ফাহিমকে বিভ্রান্ত করতে খুনির অভিনয়

ভোরের আলো ডেষ্ক:লিফটে ঢুকেই ফাহিমকে বিভ্রান্ত করতে একটুখানি অভিনয়ও করেছিল হত্যাকারী। এছাড়া হত্যাকাণ্ডের সব আলামত নিশ্চিহ্ন করতে চেয়েছিল সে। আর তাই মৃতদেহ কেটে টুকরো টুকরো করে ফেলা হয়। এরপর কাটা অংশগুলো গার্বেজ ব্যাগে ভরার উদ্দেশ্য ছিল। সপ্তম তলা থেকেই সেগুলো ময়লা ফেলার নির্দিষ্ট সুড়ঙ্গে ফেলে দেয়ার সিদ্ধান্তও ছিল। কিন্তু তার আগেই ‘কেউ একজন এসে পড়েছে’ এমন আশঙ্কায় মিশন শেষ না করেই পেছনের দরজা ও সিড়ি ব্যবহার করে পালিয়ে যায় পেশাদার খুনি। তদন্ত প্রক্রিয়ার বরাত দিয়ে নিউ ইয়র্ক পুলিশ ডিপার্টমেন্টের (এনওয়াইপিডি) একজন কর্মকর্তা এই তথ্য জানিয়েছেন কে।

এদিকে তদন্ত প্রক্রিয়ার অংশ হিসাবে ফাহিম সালেহ’র সঙ্গে ব্যবসায়ীক স্বার্থ-সংশ্লিষ্টতা ছিল এমন এক ব্যক্তিকে নিজেদের হেফাজতে নিয়েছে এনওয়াইপিডি।

যদিও এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততার বিষয়ে পুলিশ এখনো নিশ্চিত কোনো তথ্য পায়নি। সে কারণে তার নাম-পরিচয় প্রকাশ করা হচ্ছেনা। তবে নানাভাবে তাকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে। নিউ ইয়র্কে অবস্থানরত ফাহিমের পরিবার এই ভয়ঙ্কর ঘটনায় এতটাই ভেঙে পড়েছে যে, তার বাবা, মা কিংবা বোন কেউই গণমাধ্যমের সঙ্গে কোনো কথা বলছেন না। পরিবারের পক্ষ থেকে শুধু এইটুকু বলা হয়েছে যে, খুনিকে ধরে বিচারের মুখোমুখি করা হলেই কেবল তারা কিছুটা স্বস্তি পেতে পারেন এবং এই কঠিনতম মুহূর্তে এরচেয়ে বেশি কিছু তাদের বলার নেই।
তরুণ বাংলাদেশি-আমেরিকান উদ্যোক্তা ফাহিম সালেহ’র নৃশংস খুনের মামলাটি নিউ ইয়র্ক পুলিশের কাছে এই মুহূর্তে টপ প্রায়োরিটি। একইভাবে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে এই মর্মান্তিক ঘটনা। ফাহিমের পৈশাচিক হত্যাকাণ্ড এবং সেটার তদন্তের নানাদিক নিয়ে যেমন রিপোর্ট হচ্ছে, তেমনি তার উদ্ভাবনী ক্ষমতা এবং নেতৃত্ব নিয়েও প্রকাশ করা হচ্ছে নিবন্ধ। দুনিয়ার অন্যতম শীর্ষ সংবাদপত্র নিউ ইয়র্ক টাইমস এ সংক্রান্ত সংবাদ কভারেজের জন্য তাদের অন্তত তিনজন সাংবাদিক এবং দু’জন গবেষককে নিয়োজিত করেছে। এরমধ্যে উইলিয়াম কে রাশবাম নামে মেট্রো ডেস্কের একজন সিনিয়র রিপোর্টারও রয়েছেন যিনি ২০০৯ সালে ব্রেকিং নিউজ ক্যাটাগরিতে পুলিৎজার পুরষ্কার বিজয়ী টিমের সদস্য ছিলেন।
ফাহিম হত্যাকাণ্ডের তদন্তের অগ্রগতি বিষয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে এখনো পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে তেমন কিছু বলা হচ্ছে না। তবে এনওয়াইপিডি’র বিভিন্ন সূত্র থেকে মিলছে কিছু তথ্য। তেমনই একটি সূত্র মানজমিনকে জানায়, ফাহিমের কন্ডোমেনিয়াম ভবনের লিফটে কেউ নির্দিষ্ট কোনো ফ্লোরে আরোহণ করতে চাইলে তাকে ডিজিটাল “কী ফোব” ব্যবহার করে লিফটের বোতাম চাপতে হয়। কালো পোশাক ও কালো মাস্কে আবৃত খুনি লিফটে ঢুকেই ফাহিমকে বিভ্রান্ত করার জন্য এমন অভিনয় করেছিল যেন সে “কী ফোব” ব্যবহার করেছে। কিন্তু বাস্তবে সে তা করেনি। কারণ, তার কাছে ওই ভবনের ‘কী ফোব’ থাকার কোনো কারণ নেই। বরং সপ্তম তলায় লিফটের দরজা খোলার পর ফাহিমের সঙ্গেই সে লিফট থেকে নেমে যায়। লিফটের একেবারে মুখোমুখি দরজাটিই ফাহিমের এপার্টমেন্টের দরজা। সেই দরজার চাবি ফাহিমের হাতেই ছিল। লিফট থেকে বেরিয়ে খুব দ্রুতই সে এপার্টমেন্টের দরজা খোলে। ঠিক ওই মুহূর্তটিতেই কয়েক সেকেন্ডের জন্য তাদের মধ্যে কিছু একটা কথাবার্তা হওয়ার দৃশ্য লিফটের ভিতরে লাগানো সিসি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা গেছে। ফাহিম এপার্টমেন্টের দরজা খোলামাত্রই খুনি তাকে সজোরে ধাক্কা দিয়ে ভিতরে ঢুকিয়ে ফেলে। ততক্ষণে লিফটের দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আর কোনো দৃশ্যের ফুটেজ মেলেনি।
তবে মঙ্গলবার বিকেলে ফাহিমের খণ্ড-বিখণ্ড মৃতদেহ উদ্ধারের পর পুলিশ সেখান থেকে আরো যেসব আলামত সংগ্রহ করেছে তা থেকেই পরিষ্কার হচ্ছে অনেক কিছু। এনওয়াইপিডি সূত্র বলছে, ফাহিমকে কাবু করতে শুরুতেই খুনি ব্যবহার করেছে একটি ইলেক্ট্রিক্যাল স্টান-গান। এটার আঘাত অনেকটা বৈদ্যুতিক শক এর মতো এবং কোনো শব্দ হয় না। এরপর দেহের বিভিন্ন অংশ বিচ্ছিন্ন করার আগে ঠিক কিভাবে ফাহিমকে খুন করা হয়েছে সে ব্যাপারে তদন্তকারীরা এখনও সংশয়ে। তবে হত্যকারী যে খুনের সব আলামত নিশ্চিহ্ন করতে চেয়েছিল এ ব্যাপারে পুলিশ নিশ্চিত। কারণ, মৃতদেহকে টুকরো টুকরো করার সময় সেখানে স্বাভাবিকভাবেই অনেক রক্তপাত হয়েছে। কিন্তু খুনি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে সব রক্ত মুছে ফেলে। এ কাজের জন্য সে প্রয়োজনীয় জিনিষপত্রও সেখানে নিয়ে যায়। এছাড়া ইলেক্ট্রিক করাত দিয়ে কেটে বিচ্ছিন্ন করা শরীরের বিভিন্ন অংশ গার্বেজ ব্যাগে ভরে রাখাও তার আরেকটি প্রমাণ। সে চেয়েছিল গার্বেজ ব্যাগে ভরা টুকরোগুলো সপ্তম তলা থেকেই ময়লা ফেলবার নির্দিষ্ট সুড়ঙ্গ দিয়ে নিচে ফেলে দিতে। কিন্তু তার আগেই ‘কেউ একজন এসে পড়া’য় মিশন শেষ না করেই পালিয়ে যায় খুনি। সে কারণেই ইলেক্ট্রিক করাতটি যেমন বৈদ্যুতিক আউটলেটে প্লাগইন অবস্থায় ছিল তেমনি খণ্ড-বিখণ্ড শরীরের টুকরোগুলোও রয়ে যায় সেখানে। পুলিশ ধারণা করছে যে, ফাহিমকে খুঁজতে আসা তার খালাতো বোন মীরান চৌধুরীর উপস্থিতি টের পেয়েই খুনি তার মিশন অসমাপ্ত রেখে পেছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে সিড়ি ব্যবহার করে পালিয়ে যায়। এ জন্য সিড়িপথে তাকে বিশেষ চাবি ব্যবহার করতে হয়েছে এবং সেই প্রস্তুতিও তার ছিল। সবমিলিয়ে হত্যাকারী যে একজন পেশাদার খুনি এবং পুরো মিশনে সে যে সর্বোচ্চ সতর্ক ছিল এ ব্যাপারে তদন্তকারীরা নিশ্চিত।
উল্লেখ্য, নিউ ইয়র্ক তথা যুক্তরাষ্ট্রের বেশিরভাগ এপার্টমেন্ট ভবনে এমন ব্যবস্থা সংযোজিত থাকে যাতে ভবনের বাসিন্দারা যেকোনো ফ্লোর থেকে ময়লাভর্তি গার্বেজ ব্যাগ নির্দিষ্ট সুড়ঙ্গে ফেলে দিতে পারেন। ওই সুড়ঙ্গের মাধ্যমে ময়লার ব্যাগ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বেজমেন্টে রক্ষিত পোর্টেবল গার্বেজ কন্টেইনার বা স্থানান্তরযোগ্য ময়লার ভাগাড়ে গিয়ে পড়ে।
এদিকে ফাহিমের সঙ্গে ব্যবসায়িক স্বার্থ-সংশ্লিষ্টতা থাকা যে ব্যক্তিকে পুলিশ বৃহস্পতিবার তাদের হেফাজতে নিয়েছে তার ব্যাপারে বিস্তারিত কোনো তথ্য দেয়া হয়নি। শুধু এইটুকু বলা হয়েছে যে, তাকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে। তার পরিচয় সম্পর্কেও কোনো তথ্য দেয়া হচ্ছেনা। এর কারণ সম্পর্কে এনওয়াইপিডি’র একজন কর্মকর্তা মানবজমিনকে বলেন, এটা এখনো নিশ্চিত নয় যে, এই হত্যাকাণ্ডে তার আদৌ কোনো সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি-না। যদি শেষ পর্যন্ত তার কোনো সম্পৃক্ততা না পাওয়া যায় তাহলে তো তাকে ছেড়ে দেয়া হবে। কিন্তু এর আগেই যদি তার পরিচয় প্রকাশ করা কিংবা তার সম্পর্কে অনেক বেশি তথ্য গণমাধ্যমকে দেয়া হয় তাহলে সেটা হবে তার প্রতি অবিচার। এমন দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই এনওয়াইপিডি সাধারণত কোনো ব্যক্তির অপরাধ-সংশ্লিষ্টতা সম্পর্কে নিশ্চিত না হয়ে তাকে ‘পাবলিকলি এক্সপোজড’ করে না।
অন্য একটি সূত্র জানিয়েছে, ফাহিম নাইজেরিয়ায় গোকাডা নামে যে মোটারসাইকেল-ট্যাক্সি সার্ভিস পরিচালনা করছিলেন এই ব্যবসার জন্য তিনি নিউ ইয়র্কের ম্যানহাটনভিত্তিক ভেনচার ক্যাপিটাল ফান্ড হতে ৫৩ লাখ মার্কিন ডলারের তহবিল নিয়েছিলেন গত বছর। কিন্তু চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে নাইজেরিয়া সরকারের নতুন বিধিনিষেধের কারণে তাদের সেই ব্যবসা বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। আর সে কারণে কোম্পানিটি বড় রকমের আর্থিক চাপে পড়ে যায়।