদ চৌধুরী প্রমুখের ছিলেন সহকর্মী ও বন্ধু। যে সময় তার সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়, তখন তিনি সাংবাদিকতার সাথে যুক্ত না হলেও কলামনিস্ট হিসেবে পাকিস্তানে বেশ খ্যাতিমান। ২০০৯ সালের নভেম্বরে তিনি মারা যান।

সাক্ষাৎকার যখন নেওয়া হয়, এম বি নকভী তখন সত্তর পেরিয়েছেন। শীর্ণকায় কিন্তু ঋজু। অতিথিদের সাদরে অভ্যর্থনা জানিয়ে বসালেন সাদামাটা বসার ঘরে। দেখেই বোঝা যায়, কোনো রকমে ধারকর্জ করে বাড়িটা করেছিলেন বটে, কিন্তু এখন ‘দিন আনি দিন খাইয়ের’ মতো অবস্থা। কুশল বিনিময়ের পর নানা কথার ফাঁকে জানা গেল, দেখে যেমন মনে হয়েছিল তার অবস্থা সত্যিকার অর্থেই তাই। পাকিস্তানি দৈনিক ‘ডন’-এ কলাম লিখতেন। এটিই তার তখনকার একমাত্র রোজগার। সংসারের ভার তাকেই বহন করতে হচ্ছিল। বোঝা যায়, সাংবাদিকতা করেছেন বটে কিন্তু পেশা ব্যবহার করে টাকা করেননি।

নকভী বলেন, আলোচনা শুরু করার আগে চা-টা হয়ে যাক। চা আসার আগ পর্যন্ত আগতদের প্রকল্পের বিষয়টি মন দিয়ে শুনলেন। মনে হলো, তিনি বেশ উৎসাহিত। চা এলো। সঙ্গে এক প্লেট সাধারণ বিস্কিট। চায়ে ডুবিয়ে বেশ তৃপ্তির সঙ্গে খেলেন অতিথিরা। নকভীর বাসায় এসে এক ধরনের স্বাচ্ছন্দ্য অনুভব করছিলেন তারা।

চা পর্ব শেষ হলে নকভী গুছিয়ে বসলেন। বললেন, ‘কীভাবে শুরু করব?’

আফসান বললেন, ‘আপনি যেভাবেই শুরু করেন, আমাদের কোনো আপত্তি নেই’।

Image: theindependentbd.com

মুনতাসীর মামুন বললেন, ‘আচ্ছা, পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানিদের মানসিক পার্থক্য ধরে এগুলে কেমন হয়?’

‘মন্দ নয়’, বললেন নকভী। তারপর ধীরভাবে স্পষ্ট উচ্চারণে কথা বলতে লাগলেন। পারতপক্ষে বাকিরা আর কথা বলেননি। কারণ, দরকার পড়েনি। নকভী জানালেন, ভারতবর্ষে মুসলমানদের বৈচিত্র্য থাকলেও (একেক অঞ্চলের মুসলমানদের জীবনচর্চা ছিল একেকরকম) তারা এক নেতৃত্বের নিচে সমবেত হয়েছিল এবং ভারত বিভাগে সম্মত হয়েছিল। কিন্তু তারপরও তারা একত্রে থাকতে পারেনি। থাকা যে যাবে না, সেটা গোড়া থেকেই অনুভব করা যাচ্ছিল।

‘গোড়ার কথাই ধরুন,’ বললেন নকভী। ‘পূর্ব পাকিস্তান জমিদারী প্রথা বিলোপ করল। পশ্চিম পাকিস্তানে হলো এর বিরূপ প্রতিক্রিয়া। কারণ পশ্চিম পাকিস্তানের সাংসদদের অধিকাংশ ছিলেন জমিদার। তাদের মনে হলো, বাঙালিরা তো ভয়ঙ্কর। তারা জমিদারদের মানে না। মানা তো দূরে থাকুক, তাদের সম্পত্তিও কেড়ে নেয়। তাদের ক্ষমতায় আসতে দেওয়া যাবে না। পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকেরা ছিলেন ক্ষুদ্র এক গোষ্ঠী যাদের অধিকাংশই ছিলেন ভূস্বামী। এরা দখল করেছিলেন মুসলিম লীগ এবং সরকার ও দলকে সমর্পণ করেছিলেন আমলাতন্ত্রের কাছে। আমলাতন্ত্রের সঙ্গে এদের ছিল সুন্দর সম্পর্ক। এখানকার ভূস্বামীদের পূর্বপুরুষরা ১৮৫৭ সালের পর ইংরেজ আমলা বা জেনারেলদের কাছ থেকে জমিদারিগুলো পেয়েছিলেন উপহার হিসেবে। সুতরাং আমলাদের তারা দেখেছেন মেন্টর আর গাইড হিসেবে।’

মহিউদ্দিন বললেন, ‘আমাদের ওখানে তো এমনটি হয়নি।’

‘না, তা হয়নি,’ বললেন নকভী। ‘পাকিস্তানের প্রথম ১১ বছর সমস্ত কিছু কুক্ষিগত ছিল এই কোটারির (গোষ্ঠী) হাতে। যত গণতন্ত্রের কথাই বলেন না কেন, ক্ষমতার নিয়ন্ত্রক ছিলেন এরা এবং যারা গণতন্ত্রে বিশ্বাস করতেন তারাও ম্যানিপুলেটেড হয়েছেন। এ কে ফজলুল হক, সোহরাওয়ার্দী ও নাজিমুদ্দিন সবার ক্ষেত্রেই তা প্রযোজ্য।’

একটু দম নিলেন নকভী, কী যেন চিন্তা করলেন। তারপর বললেন, ‘আইয়ুব খানের ক্ষমতা দখলের পর ষাটের দশকেই বোধহয় প্রথম বড় ধরনের পরিবর্তনটা আসে। বাঙালিরা নিশ্চিত হয়ে যায় তাদের আর কখনোই ক্ষমতায় আসতে দেওয়া হবে না। অন্যদিকে পশ্চিম পাকিস্তানিদের মনে হয়েছিল, এর মধ্য দিয়ে আরেক দফা শাসকগোষ্ঠীর বিবর্তন ঘটল। জেনারেল ভাবলেন, বেসামরিক আমলারা বহুদিন বন্দুক চালিয়েছে। কিন্তু আসল ক্ষমতা তো আমাদের হাতে। সুতরাং আমরাই ক্ষমতা ভোগ করব।’

‘তারপর?’

Image: dhakatribune.com

‘সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা দখল থেকে সংকটের শুরু। ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধ সেই সংকটকে আরও ঘনীভূত করল মাত্র। ১৯৬৫ সালের নভেম্বরে সংসদে নুরুল আমীনের মতো রাজনীতিকের বক্তৃতা শুনলেও তা অনুভব করা যায়। পূর্ব পাকিস্তান একেবারে অরক্ষিত ছিল এবং শাসকদের তা নিয়ে মাথা ব্যথা ছিল না।’

‘অথচ,’ বলে উঠেন মুনতাসীর মামুন, ‘পাকিস্তান রক্ষার জন্য আন্তরিকভাবেই বাঙালি সেনারা যুদ্ধ করেছে, বুদ্ধিজীবীরা প্রচার চালিয়েছে।’

‘অর্থনৈতিক চিন্তার ক্ষেত্রেও,’ বললেন নকভী, ‘একটি পরিবর্তন এসেছিল। ওই সময় তৃতীয় পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার কাজ শুরু হয়েছে। এবং তখনই বাঙালি অর্থনীতিবিদদের সঙ্গে এখানকার আমলাতন্ত্রের সংঘাত শুরু হয়েছে। ওই সময় আমি এ বিষয়ে কিছুটা খোঁজ-খবর নিয়েছি। পশ্চিম পাকিস্তানের আমলাতন্ত্রের কামার উল ইসলাম, মাহবুবুল হক প্রমুখ যারা তখন জুনিয়র, ঠিক করেছিলেন, পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পূর্ব পাকিস্তানে ১০০ কোটি টাকার সম্পদ স্থানান্তর করবেন। সিদ্ধান্তটি ছিল পরিকল্পনা কমিশনের কিন্তু তা কার্যকর হয়নি। বাঙালি অর্থনীতিবিদেরা সোচ্চার হয়ে উঠলেন, বললেন পাটের টাকা দিয়ে করাচী গড়া হয়েছে। পশ্চিম পাকিস্তান সব সময় পূর্ব পাকিস্তানকে শোষণ করছে এবং ১৯৪৭ সালের পর প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।’

‘কথাটি বোধহয় খুব অতিরঞ্জিতও নয়,’ বললেন মামুন।

‘অতিরঞ্জন নাকি ঠিক, সেটি ডিটেলের ব্যাপার, তার মধ্যে আমি যাব না,’ বললেন নকভী। ‘কিন্তু এরপরই পশ্চিম পাকিস্তানের কোটারির মধ্যে নতুন চিন্তা এলো যা তারা ফ্রিলি অ্যাডভোকেট করতে লাগল।’ নকভী জোর দিয়ে বললেন, ‘আমি অ্যাডভোকেটিং কথাটা ব্যবহার করছি। পশ্চিম পাকিস্তানের পরিকল্পনা কমিশন আর আমলাতন্ত্রের অন্য মাথারা অ্যাডভোকেটিং করছিলেন যে আমাদের এখন বাঙালিদের কাছ থেকে মুক্তি পাওয়া দরকার। কেন? কারণ এদের জনসংখ্যা বাড়ছে, সে জনসংখ্যা স্থানান্তরিত হবে এখানে। আমাদের যা উদ্বৃত্ত তা তারা শেষ করে ফেলবে। এরা আমাদের ভার স্বরূপ। এ বোঝা টানার দরকার কী? সময় বুঝে ফেলে দাও। সুতরাং ১৯৭১ স্বর্গ থেকে আসেনি।’

এ মনোভাবটা গোড়া থেকেই পশ্চিম পাকিস্তানের ছিল। নকভী জানালেন, ষাটের গোড়ার দিকে অস্ট্রেলিয়ান অর্থনীতিবিদদের একটি গ্রুপ এসেছিল পাকিস্তানের অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা যাচাই করতে। তাদের মতামত ছিল, কৃষিক্ষেত্রে পশ্চিম পাকিস্তানের সম্ভাবনা অপার। সুতরাং পশ্চিম পাকিস্তানে কৃষিতে বিনিয়োগ করা হোক আর পূর্ব পাকিস্তানে গড়ে তোলা হোক শিল্প। কিন্তু কী হলো শেষে? নকভী বললেন, ‘চৌধুরী মোহাম্মদ আলী তখন অর্থমন্ত্রী। তিনি আমার বন্ধু নাজিউল্লাহকে বলেছিলেন, পূর্ব বাংলায় কেন শিল্প গড়ব? ওরা তো চলেই যাবে। শিল্প আমরা পশ্চিম পাকিস্তানেই রাখব। এটি ১৯৫৫ সালের ঘটনা।’

‘আমরা শুনেছিলাম,’ মহিউদ্দিন বললেন, ‘পরবর্তী সময়ে কামার উল ইসলাম, এসএম আহমদরাও এই তত্ত্বে বিশ্বাসী হয়ে ওঠেন।’

‘আসলে সময়ের কারণে নাম মনে থাকে না,’ বললেন নকভী। ‘দুটি নাম আমার ভালোভাবে মনে আছে। একজন এসএম আহমদ, আরেকজন কামার উল ইসলাম। তবে তারাই যে বিশিষ্ট ছিলেন, তা নয়। আইয়ুব খানের ‘নবরত্ন’রা সবাই এই ষড়যন্ত্রে জড়িত ছিলেন। দেখুন আমলাতন্ত্র খুব সূক্ষ্মভাবে বোনা জিনিসের মতো কাজ করে।’

‘১৯৭১ এর কথা বলছিলেন জনাব নকভী,’ খেই ধরিয়ে দেয়ার জন্য বললেন আফসান।

Image: dhakatribune.com

‘১৯৭১ এর আগে আরেকটা ব্যাপার ঘটেছিল’, বললেন নকভী। ‘এখানে একটা ধারণা জন্মেছিল যে, বাঙালিরা হিন্দুঘেঁষা। তাদের ভাষা সংস্কৃতির কাছাকাছি। হিন্দুদের সঙ্গে তাদের মাখামাখি বেশি, সুতরাং তারা নিখুঁত মুসলমান নয়। আর যারা সাচ্চা মুসলমান নয় তাদের সমানভাবে দেখার কোনো প্রশ্নই আসে না। ইমেজটি কেমন, মানে আমি ভালোভাবে বোঝাতে পারছি না। এতে তাদের প্রতিপক্ষ বা বিরোধীদল বলে মনে হচ্ছিল। তাদেরকে ভার্চুয়াল শত্রু বলে মনে করা হচ্ছিল। আমি আসল না বলে ভার্চুয়াল বললাম।’

একটু দম নিয়ে বললেন, ‘চা চলবে আরেক কাপ?’

দ্বিতীয় দফা চা পানের পর টেপ রেকর্ডারের বোতাম টিপে মহিউদ্দিন বললেন, ‘শুরু করা যাক।’ সাক্ষাৎকারটি তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ মনে হচ্ছিল। কারণ নকভী খোলাখুলি সব বলছিলেন, গুছিয়ে।

মামুন বললেন, ‘আমরা সরাসরি ১৯৭১ এ চলে আসি। আপনারা কী জানতেন, কী হচ্ছে তখন পূর্ব পাকিস্তানে? অনেককে আমরা এ প্রশ্ন করেছি। সবাই বলেছেন, তারা কিছুই জানতেন না।’

‘এটি একটি মিথ,’ একটু রাগত স্বরে বললেন নকভী। ‘ঐ সময় ট্রানজিস্টর বিপ্লব সমাপ্ত হয়েছে। গ্রাম পর্যন্ত চলে গেছে ট্রানজিস্টর। আমাদের কী বিশ্বাস করতে হবে এ ভূখণ্ডে কেউ অল ইন্ডিয়া রেডিও, বিবিসি, রেডিও ইরান বা কাবুল শোনেনি? সব রেডিও থেকেই তো তখন ১৯৭১ এর ঘটনাবলী প্রচারিত হয়েছে। এ সব রাবিশ কথাবার্তা। সবারই কিছু না কিছু ধারণা ছিল। তাছাড়া পাঞ্জাবের অনেক পরিবার নিয়মিত মানি অর্ডার পাচ্ছিল। সে সময় একজন সিপাই কত পেত? ১০০, ২০০ বা ৩০০ টাকা। কিন্তু গ্রামে সে পাঠাচ্ছিল ৫০০ বা ৬০০ টাকা। এ বাড়তি টাকা কোত্থেকে আসছিল? তার তো ঘুষের বন্দোবস্ত ছিল না! পাকিস্তান সরকার সৃষ্টি করেছে এ মিথের।’

জেনারেল নিয়াজীর বইয়ের প্রসঙ্গ এলো তারপর। এ বই নিয়ে তখন বেশ বিতর্ক চলছে। বাংলাদেশের কাছে ক্ষমা চাওয়া হবে কী হবে না, সে নিয়েও পত্রপত্রিকায় লেখালেখি হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে তার বক্তব্য জানতে চাইলেন মহিউদ্দিন আহমেদ।

‘পাকিস্তানি বাহিনী ছিল,’ অকম্পিত স্বরে বললেন নকভী। ‘বিশৃঙ্খল, লুটেরা বাহিনী, এরা লুট করেছে, ধর্ষণ থেকে শুরু করে সব রকমের অপরাধ করেছে। এ সেনাবাহিনী কত বোধহীন ছিল তার প্রমাণ জেনারেল টিক্কা খানের মন্তব্য। ঢাকা থেকে ফেরার পর সাংবাদিকেরা যখন লুট, ধর্ষণ, হত্যা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন তখন তিনি বলেছিলেন, ধর্ষণের সংখ্যাটি অতিরঞ্জিত। মাত্র তিন হাজার, মাত্র তিন হাজার মহিলা ধর্ষিত হয়েছে।’ ক্রোধে নকভীর গলার স্বর কাঁপছিল। ‘এখন টিক্কা, ইয়াহিয়া, নিয়াজী, ভুট্টোর ওপর দোষ চাপানো হচ্ছে, আসলে দেশটির চরম অর্থনৈতিক উদ্দেশ্য সাধনের জন্য এ কাণ্ড ঘটানো হয়েছিল। সবাই এর সঙ্গে জড়িত। অর্থনৈতিক প্রেরণা মানবিক বিষয়ে কতটা সিদ্ধান্ত নিতে পারে, বিশ্বে তা নিয়ে যদি কখনো কোনো বিতর্ক হয়, তবে পাকিস্তানের ঘটনাটিকে দুর্দান্ত উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা যেতে পারে। সেখানে অর্থনীতির প্রতি আগ্রহই প্রতিটি বিষয় স্থির করে।’

সাক্ষাৎকারগ্রহীতারা বললেন, ‘আমাদের সঙ্গে আলোচনায় অনেকে বলেছিলেন, পাকিস্তান একটি ইসলামি দেশ, ইসলামকে রক্ষা করা পাকিস্তানের কর্তব্য। বাঙালিরা ইন্ডিয়া বা হিন্দুঘেঁষা- এ ধরনের একটা যৌক্তিক ভিত্তি অনেকে দাঁড় করাবার চেষ্টা করেন ১৯৭১ সম্পর্কে।’

‘৬-৭শ’ বছর ধরে আমরা হিন্দুদের পাশাপাশি বাস করেছি,’ জানালেন নকভী। ‘যখন মুসলমানরা ঠিক করল হিন্দুদের সঙ্গে থাকবে না, তারা ঘর ভাগাভাগি করে নিল। স্বাধীনতার পর যখন তাদের হাতে রাজনৈতিক ক্ষমতা তখন কীভাবে সেকেন্ড গ্রেড হিন্দু এজেন্টদের দ্বারা প্রভাবিত হবে? এগুলো বাকওয়াজ, শাসকদের প্রচার।’

‘১৯৭১ সালে কি আপনি বাংলাদেশে গিয়েছিলেন?’ জিজ্ঞেস করেন মুনতাসীর মামুন। ‘কোনো ঘটনা মনে পড়ে?’

Image: business-standard.com

‘হ্যাঁ, এখান থেকে সাংবাদিকদের নিয়ে যাওয়া হয়েছিল পরিস্থিতি যে স্বাভাবিক তা বোঝাবার জন্য। শুধু বলতে পারি, মানবতার সবচেয়ে নিকৃষ্ট উদাহরণ তৈরি করা হয়েছে বাঙালিদের প্রতি। একটি ঘটনার কথা বলি। আমাদের তথাকথিত একটি রিফ্যুজি ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল যেখানে রাখা হয়েছিল বিহারীদের। একজন পাঠান কর্নেল ছিলেন ক্যাম্পের কমান্ডার। বিহারীদের ওপর বাঙালিদের অত্যাচারের অনেক কথা শোনানো হলো। কমান্ডার বললেন, এ সব কথা শুনতে শুনতে যখন আমার রাগ লাগে, ক্লান্ত লাগে তখন গ্রামে গিয়ে কিছু মানুষ মেরে আসি।’

নকভীর গলার স্বর কাঁপতে লাগল আবেগে, ‘গ্রামে নিরীহ মানুষদের লাইন ধরিয়ে গুলি করে আসে। এ ধরনের প্রচুর কাহিনী আছে। এরা কী মানুষ, নাকি পশুরও অধম…’। তিনি কথা শেষ করতে পারলেন না। বাকিরাও চুপ করে রইলেন। খানিক পর আনমনা সুরে বলতে লাগলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের হত্যা করা হয়েছে। একটা বিবরণ আমি নিজের কাছে সংরক্ষণ করতে চাই। যে জঘন্য পদ্ধতিতে অসংখ্য ছাত্রকে মেরে ফেলেছে সেটা আমি লিখব, ব্যাখ্যা করব। সে সব স্মৃতি ভোলার নয়,’ কথা শেষ হলো না, তিনি কাঁদতে লাগলেন। বাকিরা বিমূঢ়। তাদের চোখও সজল। ‘শহীদুল্লাহ কায়সার, প্রফেসর জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা- এরা ছিলেন আমার বন্ধু। এদেরও তারা তুলে নিয়ে হত্যা করেছে…’ আবারও ফুঁপিয়ে উঠলেন নকভী।

টেপ রেকর্ডারটি বন্ধ করে দিলেন মুনতাসীর মামুন।