চার্লি হেবদো এবং শ্বেতাঙ্গ বর্ণবাদী খ্রিষ্টানদের ইসলামোফোবিয়া

মাহমুদুর রহমান

চার্লি হেবদো নামটির সঙ্গে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষদের অনেকেই হয়ত তেমন পরিচিত নন। এটি ফ্রান্সের একটি ব্যঙ্গ সাপ্তাহিক পত্রিকা। ২০১৫ সালে হযরত মোহাম্মদ [সা:] এর অনেকগুলো অত্যন্ত আপত্তিকর এবং অশ্লীল ব্যঙ্গচিত্র ছাপিয়ে এবং তার প্রতিক্রিয়ায় সেখানে সন্ত্রাসী হামলায় পত্রিকার সম্পাদকসহ অনেকে নিহত হলে চার্লি হেবদো সারা বিশ্বে আলোচিত পত্রিকায় পরিণত হয়। আশ্চর্যের বিষয় হল ওই ব্যঙ্গচিত্রগুলো পত্রিকাটির নিজস্ব কোন সৃষ্টি ছিল না। এক দশক আগে প্রকাশিত অন্য দেশের পত্রিকার ছবি ছাপিয়ে চার্লি হেবদো ইউরোপে ইসলামোফোবিয়ার আগুনে তখন ঘি ঢেলেছিল।

২০০৫ সালে ডেনমার্কের চরম ইসলামবিদ্বেষী সংবাদপত্র জাইল্যান্ডস-পোস্টেন ইসলামের নবীর বিরুদ্ধে কুৎসা রটনার অংশ হিসেবে ব্যঙ্গচিত্রগুলো সর্বপ্রথম প্রকাশ করে। দীর্ঘদিন ধরেই ডেনমার্কে বর্ণবাদী শ্বেতাঙ্গ খ্রিষ্টানদের মধ্যে ইসলামোফোবিয়ার ভয়ানক বিস্তার চলছে। কদিন আগেও সেখানে এবং পার্শ্ববর্তী সুইডেনে পবিত্র কোরআন শরীফ রীতিমতো ঘোষণা দিয়ে পোড়ানো হয়েছে। বাংলাদেশ মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হওয়া সত্ত্বেও এই ধরনের ইসলাম-বিদ্বেষের সাথে সেখানকার জনগণও সবিশেষ পরিচিত। পাঠকদের নিশ্চয়ই ২০১৩ সালের শাহবাগি উন্মত্ততার কথা স্মরণে আছে। শেখ হাসিনার সমর্থনে এবং ভারতের পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত কয়েক মাসব্যাপী ওই সার্কাসে যে ব্লগার দল নেতৃত্ব দিয়েছিল তারাও মুসলমান নামের আড়ালে ফেসবুকে হযরত মোহাম্মদ [সা:] এর বিরুদ্ধে চরম অরুচিকর, অশ্লীল এবং গর্হিত প্রচারণা চালাত। বাংলাদেশে প্রথম আলো, ডেইলি স্টার, সমকাল ইত্যাদিসহ তাবৎ ইসলামবিদ্বেষী মিডিয়া ওই ব্লগারদের তখন পৃষ্ঠপোষকতা করেছে। প্রসঙ্গক্রমে শাহবাগের কথা এলেও আমার আজকের লেখার বিষয় পৃথক হওয়ায় মূল আলোচনায় ফিরছি।

শ্বেতাঙ্গ চরমপন্থীদের এই যে অন্য ধর্মের প্রতি চরম ঘৃণা এবং অবমাননা এটা নতুন কিছু নয়। ইতালির বিখ্যাত মধ্যযুগীয় কবি দান্তে তার ১৪ শতকে রচিত ক্লাসিক, ডিভাইন কমেডিতে আমাদের রসুলসহ ইসলামের মহান ব্যক্তিদের নোংরাভাবে চিত্রিত করেছেন। এদের এই মানসিক বিকারগ্রস্থ আচরণ অন্য ধর্ম এবং বর্ণের মানুষের প্রতি চরিত্রগত ঘৃণার বহিঃপ্রকাশ। হিটলারের নাৎসি জার্মানিতে ইহুদিদের বিরুদ্ধে গণহত্যা চরম সাম্প্রদায়িক শ্বেতাঙ্গ খ্রিষ্টানদের অন্তর্নিহিত ঘৃণার ফলেই ঘটতে পেরেছিল। হিটলার ইহুদী, কমিউনিস্ট, যাযাবর এবং কালোদের নিচু প্রজাতির মানুষ হিসেবে বিবেচনা করতেন। হিটলারের অনুপ্রেরণায় বিকারগ্রস্থ নাৎসিরা তাই এদেরকে হত্যা করে পৃথিবীকে তাদের বিবেচনায় পবিত্র করার তৃপ্তি অনুভব করত।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বর্ণবাদী শ্বেতাঙ্গ খ্রিষ্টানদের ঘৃণার লক্ষ্যবস্তুর পরিবর্তন ঘটেছে। তারা এক বিচিত্র কারণে জিনগতভাবে মধ্যপ্রাচ্যের ইহুদীদের আপন সমাজে গ্রহণ করে নিয়েছে। বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ইহুদীদের প্রচণ্ড প্রভাব রয়েছে। বর্ণবাদীদের দৃষ্টিতে তাই একুশ শতকে মুসলমান এবং কালো বর্ণের মানুষেরাই প্রধান শত্রু। তবে, শত্রুতার মাপকাঠিতে মুসলমান এবং কালোদের মধ্যে এরা আবার খানিকটা প্রভেদও রেখেছে। অনিচ্ছাসত্ত্বে এবং বেশ খানিকটা দূরত্ব রেখে হলেও কালোদের মোটামুটি ঠাই হয়েছে পশ্চিমা সমাজ এবং রাষ্ট্রব্যবস্থায়। সেই কারণেই বারাক ওবামা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হতে পেরেছেন। তবে ওবামাকে কিন্তু বারবার উচ্চারণ করতে হয়েছে যে তিনি মুসলমান পিতার সন্তান হলেও নিজে মুসলমান নন। অর্থাৎ কালো চললেও চলতে পারে, কিন্তু শ্বেতাঙ্গ খ্রিষ্টান চরমপন্থীদের কাছে মুসলমান আবহমানকালের শত্রু। এর ফলে কালো মানুষদের ‘ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটারস’ সংগ্রামে মার্কিন মুলুকের অনেক সাদাও যোগ দিয়েছেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মত আপাদমস্তক একজন বর্ণবাদীকেও বাহ্যিকভাবে হলেও কালোদের মন রাখার চেষ্টা করতে হচ্ছে। তাছাড়া একুশ শতকে দাঁড়িয়ে প্রকাশ্যে কালোদের হেয় করাটা আর ফ্যাশনসম্মত নয়। মুসলমানদের ক্ষেত্রে অবশ্য কোন বাছবিচার, চিন্তা-ভাবনার দরকার নাই। ইসলামোফোবিয়া এদের কাছে সব কালেই ফ্যাশনদুরস্ত।

বর্ণবাদী শ্বেতাঙ্গ লেখক, বুদ্ধিজীবীরা জুডিও-খ্রিষ্টান সভ্যতা নামে নতুন এক তত্ত্বের জন্ম দিয়েছেন যার মূল উদ্দেশ্য হলো ইসলামের বিরুদ্ধে জায়নবাদ ও চরমপন্থী খ্রিষ্টানদের ঐক্যবদ্ধ করা। প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জুনিয়র বুশের মত করে বিশ্বকে ‘আমরা’ এবং ‘ওরা’ দুই ক্যাম্পে বিভক্ত করাই এদের লক্ষ্য। এখানে ‘ওরা’ বলতে মুসলমানদের বোঝানো হচ্ছে। ডেনমার্কের জাইল্যান্ডস পোস্টেন এবং ফ্রান্সের চার্লি হেবদো যে কাজ করেছে সেটি ইহুদীদের বিরুদ্ধে করা হলে এটিকে পশ্চিমা বিশ্বে এন্টি-সেমিটিজম এবং ঘৃণা ছড়ানোর অপরাধ বিবেচনা করে কঠোর নিন্দা জানানো হতো। হয়ত ওই দুই পত্রিকার সাংবাদিকদের সাজাও দেয়া হত। কিন্তু আক্রমণের লক্ষ্য যখন মুসলমান, তখন সমগোত্রীয় অপরাধের নাম হয়ে যায় বাক-স্বাধীনতা।

২০১৫ সালে প্রধান যে দুই ব্যক্তি চার্লি হেবদো পত্রিকা অফিসে অত্যন্ত গর্হিত সন্ত্রাসী হামলা চালিয়েছিল তাদেরকে ফরাসী পুলিশ কয়েকদিনের মধ্যেই প্যারিসে বন্দুকযুদ্ধে হত্যা করেছিল। ওই মামলায় পুলিশ সন্ত্রাসী হামলায় সহযোগিতা করার অভিযোগে আরও ১৪ জনকে অভিযুক্ত করে। এদের মধ্যে ১১ জনের বিচার দুই সপ্তাহ আগে প্যারিসে শুরু হয়েছে। তিন জন অভিযুক্ত এখনো পলাতক রয়েছে। বিচার শুরু হওয়ার আগের দিন সেই চার্লি হেবদো বিতর্কিত ব্যঙ্গচিত্রগুলি পুনঃপ্রকাশ

করেছে। এই গর্হিত কাজের মাধ্যমে তারা বিশ্বের প্রায় ১৮০ কোটি মুসলমান জনগোষ্ঠীকে অপমান করার পাশাপাশি নতুন করে সন্ত্রাসে উস্কানি দেয়ার চেষ্টা করেছে। ব্যঙ্গচিত্র প্রকাশের সময় লেবানন সফররত ফরাসী প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোকে এ ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে তিনি চার্লি হেবদোর কোন রকম সমালোচনা করতে অস্বীকৃতি জানান। ২০১৫ সালে সন্ত্রাসী হামলায় নিহত এবং আহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি বলেন চার্লি হেবদোর কর্মপন্থা নিয়ে তার কোন মন্তব্য নেই। পত্রিকাটি কোন বিবেচনায় ব্যঙ্গচিত্র পুনঃপ্রকাশ করেছে সে বিষয়ে কোন মন্তব্য করার অবস্থানে তিনি নেই বলে ম্যাক্রো সাংবাদিকদের প্রশ্ন এড়িয়ে যান।

ইসলাম ধর্ম, আমাদের রসূল হযরত মোহাম্মদ [সা:] এবং মুসলমানদের নিয়ে শ্বেতাঙ্গ চরমপন্থী খ্রিস্টানরা অব্যাহতভাবে কুৎসা রটনা করলেও কোন প্রকৃত মুসলমানের অন্য কোন ধর্ম কিংবা নবী-রসূলদের অবমাননা করার কোন সুযোগ নেই। প্রথমত: ইহুদী এবং খ্রিষ্ট ধর্মে যাদেরকে নবী বলে মানা হয় পবিত্র কোরআন শরিফে তাদের সবাইকে প্রতিটি মুসলমানের নবীর মর্যাদা দেয়া হয়েছে। হযরত ইব্রাহিম [আঃ] মুসলমানের জাতির পিতা। হযরত মুসার [আঃ] শিক্ষা মুসলমানের জন্য সমভাবে পালনীয়। হযরত ঈসা [আঃ] আমাদেরও নবী। তার মা হযরত মরিয়মকে [আঃ] কোরআনে শুধু যে বিশেষ মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে তাই নয়, তার নামে পৃথক সুরাও নাজেল হয়েছে। তাই এসব নবীদের কাউকে ছোট করা মুসলমানের জন্য নিষিদ্ধ। দ্বিতীয়ত: যে কোন ধর্ম সম্পর্কেই কোনোরকম নেতিবাচক কথা বলতে আল্লাহ কোরআন শরিফে পরিষ্কারভাবে নিষেধ করেছেন। সূরা আল-আনআমের ১০৮ নম্বর আয়াতে আল্লাহ নির্দেশ দিচ্ছেন:

‘আর তারা আল্লাহকে ছেড়ে যাদের পূজা করে তোমরা তাদের গালি দিও না, কেননা তাহলে তারা সীমালঙ্ঘন করে অজ্ঞতাবশত আল্লাহকে গালি দেবে। এ রূপেই আমি প্রত্যেক জাতির কাছে তাদের কাজকর্ম সুশোভিত করে রেখেছি। অবশেষে তাদের রবের কাছে তাদের প্রত্যাবর্তন করতে হবে। তখন তিনি তাদেরকে জানিয়ে দেবেন যা তারা করতো’।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে ইসলামোফোবিয়ায় আক্রান্ত চরমপন্থী শ্বেতাঙ্গ খ্রিষ্টান এবং জায়নবাদীরা ইসলামের এই মর্মবাণীর কোন মূল্য দেয় না। তারা অব্যাহতভাবে ইসলামের বিরুদ্ধে অপপ্রচার এবং হযরত মোহাম্মদকে [সা:] অবমাননা করে চলেছে। পশ্চিমা বিশ্বের এই সমস্ত ইসলামোফোবিক গোষ্ঠীর উস্কানির বিষয়ে মুসলমানদের বিশেষভাবে সতর্ক থাকতে হবে। আমরা আল্লাহ প্রদত্ত সীমার মধ্যে থেকেই সকল অন্যায় এবং মিথ্যা প্রচারণার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাবো। তবে উস্কানির ফাঁদে পড়ে সীমালঙ্ঘন করলে পরিণামে উম্মাহই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এই প্রসঙ্গে মনে রাখতে হবে যে, মার্কিন নেতৃত্বে ন্যাটো বাহিনীর দখলে থাকা অবস্থায় ইরাকে বিস্ময়করভাবে রাতারাতি আইসিস নামের এক জঙ্গি বাহিনীর জন্ম হয়েছিল। দখলদার বাহিনীর নাকের

ডগায় আইসিস নাটকীয় দ্রুততায় ইরাক এবং সিরিয়ার এক বিরাট অংশ দখল করে সেখানে তথাকথিত খেলাফতও প্রতিষ্ঠা করে ফেলেছিল। তারা ট্যাঙ্কসহ অন্যান্য গোলাবারুদের বিশাল ভাণ্ডার গড়ে তুলেছিল। ন্যাটো বাহিনী উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে তখন চোখ বন্ধ করেছিল। পরবর্তীতে সেই গোষ্ঠীর নামে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে যে সমস্ত সন্ত্রাসী কার্যকলাপ ঘটেছে তার কোন দায়িত্বই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অথবা ন্যাটো জোট আজ পর্যন্ত গ্রহণ করেনি। বরং সেই সমস্ত চরম নিন্দনীয় অপরাধের জন্য বিশ্বের সকল মুসলমানকেই অপরাধীর কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়েছে। আল-কায়েদা অধ্যায়ের সমাপ্তি হতে না হতেই আইসিসের উত্থানের রহস্যের আজ পর্যন্ত কিনারা হয় নাই। তাই চার্লি হেবদোর ব্যঙ্গচিত্র পুনঃপ্রকাশের ঘটনাকে চিহ্নিত ইসলামোফোবিক গোষ্ঠীর উস্কানি হিসেবে বিবেচনা করে সংযত থাকাই আমাদের জন্য উত্তম।

লেখক: সম্পাদক, আমার দেশ