হালিমা ইয়াকুব: একজন রাষ্ট্রপতি ও সংগ্রামী নারী

পৃথিবীতে এমন অনেক উদাহরণ আছে, যারা প্রথম জীবনে অনেক কষ্ট করে পরবর্তীতে নিজেকে উন্নতির চরম শিখরে নিয়ে গেছেন। এক্ষেত্রে আমেরিকার সাবেক রাষ্ট্রপতি আব্রাহাম লিংকনের কথাই সবার আগে মনে পড়ে। যিনি অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারে জন্মেছিলেন। দারিদ্র্যের কষাঘাতে জর্জরিত ছিল তার শৈশব-কৈশোর। বাবা ছিলেন পেশায় মুচি। সংসারটাও ঠিকভাবে চলতো না। তিনি নিজেও মুচির কাজ করেছেন। মুচির ছেলে বলে অনেকেই অবজ্ঞার চোখে দেখতো আব্রাহাম লিংকনকে। সেই তিনিই এখন বিশ্ব রাজনৈতিক অঙ্গনে সর্বাধিক শ্রদ্ধার পাত্র।

তবে নারী হয়েও হালিমা বিনতে ইয়াকুব যে লড়াইটা করেছেন তা হয়তো আরও অনন্য। যে মানুষটি এক সময় ক্ষুধার তীব্রতা সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলেন তিনিই আজ একটি দেশের রাষ্ট্রপতি। বলছিলাম সিঙ্গাপুরের প্রথম নারী ও দ্বিতীয় মুসলিম রাষ্ট্রপতি হালিমা বিনতে ইয়াকুবের কথা।

শৈশব-কৈশোর:

১৯৫৪ সালে জন্মগ্রহণ করা হালিমা মাত্র ৮ বছর বয়সে বাবাকে হারান। বাবা ছিলেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত মুসলিম। কারখানায় ওয়াচম্যানের কাজ করে ৫ সন্তানকে বড় করার স্বপ্ন ছিল তার।

বাবার মৃত্যুর পর কঠিন দারিদ্র্যতার মুখে সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দিতে হালিমার মা কখনও হোটেলে পরিচ্ছন্নতাকর্মীর কাজ করতেন, কখনোবা রাস্তায় খাবার বিক্রি করতেন। মায়ের সঙ্গে হালিমাও সিঙ্গাপুর পলিটেকনিকের সামনে রাস্তায় ঘুরে ঘুরে খাবার বিক্রি করতেন।

তবে দারিদ্র্যতার শত অভিঘাতের মুখেও নিজের পড়াশোনাটা বন্ধ করেননি হালিমা। সিঙ্গাপুর চাইনিজ গার্লস স্কুলের পাঠ শেষে সিঙ্গাপুর ইউনিভার্সিটি থেকে আইন বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি নেন।

শিক্ষাজীবন:

১৯৭৮ সালে সিঙ্গাপুর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের পূর্বে তিনি সিঙ্গাপুর চীনা বিদ্যালয় ও তেনজেং কেটং বালিকা বিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করেন।

এরপর ১৯৭৮ সালে ন্যাশনাল ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেসের একজন আইন কর্মকর্তা হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৮১ সালে তিনি সিঙ্গাপুর বারে যোগদান করেন। তাতে করে পরিবারের ওপর নেমে আসা দারিদ্র্যতার কষাঘাতও কিছুটা কমতে থাকে। ১৯৯২ সালে তিনি এই কংগ্রেসের ডিরেক্টর নিযুক্ত হন।

২০০১ সালে তিনি সিঙ্গাপুর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। ২০১৬ সালের ৭ জুলাইে এনইউএসতে তাকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদান করা হয়।

রাজনীতিতে প্রবেশ:

ট্রেড ইউনিয়নে হালিমার সফলতা ও দক্ষতা দেখে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে রাজনীতিতে পা রাখেন হালিমা। ২০০১ সালে রাজনীতিতে প্রবেশ করে ওইবছরই সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এরপর তাকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি।

পরবর্তীতে বিভিন্ন সময়ে যুব-ক্রীড়া, সামাজিক উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ে সফলতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে ২০১৩ সালে তিনি সিঙ্গাপুরের পার্লামেন্টের স্পিকারের দায়িত্ব পান। তিনিই হন দেশটির প্রথম কোনও নারী স্পিকার।

২০০১ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত তিনি সংসদে জুরং দলের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করেন এবং ২০১৫ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত মার্সিলিং ইউ দলের প্রতিনিধিত্ব করেন।

রাষ্ট্রপতি হালিমা:

“Do Good Do Together” স্লোগান নিয়ে ২০১৭ সালে তিনি পার্টির পক্ষ থেকে রাষ্ট্রপতি পদের জন্য মনোনীত হন। শৈশব থেকে হার না মানা হালিমা হেরে যাওয়ার মানুষ নন। কোনও প্রতিপক্ষ না থাকায় নির্বাচন ছাড়াই তিনি হয়ে যান সিঙ্গাপুরের অষ্টম রাষ্ট্রপতি। সিঙ্গাপুরের দ্বিতীয় মুসলিম ও প্রথম নারী রাষ্ট্রপতি হিসেবে ইতিহাসের পাতায় নাম লেখান তিনি।

সিঙ্গাপুরে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সাড়ে ৭ লক্ষ ডলার খরচ করার বৈধতা থাকলেও প্রাথমিক প্রচার প্রচারণায় হালিমা খরচ করেছিলেন মাত্র ২ লক্ষ ২০ হাজার ডলার। দেশটির নতুন প্রজন্মের কাছে তিনি দিন দিন আস্থার প্রতীক হয়ে উঠেন।

ব্যক্তিগত জীবন:

আরব বংশোদ্ভূত মালয় নাগরিক মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল হাবশীকে জীবনসঙ্গী হিসেবে বেছে নেন হালিমা। তাদের পরিবারেও আছে ৫ সন্তান।

মেয়েকে নিয়ে সংগ্রামের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিলেও মেয়ের চূড়ান্ত সফলতা দেখে যেতে পারেননি তার মা। হালিমা রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার কিছুদিন আগেই তার মা মারা যান।