” বাংলায় মুসলিম শাসনের ইতিহাস।”

মাহবুবুর রব চৌধুরী, টরোন্ট।

সোনার  বাংলায়  স্বর্ণাক্ষরে লিখা  মুসলিম শাসনের  ইতিহাস পাঠ,  আমাদের জন্য বিশেষ  গুরুত্ব পূর্ন। বাংলাদেশের  ইতিহাসের সাথে এবং  বাংলাদেশী  কৃষ্টি , কালচার, ও মন , মানস গঠন প্রক্রিয়ার সাথেও  এটি সমম্পর্ক যুক্ত। অতীত গৌরব, বর্তমান গর্ব এবং সুন্দর সোনালী ভবিষ্যৎ গঠনে , ইতিহাসই একটি  জাতির সামনে  জীবন্ত প্রেরণার ভান্ডার।  তাই  বাংলায় মুসলিম শাসনের ইতিহাস চর্চা  এবং  গবেষণা  আমাদের জন্য  এতটাই জরুরি।

১২০৪ সালে  বখতিয়ার  খিলজির  বাংলা  বিজয় থেকে   ১৭৫৭ সনে বাংলার  শেষ  স্বাধীন  নবাব  সিরাজ -উদ -দৌল্লাহর ইতিহাস, এবং  ১৯৪৭  এ  ভারত  ভাগ  পরবর্তী  পূর্ব  পাকিস্তান  এবং  ১৯৭১  সনের  মহান স্বাধীনতা  যুদ্ধ  শেষে  অর্জিত  স্বাধীন  সার্বভৌম  বাংলাদেশের  অভ্যুদ্বয়, সমগ্র এই সময় কালটি  আমাদের  গর্বিত ইতিহাসেরই অংশ।

 বাংলায় মুসলিম  শাসনের শুরু -১২০৪  সনে ইখতিয়ার উদ্দিন  মোহাম্মদ  বখতিয়ার  খিলজির  বাংলা  বিজয়  থেকে ।  সেই  ১২০৪ থেকে  আজ   ২০২০ পর্যন্ত  ৮১৬  বছর।  ১৭৫৭ সনে  বাংলার  শেষ  স্বাধীন  নবাব  সিরাজ -উদ -দৌল্লাহর   পলাশীর ষড়যন্ত্র  মূলক  যুদ্ধে পরাজয় এবং তার পর ১৯৪৭  পর্যন্ত ১৯০ বছর ইংরেজ শাসন।এই সময় কাল বাদ দিলে – ৬২৬  বছর বাংলা, মুসলিম শাসনে ।
     ( এর মাঝে  কিছু সময়  কিছুকাল  দিল্লী ও ইসলামাবাদ কেন্দ্রিক শাসনের অভিজ্ঞতার  মাঝেও মুসলিম বাংলাকে যেতে হয়েছে।)
যখন ১২০৪  সনে ইখতিয়ার উদ্দিন  মোহাম্মদ  বখতিয়ার  খিলজি বাংলা  জয়  করেন   দিল্লীতে  তখন  মোহম্মদ ঘোরী ডাইনেস্টির  শাসন চলছে।  আর  ১৭৫৭ সনে  বাংলার  শেষ  স্বাধীন  নবাব  সিরাজ -উদ -দৌল্লাহর  সময়  দিল্লীতে   ক্ষমতায় ছিলেন  মোগল  সম্রাট  আলমগীর শাহ( ১৭৫৪ -থেকে  ১৭৫৮) পর্যন্ত ।
বাহাদুর শাহ জাফর – ছিলেন   ভারতের শেষ  মোগল  সম্রাট। -( ১৮৩৭ থেকে ১৮৫৭  পর্যন্ত) । ১৮৫৭ র  স্বাধীনতা যুদ্ধ  তথা  মহা  সিপাহী  বিদ্রোহের মাঝে  উপমহাদেশ  থেকে ৩১৫ বছরের  মুগল শাসন গৌরবের সাথে, বীর ব্যঞ্জনায়  সমাপ্তি  ঘটে।
বাংলায় বৌদ্ধ  পাল রাজত্বের পর- ১০৭০ সনে হেমন্ত সেন হিন্দু  সেন  রাজত্ব প্রতিষ্ঠা  করেন। সেনরা  ছিলেন  কর্ণাটকের  হিন্দু  ব্রাম্মন ।  দক্ষিণ  ভারত  থেকে ভাগ্য অন্বেষায়  তারা  এখানে  এসেছিলেন।  রাজ্  ভাষা হিসাবে তারা সংস্কৃতিকে গ্রহণ  করেন।  বাংলায় , দ্রাবিড় ,পৌত্তলিক, এবং  হিন্দু , বৌদ্ধ পাল আর পালের পর আবার শুরু হিন্দু সেন  আমল – এর পর ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ বখতিয়ার খিলজির বাংলা বিজয়ের সাথে  শুরু হয়  মুসলিম আমল।
 সেই থেকে এই পর্যন্ত।  ইতিহাস যুদ্ধ  জয়ের  মাঝেই মূলত  রাজ্য জয়ের  কাহিনীতে  ভরপুর। । হত্যা ও  ধ্বংস যুদ্ধের একটি সাধারণ চিত্র। কম বেশি ঘটে থাকে ।  প্রায় সর্বত্রই একই চিত্র। ইতিহাসের  এই  পরিচিত পথ  ধরেই  – ইখতার উদ্দিন  মোহাম্মদ  বখতিয়ার  খিলজি -১২০৪ সনে  ১৭ জন  অশ্বারোহী ( ঘোড়  সৌনিক)  নিয়ে – বাংলায়  লক্ষণ  সেনের  রাজধানী  নদীয়া  বিজয়  করেন।যুদ্ধের  আভাস পেয়ে  রাজা   লক্ষণ  সেন  নদীয়া  থেকে  নৌকা  যোগে  পূর্ব  বাংলায়  পালিয়ে  যান, ফলে  বখতিয়ার  খিলজি  বিনা  যুদ্ধেই  নদীয়া  জয়  করেছিলেন ।তাই  যুদ্ধের  ধ্বংস  ও  রক্তপাত  সেখানে  ঘটেনি।
বখতিয়ার খলজিকে অনেকে প্রমাণ ছাড়াই-  বিভিন্ন  প্রতিষ্ঠান  ধ্বংস এর জন্য দায়ী  করেন ,বখতিয়ার খলজি  নদিয়া  দখল করেছিলেন। বর্তমান বাংলাদেশের সীমানায় তিনি পা রাখেন নি- তাহলে ত  প্রশ্ন  আসবেই  – কুমিল্লার ময়নামতির শালবন বৌদ্ধ বিহার এবং পাহাড়পুরের  সোমপুর বিহার  কিভাবে কে বা কারা কখন, ধ্বংস করেছিলেন ?  এটি ইতিহাসেরই একটি  প্রশ্ন ?  উত্তরটি হল সোমপুর বিহার বা পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার ধ্বংস করেছিলেন বিষ্ণুভক্ত হিন্দু রাজা জাতবর্মা।আর  কুমিল্লার ময়নামতির শালবন বৌদ্ধ বিহার  ধ্বংস করে ছিলেন।হিন্দু জাত ব্রাহ্মণরা।  আর তারা কিন্তু ভুল করে বৌদ্ধদের  বিহার ধ্বংস করেননি , জেনে শুনেই ধ্বংস করেছিলেন। বৌদ্ধ পাল  রাজত্বেরও  পতন হয়  হিন্দু সেন  বংশের হাত দিয়ে।
 সেন  রাজ্  আমলে   বাঙালি বৌদ্ধ  এবং  নিম্ন  বর্ণ  শ্রেণীর  স্থানীয়  হিন্দুরাও ছিল এক নির্যাতিত জনগোষ্ঠী। সেন বংশীয় হিন্দু রাজাদের অত্যাচারে  কিছু  বাঙালি বৌদ্ধ   জীবন  ভয়ে ,নেপাল,তিব্বত , মিয়ানমার, শ্রীলংকার দিকে পালিয়ে  যান।  ওই  সময়  তাদের  হাত দিয়েই  বাংলা ভাষার আদি নিদর্শন চর্যাপদ নেপাল  ভুটান , তিব্বত ,  সিকিমের  দিকে  ছড়িয়ে যায় ।
 বৌদ্ধদের অনেকেই  পরে ইসলাম গ্রহণ  করেন। এবং  তারা  সময়ের  সাথে – কালে  কালে  বাঙালি মুসলিমে পরিণত  হন ।  সময়ের ব্যবধানে বৌদ্ধ মেজরিটি বাংলা,  মুসলিম মেজরিটি বাংলায় পরিণত হয় । পরিবর্তনের  এই  হাওয়া  অনেকে  সহজ ভাবে  মেনে নিতে  পারেননি। কিছু  বৌদ্ধ  হিংসা  মন  নিয়ে  মুসলিম বিজয় দেখেছেন। ইতিহাসের শিক্ষার বিপরীতে – বুদ্ধের  অহিংস  বাণীর বিপরীতে  মুসলমানদের  বিপক্ষে  তারা  অকারণ বিদ্বেষী মনোভাব পোষণ করেন। ।অবাক  করা  কথা  হিন্দুদের নির্যাতনে  বার্মা  পালিয়ে যাওয়া বৌদ্দদের  ছোট  একটি  অংশ – হিন্দু  হাতে পাচঁন  খেয়ে , মগ  মুল্লুকে  মুসলিম  বিরোধী – অপপ্রচার  করেছে।
প্রকৃত  পক্ষে  ঐতিহাসিকভাবে বাঙালি বৌদ্ধদের সাথে বাঙালি মুসলিমদের কোন বিরোধ ছিল না।  তবে মগদের সাথে  এবং / বার্মিজ বৌদ্ধদের সাথে বঙ্গের লোকদের নানা তিক্ত অভিজ্ঞতা রয়েছে । মগরা পর্তুগিজদের মত, এবং কখনও পূর্তগীজদের  সাথে  মিলে   বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে এসে লুন্ঠন করতো, মানুষকে ধরে নিয়ে গিয়ে দাস হিসাবে বিক্রি করে দিতো।  বাংলায় বার্মিজ বৌদ্ধ মগ , খ্রিস্টান পূর্তগীজ  জল দস্যু , এবং  হিন্দু মারাঠি বর্গীদের – আক্রমণ  , হত্যা ,  লুন্ঠন, অত্যাচার , নির্যাতনের  বিরুদ্ধে – সাধারণ  মানুষ ছিল বিক্ষুব্ধ।  জনগণের  নিরাপত্তা  বিধানে  মুসলিম শাসক   সুলতান এবং  নবাবেরা ছিলেন অকুতোভয় , দৃঢ়চেতা। আপোষহীন  গণ  মানুষের  হিরো। বাংলার সর্ব সাধারণ ,গন মানুষের  ত্রাণ কর্তা। জনগনের  কল্যাণ  ও নিরাপত্তা বিধানে সাদা সর্বদা  সচেষ্ট ।এ  বিষয়টিও বাংলার বুকে সাধারণ মানুষের মাঝে ইসলামকে জানার তীব্র  আগ্রহের কারন হয়ে দেখা  দিয়েছিল । এটি  ইতিহাস  স্বীকৃত।  এখানে বাংলায়  মুসলিম শাসনের  বিভিন্ন পর্বের -বিভিন্ন  ডাইনেস্টির – ক্রমনলোজি – ইতিহাসের  ধারা  বর্ণনা  তুলে ধরা হল।
*
  ” [ মোহাম্মদ  বখতিয়ার  খিলজি  ডাইনেস্টি – থেকে  -নবাব  সিরাজ  উদ  দৌল্লাহ  পর্যন্ত। ]”
*
মোহাম্মদ বখতিয়ার খিলজি ডাইনেস্টি – থেকে -নবাব সিরাজ উদ দৌল্লাহ  পর্যন্ত   ৫৫৩  বছর। ( ১২০৪ থেকে ১৭৫৭ সন ।)
( বাংলায় রাজ্য কেন্দ্রিক শাসন : )
1. মোহাম্মদ বখতিয়ার খিলজি ডাইনেস্টি। ১২০৪ -১২২৭
2. মামলুক সুলতানদের শাসন আমল। ডাইনেস্টি। ১২২৭ – ১২৮১
3. বলবান শাসন আমল। ডাইনেস্টি। ১২৮১ -১৩২৪
4. ( তুগলগ আমলে -তুগলগ দের নিয়োগ প্রাপ্ত বাংলার শাসন কর্তা ১৩২৪ – ১৩৩৯ * পর্যন্ত।
Governors of Bengal under Tughlaq’ s .– 1338 to 1339. )
*
5. ফকরুদ্দিন মুবারক শাহ ডাইনেস্টি। ( বাংলার স্বাধীন শাসক ) ১৩৩৯ – ১৩৫২
——————————————————————————
* সামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ ডাইনেস্টি। * ১৩৫২ – ১৪১৪ *
*******************************************************
*
( ক ) :- সামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ। * ১৩৫২ – ১৩৫৮
( খ ) :-সিকান্দার শাহ। * ১৩৫৮ – ১৩৯০ *
(গ) : – গিয়াসুদ্দিন আজম শাহ। * ১৩৯০ – ১৪১১
( ঘ) : – সাইফুদ্দিন হামজা শাহ। * ১৪১১ – ১৪১২
(ঙ ) শাহাবুদ্দিন বাইজিদ শাহ। *১৪১২ – ১৪১৪
( চ ):- জালালুদ্দিন মোহাম্মদ শাহ। **১৪১৫ – ১৪৩৩ .
( রাজা গণেশের  বড় পুত্র  যদু  গনেশ – ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে –
জালালুদ্দিন মোহাম্মদ শাহ নাম গ্রহণ করেন )
====================================================
*
 ” [ বাংলায় মুসলিম শাসনের ইতিহাস আলোচনায়  আরাকান , বার্মা  এবং রহিঙ্গা  এক উল্লেখ  যোগ্য  অধ্যায়। যা  মূলত অন্যান গুরুত্ব পূর্ণ আলোচনার  ভিড়ে হারিয়ে যায়। বাংলায় ইসলামী ইনফ্লুয়েন্স এবং মুসলিম শাসনের পূর্ণাঙ্গ পর্যালচনার  স্বার্থে  এখানে  সংক্ষিপ্ত আকারে-আরাকান , বার্মা ও  বাংলার  ছোট একটি বর্ননা –  সংযুক্ত  করা হল।]”
  ১৪০৬ সনে  মুসলিম বাংলায় ” IIlyas Shahi dynasty  – ইলিয়াস  শাহ  ডাইনাস্টি”  জামানায় –  সুলতান গিয়াস উদ্দিন আজম শাহ এর  দরবারে  আরাকান  রাজা  নরমিখলা রাজনৈতিক  আশ্রয় নেন।
নরমিখলা  [Meng-tsau-mwun],  মিন স মন  এবং মোহাম্মদ সোলায়মান শাহ, এই তিনটি  নামেই  তিনি পরিচিত  ছিলেন। তিনি  বার্মার-  আভা রাজা মিন খং এর কাছে  যুদ্ধে পরাজিত হয়ে দেশ ত্যাগ করেন। আভা রাজা মিন খং এর কবল থেকে   আরাকানের  স্বাধীনতা পুন্: উদ্ধারে নরমিখলা  সুলতানের  সাহায্য  চান।সুলতান কথা দেন। ২৪  বছর বাংলার  রাজধানী  সোনারগাঁ  থাকবার পর – ১৪৩০ সালে সুলতান মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন শাহর শাসন  আমলে -বাংলার  ৩০ হাজার  মুসলিম সেনার সাহায্যে  আরাকানের স্বাধীনতা উদ্ধার  হয়। দখলদার  বার্মিজ বিতাড়িত করে ,   নরমিখলা  নুতন  ভাবে আরাকানের শাসন ক্ষমতা গ্রহণ  করেন । নরমিখলার  এই নুতন আমল  স্বাধীন মারাউকি  Mrauk U, আমল হিসাবে পরিচিত।
  ” [ স্বাধীন আরাকান মারাউকি আমল. — ১৪৩০-থেকে ১৭৮৫ পর্যন্ত। ৩৫৫ বছর স্থায়ী হয়।]”
*
আরাকানের আছে একটি  গৌরবময় অতীত।
(১) প্রাগ ঐতিহাসিক আমল।
(২ ) ধানি ওয়াদি আমল । খ্রিস্ট পূর্ব (৬০০ থেকে – ৩০০ ) খ্রিস্টাব্দ। (৩ ) ভেসালি বা ওয়াথালী আমল। ৩০০ – ৮৯৪,পর্যন্ত।
( ৪ ) এর পর তিন পর্বে র  লেমরু আমল – ৫১২ বছর। ৮৯৪- ১৪০৬ .
( ক) : প্রথম লেমরু স্বাধীন আমল। ৮৯৪ – থেকে  ১০৪৩  পর্যন্ত।
(খ) দ্বিতীয়  : আধা -পরাধীন লেমরু  আমল। – ১০৪৪-১২৮৭ পর্যন্ত। ১০৪৪ সালে বার্মার প্যাগান রাজা আনারাথার আরাকান আক্রমণ এবং খাজনা নেবার শর্ত শুরু।
(গ) : তৃতীয় লেমরু আমল। – ১২৫৫- ১৪০৬ , পর্যন্ত। লেমরু শাসনের শেষ বা তৃতীয় পর্বের শেষ রাজা ছিলেন মিন স মন। নরমিখলার সংগ্রামী জীবনের তিনটি  পর্ব। মন স মন। [Meng-tsau-mwun],,   নরমিখলা,  সুলতান মোহাম্মদ সোলায়মান শাহ।   লেমরু শাসনের শেষ  পর্বের শেষ রাজা  মিন স মন। ইলিয়াস  শাহ  ডাইনাস্টি”  জামানায় –  সুলতান গিয়াস উদ্দিন আজম শাহ এর  দরবারে   আশ্রয়  থাকা   আরাকান  রাজা  নরমিখলা এবং  সবশেষে  বিজয়ী বেশে  আরাকান ফিরে – এসে   স্বাধীন আরাকান রাজ্যের  মারাউকি আমলের প্রতিষ্ঠাতা  সুলতান গিয়াস উদ্দিন আজম শাহ। এটি তার উপাধি।  মারাউকি আমল Mrauk U,  — ১৪৩০- ১৭৮৫ পর্যন্ত। ৩৫৫ বছর স্থায়ীত্ব  পেয়েছিল ।
*
 মধ্যযুগে  আরাকান  রাজ্ সভা  ছিল  বাংলা  সাহিত্য  চর্চার  কেন্দ্র।আরাকানে  মুসলিম বাংলার প্রভাব। তথা  মুসলিম প্রভাব ছিল সুবেদিত।
 আরাকান  – আররুকন থেকে আরাকানের উৎপত্তি। রুকন অর্থ পিলার – স্তম্ভ। ইসলামের পাঁচ স্তম্ভ, আররুকন।একখ আব:  এক আব।আরবি শব্দ।   একটি  জলাধার। “আকিয়াব “, একটি নদীর পাড়ে, এক জলের ধারে। যেমন PUNJAB (পাঞ্জাব)- পান্জ আব ,  পাঁচ নদীর পাড়ের  মত – রোহিঙ্গা  ও  কথিত  আছে সোভাগ্য  বা  রহমত  নাম থেকে উৎপত্তি।
*
  এইভাবে  বাংলাদেশের  মানুষের সাথে  ব্যবসা , বাণিজ্য , যোগাযোগ , কৃষ্টি , শিল্প , সাহিত্যের  এবং  ইতিহাসের  একটি  সমৃদ্ধ  বন্ধন  সুদূর অতীত থেকেই  আমাদের আছে।একই  সঙ্গে বাংলাদেশের  অর্থনীতি ও  নিরাপত্তা  স্ট্রাটেজির  এক  গুরুত্ব  পূর্ন আউট  পোস্ট। )
*
====================-================================================
*
( এখান থেকে  আবার  বাংলায়  মুসলিম শাসনের, – ডাইনেস্টির – ক্রমনলোজি – ইতিহাসের  ধারা  বর্ণনা পুনঃ শুরু করা হল।)
( চ ):- জালালুদ্দিন মোহাম্মদ শাহ। *১৪১৫ – ১৪৩৩ .
*
  [  জালালুদ্দিন মোহাম্মদ শাহ –  ১৪১৫ – ১৪৩৩ – রাজা গণেশের  বড় পুত্র  যদু  গনেশের মুসলিম নাম। এর  পর  বাংলার  সুলতান হিসাবে ক্ষমতায়  আসেন শামসুদ্দিন আহমদ শাহ। –  ১৪৩৩ – ১৪৩৫ ]
*
———————————————————————————————————
*
( ছ ): শামসুদ্দিন আহমদ শাহ। ১৪৩৩ – ১৪৩৫ – *
*
(জ ): নাসিরুদ্দিন মাহমুদ শাহ – ১৪৩৫ – ১৪৫৯
(ঝ ): রুকুনুদ্দীন বারবাক শাহ -১৪৩৫ – ১৪৭৪।
(এঙ):- শামসুদ্দিন ইউসুফ শাহ – ১৪৭৪ – ১৪৮১
(ট): – জালালুদ্দিন ফাতে শাহ – ১৪৮১ – ১৪৮৭
——————————————————————————————————————
*
7. ইলিয়াস শাহ বংশের পালক পুত্র হাবশী আফ্রিকান দের আমলকে ( হাবশী শাসন আমল হিসাবে ইতিহাসে উল্লেখ হয়।)
*
হাবশী শাসন আমল ১৪৮৭ থেকে ১৪৯৪ পর্যন্ত স্থায়ী হয়।
————————————————————————————
( Mughal Subahdars and Governors of Benggal subah. * 1565 – 1717 –
Independent Nawabs of Bengal. 1717 – 1757 . Till Nawab Sirajuddullah . I)
————————————————————————————-
*
বাংলার স্বাধীন নবাব।
*
“নবাব মুর্শিদ কুলি খান বাংলা , বিহার , উড়িষ্যায় ১৭১৭ সালে স্বাধীন নবাবী আমল প্রতিষ্ঠা করেন।”
১৭০০ সালে দিল্লির সম্রাট আওরঙ্গজেব তাকে বাংলায় দেওয়ান / ট্রেজারার হিসাবে নিয়োগ দেন। যোগ্যতা ও দক্ষতা দিয়ে অল্প সময়েই তিনি নিজাম / সুবেদার / গভর্নর হিসাবে প্রমোশন পান। তার এই প্রোমোশনে অনেকে জেলাস হন তারা কৌশলে সম্রাটের নাতি আজিম উস শান কে তার বিরুদ্ধে খেপিয়ে তুলেন। কুলি খানের জীবন সংকট পূর্ন হয়ে পড়ে ।
*
সম্রাট আওরঙ্গজেব বিষয়টি অনুধাবন করে নাতি আজিম- উস- শান কে পাটনায় বদলি করেন এবং নাতির নামে পাটনার নাম আজিমাবাদ নাম করণ করেন। এবং মুর্শিদ কুলি খান কে ঢাকা থেকে বদলিকরে মুকসুবাদ পাঠান। পরে এই শহরকেই নবাব মুর্শিদ কুলি খান – মুর্শিদাবাদ নাম করণ , করেন এবং বাংলা বিহার উড়িষ্যার
( রাজধানী করে ) নবাবী আমল শুরু করেন। নুতন এই রাজধানী বাংলার পুরান রাজধানী নদীয়া থেকে খুব বেশি দূরে নয়।
নবাবী আমলের তালিকা :-
*
নবাবী আমলের তালিকা :-
(  ১ ) মুর্শিদ কুলি খান -( ১৭১৭ — ১৭২৭ )
(B ) সরফরাজ খান। – -( ১৭২৭ – – ১৭২৭ )
(C) সুজা উদ দৌল্লাহ ,( ১৭২৭- ১৭৩৯ )
( D.) নবাব আলী বর্দি খান। ( ১৭৪০ – ১৭৫৬)
( E.) নবাব সিরাজ উদ দৌল্লাহ।(১৭৫৬- ১৭৫৭)
*
ধার্মিক সম্ভ্রান্ত শিক্ষানুরাগী  মা  আমেনা  বেগম  ও  পিতা  জয়েন  উদ্দিন  আহমেদ  খানের ঘরে  নবাব  সিরাজ উদ  দৌল্লাহ  ১৭৩৩ সনে  জন্ম  গ্রহণ  করেন। নানা নবাব  আলী  বর্দি  খানের  তত্ত্বাবধানে  –  বাংলার ভবিষ্যত  নবাবকে  দেশ পরিচালনার  উপযুক্ত  ট্রেনিং  এবং  শিক্ষা ,দীক্ষা , মেজাজ , মর্জি ,আদপ , ব্যবহার , রুচি , যোগ্যতা , দক্ষতায়  শ্রেষ্ট  করে  গড়ে তুলতে  নবাব  প্যালেসেই  সব  ধরনের বাবস্থা নেওয়া হয়। এবং তিনি সেই ভাবেই গড়ে উঠেন।
( He was raised at the Nawab’s palace with all necessary education and training suitable for a future Nawab. Young Siraj also accompanied Alivardi on his military ventures against the Marathas in 1746.  )
নানা নবাব আলী বর্দি খান এর কোন পুত্র সন্তান না থাকায় নাতি সিরাজ উদ দৌল্লাহ কে ১৭৫২ সনে পরবর্তী নবাব হিসাবে ঘোষণা দেন ।
নবাব সিরাজ উদ দৌল্লাহ নানা – নবাব আলী বর্দি খানের মতোই এক জন দেশ প্রেমিক প্রজা হিতৌষী জন দরদী,   অসীম সাহসী নবাব ছিলেন।নবাব সিরাজ উদ দৌল্লাহ – ছাড়া বাংলার ইতিহাস অসম্পূর্ন ও অকল্পনিয় । আজীবন তিনি তার বুদ্ধি , বিবেক , শক্তি সামর্থ দিয়ে এদেশ এবং এদেশের মানুষের কল্যানে কাজ করেছেন। জীবনের সর্বস্ব দিয়েছেন। এদেশের স্বাধীনতা রক্ষায় যৌবন কালেই জীবন দিয়ে সর্ব শ্রেষ্ঠ – ত্যাগ শিকার করেছেন।
জীবনের প্রথম শাঁস এবং শেষ নিঃশ্বাস এদেশেই ত্যাগ করেছেন। তার জীবন সম্পদের প্রথম পেনি – শেষ পয়সা এদেশের মাটির সাথে মিশে গেছে। তার রক্ত তার বংশ এদেশের মানুষের মিছিলে আজও জেগে আছে , স্বাধীনতার অতন্দ্র প্রহরী হয়ে। ।
ক্ষমতায় আসার পরই তিনি বুঝতে পারেন চারি দিকে তিনি শত্রু পরিবেষ্টিত।
প্রাসাদে খালা ঘসেটি বেগম , মীর জাফর আলী খান , বাইরে -জগৎ শেঠ , উমি চাদ , রায় দুর্লভ। কলকাতায় ইংরেজ , পশ্চিমে মারাঠা । এই কঠিন সময়ে মা আমেনা বেগম , স্ত্রী লুৎফুন নেছা,  বন্ধু ভাই , ডান হাত মীর মার্দান , ইতিহাসে মীর মদন বলে পরিচিত আর বন্ধু মোহন লাল। যারা তাদের জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তরুণ এই নবাবের প্রতি আস্থা রেখেছেন। তার  সঙ্গেই  থেকেছেন।
পলাশীর চক্রান্ত ও বিশ্বাস ঘাতকতার যুদ্ধ শেষে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজুদ্দৌলার পরাজয় ঘটে। এই পরাজয় এর সাথেই প্রকৃত পক্ষে -ভারতের পরাধীনতা ও মুসলিম শাসনের অবসানের সূত্রপাত।
*
( পলাশী যুদ্ধের পরই – শুরু হল ব্রিটিশ রাজ আর পরাধীন ভারতের ইতিহাস ।১৭৫৭ র লর্ড ক্লাইভ থেকে ১৮৫৮ র লর্ড ক্যানিং এবং ১৯৪৭ এর লর্ড মাউন্ট ব্যাটেন পর্যন্ত  ১৯০ বছর )
*
মুসলমানদের হাত থেকে চক্রান্ত করে শাসন ক্ষমতা কেড়ে নেওয়ার কথা ইংরাজ সব সময়ই মনে রেখেছে। মুসলমানদের প্রতি সন্দেহ , বিদ্বেষ , অবিশ্বাসের কমপ্লেক্স তাদের মনে থেকেই গেছে। মুসলমানকে দাবিয়ে রাখবার সব প্রচেষ্টাই তারা করেছে।  এই  কূ কর্মে  ইংরেজদের সঙ্গে স্থানীয়  মুসলিম বিদ্বেষী কিছু  চক্রান্ত কারি উগ্র  হিন্দু   ইংরেজদের  সাথী  হয়েছে।ইংরেজও   স্থানীয় এই  দালালদের নিজ স্বার্থে ব্যবহার  করেছে।
পক্ষান্তরে স্বাধীনতা পুনঃ উদ্ধারের প্রতিটি সুযোগই মুসলমান  এবং  দেশ প্রেমিক হিন্দু কাজে  লাগাবার চেষ্টা করেছে।এবং কাজে লাগিয়েছে।
স্বাধীনতাকামী  বিদ্রহী  মুসলিম মানস ধ্বংসে  ইংরেজ  ও কোন সুযোগ  ছেড়ে দেয় নি। বাংলার  মুসলিমের  অর্থনৈতিক  ভিত্তি  ধ্বংসে নীল কর , নীলচাষ  থেকে  শুরু করে ভুঁই  ফোঁড়  হিন্দু  দালালদের  মুসলিমদের  উপর  জমিদার  হিসাবে  বসিয়ে দিয়েছে।
অর্থনীতি , শিক্ষা  দীক্ষায়  এই  সময়  মুসলমান অনেক  পিছিয়ে  পড়েছে। মুসলিম  শাসন  কালে  বাংলায়  গরিব মুসলিম  ছিল অচিন্তনীয়। আর ইংরেজ শাসনে  বাংলায় ধনী মুসলিম  খুঁজে  পাওয়া  টাই  হয়ে  পড়েছিল অকল্পনীয়। অচিন্তনীয়।
ইংরাজ শাসন আমলে শোষণ ও শাসনের স্বার্থে ইংরেজরা  সারা  ভারতে ডিভাইড এন্ড রুল নীতি চালু করে। যার বিষ ফলে এখনো  মানুষ  ভুগছে। ধর্ম , বর্ণবাদকে উস্কে দিয়ে মানুষে মানুষে বিভেদ তুলে ইংরেজ শাসন দীর্ঘায়িত -করবার খায়েশ তাদের পূরণ হয়নি। শেষ মেশ বিদায় তাদের নিতে হয়েছে। তবে বিষ বৃক্ষটি এখন রয়ে গেছে।
*
ইতিহাসের স্বার্থেই ঐতিহাসিক সত্য  তুলে  ধরা   আজ   খুব  জরুরি।
*
মাহবুবুর রব চৌধুরী, টরোন্ট।
*লেখক  পরিচিতি  –  গবেষক  ,সমাজ চিন্তক। –  (আহবায়ক-২০০০ – উত্তর আমেরিকা বাংলাদেশ সম্মেলন – ফোবানা টরন্টো- কানাডা।)*