দর্শক প্রচারযন্ত্রের শিকার এবং পরিবেশক গোষ্ঠীর ইচ্ছাধীন : গ্লউবের হশা

সাক্ষাৎকার গ্রহণ : গ্যারি ক্রাউডাস, উইলিয়াম স্টার, রুথ ম্যাককরমিক ও সুজান হার্টেলেন্ডি
ভাষান্তর : আলম খোরশেদ

প্রশ্ন : যুক্তরাষ্ট্রে আপনাদের ‘সিনেমা নোভো’ (নতুন সিনেমা) আন্দোলনের সবচেয়ে পরিচিতি ছবি ‘Barren Lives’, যা ব্রাজিলের সামরিক শাসন চালু হওয়ার আগের তৈরি। এখন কি ব্রাজিলের এ রকম আরেকটি ছবি তৈরি করা সম্ভব?

উত্তর : হ্যাঁ, সম্ভব। কেননা, যদিও ব্রাজিলের এখন একটি অত্যন্ত জোরদার শক্তিশালী ও জুলুমবাজ সেন্সরপ্রথা চালু রয়েছে, তবু তা অতটা দমনমূলক নয়। আমাদের প্রতিটি ছবি নিয়েই সেন্সরের ঝামেলা হয়, কিন্তু শেষমেশ তারা ছাড় পেয়ে যায়, প্রধানত বাইরের পৃথিবীতে আমাদের সুনাম এবং ফ্রান্স ও ইতালিতে আমাদের ছবির ব্যাপক চাহিদার জন্য। ফলে, যদিও সেন্সরপ্রথা ক্রমশ আরও খারাপ হচ্ছে, আমরা তা থেকে উদ্ধার পেতে সক্ষম হয়েছি। আমাদের সাম্প্রতিক প্রায় সব কটি ছবিই অত্যন্ত রাজনৈতিক এবং অনেকটা ‘Barren Lives’ ঘরানারই। সবাই জানেন, আমাদের এই ‘সিনেমা নোভো’ আন্দোলনের জন্ম ১৯৬২ সালে ‘Barren Lives’-এর মাধ্যমে। তখন আমাদের দলে মাত্র এগারোজন পরিচালক ছিলেন, এখন তা তিরিশে এসে দাঁড়িয়েছে এবং প্রত্যেকেরই স্টাইলের তফাত সত্ত্বেও রাজনৈতিক আদর্শ এক।

প্রশ্ন : আপনাদের দলে কি কোনো সহকারী পরিচালক নেই?

উত্তর : অবশ্যই আছে, তাদের সংখ্যাও তিন শ থেকে চার শ। তবে তাদের অনেকেই পরে বাণিজ্যিক ছবির জগতে চলে গেছেন, যদিও এখনো তারা ‘সিনেমা নোভো’র নাম ব্যবহার করেন। ফলে এখন ব্রাজিলে ‘সিনেমা নোভো’ নিয়ে বেশ ভুল-বোঝাবুঝি রয়েছে। এই অনুকরণটুকু স্বাভাবিক, কেননা ব্রাজিলীয় চলচ্চিত্রের বিকাশের মূলে আমাদের ‘সিনেমা নোভো’ আন্দোলন। যেমন ধরুন, ১৯৬২ সালের ব্রাজিলে মাত্র তিরিশটি ছবি তৈরি হয়েছিল আর এ বছর সেখানে ছবি হয়েছে এক শ চারটি। এটা সত্য যে এগুলোর মধ্যে বেশ কিছু খারাপ ছবি আছে, তবু ব্রাজিলের একটি নিজস্ব চলচ্চিত্রশিল্প গড়ে উঠছে, সে বিষয়টাই আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।

প্রশ্ন : আপনার কি মনে হয় ‘সিনেমা নোভো’ সমসাময়িক ব্রাজিলীয় চলচ্চিত্রকারদের কোনোভাবে প্রভাবিত করতে পেরেছে? আঙ্গিকগত অর্থে কিংবা রাজনৈতিকভাবে?

উত্তর : ঠিক রাজনৈতিক অর্থে হয়তো ততটা নয়, তবে তা নানা রকম কারিগরি ও চলচ্চিত্রের ভাষাগত বিষয়ে নতুন চিন্তাভাবনার জন্ম দিয়েছে, যা সামগ্রিকভাবে চলচ্চিত্রশিল্পকে প্রভাবিত করে। ১৯৬২ সালে ব্রাজিলের ছবির মান ছিল খুবই খারাপ। ক্যামেরা, সম্পাদনা, শব্দ সংযোজনা—সবই এবং তাদের গল্প ছিল হুবহু মার্কিন ছবির নকল, অথচ আজকের চলচ্চিত্রের কারিগরি মান অনেক উন্নত। এর মধ্যে অনেক প্রতিক্রিয়াশীল ছবি তৈরি হচ্ছে ঠিকই, তবে তা ব্রাজিলের জনগণকে নিয়েই। এটাও একটা ছোটখাটো বিপ্লব এবং তা মার্কিন ছবির নকলনবিশি করার চেয়ে অনেক ভালো।

প্রশ্ন : ‘সিনেমা নোভো’র পরিবেশন পদ্ধতিটা ঠিক কী রকম?

উত্তর : একটি বড় পরিবেশনা সংস্থা আমাদের সব ছবি পাবলিক হলগুলোতে এবং ফিল্ম সোসাইটির ১৬ মিমি প্রেক্ষাগৃহগুলোতে দেখানোর ব্যবস্থা করে। আমার ‘আন্তোনিও’ ছবিটি রিও ডি জেনেরোর নয়টি এবং সাও পাওলোর চারটি ছবিঘরে একযোগে মুক্তি পায়। যুক্তরাষ্ট্রে ও প্যারিসে সাধারণত এক্সপেরিমেন্টাল থিয়েটারগুলোতেই আমাদের ছবিগুলো চলে। এতে করে সঠিক পরিবেশে আমাদের ছবিগুলো দেখানো হচ্ছে, তবে তা সীমিত দর্শকের মধ্যে। সমস্যাটা তাই আমাদের দুর্বোধ্যতা নয়, ব্যাপক দর্শকের মধ্যে ঠিকমতো পরিবেশিত না হওয়া।

প্রশ্ন : তাহলে আপনার কাছে দর্শকের যোগ্যতার চাইতে তাদের কাছে পৌঁছানোর ব্যাপারটাই বেশি জরুরি।

উত্তর : হ্যাঁ, কেননা, আমার মতে, সাধারণ দর্শক খুবই বুদ্ধিমান ও সংবেদনশীল। সমস্যা হলো, এই দর্শক প্রচারযন্ত্রের শিকার এবং পরিবেশক গোষ্ঠীর ইচ্ছাধীন, তাদের নিজেদের মনমতো ছবি বেছে নেওয়ার কোনো অধিকার নেই। কেননা, এই পরিবেশন পদ্ধতিটা মোটেও গণতান্ত্রিক নয়। এটা একধরনের ফ্যাসিস্ট প্রক্রিয়া; কেননা, তা দর্শকের ওপর তাদের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেয়। দর্শকদের প্রচণ্ড সংবেদনশীলতা সত্ত্বেও বিজ্ঞাপনের জোরে তারা এক বিশেষ ধরনের ছবি পছন্দ করতে শুরু করে তাদের অজান্তেই, এটা ইউরোপ-আমেরিকায় যেমন সত্য, তেমন সত্য ব্রাজিলেও। যেমন ধরুন, লাতিন আমেরিকার জনগণ একধরনের হলিউডি উপনিবেশের শিকার। হলিউডের এই প্রভাবটুকু খুবই গুরুত্বপূর্ণ এ জন্য যে এটা কোনো নান্দনিক শিক্ষা নয়, ঔপনিবেশিক শিক্ষারই মতো একধরনের বিশেষ মনস্তাত্ত্বিক মগজধোলাইও বটে।

প্রশ্ন : আপনি কি হলিউডের নান্দনিক মূল্যবোধের কথা বলছিলেন?

উত্তর : হ্যাঁ, হলিউডের মূল্যবোধ। আমি হলিউডের কিছু জিনিস পছন্দ করি। কিন্তু আমি তবু বিশ্বাস করি, লাতিন আমেরিকায় আমাদের উচিত হলিউডের একেবারে বিপরীত ধরনের ছবি তৈরি করা।

প্রশ্ন : ভিন্ন অর্থে, নাকি একেবারে বিরুদ্ধ অর্থে?

উত্তর : বিরুদ্ধ অর্থে। কেননা, হলিউড একধরনের ঔপনিবেশিক ছবির কারবার করে, আমরা যার বিরোধী। ‘আন্তোনিও’ সম্পর্কে বলা যায়, আমি একটি যথার্থ বিপ্লবী ছবি করেছি। কেননা, তা এই আধিপত্যবাদী রীতিনীতির বিরোধিতা করে।

প্রশ্ন : কিন্তু লাতিন আমেরিকার মতো সম্পূর্ণ মার্কিন-প্রভাবিত একটি অঞ্চলে এটা কি সম্ভব যে আপনি একদিকে আমেরিকান গাড়ি চালাবেন, অথচ অন্যদিকে ব্রাজিলিয়ান সংস্কৃতি ধারণ করবেন?

উত্তর : আমরা আমেরিকান জনগণের বিরুদ্ধে নই, আমরা এর পররাষ্ট্রনীতির বিরোধিতা করি। কেননা, তা আমাদের স্বার্থের পরিপন্থী। চলচ্চিত্র প্রসঙ্গে আমি বলব, আমাদের আমেরিকান ছবির বিরুদ্ধে লড়াই করতে হবে এ জন্য যে, এটা আমাদের নিজস্ব বাজারকে গ্রাস করে নিচ্ছে এবং সেই সঙ্গে আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিকেও ভোঁতা করে দিচ্ছে। তাই আমাদের প্রাণপণ একটি যুদ্ধ শুরু করতে হবে এই হলিউডি ছবির বিরুদ্ধে এবং সেটা সম্ভব, তবে আমাদের নিজস্ব একটি চলচ্চিত্রশিল্প তৈরি করতে পারলেই।

প্রশ্ন : হলিউডি ছবির যে মূল্যবোধ, তাকেই কি আপনি হলিউড অঞ্চলের কিংবা আরও সাধারণ অর্থে আমেরিকান মূল্যবোধ বলে মনে করেন?

উত্তর : আমি মনে করি, সবচেয়ে রাজনৈতিক ছবি হলো হলিউডের ছবি। এটা রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে প্রভাবশালী এ জন্য যে, এ একধরনের সামাজিক ন্যায়বিচারের কথা বলে। বামপন্থী চলচ্চিত্র আজও আমেরিকান ছবির মতো সাফল্য অর্জন করেনি। ব্রাজিলের ছবির কোনো গণরুচির ভিত্তি নেই, আবার বামপন্থী ছবিগুলোও এখন পর্যন্ত প্রকৃত বিপ্লবী ছবি হয়ে উঠতে পারেনি। বিপ্লবী ছবি জনগণের মনে বিদ্যমান ব্যবস্থার প্রতি সমর্থন জাগাবে না, বরং তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহী করে তুলবে। যেমন ধরুন, ‘জেড’ একটি বিশুদ্ধ হলিউডি ছবি। আমার মতে, প্রকৃত বিপ্লবী ছবি হলো গদারের ‘উইক এন্ড’, কেননা, এটা দর্শককে প্ররোচিত করে। শেষ পর্যন্ত অবশ্য চলচ্চিত্রের ভাষাটাই প্রধান হয়ে দাঁড়ায়। আমাদের এখন সঠিক প্রকাশ ভঙ্গিটিকেই খুঁজে বের করতে হবে। একটি নতুন আঙ্গিক, যা স্বয়ংসম্পূর্ণ, অর্থাৎ সঠিকতম, যা আমাদের উদ্দেশ্য সাধন করবে। সেটা খুব ঝকঝকে-তকতকে না-ও হতে পারে, তবে তাকে নতুন হতে হবে।

প্রশ্ন : আমি যদি আপনাকে ঠিকমতো বুঝে থাকি, তাহলে আপনি যে বিপ্লবের কথা বলছেন, সেটা যতখানি রাজনৈতিক, ততটাই নন্দনতাত্ত্বিক, এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে অনেক বেশিই নন্দনতাত্ত্বিক। কেননা, আপনার মতে, সাংস্কৃতিক বিপ্লবের পথ ধরেই আসে রাজনৈতিক বিপ্লব, বিষয় আঙ্গিককে অনুসরণ করে।

উত্তর : না, এটা সঠিক নয়। আমি মনে করি, বিপ্লবে অর্থনৈতিক উন্নতির সমান গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক উন্নতি। যেমন দেখুন, তৃতীয় বিশ্বে, আমরা শিল্পীরা রাজনৈতিক জুলুমের বিরুদ্ধে সংগ্রামের সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যমান সাংস্কৃতিক পরাশক্তির বিরুদ্ধেও যুদ্ধ করছি—এটি একাধারে একটি রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক যুদ্ধ। আমি এখানে ‘শৈল্পিক’ শব্দটির বদলে ‘সাংস্কৃতিক’ শব্দটি ব্যবহার করছি। কেননা, সেটা রাজনীতি, অর্থনীতি ও শিল্পকে একসঙ্গে ধারণ করতে সক্ষম।

প্রশ্ন : সেটা কি তার গতানুগতিক অর্থেই?

উত্তর : হ্যাঁ, গতানুগতিক, তবে সেটাই আমাদের জন্য নতুন। আমাদের নিজস্ব যোগাযোগের ভাষাটি এখন খোঁজা জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেননা, এর মাধ্যমেই আমাদের অচেতন জনগোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করা যাবে। যেমন ধরুন, আমার ‘আন্তোনিও’ ছবিতে আমি গণনাটক বা যাত্রা নিয়ে অনেক গবেষণা করেছি, যার বিভিন্ন উপকরণের মধ্যে ছিল কৃষকদের আচার-আচরণ, মনস্তত্ত্ব, তাদের ভাষা, কবিতা ও গান ইত্যাদি। নাটকের এই আঙ্গিকটিকে ব্যবহার করে আমি সেই সব কৃষকের ব্যক্তিগত আবেগ, অনুভূতি ও সংকটকে তাদের মতো করে ভাষা দিতে চেষ্টা করেছি।

প্রশ্ন : আপনি কি সাংস্কৃতিক বিপ্লব ও রাজনৈতিক বিপ্লবের মধ্যে তফাত করেন?

উত্তর : এটা বলা খুব শক্ত। কেননা, এখন লাতিন আমেরিকায় আমরা এটা ভাবতে শুরু করেছি যে সাংস্কৃতিক বিপ্লবের চাইতে এই মুহূর্তে একটি রাজনৈতিক বিপ্লবেরই দরকার বেশি। তবে সঙ্গে সঙ্গে আমরা এটাও মনে করি, এই বিপ্লব সাংস্কৃতিক বিপ্লবকে বাদ দিয়ে নয়। আমাদের কাছে এই দুইয়ের সম্পর্ক এখন অবিচ্ছেদ্য। কেননা, আমরা এখন তথ্যের আগ্রাসনের শিকার। এই তথ্য ব্যাপক অর্থে সংস্কৃতিরই নাম। আমরা এই সংস্কৃতির মানোন্নয়ন ছাড়া অর্থনৈতিক উন্নতির কথা ভাবতে পারি না। আমরা আমাদের এই প্রচেষ্টাকে নাম দিই সাংস্কৃতিক অনুসন্ধান বলে; যাতে শিল্প ও নান্দনিকতা উভয়েরই স্থান আছে। তবে শিল্প ও নন্দনতত্ত্ব রাজনীতিনিরপেক্ষ নয়, বরং তার স্পষ্ট একটি আদর্শ থাকবে। বিশুদ্ধ নান্দনিকতা আমাদের জন্য খুব কঠিন একটি ব্যাপার।

প্রশ্ন : ‘সিনেমা নোভো’র পরিচালকেরা যেহেতু ব্রাজিলের সাংস্কৃতিক উন্নয়নের কাজে নেমেছেন, এখন যদি কোনো কারণে এর মাধ্যম হিসেবে তারা যাকে ব্যহার করছেন, অর্থাৎ চলচ্চিত্র ব্যর্থ হয়, তাহলে কি তারা প্রত্যক্ষভাবে রাজনীতিতে নামবেন?

উত্তর : একটা বিশেষ অর্থে সমস্ত ব্রাজিলিয়ান বুদ্ধিজীবীই রাজনৈতিকভাবে সক্রিয়। আমরা যখন সেন্সরপ্রথার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করি, সামাজিক ও রাজনৈতিক সংকট সম্পর্কে কথা বলি, তখন শুধু চলচ্চিত্রকারেরাই নয়, ব্রাজিলের সমগ্র বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়, বিশেষত তরুণেরা সক্রিয় রাজনীতির মধ্যে থেকেই তা করেন। তবে ব্রাজিলের কোনো সাংস্কৃতিক আন্দোলনই, সংগীত, নাটক কিংবা সিনেমা শুধু সরল রাজনীতি নয়। আমরা নিজেরাই যেহেতু আমাদের নিজস্ব প্রযোজনার দায়িত্ব নিচ্ছি, তখন একধরনের অর্থনৈতিক সংগ্রামও আমাদের করতে হয় বৈকি। সেই সঙ্গে বিশুদ্ধ তাত্ত্বিক চ্যালেঞ্জ তো রয়েছেই। চলচ্চিত্রের এই প্রযোজনার ও পরিবেশনার ব্যাপারটি নিয়ে তো এস্টাব্লিশমেন্টের সঙ্গে আমাদের বিরোধ সার্বক্ষণিক।

প্রশ্ন : ‘সিনেমা নোভো’র নির্মাতাসহ ব্রাজিলের বুদ্ধিজীবীদের কি কোনো বিশেষ রাজনৈতিক আদর্শ আছে?

উত্তর : ব্রাজিলের রাজনৈতিক অবস্থা, বিশেষত, তার বৈপ্লবিক অবস্থাটি অত্যন্ত জটিল। কেননা, সেখানে অনেক কটি বামপন্থী দল রয়েছে এবং তাদের উদ্দেশ্য ও প্রবণতাও আলাদা। ব্রাজিল একটি সাংঘাতিক সন্ত্রাস ও স্ববিরোধের দেশ। কেননা, সেখানে অত্যন্ত উন্নত এবং একেবারে পিছিয়ে পড়া, দুটো অবস্থাই বিদ্যমান। পৃথিবীর আর যেকোনো দেশের চেয়ে এর বৈপরীত্য অনেক বেশি; আর কোনো দেশের কথা আমার জানা নেই, যা ব্রাজিলের মতো এ রকম একাধারে প্রচণ্ড ধনী ও দরিদ্র এবং সাংঘাতিক রকম আপসকামী আবার বিপ্লবীও। এটা এক প্রচণ্ড অনিশ্চয়তার দেশ, যেখানে সবই সম্ভব। আমি এখনো বুঝি না এটা আমাদের সুবিধা, নাকি সমস্যা। সম্ভবত কেউই তা জানেন না।

প্রশ্ন : আমরা চলচ্চিত্রের আইডিয়ার কথা শুনেছি। বুদ্ধিবৃত্তিক দৃষ্টিকোণ থেকে আপনাদের ‘সিনেমা নোভো’র পেছনের মূল আইডিয়াটি কী?

উত্তর : আমরা মূলত দুটো জিনিস চাই, যা আবার পরস্পর সম্পর্কিত। এস্টাব্লিশমেন্টের অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিবহির্ভূত একটি স্বনির্ভর প্রযোজনা ও পরিবেশনা সংস্থা এবং এমন চলচ্চিত্র নির্মাণের স্বাধীনতা, যা ব্রাজিলের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের সঠিক ছবিটি তুলে ধরবে। আমাদের প্রত্যেকের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ধ্যানধারণা এক, তবে স্টাইল ভিন্ন। কেননা, আমরা কেউই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ও রুচির সমর্থক নই। আমরা চাই আমাদের ব্রাজিলের মতোই হয়ে উঠতে, যা অত্যন্ত জটিল ও বৈচিত্র্যময়। যেমন দেখুন, আমরা একই বিষয় নিয়ে ভিন্ন ধারার ছবি তৈরি করি—‘Barren Lives’ খুবই বাস্তবসম্মত, আবার ‘আন্তোনিও’ অপেরাধর্মী। আমরা যখন রাজনৈতিক ছবি বানাই, তখন তা বক্তব্যপ্রধানও হতে পারে আবার খুব নাটকীয়ও হয়ে উঠতে পারে। আমরা সম্প্রতি খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি ছবি শেষ করেছি, যা খুব শীঘ্রই আমেরিকায় দেখানো হবে। ছবিটির নাম ‘Macunaima’, পরিচালক জোয়াকিম পেদ্রো ডি আন্দ্রেইদ-এটি আমাদের জন্য একটি নতুন ধরনের ছবি। কেননা, তা কমেডি। এটা খুব একটা নাটকীয় নয়, তবে সাংঘাতিক শ্লেষ আছে এতে, খুবই ঝাঁজাঁলো ও ভায়োলেন্ট। আমরা এই স্টাইলে আরও কিছু ছবি তৈরি করেছি, যেগুলো খুব শীঘ্রই দেখানো হবে এখানে, যেমন ‘Brazil, Year 2000’, পরিচালক ওয়াল্টার লিমা, জুনিয়র, যা একটি মিউজিক্যাল অথচ পুরোপুরি রাজনৈতিক ছবি। এ ছাড়া রয়েছে কার্লোস দিয়েগেসের ‘The Inheritors’, ব্রাজিলের ডিক্টেটর বার্গাসকে নিয়ে করা ছবি, এটিও একটি বিদ্রুপাত্মক চলচ্চিত্র কিন্তু এখানেও গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলের বৈশিষ্ট্য হিসেবে নাচ, গান, বাজনা, রংতামাশা ইত্যাদির চমৎকার প্রয়োগ রয়েছে, ফলে এটি উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ছবি, যেমন ‘আন্তোনিও’ কিংবা ‘The Reflex’ ইত্যাদির চেয়ে অনেক আলাদা।

প্রশ্ন : সেন্সর ছাড়া ‘সিনেমা নোভো’ কি আর কোনো সমস্যার মুখোমুখি হয়?

উত্তর : সম্প্রতি একটি আইন পাস করা হয়েছে, যা ব্রাজিলের রাজনীতিতে অত্যন্ত অস্বাভাবিক একটি ঘটনা। ব্রাজিলে খাটানো আমেরিকান চলচ্চিত্র পরিবেশনা সংস্থাসমূহের সমস্ত পুঁজি জাতীয়করণ করা হয়েছে। এর উদ্দেশ্য ব্রাজিলের নিজস্ব বাণিজ্যিক ছবির বাজারকে উৎসাহিত করা, কিন্তু এটা কেবল একধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্নীতিই বাড়াবে। আমরা এ-জাতীয় প্রতিষ্ঠানের নিন্দা করি। কেননা, এর চরিত্র ফ্যাসিস্ট এবং এটা হলিউডি কায়দার ব্রাজিলীয় ছবি তৈরির লক্ষ্যেই একধরনের অর্থনৈতিক সংস্কার মাত্র।

প্রশ্ন : আপনি একে ফ্যাসিস্ট বলছেন, সেটা নিশ্চয়ই বিশুদ্ধ রাজনৈতিক অর্থে নয়; কেননা, এটা তো কোনো সংঘ নয়? তাহলে আপনি কি প্রতিক্রিয়াশীল বলতে চাচ্ছেন?

উত্তর : হ্যাঁ, প্রতিক্রিয়াশীল। কেননা, তারা খুব ‘মধুর’ ছবি বানায়, যা ব্রাজিলের দারিদ্র্যকে পাশ কাটিয়ে গোলাপি লেন্সের মধ্য দিয়ে তোলা। অর্থনৈতিকভাবে বলতে গেলে বলতে হয়, তারা ফ্রান্স ও ইতালির মতো লাভজনক ছবি তৈরি করতে চায়। আমেরিকান পরিবেশনা সংস্থাগুলো গদার ও কয়েকজন বাদে আর সবাইকে কিনে নিয়ে ইতালির ‘নিউ রিয়েলিজম’ ও ফ্রান্সের ‘নিউ ওয়েভ’ ধারার ছবির জগৎটাকে একেবারে ধ্বংস করে দিয়েছে। আজ শ্যাব্রল ও ভাদিমের মতো পরিচালকেরা আমেরিকান জনরুচি অনুযায়ী ছবি বানান।

প্রশ্ন : কিন্তু তাঁরা তো আদতেই বুর্জোয়া।

উত্তর : তাঁরা নষ্ট হয়েছেন পুঁজির প্ররোচনায়।

প্রশ্ন : তাঁরা পুঁজি দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন ঠিকই, তাই বলে কি সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছেন?

উত্তর : হ্যাঁ, তাই। তবে তাঁদের কেউ কেউ জানেন না একে কীভাবে এড়াতে হবে। ভিসকন্তি, আন্তোনিওনি ও ফেলিনির মতো সব বিখ্যাত ইতালীয় পরিচালকের ছবির প্রযোজক আজ আমেরিকান কোম্পানি। কার্লো পন্টি যে ছবিটি প্রযোজনা করেন, তার পয়সাও আসে আমেরিকা থেকে। ইতালির আজ আর নিজস্ব চলচ্চিত্রশিল্প বলতে কিছু নেই, যা প্রকৃত ইতালীয়।

প্রশ্ন : এর একটা অর্থনৈতিক কারণও আছে। তাদের ছবির বাজেট এত বেশি যে তাকে আন্তর্জাতিক বাজার সন্ধান করতেই হয়, যেখানে আপনাদের ছবির খরচ অত্যন্ত কম। আপনাদের একটা ছবির পেছনে গড়ে কত খরচ পড়ে?

উত্তর : হ্যাঁ, আপনি ঠিকই বলেছেন। আমাদের একটি ছবির পেছনে খরচ পড়ে এক লাখ ডলারের মতো। ‘সিনেমা নোভো’র নীতিই এটা, কম বাজেটের ছবি করা।

প্রশ্ন : ‘সিনেমা নোভো’র অধিকাংশ পরিচালকই কি মার্ক্সীয় ধ্যানধারণায় বিশ্বাসী?

উত্তর : হ্যাঁ, কমিউনিস্ট, তবে অনেকেই পার্টির সদস্য নন।

প্রশ্ন : ইউরোপের অনেক মার্ক্সিস্টই তো কমিউনিস্ট পার্টি, এমনকি সোশ্যালিস্ট পার্টিরও বিরোধী, এটা খুব ইন্টারেস্টিং বলে মনে হয় না কি আপনার কাছে?

উত্তর : ব্রাজিলে আমরা তাই রাজনীতির প্রাতিষ্ঠানিকতায় বিশ্বস করি না। কেননা, এখানে আমরা একদিকে তথাকথিত ‘জনরুচির সংস্কৃতি’, অন্যদিকে এই ইউরোপীয় বামপন্থার শিকার। তাই আমাদের কাছে হলিউড যতটা পরিত্যাজ্য, সার্ত্রও তাই। আমরা আমাদের বাস্তবতার সঙ্গে আরও গভীর সম্পর্কে যেতে প্রয়াসী, যাতে করে আমরা আমাদের নিজস্ব রাজনীতিকেও খুঁজে নিতে পারি।

প্রশ্ন : লাতিন আমেরিকার আর সব দেশের মতো ব্রাজিলেও জনসংখ্যা বিস্ফোরণ একটি বড় সমস্যা, ‘সিনেমা নোভো’র কোনো ছবি কি এদিকে নজর দিয়েছে?

উত্তর : এখন পর্যন্ত নয়, তবে একজন নতুন পরিচালক এসেছেন, Eduardo Excorel, যিনি এতকাল আমার আন্তনিওসহ আমাদের অনেক ছবি সম্পাদনা করেছেন। তাঁর প্রথম ছবিটি এই বিষয়ের ওপরই তোলা হচ্ছে।

প্রশ্ন : লাতিন আমেরিকার আর কোনো ছবি কি এই বিষয় নিয়ে তৈরি করা হয়েছে?

উত্তর : আমি কেবল একটি ছবি দেখেছি এ বিষয়ে, বলিভিয়ার পরিচালক হোর্হে সানহিনেসের ‘ব্লাড অব দ্য কনডর’, যা ভেনিস উৎসবে দেখানো হয়েছে গত বছর। জনসংখ্যা ব্রাজিলের একটি বড় সমস্যা। যুক্তরাষ্ট্রের ‘পিস কর্পস’ বলে কথিত গোষ্ঠীটি আমাদের মেয়েদের একযোগে বন্ধ্যা করে দিচ্ছে। গত বছর এক লাখ গরিব ঘরের মেয়েকে এ রকম বন্ধ্যা করা হয়েছে। এটি ব্রাজিল সরকারের পরোক্ষ অনুমতি নিয়েই করা হচ্ছে।

প্রশ্ন : ‘সিনেমা নোভো’ কি এর বিরুদ্ধে?

উত্তর : আমি এই সমস্যাটি বিষয়ে বিশদভাবে অবগত নই, তবে নীতিগতভাবে আমি এ রকম জোরপূর্বক বন্ধ্যাকরণের বিপক্ষে। কেননা, আমার ধারণা, এভাবে এমন একটি আমূল সামাজিক সমস্যার স্থায়ী সমাধান হতে পারে না। তবে এ ব্যাপারে আমার চাইতে ব্রাজিলের সমাজবিজ্ঞানী ও অর্থনীতিবিদেরাই ভালো বলতে পারবেন।

প্রশ্ন : ‘সিনেমা নোভো’ বিষয়ক কোনো প্রকাশনা আছে কি ব্রাজিলে?

উত্তর : না, আমরা কখনো চলচ্চিত্র পত্রিকা প্রকাশ করিনি। কেননা, আমরা বাস্তব চর্চার আগেই তত্ত্বে প্রসার ঘটুক, এমনটি চাইনি। এ বছরই আমরা আমাদের প্রথম পত্রিকা বের করছি। যেহেতু আমাদের বিরুদ্ধে এখন প্রচুর প্রচারণা চলছে, সেহেতু মনে হয় এটাই প্রকৃষ্ট সময় আমাদের মুখপত্র প্রকাশের।

প্রশ্ন : এটা বোধ হয় সব লাতিন আমেরিকান দেশ বিষয়েই সত্য। চর্চা দিয়ে শুরু করে তারপর তত্ত্ব নির্মাণ।

উত্তর : হ্যাঁ, ঠিক তাই। আমরা ছবি তৈরি শুরু করার আগে ব্রাজিলে প্রচুর সিনেমা পত্রিকা ছিল। কিন্তু কোনো ছবি ছিল না। আমরা এই অবস্থাটা বদলানোর সিদ্ধান্ত নিই। লাতিন আমেরিকার এই সব সিনেমা পত্রিকা ইউরোপীয় পত্রিকার অনুকরণ ছাড়া আর কিছুই নয়। এরা পত্রিকা প্রকাশ করে Positif কিংবা Cahiers du Cinema -র অনুকরণে, সেগুলো ভালো পত্রিকা হলেও তাকে নকল করতে হবে কেন? আমরা এই চিন্তাবর্জিত অনুকরণের বিরুদ্ধে লড়াই করি।

প্রশ্ন : আপনারা তাহলে এখনো ‘সিনেমা নোভো’ বিষয়ে কোনো বিশদ তত্ত্ব খাড়া করেননি?

উত্তর : না, তবে আমরা অনেক প্রবন্ধ লিখেছি এবং সাক্ষাৎকারে এ বিষয়ে বলেছি। তবে এ নিয়ে কোনো বিশেষ শাস্ত্র খোলার বিরুদ্ধে আমরা, যেমনটি আমরা ফ্যাসিজম ও ফর্মালিজমেরও বিরুদ্ধে। ১৯৬১ সালে আমি ‘ব্রাজিলীয় চলচ্চিত্রের সমালোচনা’ নামে একটি প্রবন্ধ লিখি, যা ‘সিনেমা নোভো’ প্রতিষ্ঠার প্রথম প্রণোদনা হিসেবে কাজ করে। শীঘ্রই আমি এর দ্বিতীয় খণ্ড লিখব, যাতে আমাদের এই প্রচেষ্টাসমূহের বিশ্লেষণ থাকবে। এ ছাড়া অন্যান্য বিষয়েও কিছু বইপত্র প্রকাশের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।

প্রশ্ন : আপনি চলচ্চিত্রবিষয়ক প্রকাশনার মধ্যে কোনগুলোকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন?

উত্তর : আমি মার্কিন পত্রিকা পড়ি না ইংরেজি জানি না বলে। তবে Cahiers du Cinema, Positif আমি পড়ি, যারা পরস্পর থেকে অনেক ভিন্ন, এমনকি বিপরীতও বটে। কাইয়ের চলচ্চিত্রের ভাষা, আঙ্গিক ও নন্দনতত্ত্ব বিষয়ের লেখাগুলোকে আমি গুরুত্বপূর্ণ মনে করি, আবার Positif-এর সামাজিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষণও আমার পছন্দসই।

প্রশ্ন : এ ধরনের কোনো পত্রিকা কি আপনাদের ‘সিনেমা নোভো’কে প্রভাবিত করেছে?

উত্তর : না, সে রকমভাবে নয়।

প্রশ্ন : ‘কাইয়ে দ্যু সিনেমা?’

উত্তর : না। প্রথম দিকে তো আমি এই পত্রিকার সাংঘাতিক বিরোধী ছিলাম। কেননা, তখন সেটাকে আমার খুবই ডানপন্থী বলে মনে হতো। তবে তার বর্তমান চেহারাটি আমার ভালো লাগে। আমরা পত্রিকার চাইতে বরং ছবি দেখেই শিক্ষিত হয়ে উঠেছি বেশি।

প্রশ্ন : কোনো বইয়ের কথা কি মনে পড়ে?

উত্তর : আমরা ব্রাজিলের চলচ্চিত্র সংসদগুলোতে মূলত আইজেনস্টাইনের বই-ই বেশি পড়েছি। তিনিই চলচ্চিত্র বিষয়ে সবচেয়ে অগ্রসর চিন্তাভাবনা করেছেন, যা স্তালিনের খপ্পরে পড়ে দীর্ঘদিন বিস্মৃতিতে ডুবে ছিল। এ ছাড়া ফ্রান্সের ‘নিউ ওয়েভ’ নয়, ইতালির ‘নিউ রিয়েলিজম’ ধারা, বিশেষত ‘পয়জা’ বা ‘লা তেরা ত্রেমা’র মতো ছবি ‘সিনেমা নোভো’কে বেশ আন্দোলিত করেছিল।

প্রশ্ন : তাহলে প্রধানত চলচ্চিত্রের মাধ্যমেই ‘সিনেমা নোভো’র ধারণাটি গড়ে ওঠে?

উত্তর : হ্যাঁ। তিন ধরনের ছবি ছিল আমাদের প্রাথমিক প্রেরণা। প্রথমত রসেলিনি ও ভিসকন্তির ‘ওপেন সিটি’, ‘লা তেরা ত্রেমা’, ‘পয়জা’ ইত্যাদি। দ্বিতীয়ত বুনুয়েলের এই সমস্ত মেহিকান ছবি, ‘লস অলবিদাদস’ কিংবা ‘নাজারিন’ এবং তৃতীয়ত ও প্রধানত রাশিয়ান মহিরুহ আইজেনস্টাইন ও দভঝেঙ্কোর ছবিসমূহ। এই সমস্ত ছবি আমাদের সাংঘাতিকভাবে আকর্ষণ করে এবং আমরা তাদের তত্ত্ব সম্পর্কে পড়াশোনা করি। তবে New Wave-এর বিরুদ্ধে আমরা প্রচুর লড়াই করেছি। কেননা, সেসব ছবি আমাদের পছন্দ হতো না। আমরা এখন গদারকে পছন্দ করি, তবে আগে তাঁর বুর্জোয়াপনা, আঙ্গিকসর্বস্বতার কারণে তিনি আমাদের পছন্দনীয় ছিলেন না।

প্রশ্ন : আপনি যখন বলছেন যে এখন সময় এসেছে ‘সিনেমা নোভো’র একটি মুখপত্র প্রকাশের, তখন কি এটাই বোঝাতে চাইছেন যে ‘সিনেমা নোভো’ আন্দোলনের তত্ত্ব ও আদর্শ সংজ্ঞায়নের সময়ও এখন এসেছে?

উত্তর : হ্যাঁ, এখন যখন আমাদের পেছনে আট বছরের অভিজ্ঞতা রয়েছে, তখন আমরা সেটা নিয়ে আলোচনা করতে পারি বৈকি এবং সেটা তাত্ত্বিক ভিত্তিতেও হতে পারে। আমি মনে করি, এখনো চলচ্চিত্রে দুটো প্রধান সমস্যা রয়ে গেছে, তা হলো চলচ্চিত্রের প্রকৃত উদ্দেশ্য কী এবং তার যথাযথ ভাষাটি কী, এই দুই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা। গতানুগতিক ধ্যানধারণা চুরমার করে দিয়েই আমাদের এর উত্তর খুঁজতে হবে। গত দশ বছরে, এই ভবিষ্যৎ ছবির পূর্বসূরি হিসেবে প্রচুর কাজ হয়েছে, যেমন ফ্রান্সের ‘নিউ ওয়েভ’, আমেরিকার ‘আন্ডারগ্রাউন্ড’ সিনেমা, তৃতীয় বিশ্বের রাজনৈতিক চলচ্চিত্র ইত্যাদি, তবে এগুলোই শেষ কথা নয়, এরা কেবল পথের আন্দাজ দিতে পরে। সত্যিকার নতুন পথের সন্ধান আমাদের খুঁজে বের করতে হবে।

(সংক্ষেপিত)

প্রথম প্রকাশ : Cineaste Magazine, Summer 1970