নবাব সেজে প্রতারণা

জন্ম সৌদি আরবের মক্কায়। বেড়ে ওঠেন নিউ ইয়র্কে। ব্যবসা করেন দুবাইতে। সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালের মালিকানার বড় অংশীদার তিনি। স্থায়ী বসতি নেদারল্যান্ডসের আমস্টারডাম শহরে। শুধু তাই নয়, নবাব স্যার সলিমুল্লাহ খানের নাতি সেজে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন আলী হাসান আসকারী নামধারী এক ব্যক্তি। যিনি নিজেকে ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের চেয়ারম্যানের ছেলে হিসেবেও দাবি করে থাকেন।

পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, আলী হাসান নামধারী এই ব্যক্তি ভয়ংকর প্রতারক। সবই তার ভুয়া পরিচয়। ইতিমধ্যে তার বিরুদ্ধে প্রতারণার একাধিক মামলা হয়েছে। গত বুধবার পাঁচ সহযোগীসহ গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে তিন দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইমের (সিটিটিসি) তদন্তকারী দল।

সিটিটিসির ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইমের অতিরিক্ত উপকমিশনার মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, আসকারী একজন বড় মাপের প্রতারক। নানা কৌশলে অসংখ্য মানুষের কাছ থেকে তিনি কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে তথ্য পেয়েছি। তিনি আরও বলেন, নবাবের নাতি হিসেবে আসকারী নিজেকে যে নামে পরিচয় দিতেন সেটি তার আসল নাম নয়। একেবারে ভুয়া। এছাড়া তার আরও একাধিক ভুয়া নাম পাওয়া গেছে। যদিও প্রতারক আলী হাসান আসকারীর প্রকৃত নাম-ঠিকানা জানা যায়নি। তবে তার স্ত্রীর চুয়াডাঙ্গার ঠিকানা ধরে তার আসল নাম-পরিচয় জানার চেষ্টা চলছে।

একাধিক ভুক্তভোগী দেশ রূপান্তরকে বলেন, আলী হাসান আসকারী নামধারী এ ব্যক্তির ব্যবহার এতই মধুর ছিল, যে মাপের প্রোফাইল ছিল, তাতে কখনই তাকে প্রতারক মনে হয়নি। যার কারণে তার হাতে কোটি কোটি টাকা তুলে দেওয়া হয়েছে।

ফেনীর ধুমসাদ্দা কওমি মাদ্রাসার সহকারী শিক্ষক আবদুল আহাদ সালমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মাদ্রাসাটি আমাদের পারিবারিক জমিতে গড়ে উঠেছে। করোনাকালে অসহায় মানুষজনকে খাদ্য সহায়তা করা হয়েছে মাদ্রাসার পক্ষ থেকে। সেই ছবির সূত্র ধরে নবাব আলী হাসান আসকারীর সঙ্গে ফেইসবুকে পরিচয় হয়। একপর্যায়ে বিভিন্ন কৌশলে তিনি আমার আস্থা ও বিশ্বাস অর্জন করেন। বলেন, আপনি তো করোনায় অনেক মানুষের খেদমত করতেছেন, এটা আমাকেও অনুপ্রাণিত করে। আমিও কিছু করি, বলে বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন পর্যায়ের রাজনৈতিক নেতা ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সঙ্গে ত্রাণ বিতরণের ছবি পাঠান। এরই একপর্যায়ে তিনি আমাকে বলেন, অল্প খরচে তিনি অনেক লোককে সিঙ্গাপুরে পাঠাতে পারবেন। নবাব পরিবারের সন্তান বলে তার পরিবারের দেশের বাইরে সুনাম ও ব্যবসা দুটোই রয়েছে। সিঙ্গাপুরে মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালের ডিরেক্টরদের একজন তার বাবা। হাসপাতালটির ওয়ার্ডবয় থেকে শুরু করে অন্যান্য কাজের জন্য প্রায় ৫০০ লোক লাগবে। প্রতিজনের কাছ থেকে আড়াই লাখ টাকা করে নেবেন। তবে ওই টাকা তাকে দিতে হবে না। যা পান সবই আপনার মাদ্রাসার কাজে ব্যবহার করবেন।’

আবদুল আহাদ সালমান বলেন, ‘এমন প্রস্তাবে আমি রাজি হই। পারিবারিকভাবে আমাদের পরিবার এলাকার মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য বিধায় অল্প সময়ের মধ্যেই ৪০০ জনের পাসপোর্ট তৈরি ও সংগ্রহ করে তার কাছে পাঠাই। পরে সবার মেডিকেল পরীক্ষা করতে হবে বলে জানান আসকারী। তার কথামতো ঢাকা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ৪০০ জনের মেডিকেল পরীক্ষা করানো হয়। মেডিকেল পরীক্ষার জন্য জনপ্রতি ৮ হাজার ৫০০ টাকা করে ৩৪ লাখ টাকা দেওয়া হয়। এর কয়েক দিন পর তিনি বলেন, ওয়ার্ডবয়ের সার্টিফিকেট লাগবে। কিন্তু আমার লোকজন তো কোনো হাসপাতালের ওয়ার্ডবয়ের চাকরি করেনি, তাই সার্টিফিকেট দিতে অপারগতা প্রকাশ করলে তিনি রাশেদ নামে একজনের মোবাইল নম্বর দিয়ে যোগাযোগ করতে বলেন। তার দেওয়া মোবাইল নম্বরে যোগাযোগ করলে ওই ব্যক্তি জানায়, প্রতি সার্টিফিকেটের জন্য ৭৫ হাজার টাকা করে লাগবে। পরে কয়েক দফায় ৩ কোটি টাকা নেওয়া হয়। সব টাকাই তারা নগদ নিয়েছে। পরবর্তীকালে আসকারীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও পাওয়া যায়নি তাকে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমার কথার ওপরে এলাকার ৪০০ জনের অধিকাংশই লোন করে টাকা সংগ্রহ করে আমার কাছে দিয়েছিল। এখন তাদের কোনো প্রশ্নের জবাব দিতে পারি না। তাই এলাকাতেও যেতে পারছি না।’

একইভাবে সিরাজগঞ্জের মঞ্জুর রহমানের কাছ থেকে সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ায় লোক পাঠানোর কথা বলে ৫০ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন আসকারী। জামালপুরের মাসুম হাসান মাহমুদের কাছ থেকে ৪৩ লাখ ও নাইমের কাছ থেকে নিয়েছেন ১৭ লাখ টাকা।

সিটিটিসির কর্মকর্তারা জানান, রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশেই প্রতারণার জাল পেতেছেন এই প্রতারক ও তার সহযোগীরা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেইসবুক ও ইউটিউব চ্যানেলে বিভিন্ন মিথ্যা পরিচয়ের প্রচার চালান। ফেইসবুক প্রোফাইলে মন্ত্রী-এমপিসহ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের ছবি আপলোড করে প্রতারণার ফাঁদ পেতে শত শত মানুষকে নিঃস্ব করেছেন। প্রতারণার কাজ সহজে করার জন্য নিজকে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে তুলে ধরতে চলাফেরা করেন সুসজ্জিত দেহরক্ষী নিয়ে। কৌশল হিসেবে কখনো প্রধানমন্ত্রীকে ফুপু ও ড. গওহর রিজভীকে মামা হিসেবে পরিচয় দিয়ে থাকেন।

তারা আরও জানান, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের নামও ভাঙিয়েছেন তিনি। এখন রিমান্ডে নিয়ে এসব বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। প্রতারণার আরও কোনো কৌশল আছে কি না কিংবা হাতিয়ে নেওয়া টাকা অন্য কোথাও পাচার করেছেন কি না তাও জানার চেষ্টা চলছে।

পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, বছর পাঁচেক আগে নিজের নামের সঙ্গে খাজা শব্দটি যোগ করেন আলী হাসান আসকারী। নবাব সলিমুল্লাহ খানের বংশধর হিসেবে খাজা আমানুল্লাহ আসকারীর ছেলে হিসেবে পরিচয় দিতে শুরু করেন তিনি। ফেইসবুক ও ইউটিউব চ্যানেলে নিজেকে নবাবের বংশধর হিসেবে প্রচার চালান। একই সঙ্গে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রী, এমপি, জ্যেষ্ঠ আওয়ামী লীগ নেতা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বিভিন্ন প্রোগ্রামে পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তুলতেন। সেসব ছবি আপলোড করতেন ফেইসবুকে। এগুলো ছিল প্রতারণার হাতিয়ার। এ কাজে সারা দেশেই নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন। প্রাথমিকভাবে তার চক্রের সদস্য হিসেবে ডজনখানেকের নাম-পরিচয় পাওয়া গেছে।

পুলিশ আরও জানায়, মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে নার্স, ওয়ার্ডবয় থেকে বিভিন্ন পদের লোক নিয়োগ ছাড়াও পোল্যান্ড ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে লোক পাঠানোর নামেও টাকা নিয়েছেন আসকারী। এমনকি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করিয়ে দেওয়ার নাম করেও অনেকের কাছ থেকে হাতিয়ে নিয়েছেন মোটা অঙ্কের টাকা। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি স্বীকার করেছেন, তার এ প্রতারণার কাজে অনেকেই সহযোগী হিসেবে ছিল। এছাড়া পুলিশের এসআই পদে চাকরি দেওয়ার নামে জামালপুরের মাহমুদুল হাসান মাহমুদ নামে এক ব্যক্তির কাছ থেকে ৪৩ লাখ টাকা নিয়েছেন। একই সঙ্গে আরও সাতজনকে সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে চাকরি দেওয়ার কথা বলে ২৩ লাখ টাকা নেন। এছাড়া আসকারীর প্রতারণার শিকার হয়েছেন ইব্রাহীম আলী সাগর নামে সিঙ্গাপুর প্রবাসী এক যুবকও।