সর্বনাশ!

মেডিকেল কলেজ। ডাক্তার তৈরির কারখানা। লেখাপড়া করে যথাযথ শিক্ষা নিয়েই সেবা দেন চিকিৎসকরা। মানুষের জীবন রক্ষায় ভূমিকা রাখেন। কিন্তু গোড়াতেই যদি গলদ হয়, তাহলে সেই ডাক্তার জীবন রক্ষার বদলে অজান্তেই প্রাণ হন্তারক হতে পারেন। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ উদ্‌ঘাটন করেছে তেমনি এক ভয়ঙ্কর গলদ। মেডিকেল কলেজের প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে বছরের পর বছর। বিপুল অর্থের বিনিময়ে লেখাপড়া না করেই সেই প্রশ্নে পরীক্ষা দিয়ে মেডিকেলে ভর্তি হয়েছেন অনেকে।

প্রশ্নপত্র ফাঁসের কারণে মেধার লড়াই ছাড়াই মেডিকেলে ভর্তি হয়েছেন শিক্ষার্থীরা।

প্রশ্ন ফাঁসের এই ঘটনা ঘটেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রেসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাধ্যমেই। ২০১৩ সাল থেকে মেডিকেল কলেজের ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হতো স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রেস থেকেই।  এই চক্রের তিনজন সহ মোট পাঁচ জনকে গ্রেপ্তার করেছে সিআইডি। সিআইডি জানিয়েছে, এই চক্রে অর্ধশত ব্যক্তি জড়িত। প্রশ্ন ফাঁস করে রাতারাতি আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়েছে জড়িতরা। মালিক হয়েছে কোটি কোটি টাকার। গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে মেডিকেলে ভর্তি পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসে জড়িত দু’জনের সাত দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। আজ তাদের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করবে সিআইডি। এ ছাড়া বাকি দু’জন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনায় জড়িত থাকার বিষয়ে বুধবার আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে।

জানা গেছে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রেসের মেশিনম্যান সালাম, তার খালাতো ভাই জসিম মিলে দেশব্যাপী একটি চক্র গড়ে তুলে। চক্রটির মাধ্যমে শত শত শিক্ষার্থী টাকার জোরে মেডিকেল কলেজগুলোতে ভর্তি হয়েছে। এর বাইরে আরো অনেকে এই চক্রে জড়িত।  সিআইডি জানিয়েছে, এই চক্রের প্রধান মাস্টারমাইন্ড জসিম উদ্দিন ভূঁইয়া মুন্নু। মানিকগঞ্জের সিংগাইর এলাকার মুন্নু প্রশ্ন ফাঁস করে হাতিয়ে নিয়েছে কয়েক কোটি টাকা। তার পুরো পরিবার এই অপকর্মে জড়িত। প্রশ্ন সংগ্রহ করে বিভিন্নভাবে আগ্রহী শিক্ষার্থীদের কাছে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে বিক্রি করতো এই চক্র। প্রশ্নবাবদ প্রতি জনের কাছ থেকে নেয়া হতো পাঁচ লাখ টাকা। মুন্নুর বেশ কয়েক আত্মীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রেসে চাকরি করে। তাদের মাধ্যমে সেখান থেকেই প্রশ্নপত্র সংগ্রহ করে এই চক্র। মুন্নু তার সহযোগী জাকির হোসেন দীপু ও পারভেজ হোসেন খানকে গ্রেপ্তারের পর জিজ্ঞাসাবাদে সিআইডিকে জানিয়েছে, ২০১৩ সাল থেকে সরকারি মেডিকেল ও ডেন্টাল কলেজে ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস করে আসছে। ইতিমধ্যে প্রশ্ন ফাঁসের মাধ্যমে চক্রটি অর্ধশত কোটি টাকা উপার্জন করেছে।

প্রশ্নপত্র ফাঁস করে কর্মহীন জসিম উদ্দিন মুন্নু রাতারাতি আঙ্গুল ফুলে কলাগাছে পরিণত হয়েছে। তার কাছে ২ কোটি ৬৫ লাখ টাকার ৩৯টি চেক, ২ কোটি ২৭ লাখ টাকা মূল্যের সঞ্চয়পত্র পাওয়া গেছে। এ ছাড়াও ঢাকায় তিনটি বাড়ি রয়েছে তার। রয়েছে বিলাসবহুল দুটি গাড়ি। একইভাবে পারভেজ হোসেন খানের কাছে বিভিন্ন ব্যাংকে ৮৪ লাখ টাকার চেক ও জাকির হোসেন দীপুর কাছে ৫৭ লাখ টাকার এফডিআর ও চেক পেয়েছে সিআইডি। ধারণা করা হচ্ছে নামে-বেনামে বিভিন্ন ব্যাংকে বিপুল অর্থ রয়েছে এই চক্রের সদস্যদের। অবৈধভাবে উপার্জিত অর্থ তারা বিদেশে পাচার করে থাকতে পারে। এই চক্রে বিভিন্ন পর্যায়ের অর্ধশত ব্যক্তি জড়িত বলে প্রাথমিকভাবে তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে সিআইডি।

এ বিষয়ে সিআইডি’র অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার কামরুল আহসান মানবজমিনকে জানান, মেডিকেলে প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনায় জড়িত তিন জনকে রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ করে আরো তথ্য উদ্‌ঘাটন করা হবে। প্রশ্নফাঁস ছাড়াও তাদের অবৈধ অর্থ সম্পর্কে অনুসন্ধান করা হচ্ছে। এ বিষয়ে তাদের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং আইনে মামলা হতে পারে। তিনি বলেন, এই চক্রে জড়িত অন্যদের গ্রেপ্তার করতে তৎপরতা চালাচ্ছে সিআইডি।

এ বিষয়ে গতকাল দুপুরে সিআইডি সদর দপ্তরে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সিআইডির সাইবার অপরাধ বিভাগের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার সুমন কুমার দাস বলেন, ২০১৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ে তদন্ত করে সিআইডি। ওই সময়ে দুটি চক্রের সন্ধান পায় তারা। একটি চক্র সরাসরি প্রেস থেকে প্রশ্নপত্র সংগ্রহ করে বিক্রি করতো। অন্য চক্রটি পরীক্ষার কেন্দ্র থেকে বিশেষ ডিভাইসের মাধ্যমে প্রশ্ন সংগ্রহ করে তাৎক্ষণিক উত্তর রেডি করে ডিভাইসের মাধ্যমে পরীক্ষার্থীকে জানিয়ে দিতো। ওই মামলায় ১২৫ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশিট দেয়া হয়। ওই মামলায় গ্রেপ্তার ৪৭ জনের মধ্যে ৪৬ জনই আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়।

২০১৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘ ইউনিটের প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ ওঠার পর আবার মাঠে নামে সাইবার পুলিশ, সিআইডি। এই চক্রের ১৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের মধ্যে আট জন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। তবে দীর্ঘদিন পলাতক থাকার পর গত ১৯শে জুলাই এই চক্রের সদস্য এস এম সানোয়ার হোসেনকে গ্রেপ্তার করে সিআইডি। জিজ্ঞাসাবাদে সানোয়ার ২০১৩, ২০১৫ ও ২০১৭ সালে মেডিকেল ও ডেন্টাল কলেজে ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেয়। তার দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে গত ২০শে জুলাই রাজধানীর মিরপুর এলাকায় অভিযান চালিয়ে জসিম উদ্দিন, পারভেজ খান, জাকির হোসেন ও মোহাইমিনুলকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তার পাঁচ জনসহ ১৪ জনের নাম উল্লেখ করে ওই দিনই মিরপুর থানায় পাবলিক পরীক্ষা আইনে মামলা করে সিআইডি। এতে ১৫০  থেকে ২০০ জন অজ্ঞাত আসামি করা হয়। তাদের মধ্যে সানোয়ার ও মোহাইমিনুল আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। তারা দু’জন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি প্রশ্ন ফাঁসে জড়িত। বাকি তিন জনের সাত দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। শুক্রবার কারাগার থেকে তাদের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।

সংবাদ সম্মেলনে সিআইডি কর্মকর্তারা জানান, ১৯৮৮ সাল থেকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রেসে মেডিকেল ও ডেন্টাল কলেজের ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ছাপা হয়ে আসছে। ওই ছাপাখানা  থেকেই বারবার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি মেডিকেল, ডেন্টাল কিংবা আর্মড ফোর্স মেডিকেল কলেজে ভর্তি হওয়াটা শিক্ষার্থীদের একটা স্বপ্ন। এ চক্রের কারণে মেধাবী শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন ব্যর্থ হচ্ছে। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন সিআইডি’র সাইবার অপরাধ বিভাগের উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি) শাহ আলমসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।Rudro Mizan, Manob zomin