বিএসএফ-বিজিবি প্রকাশ্য রেষারেষি বৃহত্তর কোনো বিরোধের ইঙ্গিত কী?

ভারত থেকে বাংলাদেশে গরু চোরাচালান বহু পুরানো পরিচিত ঘটনা। কিন্তু এ মাসে এই বিষয় নিয়ে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী যেভাবে প্রকাশ্যে, বিবৃতি দিয়ে পরস্পরকে এই চোরাচালানের অংশীদার বলে দায়ী করছে, তার নজির বিরল।

পাচার করা গরু দিয়ে কোরবানি হয় কিনা, সে ধরনের কোরবানি পশু নির্যাতনের সামিল কিনা- বিবৃতি দিয়ে বিএসএফের মত একটি ভারতীয় প্রতিরক্ষা বাহিনীর পক্ষ থেকে সেই প্রশ্ন তোলার নজিরবিহীন ঘটনা নিয়ে বাংলাদেশে বিস্ময় সৃষ্টি হয়েছে।

এনিয়ে বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষা বাহিনী বিজিবির সাবেক প্রধান লে. জে. (অব) মইনুল ইসলাম বলেন, প্রকাশ্যে বক্তব্য-বিবৃতি দিয়ে এক বাহিনী আরেক বাহিনীকে চোরাচালানে জড়িত থাকার জন্য দায়ী করার এই ঘটনায় তিনি বিস্মিত।

তিনি বলেন, ‘বিএসএফ কিন্তু কোনো ব্যক্তিকে দায়ী করেনি, প্রতিবেশী দেশের একটি পুরোবাহিনীকে দায়ী করেছে। এটা যেমন অস্বাভাবিক তেমনি অন্যায়। ফলে বিজিবির পক্ষ থেকে পাল্টা বিবৃতি জারি করা যথাযথ হয়েছে বলে আমি মনে করি।’

ঝগড়ার শুরু যেভাবে : এই ঝগড়ার শুরু ৬ জুলাই, যখন বিএসএফের সাউথ বেঙ্গল ফ্রন্টিয়ারের ডিআইজি এসএস গুলেরিয়া ঈদের আগে গরু চোরাচালান নিয়ে একটি বিবৃতি জারি করেন। বিএসএফের ওই বিবৃতিতে বিজিবিকে এই চোরাচালানে মদদ দেওয়ার জন্য অভিযুক্ত করা হয়।

একই সঙ্গে ওই বিবৃতিতে বলা হয়, যেভাবে কোরবানির উদ্দেশ্যে গরুগুলোকে ভারত থেকে বাংলাদেশে ঢোকানো হয় তা পশু নির্যাতনের সামিল, এবং ওই গরু দিয়ে আদৌ কোরবানি হয় কি-না তা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়।

বিএসএফের ওই বিবৃতির দুই সপ্তাহ পর গত রোববার বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবির পক্ষ থেকে একটি পাল্টা বিবৃতি জারি করে চোরাচালানের পেছনে বিএসএফের মদদের অভিযোগ তোলা হয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়, ‘প্রকৃতপক্ষে ভারতীয় চোরাকারবারিদের মাধ্যমে সীমান্ত এলাকায় ভারতের মাটিতে গরু সমাগম ও নদীপথে গরু পাচারে বিএসএফের নিষ্ক্রিয়তা নিঃসন্দেহে বিভিন্ন প্রশ্নের অবতারণা করে।’

কোরবানির সঙ্গে পশু নির্যাতন নিয়ে যে প্রশ্ন বিএসএফ তুলেছে, তার তীব্র প্রতিবাদ করে বিজিবি বলেছে, এই ধরনের বক্তব্য ঈদুল আজহার জন্য অবমাননাকর এবং মুসলমানদের ধর্মীয় অনুভূতিতে চরম আঘাত হানার সামিল।

চাপ তৈরির চেষ্টা?

লে. জে. (অব.) মইনুল ইসলাম মনে করেন, গরু চোরাচালান নিয়ে ৬ জুলাই প্রকাশিত বিএসএফের ওই ‘অস্বাভাবিক’ বিবৃতি এককভাবে ওই বাহিনী দিতে পারে না এবং এর পেছনে ভারত সরকারের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত কাজ করেছে।

‘সীমান্তে নানারকম মতবিরোধ রুটিন ব্যাপার। স্থানীয়ভাবে তার সমাধান হয়। গুরুতর মতবিরোধ দেখা দিলে কূটনৈতিক পর্যায়ে তার সমাধানের চেষ্টা হয়, কিন্তু এখানে তা হয়নি…বিশেষ করে ধর্ম নিয়ে কথা বলা একেবারেই অবিবেচকের কাজ।’

‘আমি বুঝতে পারছি না কেন ভারত সরকার একটি বর্ডার ফোর্সকে দিয়ে এমন সব কথা বলাতে গেল!’

জেনারেল ইসলাম সন্দেহ করছেন, চীন-ভারত সীমান্ত বিরোধ নিয়ে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে নিশ্চুপ থাকার জন্য বাংলাদেশের ওপর ভারত হয়তো কোনো চাপ সৃষ্টির চেষ্টা করছে।

চীন-ভারত সীমান্ত সংঘাত নিয়ে ভারতের প্রতিবেশীরা কেউ কোনো কথা বলেনি। ভারত হয়তো এটা ভালোভাবে নেয়নি…এটা হতে পারে চাপ সৃষ্টির চেষ্টা হচ্ছে।

এটা অনস্বীকার্য যে চীন-ভারত সীমান্ত বিরোধ নিয়ে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো একটি নিরপেক্ষ অবস্থানে থাকার চেষ্টা করে যাচ্ছে।

কাশ্মীরে পুলওয়ামায় জঙ্গি হামলায় ভারতীয় সৈন্যের মৃতু্যতে যেখানে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে দ্রম্নত সহমর্মিতা জানিয়ে বিবৃতি জারি করা হয়েছিল, সেখানে গালওয়ানে ২০ জন ভারতীয় সৈন্যের মৃতু্য নিয়ে চুপ ছিল ঢাকা।

পর্যবেক্ষকদের অনেকেই মনে করছেন, ভারত সরকার এবং ভারতীয় সমাজ-রাজনীতির একটি অংশের মধ্যে প্রতিবেশীদের এই ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।

মার্কিন সাময়িকী বস্নুমবার্গে এক মন্তব্য প্রতিবেদনে অর্চনা চৌধুরী এবং বিভুদত্ত ওরাধান লিখেছেন, ‘নরেন্দ্র মোদি যদি আশা করে থাকেন বিপদের সময় তিনি প্রতিবেশীদের কাছ থেকে সমর্থন পাবেন, তিনি ভুল ভেবেছিলেন। যেখানে তাদের সৈন্যের নিহত হওয়ার ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্র বা ব্রিটেন সমবেদনা জানিয়েছে, ট্র্যাডিশনাল মিত্র বাংলাদেশ এবং নেপাল সেখানে ছিল নিশ্চুপ।’

ওই প্রতিবেদনে লেখা হয়েছে, নরেন্দ্র মোদির দ্বিতীয় দফার শাসনে তার কট্টর হিন্দু জাতীয়তাবাদী এজেন্ডায় প্রতিবেশীদের মধ্যে ভয়, সন্দেহ অস্বস্তি বিরাজ করছে।

এটা সবারই জানা যে, ভারতে এনআরসি এবং ধর্মের ভিত্তিতে করা সংশোধনী নাগরিকত্ব আইন নিয়ে বাংলাদেশ একেবারেই খুশি নয়।

ভারত বাংলাদেশকে হারাতে চায় না

তবে দিলিস্নর জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের (জেএনইউ) আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক সঞ্জয় ভরদোয়াজ বলেন, চীন-ভারত বিরোধে পক্ষ নেওয়ার জন্য ভারত বাংলাদেশের ওপর বড় কোনো চাপ সৃষ্টি করবে বলে তিনি মনে করেন না।

তিনি বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, গরু চোলাচালান নিয়ে বিএসএফের বিবৃতির সঙ্গে ভারত সরকারের বৃহত্তর নীতির কোনো সম্পর্ক নেই। বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকে গরু চোরাচালান কমাতে তারা প্রকাশ্যে কথা বলছে। গরু চোরাচালান অনেকের কাছে আর দশটি ব্যবসার মতো একটি ব্যবসা, কিন্তু অনেকের কাছে গরু- এটি একটি ধর্ম বিশ্বাস।’

তিনি বলেন, আঞ্চলিক বড় দুই শক্তির বিরোধে ছোট দেশগুলো যে চুপ থাকবে- এই বাস্তবতা ভারতের নীতি-নির্ধারকরা বোঝেন।

চীন-ভারত বিরোধ নিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার ছোট দেশগুলো ভেতরে ভেতরে হয়তো খুশি। তারা মনে করছে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের একাধিপত্যকে চীন চ্যালেঞ্জ করছে, এবং তারা মনে করছে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কে একটা ভারসাম্য তৈরি করার ক্ষেত্রে এটা তাদের একটি সুযোগ।

শীতল যুদ্ধের সময় এটা দেখা গেছে। এটা খুবই স্বাভাবিক একটি মনস্তত্ত্ব্ব, এবং আমার মনে হয় ভারতের নীতি-নির্ধারকরা তা বোঝেন।

অধ্যাপক ভরদোয়াজ বলেন, চীন পরোক্ষাভাবে সেই ভারসাম্য তৈরিতে সাহায্য করছে।

তিনি মনে করেন, ভারত যদি বাংলাদেশের মতো দেশের কাছ থেকে এ সময় আনুগত্য প্রত্যাশাও করে, তার জন্য বাংলাদেশের ওপর চাপ তৈরির ঝুঁকি নেবে না।

বাংলাদেশকে হারানোর কোনো ঝুঁকি ভারত এখন নেবে না।

আর তাছাড়া, চীনের সঙ্গে ‘বাফার স্টেট’ হিসেবে নেপাল বা ভুটানকে নিয়ে ভারতের যে উদ্বেগ, বাংলাদেশ বা শ্রীলংকাকে নিয়ে ততটা নেই।

উপরন্তু, অধ্যাপক ভরদোয়াজের মতে, ভারত এখনও চীনের সঙ্গে পুরাদস্তুর বিরোধে জড়াতে অনিচ্ছুক এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের স্বার্থে এখনও চীনকে একটি সুযোগ হিসেবে দেখে ভারত।

নিরাপত্তার উদ্বেগ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সুসম্পর্ক চাইছে ভারত, কিন্তু ভারত এখনও যুক্তরাষ্ট্রের একটি ক্লায়েন্ট স্টেট হতে অনিচ্ছুক। এবং সেজন্য ইন্দো-প্যাসিফিক জোটে পুরোপুরি ঢোকার ব্যাপারে ভারতের মধ্যে এখনও কুণ্ঠা রয়েছে।

ভারসাম্য তৈরি করছে চীন

তবে অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, চীনের সঙ্গে সীমান্ত নিয়ে সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে ভারত যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে তৈরি চীন-বিরোধী জোটগুলোতে আরও ঘনিষ্ঠভাবে ঢুকে পড়তে বাধ্য হবে। আর সেই সঙ্গে বদলে যাবে তাদের বৈদেশিক এবং কৌশলগত সম্পর্কের নীতি।

বাংলাদেশের মতো দক্ষিণ এশিয়ার ক্ষুদ্র প্রতিবেশীদের পক্ষে তখন নিরপেক্ষ অবস্থানে থাকা দুরূহ হয়ে পড়তে পারে।

অবশ্য হংকংয়ের দৈনিক সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টে এক সাক্ষাৎকারে চীনা সাবেক কূটনীতিক এবং বেইজিংয়ে ফুদান বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ঝাং জিয়াডং বলেন, দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের একাধিপত্যের ভয়ে ছোট দেশগুলো চীনের দিকে ঝুঁকছে, কিন্তু তার মানে এই নয় যে তাদের একটি শিবিরেই থাকতে হবে।

যতক্ষণ পর্যন্ত চীন ও ভারতের মধ্যে শক্তির ভারসাম্য রয়েছে ততক্ষণ ছোট দেশগুলোর স্বতন্ত্র অবস্থান নেওয়ার সুযোগ থাকবে। জবরদস্তি করে কোনো একটি পক্ষে তাদের নেওয়া যাবে না। বিবিসি বাংলা