রিয়েল এস্টেট : বিদেশী বিনিয়োগকারীদের উপর নজর রাখবে কুইবেক সরকার

লিখেছেন রিয়েল্টর শিহাব উদ্দিন

রিয়েল এস্টেটের বাজারে বিদেশী বিনিয়োগকারীদের প্রভাব খতিয়ে দেখবে কুইবেক সরকার। কানাডার নাগরিক নন, এমন কেউ কুইবেকের রিয়েল এস্টেট  মার্কেটকে অস্থিতিশীল করছেন কি না, এ ব্যাপারে নজরদারির জন্যেই মূলত এ বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। এর ফলে  প্রত্যেক ক্রেতা-বিক্রেতাকে বাধ্যতামূলকভাবে নিজের জাতীয়তা নিশ্চিত করতে হবে। পহেলা অক্টোবর ২০২০ থেকে কার্যকর হতে যাচ্ছে এই বিশেষ ব্যবস্থা।

২০১৮ সাল পর্যন্ত অনেকটা শান্ত ছিল কুইবেকের রিয়েল এস্টেট মার্কেট। এরপর  থেকে বাড়ির মূল্যবৃদ্ধিতে যে ঊর্ধ্বমুখী ভাব শুরু হয় তা এখনো চলছে | সবরকম প্রোপার্টির ক্ষেত্রেই দামের ক্রমাগত বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। কুইবেক রিয়েল এস্টেট ব্রোকারদের পেশাদার সংগঠন APCIQ-এর সূত্রমতে আগস্ট ২০২০ এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী  মন্ট্রিয়লের বাড়ির দাম গত বছরের একই সময় থেকে ২৪% বেড়েছে, এক মাস আগে জুলাই মাসের পরিসংখ্যানে যা ছিল ১৮%। মাসিক, ত্রৈমাসিক কিংবা ষাণ্মাসিক, সকল পরিসংখ্যান থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী বিগত বছরের তুলনায় গড়পড়তা প্রোপার্টির মূল্যে আশঙ্কাজনক বৃদ্ধি পরিলক্ষিত হচ্ছে। দাম বৃদ্ধির সাথে সাথে লিস্টিং কমে যাওয়া, প্রতিটি লিস্টিংয়ের বিপরীতে একাধিক অফার পড়া, আস্কিং প্রাইসের উপরে প্রপার্টি বিক্রি হওয়া – এসবই এখন কুইবেকের রিয়েল এস্টেট মার্কেটের স্বাভাবিক চিত্র। শুরুর দিকে বৃদ্ধির এই বেপরোয়া দশা মন্ট্রিয়ল আইল্যান্ডে পরিলক্ষিত হলেও খুব তাড়াতাড়ি তা ছড়িয়ে পড়ে পার্শ্ববর্তী লাভাল এবং সাউথ শোরের প্রায় সব সিটিতে। ওভার প্রাইস ট্রেন্ডের প্রাথমিক পর্যায়ে প্রোপার্টিগুলো বিক্রি হচ্ছিল আস্কিং প্রাইসের উপরে ১/২ হাজার, তারপর ১ থেকে ২%, এখন সেটা ৫০ হাজার থেকে ১ লক্ষ ডলারের উপরে গিয়ে ঠেকেছে।

বিদ্যমান ডাটা অনুযায়ী টরন্টো ও ভ্যানকুবারের দিকে তাকালে অনাবাসী বিনিয়োগকারীদের সংখ্যা অনেক বেশী দেখা যায় টরন্টোতে  ২০১৬/২০১৭ সালের দিকে  অনাবাসী বিনিয়োগকারীদের উপস্থিতি ছিল যথাক্রমে ৭.২% এবং ভ্যানকুবারে ছিল ১৩.২%সেই হিসেবে কুইবেকের রিয়েল এস্টেট মার্কেটে অনাবাসী বিনিয়োগকারীদের উপস্থিতি বা অনুপস্থিতি সম্পর্কে তাদের ফার্স্ট হ্যান্ড ডেটা নেই।  ২০২০-২০২১ সালের বাজেটে প্রকাশিত জেএলআর সলিউশনস  সংকলিত তথ্যানুসারে, কুইবেক এবং মন্ট্রিয়ল  আইল্যান্ডে  বিদেশি ক্রেতাদের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য নয়। কুইবেকের সমস্ত রিয়েল এস্টেট লেনদেনে বিদেশি ক্রেতাদের অনুপাত ২০১৮/ ২০১৯  সালে  ছিল ১% এর মতো। একই রকম পর্যবেক্ষণে, মন্ট্রিল আইল্যান্ডে বিদেশি ক্রেতাদের অনুপাত ৩% এর মতো | মাঠ পর্যায়ের পর্যবেক্ষণের সাথে পরিসংখ্যানের এই সোর্সের কোন মিল নেই আর তাই নতুন এই ডিক্লারেশনের মাধ্যমে কুইবেক সরকার বাস্তবে এই সংখ্যা কত তা  জানার তাগিদ বোধ করছে যা তাদের ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্ত গ্রহণে সাহায্য করবে

অনাবাসী বিনিয়োগকারীদের উপস্থিতি প্রসঙ্গে গত পহেলা সেপ্টেম্বর প্রাদেশিক অর্থ মন্ত্রণালয়ের মিডিয়া বিভাগের প্রধান  জ্যাক ডেলরমে বলেন, “সাম্প্রতিক বছরগুলিতে দেখা গেছে যে বিদেশী ক্রেতারা কানাডিয়ান রিয়েল এস্টেট মার্কেটে প্রভাব বিস্তার করেছেন, যা বিশেষত বাড়ির দাম বাড়িয়ে বাজার অস্থিতিশীল করার পেছনে নিয়ামকের ভূমিকা পালন করছে।” তিনি বলেন, “ব্রিটিশ কলম্বিয়া এবং অন্টারিওর মতো কিছু প্রদেশে এই ঘটনাটিকে নিয়ন্ত্ৰণ করার জন্য আইন প্রণয়ন করা হয়েছে।”

উল্লেখ্য,  ভ্যানকুবার এবং টরন্টোতে অনাবাসিক ক্রেতাদের কেনা প্রপার্টির মূল্যের উপর  ১৫% থেকে ২০% বিশেষায়িত ট্যাক্স দিতে হয়। এটিকে অনেকাংশে ব্রেক চাপার সাথে তুলনা করা যায়। মূলত স্থানীয় নাগরিকদের ক্রমবর্ধমান ব্যয়বহুল আবাসন মার্কেটে বিনিয়োগে সহায়তা করার জন্য এই বিশেষ ব্যবস্থা প্রণয়ন করা হয়েছেট্যাক্স আরোপের ফলে এই দুই সিটিতে বাড়ির দাম যে পুরোপুরি নিয়ন্ত্ৰণে এসেছে তা বলার সুযোগ যদিও নেই, তারপরও বিষয়টিকে বিবেচনায় এনে আকাশচুম্বী মূল্যের উপর একটি ব্রেক চাপা অবশ্যই একটি দূরদৃষ্টিসম্পন্ন উদ্যোগ|

তবে এ কড়াকড়ির ব্যাপারে এখনই কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে না। এ ব্যাপারে জ্বালানি ও প্রাকৃতিক সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রেস রিলেশনশিপ প্রতিনিধি সিলভেন ক্যারিয়ার বলেন, “এখানে নিরাপদ বিনিয়োগের সন্ধানের জন্য বিদেশিদের নিরুৎসাহিত করার আগে আমাদের জানতে হবে যে তারা আসলেই উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় উপস্থিত রয়েছেন কিনা। সুতরাং, রিয়েল এস্টেটে বাজারের অনাবাসীদের সম্ভাব্য প্রভাবের ব্যাপারটি যাচাই করতে কুইবেক পরিসংখ্যানগত নজরদারি চালিয়ে যেতে ইচ্ছুক। কুইবেকের জাতীয় পরিষদে এ বিষয়টি কয়েক বছর ধরে আলোচনায় আসছে।” তিনি আরো বলেন, “২০১৩ সালের প্রথমদিকে, কুইবেক সরকারকে রিয়েল এস্টেট বাজারের পরিস্থিতির দিকে বিশেষ মনোযোগ দিতে এবং বিদেশী ক্রেতাদের দ্বারা পরিচালিত লেনদেনের পরিমাণ মূল্যায়ন করার জন্য বিভিন্ন মহল থেকে সুপারিশ করা হয়েছিল।”

বছরের পর বছর ধরে রিয়েল এস্টেট মার্কেট নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্যে বিবিধ আইন ও খসড়া বিধিমালাতে যদিও সংশোধন ও সংযোজন  হয়েছে, তথাপি ফিনিশিং টাচটা অনুপস্থিত ছিল। এবার রিয়েল এস্টেট বা রিয়েল এস্টেট ট্রাস্টের ক্ষেত্রে ক্রেতা এবং বিক্রেতার জাতীয়তার বাধ্যতামূলক যাচাইয়ের মাধ্যমে এটি প্রয়োগ করা হলো। 

ক্রেতারা এ ব্যাপারে চাতুরতার আশ্রয় নিচ্ছে কিনা, কিংবা ফাঁকি দিয়ে অন্য কৌশল নিচ্ছে কিনা সরকার তা জানতে চায়  সেক্ষেত্রে ক্রেতা তার পরিবারের সদস্যদের জন্যে ক্রয়কৃত প্রোপার্টি পুরুষাণুক্রমে তাদের প্রাথমিক বাসস্থান হিসেবে ব্যবহার করতে ইচ্ছুক কি না, তা পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করতে হবে। এব্যাপারে ক্রেতা প্রদত্ত তথ্য কোথাও প্রকাশ করা হবে না, তবে অর্থনৈতিক, রাজস্ব, বাজেট এবং আর্থিক বিষয়ে নীতিগত বিকাশের জন্য তা অর্থ মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করা হবে

কুইবেক সরকার কর্তৃক গৃহীত এই পদক্ষেপে অচিরেই বাড়ির দামে কোন প্রভাব পড়বে এটা মনে করার কোনো কারণ নেই। যতদিন পর্যন্ত না টরন্টো ও ভ্যানকুবারের এর মতো অনাবাসী বিনিয়োগকারীদের কানাডায় বাড়ি কেনার উপর অতিরিক্ত ট্যাক্স চাপিয়ে না দেয়া হবে, ততোদিন কোন ধরণের পরিবর্তন লক্ষ্য করা সম্ভাবনা খুবই কম।

 

লেখক : প্রকৌশলী শিহাব উদ্দিন, 

রিয়েল এস্টেট ব্রোকার , (৫১৪) ৩৬৮ ৯০০০