শৈশবের কোরবানির ঈদ : দাদার বাড়ির স্মৃতি (দ্বিতীয় পর্ব)

লিখেছেন ডঃ মোহম্মদ মাহবুব চৌধুরী, মন্ট্রিয়াল, কানাডা থেকে

দাদার বাড়ির অবস্থান

আমার দাদার বাড়ির অবস্থান বিরাহিমপুর গ্রামের দক্ষিন-পশ্চিম প্রান্তে। বাড়ির পশ্চিমে কাচারি ঘরের পরে কিছু নিচু ক্ষেতি জমি পার হলেই বড় খাল এবং এইখাল ধরেই নৌকাপথে জকসিন হতে আমরা দাদার বাড়িতে আসতাম। খালপাড়ের একটু উঁচু জায়গায় বাড়ির পারিবারিক কবরস্থান। খালের ওপাড়ে রামনগর গ্রাম। এই রামনগরের ভুঁইয়া বাড়ি আমার জেঠি আম্মার বাবার বাড়ি যা আমাদের বাড়ি থেকেও দেখা যেত। বাড়ির দক্ষিনে বড় খাল হতে বের হওয়া পূর্ব-পশ্চিম বিস্তৃত সরু ছোট খাল বা দাঁড়া যার ওপাড়ে মালেদের বাড়ি, এরপরেই কালাদের বাড়ি। এই মালেদের বাড়ির পশ্চিমের একটু বিচ্ছিন্ন অংশে ছিল দাদাদের আরেকটা ভিটি বাড়ি-আবেদি বাড়ি যেখানে উনারা কখনো থাকেননি। বাড়ির উত্তরদিকে একটু নিচু জমি পার হয়ে উত্তর বাড়ি-মতিন মাষ্টারদের বাড়ি আর পূর্বদিকে দাদার বাড়ির পুরানো পুকুরের ঐপাড়ে সামান্য জংগল পার হয়ে পাটোয়ারি বাড়ি।এই পাটোয়ারিদের পূর্বপুরুষদের কাছ হতেই আমাদের দাদা আর মতিন মাস্টারের বাবারা ইয়ার বাড়ি আর উত্তর বাড়ির জমি কিনে নেন। পাটোয়ারি বাড়ি পার হয়ে উত্তর বাড়ির পুকুর ঘেঁষে সামান্য দক্ষিন-পূর্বদিকে চাপরাশি বাড়ি-আমার দাদাদের মামার বাড়ি যেখানে ছোটবেলায় বাপ-মা হারানো আমার দাদারা দুই ভাই বড় হন। চাপরাশি বাড়ির পর সামান্য একটু জংগল পার হয়ে পূর্বদিকে দেওয়ান বাড়ি, আর সামান্য উত্তর-পূর্বে চৌকিদার বাড়ি। এই দেওয়ান বাড়িই হলো আমার আম্মার দাদার অর্থাৎ আমার নানার গ্রামের বাড়ি। আম্মার দাদু ছিলেন আমার দাদার আপন ছোট খালা যার হাতেই ছোটবেলায় আমার দাদারা দুই ভাই লালিত-পালিত হন। উত্তর বাড়ির পুকুরের উত্তর-পূর্বদিক দিয়ে জংগলের ভেতর দিয়ে আরেকটা সরু পথ ধরেও চৌকিদার বাড়িকে বামে রেখে দেওয়ান বাড়ির দরজায় আসা যায়। মুলত এটাই ছিল শীত-বর্ষা দুই ঋতুতেই বিরাহিমপুর গ্রামের ভেতর থেকে আমাদের ইয়ার বাড়িতে আসার প্রধান রাস্তা। শীতকালে আমরা দাদার বাড়িতে গেলে জকসিন হতে নৌকা না নিয়ে রিকশায় করে খালের পাশের মাটির রাস্তা ধরে বালাসপুর এসে সোজা দাদারবাড়ির পশ্চিম দিকের খালপাড় পর্যন্ত না গিয়ে নোয়াহাটখোলার পুল দিয়ে খালের ডানদিকের পথ ধরে দেওয়ান বাড়ির সামনে দিয়ে পূর্বদিক হতে আমরা দাদার বাড়িতে ঢুকতাম।

 

# দাদার বাড়ির ইতিহাস

আমার দাদার বাড়ির ছোট্ট একটা ইতিহাস আছে। আমার দাদারা দুই ভাই-বড়জন আমার দাদা মৌলভি সালামতউল্লাহ এবং ছোটজন আমাদের ছোট দাদা হাবিবউল্লাহ যাকে আব্বারা আদর করে ‘দুদু’ বলে ডাকতেন। দাদাদের আদি বাড়ি ছিল বড়ালিয়া (এক বড় আউলিয়ার মাজার থেকে এ নাম)। খুব ছোটবেলায় বাবা-মা মারা যাওয়ায় উনারা মামার বাড়ি বিরাহিমপুর চাপরাশি বাড়িতে, মুলত উনাদের সবচেয়ে ছোট খালার পরম স্নেহ-মায়াতেই বড় হন। পরবর্তিতে পাশের দেওয়ান বাড়িতে ছোট খালার বিয়ে হলেও উনার অপত্য স্নেহ-ভালোবাসা হতে কখনো বন্চিত হননি দাদারা দুই ভাই। জীবনের সেই সংকটময় সময়ে মা-বাপহারা এই দুই ভাইকে পাখির মত আগলে রাখেন তাদের এই ছোট খালা।আমার দাদার এই মহীয়শী ছোট খালাই হলেন আমার নানার মা-আমার আম্মার আপন দাদু । আমার দাদা ও নানা তাই আপন দুই খালাতো ভাই আর সেদিক হতে আমার আব্বা-আম্মা সম্পর্কে চাচাতো ভাই-বোন। দেওয়ান বাড়ি আম্মার দাদার বাড়ি আর সেই সুবাধে আমাদেরও নানার গ্রামের বাড়ি। যাই হোক, আব্বার কাছে শুনেছি ১৫-২০ বছর বয়সের সময় আমার দাদা ভাগ্যান্বষনে কোলকাতা চলে যান। বৃটিশ আমল তখন, ১৯১৫-২০ সালের ঘটনা। ছোট দাদা গ্রামেই মামার বাড়িতে থেকে যান, যদিও দেওয়ান বাড়ির ছোট খালাই মুল অভিবাবকত্ব জারি রাখেন- কখনো নিজের কাছে রেখে ভালোমন্দ খাইয়ে-পরিয়ে আবার কখনোবা দূর হতে দিক-নির্দেশনামুলক পরামর্শ প্রদান করে।

কোলকাতায় গিয়ে দাদা জাহাজে চাকরি নেন, জাহাজেই থাকতেন বছরের বেশির ভাগ সময়। আব্বার কাছে শুনেছি জাহাজ কোলকাতায় ভিড়লে দাদা থাকতেন কোলকাতার রাইটার্স বিল্ডিং এর আশেপাশে কোথাও-বছরে একবার কি দুবার গ্রামে আসতেন। বাইরে থাকার কারনে আমার দাদা বিয়েও করেন দেরি করে। ৩০ এর দশকের শেষ দিকে দাদা যখন পাশের মদনপুর গ্রামের বুধার বাড়িতে আমার কিশোরী দাদুকে বিয়ে করেন উনাদের বয়সের ব্যবধান ছিল প্রায় ২০-২৫ বছরের মত। দাদা তার নববিবাহিত স্ত্রীকে মামার বাড়িতে রেখেই আবার কোলকাতা ফিরে যান এবং আগের ধারায়ই বছরে দুই-একবার গ্রামে এসে পরিবারের সাথে সময় কাটিয়ে যেতেন। এই মামার বাড়িতেই দাদা-দাদুর কোল আলো করে বিয়ের তিন-চার বছরের মাথায় আমার জ্যাঠা -সেকান্দর মিয়া এবং উনার প্রায় ৬/৭ বছর পর আমার আব্বা-মো: আলী আকবর এর জন্ম। দাদা উনার ছোট ছেলে মানে আমার আব্বাকে আদর করে ডাকতেন ‘আলী’ আর দাদু ডাকতেন ‘আকাব্বর’।

তো দাদা কোলকাতা যাবার পর থেকেই উনার মামাদের কাছে পরিবারের, বিশেষ করে ছোট ভাইয়ের দেকভালের জন্য নিয়মিত টাকা পাঠানোর পাশাপাশি সময়ে সময়ে মামার বাড়ির আশেপাশে নিজের জন্য কিছু সম্পত্তি কেনার জন্যও টাকা পাঠাতেন। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, মামারা সে টাকা দিয়ে দাদার বা দাদার ভাইয়ের নামে কিছু না কিনে আমাদের বর্তমান ইয়ার বাড়ির ভিটা সংলগ্ন এলাকায় নিজেদের নামেই জমি কিনতে থাকেন। দাদা ছিলেন সহজ-সরল আর ভদ্র মানুষ, ভুলেও বুঝতে পারেননি কি হচ্ছে এদিকে। বাইরে থাকায় জমির কাগজ বা দলিলপত্র ওভাবে কখনো দেখেননি বা দেখার সুযোগও পাননি-মামাদের মুখের কথার উপরই ভরসা রেখেছিলেন! ছোট দাদা বুদ্ধিমান ছিলেন আর গ্রামে থাকায় কিছুটা টেরও পেতেন মামারা ভাইয়ের পাঠানো টাকা দিয়ে কি করছেন কিন্তু শক্তভাবে বিষয়গুলো খতিয়ে দেখার মত পজিশনে ছিলেন না। যাই হোক নিজের ছোট ছেলের (আমার আব্বা) জন্ম আর ছোট ভাইর ( ছোট দাদা) বিয়ের পর নিজেদের আপন ভিটি পত্তনের উদ্দশ্যে আমার দাদা যখন মামাদের কাছে উনার সম্পত্তি বুঝে নিতে চাইলেন-মামারা পুরোপুরি অস্বীকার করলেন। দাদার জমির কাগজপত্রতো মামারা নিজেদের নামেই করে রেখেছিলেন ফলে গ্রাম্য সালিশ বা মুরুব্বিদের হস্তক্ষেপেও বিশেষ কোন লাভ হয়নি- কোটকাচারির বিষয়গুলোতো বুঝতেনইনা দাদারা! আপন মামাদের এই বিশ্বাসঘাতকতায় দাদা অনেক কষ্ট পেয়েছিলেন কিন্তু কিছু করার ছিলনা। এই অন্যায়ের বিচারের ভার আল্লাহর উপর ছেড়ে দিয়ে, উত্তর বাড়ির নুরুল আমিন হাজির বাবা (আজিজুর রহমান) আর ছোট দাদার পরামর্শে আমার দাদা নিজের অর্জিত টাকায় আজকের ইয়ার বাড়ির বর্তমান ভিটার একটা অংশ পাশের পাটোয়ারি বাড়ির কোন এক ওয়ারিশের কাছ হতে কিনে নেন। মামার বাড়ির ক্রমশ দু:সহ হয়ে উঠা পরিবেশ থেকে মুক্ত হয়ে নিজেদের ছোট্ট এই নতুন ভিটার উত্তর ও দক্ষিনে দুটি নতুন টিনের ঘর তৈরির মাধ্যমেই শুরু হয় দুই ভাইয়ের স্বাধীন সংসার জীবন, ১৯৪৮-৫০ এর মাঝামাঝি কোন সময়ে সম্ভবত। পরিবারসহ দাদারা যখন নতুন বাড়িতে (বর্তমান ইয়ার বাড়ি) উঠেন আমার আব্বার বয়স সম্ভবত এক কি দুই, আর জ্যাঠার বয়স সাত কি আট। এই ইয়ার বাড়িতেই আমার বড় ফুফু খোদেজা বেগম (আব্বার ৩/৪ বছরের ছোট) আর দাদার পরিবারের সর্বকনিষ্ঠ সন্তান আমাদের আদরের ছোট ফুফু ফাতেমা বেগমের (বড় ফুফুর ৪/৫ বছরের ছোট) জন্ম হয়। অন্যদিকে ছোট দাদা নতুন বাড়িতে উঠেন উনার সদ্য বিবাহিত স্ত্রীকে নিয়ে-তখনো কোন সন্তান হয়নি উনাদের। ছোট দাদা বিয়ে করেছিলেন দেওয়ান বাড়িতে-উনারই মাতৃসম ছোটখালার অতি আদরের মেয়ে ময়ফুলি কে (আমার নানার আপন বোন)।এই নতুন বাড়িতেই সম্ভবত ১৯৫২ সালের দিকে দুই নাবালক সন্তান-শফিক ও আবুকে রেখে সেসময়ের ভয়ংকর কলেরা রোগে মারা যান আমার ছোট দাদু যিনি সম্পর্কে আমার আম্মার আপন ফুফু ছিলেন। তখন শফিক কাকার বয়স মাত্র দু বছর আর আবু কাকার বয়স ৬/৭ মাস। মৃত্যুশয্যায় ছোট দাদু নাকি আমার দাদুর হাত ধরে অনুরোধ করেছিলেন উনার মৃত্যুর পর আমার দাদু যেন তাঁর দুই নাবালক সন্তান শফিক আর আবুকে নিজের ছেলেমেয়েদের মতই আদর-যত্নে আগলে রাখেন। আমার দাদু তাঁর কথা রেখেছিলেন-শফিক ও আবু কাকাকে নিজের ছেলেমেয়েদের মতই অপত্য মাতৃস্নেহে লালন পালন করে বড় করেন। ছোট দাদা পরে পাশের মালেদের বাড়িতে আবার বিয়ে করেন এবং তাঁর গর্ভেই আমার নুরু কাকা, কুলসুম ফুপু, শামু কাকা আর হোসেন কাকার জন্ম। ছোটদাদু বলতে আমরা এই দাদুকেই চিনতাম।

যাই হোক, নতুন ভিটা কিনার পরও চারদিকে মামাদের জমি থাকায় নানাভাবেই উনারা দুই দাদার পরিবারের চলাফেরায় প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করতে থাকেন। ৬০ এর দশকের শুরুতে আমার দাদা কোলকাতা থেকে স্থায়ীভাবে বাড়িতে এসে বিষয়গুলো দেখে সত্যিই বড় কষ্ট পান-অথচ বাড়ির ভিটি সংলগ্ন মামাদের এই জমিগুলোর বেশীরভাগই দাদার কোলকাতা হতে পাঠানো টাকায় কেনা! পরে আমার আব্বা যখন পড়াশোনা করে কৈশর পেরিয়ে তারুন্যে, জমি-জমার হিসেব নিকেষ যখন একটু একটু করে বুঝতে শিখেন তখন নিজ উদ্যেগেই ধাপে ধাপে দাদাদের বাড়ির বাইরের দিকের কিছু জমি বিক্রির ব্যবস্থা করে বাড়ি সংলগ্ন দাদার মামাদের দাবিকৃত বা দখলিকৃত জমিগুলো পুন:-ক্রয়ের ব্যাপারে উদ্যোগী ভুমিকা নেন। এসময় বুদ্ধি-পরামর্শ দিয়ে আমার ছোট দাদা আর উত্তর বাড়ির মতিন মাস্টারও আব্বাকে অনেক সহযোগিতা করেন।পরবর্তিতে আব্বার চাকুরি জীবনে মুল ভিটিসংলগ্ন এই জমি পুন:ক্রয় প্রক্রিয়া আরো ত্বরান্বিত হয় এবং সেই ধারায়ই ৬০’র দশকের শেষ হতে ৮০’র দশকের শুরু পর্যন্ত মুল ভিটি সংলগ্ন জমির মালিকানা পুন:প্রতিষ্ঠিত হয়ে আমাদের আজকের ইয়ার বাড়ির বর্তমান সীমানা অর্জিত হয়!

 

# আমার চোখে দেখা দাদার বাড়ি

আমার জ্ঞানবুদ্ধি হবার পর হতে ইয়ার বাড়ির যে রূপটা দেখি তা হল- বাড়ির উত্তর দিকে ছোট দাদার ঘর আর দক্ষিন দিকে আমার দাদার ঘর আর সংলগ্ন একটা একচালা ঘর যাকে উনারা বলতেন ‘সারভার তল’। বাড়ির উত্তরদিকে ছোট দাদার ঘরের পশ্চিমে আমার দাদাদের আরেকটা ঘর ছিল যাকে সবাই বলতো ‘উত্তর ঘর’। এই ‘উত্তর ঘরের’ পিছন দিক দিয়ে কিছু খালি জায়গা পেরিয়ে একটা নিচু ডোবার মত ছিল যেখানে আব্বা-চাচা ও চাচাতো ভাইদের মাছ ধরতে দেখেছি। দুই দাদার মুল ঘরের মাঝখানে ছিল একটা বড় উঠান। এই উঠানের পূর্বদিক জুড়ে ছিল দাদাদের লাগোয়া দুটি রসুই ঘর। দুটি রসুই ঘরেরই সামনের দিকে বেড়া দিয়ে ঘেরা উন্মুক্ত অংশে ছিল অতিরিক্ত মাটির চুলা-প্রকৃতপক্ষে এই উন্মুক্ত চুলাগুলোতেই রান্না হত বেশি। রসুই ঘরের গা ঘেঁষে উঠানের দিকে মুখ করে ছিল দাদাদের দুটি হাঁস-মুরগির ঘর বা খোঁয়াড়। দাদাদের ঘরের মাঝ বরাবর কুলুঙিতে ঝুলানো কবুতরের কয়েকটি ঘরও ছিল। ছোটদাদাদের রসুই ঘরের পরে বাড়ির উত্তর-পূর্ব কোনায় ছিল শফিক কাকার (ছোট দাদার বড় ছেলে) পুরানো ঘর। এই ঘরের সামান্য উত্তর-পূর্বে বাড়ির পুরানো পুকুরের গা ঘেঁষে ছিল বাড়ির প্রধান বাথরুম। দাদাদের রসুইঘরের পূর্বে ছিল বাড়ির পুরানো পুকুর আর পুকুরের পূর্ব দিকের পাড় হতে খানিকটা জঙ্গল পেরুলেই পাটোয়ারি বাড়ির সীমানা শুরু। কোন এক সময় বাড়ির পুরানো পুকুর ও রসুইঘরের মাঝখানের সরু পায়ে হাটা পথের এক পাশে রসুই ঘরের গা ঘেষে দাদা-দাদুদের হাঁস-মুরগির খোঁয়াড় দেখেছিলাম বলে মনে হয়।অন্যদিকে, বাড়ির উঠানের পশ্চিম দিকে ছিল একটা টিউব ওয়েল, একটা বড় তুলা গাছ আর কিছু ঝোপঝাড়। এরপর একটু নিচু জমিতে ছিল লাউ বা কোমড়ার মাচা। ৮৫/৮৬ সালের দিকে উঠানের পশ্চিমদিকের এই নিচু জায়গাটাকে আরেকটু পশ্চিমের একটা নিচু জমি হতে মাটি তুলে ভরাট করে উঠানের সমান উঁচু করা হয়। বাড়ির বর্ধিত উঠানের উত্তর পাশে আমাদের পুরানো ‘উত্তর ঘরে’র একটু সামনে শফিক কাকা তার নতুন ঘর তোলেন। আর পশ্চিমের যে জমি হতে মাটি উত্তোলন করা হয় সেখানে বাড়ির জন্য একটা নতুন পুকুর কাটা হয়। এই পুকুরের পশ্চিম পাড় পর্যন্ত পশ্চিম দিকে দাদার বাড়ির নতুন সীমানা নির্ধারন করা হয়। এই পুকুরটির পশ্চিম পাড় হতে বড় খাল পুরোটাই ছিল নিচু ক্ষেতি জমি-আর কোন বাড়ি ছিলনা মাঝখানে। নতুন পুকুরের চারদিক ঘিরে অনেকগুলো কলা গাছ লাগানো হয়। কলাগাছের ফাঁকে ফাঁকে কিছু নারকেল, তাল, সুপারিগাছ আর ঝোপ-ঝাড় লাগিয়ে পুকুরটাকে বাইরের মানুষের দৃষ্টির আড়াল করা হয়।

 

(১) দাদাদের ঘর

দাদাদের ঘরগুলো তখনো ঢেউটিন আর কাঠের খুঁটিতে তৈরি, উপরে টিনের চাল। দরজা-জানালাগুলোও ছিল টিন-কাঠের ফ্রেইমের এবং এগুলো খোলা-বন্ধ করার জন্য ছিল কাঠের খিলান। ঘরের কাঠের ফ্রেইম বা খুঁটিগুলোতে আলকাতরা মেখে স্থায়িত্ব বাড়ানো হতো। আলকাতরা লাগানোর পর প্রথম প্রথম ঘরের ভেতর আলকাতরার গন্ধ থাকতো মোটামুটি প্রকট! ঘরের ভেতরের রুমগুলো ছিল বাঁশের বেড়া দিয়ে আলাদা করা। প্রাইভেসি ছিল কম-পাশের রুমের খুটখাট, ফিসফিস বা কথাবার্তা সবই মোটামুটি কান খাড়া থাকলে শোনা যেত। দাদাদের ঘরের মেঝে তখনো মাটির। এই মাটির মেঝে ঘরের টিনের দেয়ালের বাইরেও প্রায় দেড় দুই হাত চওড়া ছিল। আমার জেঠি-চাচি বা দাদুদের প্রায়ই দেখতাম পানি, কাদা মিশানো আধা তরল মিশ্রণে কাপড় চুবিয়ে লেপে লেপে মেজে ঐ মেঝের শুকিয়ে যাওয়া, ফেটে যাওয়া অবস্থা থেকে রিস্টোর করতেন। আর একটু শুকিয়ে গেলে পুরো ঘরের মেঝের বাইরের দিক কী যে পরিচ্ছন্ন ও সুন্দর লাগতো! এই মাটির মেঝে বাইরের থেকে খুঁড়ে বা সিঁদ কেটে চুরি-ডাকাতির কথা গ্রামে অনেক শোনা যেত যদিও আমাদের বাড়িতে এধরনের ঘটনা ঘটতে শুনি নাই খুব একটা।গরমকালে রোদে টিনের ঘর অনেক গরম হয়ে পড়তো। কারেন্ট না থাকায় ঘরে বানানো বেতের হাতপাখা (বিছন) ঘুরিয়ে বাতাস খাওয়া ছাড়া আর কোন উপায় ছিলনা। বাড়ির পুকুর সংলগ্ন অনেকগুলো মোস্তাক গাছ ( একধরনের বেত গাছ) ছিল যার ছাল পাতলা স্লাইস করে কেটে দাদু বা জেঠি আম্মা নিজ হাতেই নানারকম নকশা সমৃদ্ধ বিছানা, নামাজের চাটাই, বিছন বা হাতপাখা তৈরি করতেন।নকশা করার জন্য নির্দিষ্ট কয়েকটা বেতের স্লাইসে কালো রং মাখানো হত। এধরনের বেতের চাটাই বা বিছানায় গরমকালে শুয়ে অনেক আরাম পাওয়া যেত।শৈশবে দাদার বাড়ি হতে আমাদের মাইজদি বা ঢাকার বাসায় নানা ডিজাইনের কত নামাজের চাটাই, বিছানা আর হাতপাখা যে পাঠানো হয়েছিল বলে শেষ করা যাবেনা। জানিনা গ্রামের বাড়ি-কেন্দ্রিক বেতের এই কুটিরশিল্প এখনো টিকে আছে কিনা! যাই হোক, গরমকালে শনের ছাদওয়ালা বেড়ার ঘরে টিনের ঘরের মত অতটা গরম লাগতোনা- বাড়িতে শফিক কাকার সংসারের প্রথম ঘরটায় এইরকম আরাম পাওয়া যেত। অন্যদিকে, শীতকালে রাতের বেলায় টিনের ঘরগুলো অসম্ভব ঠান্ডা হয়ে যেত। তার উপর মাটির মেঝে আর টিনের দেয়ালের মাঝের ফাঁকা জায়গা দিয়ে হু হু করে বাতাস ঢুকে পুরো ঘরটাকে একধরনের আইস হাউজ বানিয়ে ফেলতো-দুই তিন লেয়ারের লেপ গায়ে দিয়ে শীতের ঠান্ডাটাকে তখন মানাতে হত। তবে টিনের ঘরের সবচেয়ে আকর্ষনীয় অভিজ্ঞতা হত বর্ষাকালে। টিনের চালের উপর ঝমঝম বৃষ্টির শব্দ শোনার মত রোমান্টিক মুহুর্ত বোধ হয় খুব কমই আছে এই পৃথিবীতে। আজো দুরপ্রবাসে বসে যখনই বৃষ্টি দেখি মনটা কেমন যেন ছুটে যায় দেশ-কাল-সীমানা পেরিয়ে শৈশবে, আমাদের গ্রামের বাড়িতে, সেই বৃষ্টির দিনগুলোয়-দাদার ঘরে টিনের চালের নিচে শুয়ে বৃষ্টির শব্দ শোনার সেই আকুলতায়। বড় স্মৃতিকাতর হয়ে পড়ি তখন!

 

(২) দাদাবাড়ির রসুই ঘর ঢেকি

বাড়ির উঠানের পূর্বপাশে, দাদার ঘরের ভিতরের রুমের দরজা দিয়ে বের হলেই সামনে পড়তো বেড়া ঘেরা ছোট জায়গায় দুই ইউনিটের দুইটা উন্মুক্ত মাটির চুলা যার পেছনে ছিল দুই দাদার লাগোয়া দুটি রসুই ঘর। ছোটদাদার রসুই ঘরের সামনেও বেড়া দিয়ে ঘেরা একটা ছোট জায়গায় উন্মুক্ত দুটি মাটির চুলা ছিল। বৃষ্টিবাদল না হলে দাদু-চাচিরা বাইরের এই উন্মুক্ত চুলাতেই রান্না করতেন। রান্নার জন্য বাড়ির কোন গাছের কাঠ, ডালপালা বা শুকনা পাটকাঠি ব্যবহার করা হত। কাঠের আগুন তড়কে দেয়ার জন্য মাঝে মাঝে দাদু বা জেঠিকে দেখতাম বাঁশের সিলিন্ডারের মত গোল একটা নলে মুখ চেপে ফুঁ দিতে। আগুনের ভাঁপে দাদু-জেঠিদের মুখ ঘামে নেয়ে উঠতো। কাঠের আগুনের ধোঁয়ায় যারা রান্না করতেন তাদেরতো বটেই পাশে দাড়িয়ে থাকলে আমাদেরও চোখে পানি চলে আসতো। তবে শীতকালে রাতের বেলায় রান্নার সময় চুলার পাশে দাড়ালে বড় আরাম লাগতো। রাতের নিকষ অন্ধকারে চুলার আগুনের আঁচে দাদু বা জেঠির মুখটা অতিপ্রাকৃতিক মনে হত! বাইরের এই উন্মুক্ত চুলাগুলোর পিছনেই ছিল দাদার মুল রসুইঘর। সেখানেও ছিল আরো দুটো মাটির চুলা। বৃষ্টি-বাদল হলে বা অতিরিক্ত চুলার ব্যবহার দরকার পড়লেই কেবল এই চুলাগুলাতে রান্না চড়ানো হত। রান্নার পর বিড়ালের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য তরকারির পাতিল মাটি হতে একটু উপরে পাটের দড়ির শিকায় ঝুলিয়ে রাখা হত। রান্নার জন্য রসুইঘরের এককোনায় পাটকাঠির স্তুপ বা কাঠের লাকড়ি রাখা থাকতো। খুব ছোটবেলায় দাদার বাড়িতে মাটির চুলায় বা লাকড়িতে আগুন ধরানের জন্য দিয়াশলাইর ব্যবহার দেখি নাই খুব একটা। গন্ধক (সালফার) আর পাটকাঠি সহযোগে একটা বিকল্প ব্যবস্থার কথা কিছুটা মনে আছে। বাজার থেকে হলুদ গন্ধকের (রম্বিক সালফার) ছোট ছোট চাক কিনে এনে মাটির থালার উপর রেখে মাটির চুলার আগুনের হালকা তাপে গন্ধকটা গলিয়ে ৩-৪ ইঞ্চি করে কাটা শুকনা পাটকাঠির দুই মুখে গুঁজে দিয়ে ঠান্ডা করে শুকানো হত।এই গন্ধকে গোঁজা পাঠকাঠির একটা মাথা মাটির চুলায় রান্নার পরে পড়ে থাকা ম্রিয়মান তুষের আগুনে সামান্য একটু ধরলেই দপ করে আগুন জ্বলে উঠতো। গন্ধক- পাটকাঠির এ সমন্বিত ব্যবস্থা অনেকটা আজকের দিনের দিয়াশলাই বা ফায়ার স্টার্টারের মত কাজ করতো।পরবর্তিতে দিয়াশলাই সহজপ্রাপ্য হয়ে পড়ায় আগুন ধরানোর জন্য গন্ধক-পাটকাঠির সরাসরি ব্যবহার আস্তে আস্তে কমে যায়।

মাঝে মাঝে জ্যাঠাতো ভাই মিলনের সাথে লুকিয়ে লুকিয়ে রসুই ঘরে ঢুকে ছোট পাটকাঠির মাথায় আগুন জ্বালিয়ে অন্য মাথা দিয়ে বড়দের মত সিগারেট খাওয়ার কায়দায় টান দিয়ে ধোঁয়া ছাড়তাম। পাঠকাঠির জলন্ত শলাকা ফুঁকেই আমার প্রথম ধুমপানের অভিজ্ঞতা! তবে পাটশলাকা দিয়ে ধুম্রপানের অভিজ্ঞতা খুব একটা সুখকর ছিলনা-দুএকটা টান দেবার পরই ঠোঁটে আগুনের প্রচন্ড তাপ লাগতো। সহ্য করতে না পেরে এই ধুম্রশলাকাটি তখন ছুঁড়ে ফেলে দিতাম।

রসুই ঘরের ভেতরে একপাশে ছিল একটা কাঠের ঢেকি যেখানে আমি নিজেও জেঠিআম্মাকে ধান ভানতে দেখেছি। ঢেকির গোড়ার দিকে একজন মহিলাকে দেখতাম ঠিক উপরেই আড়াআড়ি করে ঝুলানো একটা বাঁশের খুঁটিতে হাত দিয়ে শরীরের ভার ধরে রেখে এক পা মাটিতে রেখে আরেক পা দিয়ে ঢেকির গোড়ার চ্যাপ্টা অংশে চাপ দিয়ে ঢেকির লম্বা মাথাটাকে ছন্দে ছন্দে উঠাতেন আর নামাতেন। সেই সাথে ঢেকির লম্বা মাথার সামনের দিকে লম্বালম্বি করে লাগানো কাঠের দন্ডটাও উপরে উঠে ও নেমে নিচের মাটিতে গর্ত করা অংশে রাখা ধান ভেনে যেত। এই শক্ত দন্ডটি উঠানামার সাথে অপূর্ব সমন্বয় রেখে আমার জেঠি আম্মা হাত দিয়ে গর্তের ধানগুলোকে একটু নাড়িয়ে দিতেন। ঢেকিতে ধান ভানার এই পুরো প্রক্রিয়াটাই ছিল ভীষন শৈল্পিক এবং দৃষ্টিমনোহর । ঢেকিতে ধান ভানা ছাড়াও ভিজা চাল গুড়া করে চালের গুঁড়ির আটা তৈরি করা হত। দাদার বাড়ি হতে প্রায়ই এই চালের গুড়ির আটা আমাদের মাইজদি বা ঢাকার বাসায় পাঠানো হত। কোরবানির মাংসের সাথে এই চালের গুড়ির আটার রুটি এখনো আমার অসম্ভব প্রিয় একটা খাবার।কালের পরিক্রমায় বাজারে ধান ভানার কল চলে আসলে দাদার বাড়িতে ঢেকির ব্যবহার অনেকটাই কমে যায়। কালের সাক্ষী হিসেবে দাদুর রসুই ঘরে ঢেকিটি অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে ছিল আরো বেশ কয়েকবছর!

 

(৩) দাদাবাড়ির উঠান

দাদার বাড়ির উঠানটা ছিল মোটামুটি বড় আর মাটি অত আঠালো ছিলনা বলে পানি জমতোনা বা প্যাঁক-কাদাও খুব একটা হতে দেখতামনা। দিনের বেলায় বাড়ির গুঁড়া-গাঁড়া পোলপানরা উঠানের মাটিতে গড়াগড়ির খেলা করতো। শরীরের স্পর্শকাতর জায়গাসহ উনাদের নাংগা শরীরের বিভিন্ন অংশে শুকনা মাটি বা কাদা লেগে থাকত যা দেখতে বড়ই মনোহর ছিল। এই পোলাপানদের নাংগা কোমরে কালো কাইতন বা ফিতা বেধে দুইটা পিতলের ছোট ঝুনঝুনি ঝুলিয়ে দেয়া হতো যাতে উনারা উঠান থেকে এদিক সেদিক বা পুকুরের দিকে গেলে ঝুনঝুনির শব্দ ধরে গুরুজনরা উনাদেরকে রক্ষা করতে পারতেন। আমরা বাড়িতে গেলে কদাচিৎ আমাদের উঠানে চাচাতো-ফুফাতো ভাই-বোনেরা একসাথে লুকোচুরি, কানামাছি, মাঝে মাঝে ফুটবল আর ব্যাডমিন্টন খেলতাম। খেলাধুলার জন্য কাচাড়ি ঘরের সামনের জায়গায় বা বাড়ির পাশের নিচু জমিতেই আমরা সবাই জড়ো হয়ে খেলাধুলা করতাম।

উঠানের পূর্বদিকে দাদাদের রসুই ঘরের সাথে লাগোয়া ছিল কাঠের এবং টিনের তৈরি দুটি হাঁস-মুরগির খোঁয়ার। দিনের বেলায় হাঁস-মুরগিগুলো ছেড়ে দেয়া হত আর সন্ধ্যার আগে আগে দাদু বা জেঠি আম্মা ‘আ তই তই তই তই তই’ করে ডেকে বাড়ির আনাচে কানাচে হতে উঠানে জড়ো করে খোঁয়াড়ে ঢুকাতেন। বাড়ির উঠানে দিনের একটা সময় হাঁস-মুরগি, কবুতরের খাবার হিসেবে খুদ, গম বা ভাত ছিটিয়ে দেয়া হত। উঠানের এদিক ওদিকে চোখে পড়তো হাঁস-মুরগি বা কবুতরের বিষ্ঠা। আমরা বাড়িতে গেলে দাদু প্রায়ই এই গৃহপালিত হাঁস-মুরগি বা কবুতর জবাই করে আমাদের জন্য রান্না করতেন। মাটির চুলায় ঝালঝাল করে রান্না করা মাংসের স্বাদ যেন এখনো মুখে লেগে আছে! এছাড়া মাঝেমাঝেই বাড়ির হাঁস বা মুরগির সদ্যপাড়া ডিম সিদ্ধ বা পোচ করে আমাদেরকে খেতে দেয়া হত।

ধান কাটার পর মাঝে মাঝে উঠানে মেশিন বসিয়ে ধানের শীষ থেকে চুরানি দিয়ে ধান আলাদা করা হত। আমার হালকা মনে আছে চুরানি মেশিন আসার আগে বাড়ির উঠানে বড় বড় কলসাকৃতির মাটির মটকায় ক্ষেত হতে কাটা ধানের শীষের গোছা ধরে পালাক্রমে বাড়ি দিয়ে ধান আলাদা করা হত। কিন্তু জ্ঞানবুদ্ধি আসার পর ধান বা চাল সংরক্ষন ছাড়া বাড়িতে মাটির মটকার ব্যবহার আর দেখি নাই। যাই হোক, ধান আলাদা করার পর উঠানে বেতের চাটাই বিছিয়ে তার উপর ভিজা ধান ছড়িয়ে সূর্যের আলোয় শুকাতে দেয়া হত। দাদু-জেঠি-চাচিরা মাঝেমাঝে উঠানে এসে পা দিয়ে ধানগুলো মাড়িয়ে বা উল্টেপাল্টে দিতেন! উঠানের পূর্বদিকে গোল-পোষ্টের মত করে লাগানো বাঁশের খুঁটিতে বাড়ির ভেজা কাপড়চোপড় শুকানো এবং লেপ-তোষকে ওম দেয়া হত।

গরমের দিনে বিকেলের দিকে বা রাতের বেলায় বাড়ির উঠানে চাটাই বিছিয়ে বা লম্বা টুল বসিয়ে দাদা-দাদু, চাচা-চাচি আর আমরা পোলাপানরা বাইরের বাতাস খাবার জন্য জড়ো হয়ে বসতাম। আব্বা-চাচারা নানারকম পারিবারিক আলাপ সারতেন। পূর্নিমার রাতে চাঁদের আলোয় এই সময়টা বড় অসাধারন কাটতো! অমাবশ্যার সময় কখনো কখনো হারিকেন ডিম করে রেখে উঠানে বসা হোত। উঠান হতে আশেপাশের বড় বড় গাছ আর ঝোপঝাড়ের দিকে তাকালে কেমন যেন এক গা ছমছম করা অনুভুতি হত! আব্বা-আম্মা বা চাচাদের আরো গা ঘেঁসে বসে ভয়ের অনুভুতি দূর করতাম। শীতকালে রাতের বেলায় উঠানের অন্ধকার কোনে বা ঝোপে জোনাকি পোকারা যখন একে একে জ্বলে উঠতো চারপাশটাকে এক রূপকথার জগৎ মনে হত। এক অপার্থিব সৌন্দর্য্যে মনটা জুড়িয়ে যেত! শীতের ভোরে বা রাতে উঠানের মাঝখানে খড়, পাটকাঠি আর শুকনা ডালপালা জড়ো করে সবাই মিলে আগুন পোহানোর স্মৃতি সত্যিই ভোলার নয়! অনেক ছোট থাকতে যখন বাড়ি যেতাম রাতের বেলা শামু কাকা বা হোসেন কাকা প্রায়ই আমাদেরকে কোলে নিয়ে উঠানের মধ্যে হেঁটে হেঁটে গান শুনিয়ে আমাদের ঘুম পাড়াতেন। শামু কাকার গলায় ‘এই পদ্মা এই মেঘনা’ গান শুনে ঘুম আসার কথা এখনো বেশ মনে পড়ে।

বাড়ির বড় কোন অনুষ্ঠানে, চল্লিশা বা চারদিনের খাবার খাওয়ানোর সময় পুরা উঠান জুড়ে চাটাই বিছিয়ে লোকজনদের বসিয়ে খাবার পরিবেশন করা হত। ৮১/৮২ সালের দিকে আমার নুরু কাকা আর হাফেজ কাকার বিয়ের বৌভাতের খাবার অ্যারেন্জমেন্টও বাড়ির উঠানে হয়েছিল বলে কিছুটা মনে পড়ে। এটুকু মনে আছে নুরু কাকা নিজের বিয়ের পর, সম্ভবত বৌভাতের অনুষ্ঠানে নিজেই গরম ভাত আর গরুর মাংস পরিবেশন করেছিলেন। এই অনুষ্ঠানেই সম্ভবত জীবনেপ্রথম ভারি খাবারের পরে পাতলা দই আর বাতাসা খাবার অভিজ্ঞতা হয়েছিল। এরপর ৮৮/৮৯ সালের দিকে এই উঠানেই জেঠাতো বোন রত্না আপা আর চাচাতো বোন সুফিয়ার বিয়ের দিনের রং ছুড়াছুড়ি আর খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। বাড়ির রসুই ঘর হতে বড় কাঁচের বাটি বা অ্যালুমিনিয়ামের বোল এ করে ভাত, মাংস বা ডাল উঠানে এনে কাকারা নিজ হাতে মেহমানদের খাবার পরিবেশন করতেন। পোলাও-কোর্মা খাবার পর মাটির হাড়ি হতে সুস্বাদু দই আর বাতাসা পরিবেশন করা হত। দাদা-দাদুর মৃত্যুর পর চারদিনের আর চল্লিশা খাওয়ার আয়োজনও এই উঠানেই করা হয়।

 

(৪) দাদা বাড়ির গোয়াল ঘর, কাচাড়ি পরিপার্শ্ব

গ্রামের ভেতর দিয়ে উত্তর বাড়ি হয়ে পাটোয়ারি বাড়ির সামনে দিয়ে বড় খাল বরাবর পশ্চিম দিকে অগ্রসর হয়ে আমাদের বাড়িতে আসলে হাতের ডানে বাড়ির পুরানো পুকুর ঘেঁসে শুরুতেই চোখে পড়তো একটা বড় খড়ের গাদা।একটা শক্ত বাঁশ বা সুপারি গাছের চিকন লম্বা গুঁড়িতে মাটি হতে শুরু করে গুঁড়ির মাথা পর্যন্ত খড় পেঁচিয়ে কীভাবে এই বিরাট খড়ের গাদাটি তৈরি করা হত তা ছিল আমার কাছে এক বড় বিস্ময়! গরুর খাবার হিসেবে তো বটেই গ্রামের বাড়িতে জ্বালানী হিসেবেও খড়ের এক ব্যাপক ব্যবহার ছিল। মোটামুটি শীতকালে রাতের বেলা বা ভোরে এই খড় পুড়িয়েই বাড়িতে বাড়িতে আগুন পোহানো হত। মাঝেমাঝে খড়ের সাথে শুকনা পাটকাঠিও যোগ করা হত। সেই খড় পোড়ানোর গন্ধ যেন এখনো নাকে লেগে আছে! কোন কোন সময় খড় পোড়ানোর সময় আগুনের মধ্যে দুই-একটা আলুও দিয়ে দেয়া হত। গ্রামের বাড়িতে মাটির চুলায় বা খড়ের আগুনে পোড়ানো এই সিদ্ধ আলু খাবার স্বাদ বা অভিজ্ঞতা ছিল সত্যিই অসাধারন।

দাদার বাড়িতে ঢুকার মুখের এই খড়ের গাদার একটু সামনেই বাড়ির পুরানো পুকুরের ধার ঘেষে ছিল আমার দাদার গোয়াল ঘর।দাদারা তখন গরু পালতেন যা বর্গা চাষে ব্যবহৃত হতো। গরুর কাঁধে জোয়াল বসিয়ে আর মুখে কাঁউর লাগিয়ে (যাতে লাংগল টানার সময় আশেপাশের ঘাস, লতাপাতা বা ধান মুখে দিতে না পারে) চাষের ক্ষেতে লাংগল টানানো ছিল গ্রাম-বাংলার এক অতি পরিচিত দৃশ্য! আজও যেন স্মৃতির পাতায় পরিষ্কার দেখতে পাই দাদার গোয়াল ঘরে গরুগুলোর ঘাস বা খড়কুটো খাবার পর অলসভাবে বসে থেকে জাবর কাটা আর মাঝে মাঝে লেজ নাড়িয়ে মশা বা মাছি তাড়ানোর দৃশ্য, মাঠ বা গোয়ালঘর হতে ক্ষনে ক্ষনে ভেসে আসা গরুর ‘ হাম্বা হাম্বা’ ডাক, গ্রামের চলার পথের নানা জায়গায় পড়ে থাকা গোবর, খুঁটিতে বাঁধা গরুর পাশ দিয়ে যাবার সময় ছোটপোলাপানদের লাঠির খোঁচা দিয়ে গরুকে উত্তক্ত করার দৃশ্য, মাটিতে শক্ত করে লাগানো খুঁটি হঠাৎ উপড়ে ফেলে দড়ি-খুঁটিসহ মাঠে বাঁধা গরুর অকস্মাৎ এলোপাথাড়ি দৌড় আর পেছন পেছন গরুটির নাগাল পাবার জন্য রাখালের প্রানপন চেষ্টা, খালে-পুকুরে গরুকে গোসল করানো আর গোধূলিবেলায় মাঠ হতে চাচা বা চাচাতো ভাইদের গরুকে হাঁটিয়ে বাড়িতে নিয়ে আসার সেই চিরায়ত দৃশ্য! আমাদের একেবারে ছোটবেলায় দাদার গোয়াল ঘরে ৫/৬ টি গরু-বাছুর চোখে পড়তো। বর্গার গরু ছাড়াও কোরবানির সময় এই পালিত গরু হতেই কোন একটিকে কোরবানি দেয়া হত। পরের দিকে অবশ্য পোদ্দার বাজার হতে আলাদাভাবে কোরবানির গরু কেনা হত। দাদার পালিত গরুদের মধ্যে মোটামুটি কোন একটা গরু সবসময় দুধ দিত। জেঠি আম্মা বা দাদুকে দেখতাম বিশেষ আয়োজন করে গরুর দুধ দোয়াতে। দোয়ানো দুধ একটা অ্যালুমিনিয়ামের বালতিতে সংগ্রহ করে একটা ডেডিকেটেড দুধের হাড়িতে নিয়ে মাটির চুলায় অল্প আঁচে গরম করে সরসহ গরম দুধ রাতের খাবারের পর পরিবেশন করা হত। দুধের চাইতে দুধের সরের প্রতি লোভ বেশি ছিল সবার-নিজের এবং চাচাতো ভাইবোনদের সাথে সর খাওয়া নিয়ে কাড়াকাড়ি লেগে যেত! কখনো কখনো লুকিয়ে লুকিয়ে দুধের হাঁড়ির ঢাকনা সরিয়ে দুধের সর খেয়ে ফেলতাম! বিড়ালের উপদ্রব হতে বাঁচার জন্য দুধের পাতিলটা মাটি হতে একটু উপরে পাটের দড়ির বা নারিকেলের ছোবড়ায় তৈরি শিকায় ঝুলিয়ে রাখা হত।

পাটোয়ারি বাড়ি হতে পশ্চিমদিকে বড়খাল বরাবর পথে আমাদের বাড়িতে ঢুকার মুখে একটু ডান দিকে চেপে খড়ের গাদা আর গোয়াল ঘরকে পেরুলেই হাতের বামে পড়তো বাইল ( সুপারি গাছের ডাল) দিয়ে ঘেরা বাড়ির মহিলাদের বাথরুম। আর তার সামান্য ডানেই বাঁশের ফ্রেইমে ঝুলানো সুপারির গাছের বাইল দিয়ে ঘেরা বাড়িতে ঢুকার একটা ছোট গেইট-যা অতিক্রম করলে বাম পাশে আমার দাদার ঘর, ডানে রসুই ঘর, আর সামনে বাড়ির উঠান। বাড়ির লোক আর খুব পরিচিত মানুষ, বিশেষত মহিলারা এই পথ দিয়ে বাড়িতে ঢুকতেন। অন্যদিকে, পাটোয়ারি বাড়ি হতে দাদার বাড়িতে ঢুকার মুখে ডান দিকে না চেপে বড়খাল বরাবর সোজা পশ্চিম দিকে আমার দাদার ঘরের পিছন দিক দিয়ে একটু এগুলেই হাতের ডান পাশে চোখে পড়তো সুপারির বাইল দিয়ে ঘেরা বাড়ির প্রধান গেইট যা অতিক্রম করলেই বাড়ির উঠান, সামনে ছোট দাদাদের ঘর, আর ডানে আমার দাদার ঘরে ঢোকার প্রধান দরজা। এই পথেই সচরাচর আমাদের বাড়িতে বা উঠানে মেহমানরা ঢুকতেন। দাদার ঘরের পিছন দিক আর এই সরু পথের মাঝে তখনো ছোট একটু ঝোপের মত ছিল। কিন্তু বর্তমানে ঐ ঝোপ পরিষ্কার করে দাদার ঘরের পিছনের দিকে নতুন একটা দরজা করে এই দিকটাকে বাড়ির সন্মুখভাগে রূপান্তরিত করা হয়েছে। ফলে উঠানে না ঢুকেই মেহমানরা দাদার ঘরে সরাসরি প্রবেশ করতে পারে। বাড়ির উঠানে ঢুকার পুরানো বাইলের গেইটটা এখনো আছে তবে অনেক সরু।

যাই হোক, বাড়িতে ঢোকার এই প্রধান গেইটকে ডানে রেখে বড় খাল বরাবর পশ্চিম দিকে আরেকটু এগুলেই হাতের ডানে পড়তো আরেকটি বড় খড়ের গাদা (এক সময় এই খড়ের গাদার পাশেই দাদাদের গোয়ালঘরটা ছিল যা পরে সরিয়ে ফেলা হয়) , তারপর দাদাদের কাচারি ঘর। এই কাচাড়ি ঘরে বাড়ির স্থায়ী একজন হুজুর থাকতেন যার কাজ ছিল সকালে বাড়ির ছেলেপেলেদের সুরা, কোরান তেলাওয়াত শিক্ষা দেয়া, ওয়াক্ত অনুযায়ি আযান দেয়া আর সন্ধ্যার পরে পোলাপানদের স্কুলের বাংলা, অংক, ইংরেজি শিক্ষা দেয়া। বিনিময়ে হুজুরদের থাকা খাওয়া ছিল ফ্রি। সেসময় গ্রামের প্রতিটা বাড়িতেই-বাড়ির সদর দরজায় একটা করে কাচাড়ি ঘর থাকতো এবং সেখানে বাড়ির বাচ্চাদের আরবি আর স্কুলের পড়ায় সাহায্য করার জন্য মাদ্রাসার কোন ছাত্রকে জায়গির রাখা হত। কাচারি ঘরের পরে পশ্চিম দিকে দাদার বাড়ির শেষ সীমানা। সেখানে লাগানো কয়েকটি তাল, নারকেল আর খেজুর গাছের কথা এখনো মনে আছে। কাচারি ঘর পার হয়ে পায়ে হাটা সরু পথটি বামদিকে ছোট খাল ( দাঁড়া) আর ডানদিকে নিচু ধানি জমি রেখে একেবারে বড় খাল পর্যন্ত গিয়ে শেষ হয়। এই পথের শেষ প্রান্তে হাতের ডানে বড় খাল ঘেষে একটু উঁচু জায়গায় আমাদের পারিবারিক কবরস্থান।

দাদার বাড়ির উত্তর ও পশ্চিম দিকে বাড়ির সীমানা পেরিয়ে অনেক নিচু জমি ছিল যেখানে সারা বছর জুড়ে নানা ধরনের ধান, বর্ষার সময় ধান, পাট আর শীতকালে মিষ্টি আলু, মরিচ, মটর, মুগ ডাল, খেসারি ডাল ও অড়হড় ডাল ইত্যাদি রবিশস্যের চাষ হত। এই নিচু জমিগুলো বর্ষার পানিতে পুরোটাই ডুবে গিয়ে বিলে রূপান্তরিত হোত। আগেই বলেছি আমার শামু কাকা আর হোসেন কাকা বাড়িতে গেলে আমাকে সব সময় কোলে কোলে রাখতেন। মনে পড়ে কোন এক ঘোর বর্ষায় কোরবান ঈদের সময় বাড়িতে গেলে শামু কাকা আমাকে কোলে নিয়ে বাড়ির শেষ মাথায় বিলের সামনে একটা নারকেল গাছের নিচে দাঁড়িয়ে গভীর মনযোগে অস্তগামি সূর্যের লালচে আলোয় এক নিবিষ্টে একটা বাঁশের বাঁশি বাজাচ্ছিলেন। বিলের পানিতে গোধূলির লাল রংয়ের তীর্যক প্রতিফলন আর মনকাড়া বাঁশির সুরে এমন একটা ঐন্দ্রজালিক পরিবেশের সৃষ্টি হয় যে আমি উনার ঘাড়ে মাথা রেখে তন্ময় হয়ে বাঁশি বাজানো শুনছিলাম। আমার বয়স ছিল সম্ভবত পাঁচ কি ছয়! ঐ ঘোর লাগানো সন্ধ্যায় শামু কাকার সেই জাদুকরি বাঁশির সুর আমি যেন আজো শুনতে পাই! আমার জীবনের এক অনন্য স্মৃতি!

 

শৈশবের কোরবানীর ঈদ: দাদার বাড়ির স্মৃতি-প্রথম পর্ব

লেখক : ডঃ মোহম্মদ মাহবুব চৌধুরী কানাডার অটোয়াস্থ কার্লটন বিশ্ববিদ্যালয় হতে রসায়নে পিএইচডি সম্পন্ন করে বর্তমানে একটি মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানী-NXP Semiconductor Inc. এ External Quality Engineer হিসেবে কর্মরত আছেন। এর আগে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এর রসায়ন বিভাগ হতে বিএসসি (সম্মান) এবং এমএসসি সম্পন্ন করে প্রায় তিন বছর শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগে শিক্ষকতা করেন।

 

এমন আরো সংবাদ

একটি উত্তর দিন

দয়া করে আপনার মন্তব্য লিখুন !
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন

সর্বশেষ সংবাদ