সুন্দর জীবনের বার্তাবাহক শারদীয় দুর্গোৎসব

লিখেছেন নমিতা মন্ডল

দুর্গা শব্দের ব্যুৎপত্তিগত অর্থ হলো র্দু+গম্ (কর্মবাচ্যে)+ড+স্ত্রীলিঙ্গে আপ্ = দুর্গা। দুর অর্থাৎ দুরধিগম্য। দেবীর তত্ত্ব অতি দুর্জ্ঞেয় তাই তিনি দুর্গা। দুর্গা শব্দের নানাবিধ অর্থ করা যায়। দুর্গ শব্দের এক অর্থ দুঃখ বা দুর্গতি। যিনি নানাবিধ দুর্গতি নাশ করেন, তিনিই দুর্গা। আবার দুর্গা শব্দে দুর্গ নামক দৈত্য, মহাবিঘ্ন, ভববন্ধন, কুকর্ম, শোক, দুঃখ, নরক, যমদ-, পুনর্জন্ম, মহাভয়, অতিরোগ বোঝায়। আ শব্দের অর্থ হন্তা অর্থাৎ নাশ করেন। যিনি এই সব নাশ করেন, তিনি দুর্গা নামে কীর্তিতা।

দুর্গাপূজার প্রচলন যে কত প্রাচীন তা নির্ণয় করা দুঃসাধ্য। কারণ বর্তমানে যিনি দুর্গা নামে অভিহিত, বৈদিক যুগে তিনিই রুদ্রাণী বা অম্বিকা বা অন্য কোনো শক্তি নামে অভিহিত হয়ে পূজিত হয়ে আসছেন। একই পুরুষ দেবতা যেমন বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন নামে প্রকাশিত হয়ে আসছেন, তেমনি ঐ পুরুষশক্তির আধার মহাশক্তিও বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন নামে প্রকাশিত হয়ে আসছেন। মানুষ, জীব বা জড়ের কর্মক্ষমতা যেমন শক্তি; তেমনি দেবগণেরও কর্মক্ষমতা বা তেজ শক্তি নামেই কথিত। যেমন অগ্নির দাহ করার ক্ষমতাই তার শক্তি, এই শক্তির নাম স্বাহা; ইন্দ্রের বৃষ্টি বর্ষণ করার ক্ষমতাই তার শক্তি, এই শক্তির নাম ঐন্দ্রী বা ইন্দ্রাণী; রুদ্রের সংহার করার ক্ষমতাই তার শক্তি, এই শক্তির নাম রুদ্রাণী; এরকম ব্রহ্মার ব্রহ্মাণী, বিষ্ণুর বৈষ্ণবী, মহেশ্বরের মাহেশ্বরী অর্থাৎ যে পুরুষদেবতার যে আকৃতি-প্রকৃতি তার শক্তিও সেই আকৃতি-

প্রকৃতির হয়ে থাকে। পুরুষদেবতার শক্তিই স্ত্রীরূপ মাত্র। অতএব শক্তি ও শক্তির অধিকারীতে কোনো ভেদ নেই। কেবল লৌকিক দৃষ্টিতে দেব ও দেবশক্তিতে পতি-পতœী সম্পর্ক কল্পিত হয়েছে। কিন্তু সব দেবসত্তা যেমন এক ও অদ্বয়, তেমনি তাদের শক্তিও এক ও অদ্বয়।

হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা বহু দেবতায় বিশ্বাস সত্ত্বেও যেমন সব দেবতার মধ্যে একেশ্বরের অস্তিত্বে গভীর বিশ্বাসী, তেমনি সব দেবতার সম্মিল্লিত শক্তি এক মহাশক্তিতেও গভীর বিশ্বাসী। এই মহাশক্তির কোনো ভেদ নেই, ভেদ তার প্রকাশে। যেমন অগ্নিকে কেউ বলে আগুন, কেউ বলে অনল, কেউ বহ্নি, কেউ পাবক অর্থাৎ অগ্নিকে যে নামেই ডাকুক না কেন, তাতে অগ্নি বহু হয়ে যায় না; অগ্নি একই থাকে। তেমনি এই বিশ্ব চরাচরে সেই একই শক্তিকে অন্তরে উপলব্ধি করে কেউ বলছেন মহামায়া, কেউ মহাদেবী, কেউ রুদ্রাণী, কেউ অম্বিকা অর্থাৎ মূলে সেই একই মহাশক্তি। সুতরাং সৃষ্টির যেদিন থেকে দেবতা পূজা পেয়ে আসছেন, সেদিন থেকে কোনো না কোনো নামে তার শক্তিও পূজিত হয়ে আসছে। তবে কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে দুর্গমধ্যে অপরাজিতা মূর্তি প্রতিষ্ঠার (খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দী) উল্লেখ থেকে, কুষাণ সম্রাট হুবিষ্কের (খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতাব্দী) পাঞ্জাব মিউজিয়ামে রক্ষিত মুদ্রায় নারী (উমা বা পার্বতী) ও পুরুষ (ভবেশ) মূর্তি থেকে অনুমান করা হয় খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দী থেকে শক্তিপূজা প্রচলিত হয়ে আসছে।

তবে এই পূজা প্রথমে বসন্তকালে (মতান্তরে) অনুষ্ঠিত হতো। কথিত আছে ত্রেতা যুগে রাম অবতারে রাবণকে সংহার করার জন্য অকালে (বৈশাখ থেকে আশ্বিন এই ছয় মাস দক্ষিণায়ন এবং দেবতাদের রাত্রি; কার্তিক থেকে চৈত্র এই ছয় মাস উত্তরায়ণ এবং দেবতাদের দিন। রাত্রে অর্থাৎ অকালে) মা দুর্গার জাগরণ ঘটিয়ে রাম (মতান্তরে ব্রহ্মা) শক্তির পূজা করেছিলেন। তাই ত্রেতা যুগ থেকে শরৎকালে মায়ের পূজার প্রচলন হয়ে গেছে।

আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষের ষষ্ঠী থেকে নবমী তিথি এই চারদিন বিভিন্ন উপাচারে পূজা অনুষ্ঠিত হয়। দশমী তিথিতে হয় মায়ের বিসর্জন। ত্রেতা যুগে রামের পূজা থেকে এই বিসর্জনের দশমীকে বিজয়া দশমী হিসেবে অভিহিত করা হয়। কারণ দেবীর বর লাভ করে রামচন্দ্র নবমী তিথিতে রাবণকে সংহার করেছিলেন এবং দশমী তিথিতে যুদ্ধের বিজয়োৎসব সম্পন্ন করেছিলেন। এ জন্যই আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষের দশমী তিথিকে বলা হয় বিজয়া দশমী। মূলত মহোৎসব দুর্গাপূজার সর্বশেষ অনুষঙ্গ হচ্ছে এই বিজয়া দশমী।

এই বিজয়ার মাধ্যমে মা আমাদের শিক্ষা দেন কীভাবে পাশবিক তমকে পদদলিত করে সত্ত্ব ও রজঃ গুণান্বিত হয়ে দুর্গতি নাশ করতে হয়। যেমন তিনি পাশবিক তম মহিষাসুরকে বধ করে সত্ত্ব ও রজঃ গুণান্বিত হয়ে দুর্গতি নাশ করেন। তিনি শিক্ষা দেন কীভাবে বিদ্যা এবং ধন উভয়ে বিরোধী ভাবাপন্ন হওয়া সত্ত্বেও সহাবস্থানে রাখতে হয়। যেমন করে তিনি তার দুই কন্যা সরস্বতী এবং লক্ষ্মীকে একই পরিবারভুক্ত করে সহাবস্থানে রেখেছেন। তিনি শিক্ষা দেন কীভাবে উচ্চ স্তরের লোকদের সঙ্গে নিচু স্তরের লোকদের সমন্বয় ঘটিয়ে সংসারে সহাবস্থান করতে হয়। যেমন করে তিনি গণেশের মস্তকের বিশাল হাতির সঙ্গে গণেশের বাহন ক্ষুদ্র মূষিকের সমন্বয় ঘটিয়েছেন। তিনি শিক্ষা দেন কীভাবে সাত্ত্বিক গুণকে জাগ্রত করে জাতশত্রুদের সঙ্গেও একই সংসারে বসবাস করা যায়। যেমন করে তার সংসারে কার্তিকের বাহন ময়ূরের খাদ্য শিবের গলার অলংকার সাপ রয়েছে। লক্ষ্মীর বাহন পেঁচার খাদ্য গণেশের বাহন মূষিক রয়েছে। তিনি শিক্ষা দেন কীভাবে হিংসা ব্যতিরেকে কদাকার বা কুশ্রীর সঙ্গে সুশ্রীর সহাবস্থান হয়। যেমন তার সংসারে কদাকার পেঁচার সঙ্গে সরস্বতীর বাহন সুশ্রী রাজহংস রয়েছে। তিনি শিক্ষা দেন কীভাবে সংসারে মন্দটুকু বর্জন করে ভালোটুকু গ্রহণ করতে হয়। যেমন করে রাজহংস জলটুকু বর্জন করে দুধটুকু গ্রহণ করে।

এখানে আছে কলা বৌ যা কিনা কদলী, কচু, হরিদ্রা, জয়ন্তী, বিল্ব, দাড়িম্ব, অশোক, মান ও ধানের সমন্বয়ে তৈরি। এ থেকে আমরা শিক্ষা পাই প্রকৃতিও আমাদের সংসারের অংশ। অর্থাৎ মায়ের এই সংসার থেকে আমরা আমাদের ব্যক্তি-জীবনে, সমাজ-জীবনে, রাষ্ট্রীয়-জীবনে কেমন করে কুপথ থেকে সুপথে চলতে পারি তার সামগ্রিক শিক্ষাই পেতে পারি এবং পরিবারে, সমাজে, রাষ্ট্রে আমাদের ঐক্য ও সহাবস্থান থাকলে আমরা যেকোনো বাধা-বিপত্তি-দুর্গতি মোকাবিলা করে জয়ী হতে পারি। আর এভাবেই আমাদের ঐক্য থাকতে হবে এবং অসুন্দরকে জয় করে সুন্দর জীবন ধারণ করতে হবে।

লেখক: চেয়ারম্যান, সংস্কৃত বিভাগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]