মুখোমুখি ১০ মিনিট সাহেদ-সাবরিনার মুখে ৩০ রুইকাতলার নাম!

জোবেদা খাতুন হেলথ কেয়ারের (জেকেজি) চেয়ারপারসন ডা. সাবরিনা আরিফ চৌধুরী ও রিজেন্ট হাসপাতালের কর্ণধার সাহেদ করিমের মুখ থেকে বেরিয়ে আসছে অনেক রুইকাতলার নাম। এরা সবাই তাদের কাছ থেকে বিভিন্ন ধরনের সুযোগ-সুবিধা নিয়ে দুর্নীতিতে সহায়তা করেছেন। এ কারণে দুই দিন আগে সাহেদ-সাবরিনাকে ডিবি কার্যালয়ে মুখোমুখি করা হয়েছিল। সেখানে দেখা গেছে, দুইজনের প্রতারণার ধরন দুই রকমের। কিন্তু তারা দুইজনই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অসাধু একই শ্রেণির কর্মকর্তার কাছ থেকে কাজ বাগিয়ে নিয়েছেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ছাড়াও বিভিন্ন পেশার অন্তত ৩০ জনের নাম তারা বলেছেন, যারা এদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়েছেন। এই নামগুলো এখন যাচাই-বাছাই চলছে। সোমবার রিমান্ড শেষে সাবরিনাকে কারাগারে পাঠানো হলেও আবারও তাকে রিমান্ডে আনার সম্ভাবনা রয়েছে বলে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে।

জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার আব্দুল বাতেন বলেন, দুই দিন আগে সাবরিনা ও সাহেদকে ১০ মিনিটের জন্য মুখোমুখি করা হয়েছে। তাদের দুজনেরই মুখে কিছু কমন নাম চলে আসায় তাদের একত্রে বসানো হয়েছিল। নামগুলো নিয়ে যাচাই-বাছাই চলছে। তদন্তের কারণে এখনই কারও নাম প্রকাশ করা সম্ভব নয়। তবে এরা সবাই সমাজে রুইকাতলা হিসেবে পরিচিত। আসা করা যাচ্ছে, দ্রম্নতই এই মামলার চার্জশিট প্রদান করা সম্ভব হবে।

ডিবি সূত্র জানায়, সাহেদ, আরিফ ও সাবরিনার মোবাইল ফোন ঘেঁটে অনেক তথ্য পাওয়া গেছে। যদিও তারা আগেই তাদের মোবাইল ফোন থেকে বিভিন্ন অ্যাপসগুলো ডিলিট করে দেন। এরপর প্রযুক্তির সহায়তায় সেগুলো উদ্ধার করা হয়েছে। সেখানে দেখা গেছে অনেক প্রভাবশালীর সঙ্গে যোগাযোগ ছিল তাদের। তাদের ধারণা ছিল বিপদে পড়লে ওই ব্যক্তিরা তাদের পাশে দাঁড়াবেন। এসব ব্যক্তির প্রভাব খাটিয়েই আরিফ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের লোকজনকে তটস্থ করে রাখতেন। এ কারণে জেকেজির জন্য পিপিই, গস্নাভসসহ মেডিকেল সরঞ্জামও প্রয়োজনের তুলনায় বেশি নিতে পেরেছিলেন। পরে এসব মালামাল তিতুমীর কলেজ থেকে উদ্ধার করা হয়। ফেসবুক মেসেঞ্জার ও হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর ও চিকিৎসকদের একটি সংগঠনের প্রভাবশালী কয়েকজনের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করতেন সাবরিনা। নিজের গস্ন্যামারকে পুঁজি করে এসব ব্যক্তির সঙ্গে সখ্য গড়ে তুলেছিলেন সাবরিনা। এ ধরনের অন্তত ১০ জনের নামের তালিকা এখন ডিবির হাতে। এদের অনেকেই আবার সাবরিনার প্রতারণার বিষয়টি জেনে গেলে তাদেরও ম্যানেজ করা ফেলেন। কাউকে টাকা দিয়ে আবার কাউকে মুখের কথায় বস করেন সাবরিনা। কয়েকজনের কাছে সাবরিনার বিপুল পরিমাণ টাকাও জমা রয়েছে বলে সূত্রটি দাবি করেছে। এমন কথার সূত্র ধরে ওই সব ব্যক্তির ওপর নজরদারি অব্যাহত রয়েছে।

সাবরিনা-আরিফের মামলার তদন্ত তদারক কর্মকর্তা ডিবির তেজগাঁও জোনের উপ-পুলিশ কমিশনার গোলাম মোস্তফা রাসেল যায়যায়দিনকে বলেন, সাবরিনা কয়েকজনের নাম বলেছেন। কিন্তু নাম বললেই তারা দোষী না। এ কারণে তাদের বিরুদ্ধে প্রমাণ সংগ্রহ করা হচ্ছে। প্রমাণ পাওয়া গেলে তাদেরও আইনের আওতায় আনা হবে। প্রয়োজনে সাবরিনাকেও তাদের মুখোমুখি করা হতে পারে।

সূত্রমতে, জেকেজি প্রতিষ্ঠানের আরিফুল হক চৌধুরী করোনার নমুনা সংগ্রহে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সঙ্গে চুক্তি করলেও জেকেজির ট্রেড লাইসেন্স তার এক বোনের নামে বলেও তথ্য পেয়েছে ডিবি। তবে মার্চে চুক্তি করে গত জুনে জমা দেওয়া ওই লাইসেন্সটি আবার পুরানো তারিখ বসিয়ে করা হয়েছে। পরে সেটি আরিফের স্ত্রী জেকেজির চেয়ারপার্সন ডা. সাবরিনা আরিফ চৌধুরী প্রভাব খাটিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে জমা দেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে। এক্ষেত্রে কয়েকজন চিকিৎসক নেতা তাকে সহযোগিতা করেন। প্রয়োজনে তাদেরও ডিবি কার্যালয়ে ডেকে পাঠানো হতে পারে।

এদিকে সাহেদের প্রতারণার জন্য মূলত টকশোকে দায়ী করছেন তদন্ত-সংশ্লিষ্টরা। সাহেদ তার প্রতারণায় সহায়তার জন্য হেভিওয়েট অন্তত ২০ জনের নাম বলেছেন। এরা সবাই নেতা, দূত, আমলা, মিডিয়া, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য। তদন্ত-সংশ্লিষ্টদের কাছে এসব কর্মকর্তার দাবি, সাহেদকে তারা টকশোর মাধ্যমে চিনেছেন। তাছাড়া তিনি নিজেও একটি পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক। বিভিন্ন আমলার দাবি, বেশিরভাগ সময় সাহেদ তাদের ফোন করে টকশোর জন্য কিছু তথ্য দরকার বলে জানাতেন। এরপর ওই কর্মকর্তার সঙ্গে দেখা করে সেলফি তুলতেন। আবার মাঝেমধ্যে কিছু তদবিরও করতেন।

ডিবির এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বয়স বেশি দেখানোর জন্য সাহেদ চুল সাদা করে রাখতেন। কোনোভাবেই তার জন্ম ১৯৮০ সালের নিচে হবে না। এসব কাঁচা-পাকা ও টকশো করা বুদ্ধিজীবী যখন কোনো কর্মকর্তার সামনে গিয়ে দাঁড়াতেন তখন তারা এমনিতেই তাকে সালাম দিয়ে সমাদর করতেন। এই সুযোগে তিনি তার নিজের স্বার্থ উদ্ধারের চেষ্টা করেছেন। কোনো কর্মকর্তাকে দিয়ে কাজ করাতে পেরেছেন আবার কারও কাছ থেকে খালি হাতেও ফেরত এসেছেন। সেক্ষেত্রে পরে তিনি বিভিন্ন ধরনের বড় মাপের সাংবাদিক নেতাদের ব্যবহার করতেন। যারা কমন ফেস, তাদেরই বেশি চয়েস করতেন। তবে একজনকে দিয়ে একাধিক কাজের তদবির করাতেন না। বিনিময়ে সাহেদও তাদের খুশি করে গেছেন। দিয়েছেন অর্থকড়ি, গাড়ি, বিদেশে প্রমোদ ভ্রমণের সুবিধাও। এসব নেতার দাবি তারা সাহেদকে চিনে ফেলার পর তার কাছ থেকে সরে আসেন। পরে তাদের সেলফি দিয়ে সে বিভিন্ন স্থানে প্রভাব খাটিয়ে চলাফেরা করতেন।

সাহেদের মামলার তদন্ত তদারক কর্মকর্তা ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উত্তরা জোনের ডিসি শফিকুল আলম বলেন, নাম বললেই সে দোষী নই। এ কারণে এখন প্রমাণ সংগ্রহ করা হচ্ছে। সেখানে সাহেদের প্রতারণায় কাউকে যুক্ত পাওয়া গেলে কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া হবে না। এ বিষয়ে পুলিশ কঠোর অবস্থানে রয়েছে।

জানা গেছে, জেকেজির ভুয়া করোনা টেস্টের মামলায় সাবরিনাসহ আরও সাতজন আসামি রয়েছেন। অন্যরা হলেন- সাবরিনার স্বামী আরিফুল হক চৌধুরী, আরিফুলের ভগ্নিপতি সাঈদ, কর্মকর্তা-কর্মচারী হুমায়ুন কবির, তানজিনা পাটোয়ারী, মামুন ও বিপস্নব। গত ১২ জুলাই সাবরিনাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশের তেজগাঁও ডিভিশনে আনা হলে পরে তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। সোমবার ঢাকার একটি আদালত সাবরিনাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। এর আগে গত ২৩ জুন গ্রেপ্তার করা হয় আরিফ চৌধুরীকে। এ ঘটনার পর করোনা টেস্টের জাল সনদ সরবরাহ এবং টেস্ট ও চিকিৎসায় অতিরিক্ত টাকা আদায়সহ বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে ৬ জুলাই রিজেন্ট হাসপাতালে অভিযান চালায়র্ যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত। অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় পরদিন ৭ জুলাই হাসপাতালটির উত্তরা শাখা এবং ৮ জুলাই মিরপুর শাখা সিলগালা করে দেয়র্ যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত। এরপর একে একে বেরিয়ে আসতে থাকে রিজেন্ট হাসপাতালের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাহেদের নানা অপকর্মের ভয়াবহ সব তথ্য। মুখ খুলতে শুরু করেন ভুক্তভোগীরা। এছাড়া সাহেদকে ভয়ংকর প্রতারক উলেস্নখ করে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে ২০১৬ সালে তৎকালীন পুলিশ মহাপরিদর্শককে চিঠি দেয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তার বিরুদ্ধে পাওনাদারদের নিয়মিত নির্যাতনের অভিযোগও অঢেল। কেউ পাওনা টাকা চাইলে তাকে নানাভাবে হয়রানি ও অপদস্থ করতেন সাহেদ। এ পর্যন্ত তার নামে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অন্তত ৫৬টি মামলার সন্ধান পাওয়া গেছে।র্ যাবের হট লাইনে অভিযোগ জমা পড়েছে দেড় শতাধিক।

সাহেদের এনআইডি

বস্নক করল ইসি

নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিব মো. আলমগীর জানিয়েছেন, রিজেন্ট হাসপাতালের চেয়ারম্যান সাহেদ করিমের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি কার্ড) বস্নক করে দেওয়া হয়েছে। তিনি জালিয়াতি করে এনআইডি সংশোধন করেছেন কি না, তা নিয়ে তদন্ত চলছে।

আমরা অভিযোগ পেয়েছি তিনি জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে এনআইডি সংশোধন করেছেন।

সোমবার বিকালে নির্বাচন ভবনে নিজের কার্যালয়ে সাংবাদিকদের এ সংক্রান্ত তথ্য দিতে গিয়ে তিনি এ কথা বলেন।

ইসি সচিব বলেন, এনআইডি মহাপরিচালকের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। সাহেদ বিদেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সনদ দিয়ে এনআইডি সংশোধন করেছেন। আমরা ব্রিটিশ কাউন্সিলের মাধ্যমে কিংবা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে খোঁজ নিয়ে দেখব প্রকৃত ঘটনা কী। এরপর তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে তার সংশোধিত এনআইডি বাতিল করা হবে। এছাড়া তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হবে। আমরা ইতোমধ্যে এ ধরনের ঘটনায় অনেকের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছি। অনেকে শাস্তিও পেয়েছেন।

মো. আলমগীর বলেন, সাহেদ প্রথমে যে এনআইডি করেছিলেন, সেখানে তার নাম ছিল সাহেদ করিম। পরবর্তীকালে তিনি এটি সংশোধন করে মো. সাহেদ হয়ে যান। প্রথমে তার জন্মসাল ছিল ২ জুলাই ১৯৭৫। পরবর্তীকালে তিনি সেটা ৭৮ করে নেন। আবার এর সপক্ষে তিনি ও-লেভেলের কাগজপত্র দাখিল করেন।