সোশ্যাল হাউসিংয়ে রূপান্তরিত হচ্ছে প্লাজা হাচিসন

লিখেছেন রিয়েল্টর শিহাব উদ্দিন

মন্ট্রিয়লের অন্যতম ব্যস্ততম মেট্রো স্টেশন পার্ক মেট্রো সংলগ্ন  ‘প্লাজা হাচিসন’ এ সময়ের বহুল আলোচিত একটি  প্রপার্টি। বাণিজ্যিক কেন্দ্রে অবস্থান, রাস্তার ওপাশেই মেট্রো স্টেশন ও বাস স্টপগুলো। ব্যস্ত কর্পোরেট এলাকার সুবিশাল এ প্রপার্টিকে আরো আলোচিত করে তুলে সিটি প্রশাসনের হস্তক্ষেপ। পুরো নগরজুড়ে হাউজিং সংকট এর মোকাবেলায়  নতুন যে বৈপ্লবিক পরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে, যার মডেল হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে  ৫-তলা বিশিষ্ট এ ভবনের অধিগ্রহণ ও পরবর্তী প্রক্রিয়াকরণকে। 

বিক্রেতা স্বপ্রনোদিত হয়ে বিক্রির সিদ্ধান্ত নেননি।সত্য বলতে কি, অনেকটা বাধ্য হয়ে বিক্রয় প্রক্রিয়ায় উপনীত হয়েছেন| বিষয়টি বেশ কয়েক দিক দিয়ে বিষয়টি আলোচনার দাবী রাখে। প্রথমত: প্রাইভেট একটি পপ্রপার্টিকে সোশ্যাল হাউজিংয়ে রূপান্তর।  দ্বিতীয়তঃ ক্রয়ের ক্ষেত্রে  Ville de Montréal কর্তৃক প্রথম বারের মতো pre-emptive right প্রয়োগ। তৃতীয়তঃ মার্কেট প্রাইসে পাবলিক প্রতিষ্টান কর্তৃক প্রপার্টি ক্রয়। 

শুরুতে প্রপার্টির মালিক পক্ষের ইচ্ছা ছিল পুরোপুরি রেনোভেশনের মাধ্যমে বেশ কিছু High End কন্ডোমিনিয়াম তৈরি করা হবে। সে লক্ষ্যে ২০১৭ সাল নাগাদ তৎকালীন টেনেন্টদের নিকট লিজ ছেড়ে তাৎক্ষণিকভাবে অন্যত্র স্থানান্তরিত হবার মর্মে নোটিস যায়। নোটিসে নতুন টেনেন্টদের আকৃষ্ট করার লক্ষ্যে জরুরি রেনোভেশনের কথা উল্লেখ করা ছিল। স্বাভাবিকভাবেই আচমকা এই বাড়ি ছাড়ার নোটিস তৎকালীন বাসিন্দাদের জন্যে চপেটাঘাত হয়ে আসে। প্রতিবাদে নেমে পড়ে ভবনে ব্যবসা পরিচালনাকারী টেনেন্টরা। পরবর্তীতে টেনেন্টদের সাথে প্রতিবাদে যোগ দেয় বিভিন্ন কমিউনিটি সংগঠন ।

পার্ক এক্সটেনশনে নতুন ইমিগ্রেন্টদের বৃদ্ধিতে এমনিতেই ব্যাকফুটে ছিলেন টেনেন্ট শ্রেণীর বাসিন্দাবৃন্দ। মড়ার উপর খাড়ার ঘা হিসেবে যোগ হয় উট্রেমন্টের প্রাণকেন্দ্রে মন্ট্রিয়ল ইউনিভার্সিটির নতুন ক্যাম্পাস। হাউজ রেন্টের  উপর্যুপরি অস্বাভাবিক বৃদ্ধি ঠেকাতে মন্ট্রিয়ল সিটি কাউন্সিলের নিজে অভিভাবক হয়ে উক্ত প্রপার্টি কেনা এবং তা পরবর্তীতে সোশ্যাল হাউজিং হিসেবে ব্যবহারের সিদ্ধান্ত সর্বমহলেই বেশ প্রশংসা কুড়াচ্ছে। 

BSR Group-এর মালকানাধীন প্লাজা হাচিসন (7290-7300 Hutchison St.) ক্রয়ের ক্ষেত্রে মন্ট্রিয়লকে গুনতে হবে প্রায় সাড়ে ছয় মিলিওন ডলার, যা মিউনিসিপাল ইভালুয়েশনের চাইতে প্রায় ২৫% বেশি। বিতর্ক এড়িয়ে মিউনিসিপাল ইভালুয়েশনের এর উপরে মার্কেট প্রাইসে প্রপার্টি কেনা যেকোন পাবলিক প্রশাসনের জন্য অনেক ঝুঁকিপূর্ণ।   প্রপার্টি ক্রয়ের জন্যে সিটি কাউন্সিল মোট ৬০ দিন সময় পাচ্ছে। এই নির্ধারিত সময়ের আগেই মালিকানা হস্তান্তরের মীমাংসা হবে আশা করা যায়। এই লেনদেনে মন্ট্রিয়ল শহর ক্রেতার ভূমিকা পালন করবে এবং মালিকানা অধিগ্রহণ করবে।প্রপার্টির এই বর্ধিত দামের পরও প্রশাসনে সন্তুষ্টির খবর পাওয়া গেছে। সুতরাং সোশ্যাল হাউজিং প্ল্যান বাস্তবায়নে অর্থ কোন বাধা হয়ে আসছে না, যা আরেকটি স্বস্তির সংবাদ। 

এদিকে পার্ক এক্স-এ সোশ্যাল হাউজিং বাড়ানোর দাবি নিত্য দিনের ঘটনা। এ দাবিতে প্রতি উইকেন্ডেই দেখা যায় কোন না কোন  সংগঠনের ব্যানারে লোকজনের মিছিল। এমতাবস্থায় সোশ্যাল হাউজিং প্রকল্প বাস্তবায়নের এই সিদ্ধান্ত সময়োপযোগী এবং খুবই গুরুত্বপূর্ণ। 

সিটি কাউন্সিল ইতোমধ্যে বিভিন্ন লোকাল কমিউনিটির সাথে কোলাবোরেট করে কাজ করছে যাতে উপযুক্ত সিটিজেনরাই পরিকল্পিত এই সুবিধা ভোগ করতে পারে। ফেডেরাল ফান্ডিং থেকে শুরু করে আরো অনেক ফান্ডামেন্টাল ব্যাপারে এখনো কোন  উল্লেখযোগ্য রূপরেখা প্রণয়ন হয়নি, কিন্তু কার্যক্রম হাতে নেবার পর সবই আপন গতিতে আগাবে বলে জানিয়েছেন কর্তৃপক্ষ। প্রাথমিকভাবে ছোট ও সিঙ্গেল পরিবারগুলোর জন্যে ৪০ টি ইউনিট রাখার আভাস পাওয়া গেছে। 

মন্ট্রিয়লের অর্থনৈতিক এবং সামাজিক বৈচিত্র্য বজায় রাখতে সোশ্যাল হাউজিং এক যুগান্তকারী হাতিয়ার হতে যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন ভিলরে ডিস্ট্রিক্ট এর কাউন্সিলর Rosainne Filato। পার্ক এক্সটেনশনের বেশ কিছু পুরনো বাসিন্দাদেরকে তাদের আপন শহর থেকে বিতাড়িত হওয়ার মতো দুঃখজনক ঘটনা  এড়ানোর ক্ষেত্রে এটা সাহায্য করবে বলে দাবি করেন তিনি।

মার্শে পরদেশ, দূর্গা ফার্নিচার, CLAM ফ্রেঞ্চ স্কুল সহ আরো অনেক ব্যবসা ছিল এ ৫-তলা ভবনে। মার্শে পরদেশ স্বত্ত্বধিকারী আব্দুল আজিজ জানান, ব্যবসা স্থানান্তর জনিত কারণে অনেক দুর্ভোগে পড়তে হয়েছে তাদের। তিনি বলেন,  “বিল্ডিং ১০০ বছরের চেয়ে পুরাতন হয়ে যাওয়াতে  মার্কেটে সেল করতে পারেনি মালিক কর্তৃপক্ষ। তাছাড়া আর্থিক অব্যবস্থাপনার কারণে আইনে জটিলতায় পড়ে তারা। সিটি সেই সুযোগে ভালোই করেছে। সময়ের দাবি ‘সোশ্যাল হাউসিং’র নামে প্লাজা হাচিসন অধিগ্রহণ কার্যত  একটি সফল উদ্যোগ।”

যদিও ৪০ টি ইউনিট পার্ক এক্সটেনশনের  মত বিশাল এবং জনবহুল একটি নেইবারহুডের বর্তমান হাউজিং ক্রাইসিসের তুলনায় খুবই নগন্য, তথাপি এই ধরনের অ্যাপ্রোচ মন্ট্রিয়লে এবারই প্রথম। সব ঠিকঠাক কাজ করলে সামনে এ ধরনের আরো উন্নয়নমুখী কার্যক্রম বাস্তবায়নের সুযোগ থাকবে, যা থেকে সকল শ্রেণিপেশার নাগরিকই সুবিধা পাবেন।

 

লেখক : প্রকৌশলী শিহাব উদ্দিন, 

রিয়েল এস্টেট ব্রোকার , (৫১৪) ৩৬৮ ৯০০০