একটি ঐতিহ্যবাহী আদর্শ পরিবার

রেশাদ চৌধুরী:

প্রাচীন যুগে বিলাত ফেরত কথাটা ছিল একটা বিরাট সম্মানসূচক পরিচিতি। উচ্চ শিক্ষা অর্জনকারি অর্থাৎ সিভিল সার্ভিসের কমিশনার, ডেপুটি কমিশনার, হাইকোর্টের জাস্টিস, ডিস্ট্রিক জাজ, ব্যারিস্টার, অক্সফোর্ড বা ক্যামব্রিজের ডিগ্রিধারি, অধ্যাপক এবং জাতীয় পন্ডিতদের বুঝানো হতো।
সিলেট দক্ষিণ সুরমা উপজেলায় আমার নিজ গ্রাম জালালপুরের উত্তর পাশে এক মাইলের ভেতরেই বিরাহীমপুর গ্রামের একটি মুসলিম ঐতিহ্যবাহী পরিবার ছিল। তখনকার দিনে প্রায় ১৫/১৬ জন নর-নারী উচ্চশিক্ষার ডিগ্রি নিয়ে বিলাত ফেরত ছিলেন। এ বাড়িটি এলাকায় কমিশনারের বাড়ি হিসেবে পরিচিত ছিল।
এ পরিবারকে নিয়ে লিখতে বসে ছোট বেলার একটা কথা মনে পড়ে গেছে। ঠিক মনে নেই, তখন আমি ছিলাম তৃতীয় বা চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্র। সিলেট থেকে প্রায় চার মাইল দক্ষিণে বিরাহীমপুরে রাস্তার পাশেই চোখে পড়ার মতো কমিশনার সাহেবের বিশাল সুন্দর বাড়িটি অবস্থিত। তাদের বাড়ির মাইলের মধ্যেই আমাদের বাড়ি। ছোট বেলা যখন চাচার সঙ্গে রিক্সাতে করে সিলেট শহর থেকে গ্রামের বাড়ি যেতাম তখন তাকে জিজ্ঞেস করতাম এত সুন্দর বিশাল বাড়িটির মালিক কে বা কাহারা? উত্তরে চাচা বলতেন, এটি কমিশনার আই.সি.এস গজনফর আলী খান সাহেবদের বাড়ি। আবার প্রশ্ন করতাম কমিশনার, আই.সি.এস এত লম্বা নাম কেন? উত্তরে চাচা আমাকে বলতেন, কমিশনার তাঁর পদবী এবং আই.সি.এস তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা। তাঁর নাম হলো গজনফর আলী খান। প্রশ্নের কোন শেষ নাই। আবারও প্রশ্ন করতাম মানুষের শিক্ষা বা পদবী নামের পরে থাকে তাঁর বেলায় আগে কেন? উত্তরে আমার চাচা বলেছিলেন, মনযোগ দিয়ে লেখাপড়া করে বড় হও তখন সবই জানতে পারবে। লিখতে গর্ববোধ হচ্ছে আমারই পাশের গ্রামে আমাদের মতই এক মধ্যবিত্ত পরিবারে সে যুগে ১৫/১৬ জন মহিলা ও পুরুষ শুধু অক্সফোর্ড-ক্যামব্রিজের উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে দেশে এসে ভারতের বিভিন্ন উচ্চ পদে চাকুরি করতেন। একই পরিবারে এত উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ছিলেন তা ভাবতেও অবাক লাগে।এ পরিবারটি আসলেও দেশের জন্য একটি আদর্শ পরিবার হয়ে দাঁড়ায়। এখানে উল্লেখ্ করা যেতে পারে, অবিভক্ত ভারত বর্ষের সর্ব্প্রথম আই.সি.এসও ছিলেন একজন বাঙ্গালি। তিনি ছিলেন বাংলা সাহিত্যের শিরোমনি ও নভেলপ্রাপ্ত কবি ণ্ডরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জৈষ্ঠ ভ্রাতা সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর।
ইংরেজি ভাষার জ্ঞানের সাগর কমিশনার গজনফর আলী খান ছিলেন মাদ্রাসার ছাত্র। তিনি কলকাতা মাদ্রাসা থেকে এনট্টেন্স (মেট্টিক) এবং পরে এফ.এ অর্থাৎ ইন্টারমিডিয়েট পাস করে ব্যারিস্টারি পড়তে বিলেতে চলে যান।এ সময় তার সহপাঠীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ব্যক্তি ছিলেন পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ। তিনিও ছিলেন করাচি মাদ্রাসার ছাত্র।ইংরেজির সঙ্গে সঙ্গে আরবি ভাষার উপরও কমিশনার সাহেবের দখল ছিল প্রচুর। তাঁর পান্ডিত্যের জন্য তিনি বিলেতের সুধী সমাজে ওরিয়েন্টাল স্কলার বা প্রা্চ্য বিদ্যার পন্ডিত হিসেবে পরিচিত ছিলেন। কমিশনার গজনফর আলী খান এই পরিবারের একজন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব। তিনি ছিলেন অভিবক্ত ভারতবর্ষের প্রথম মুসলিম আই.সি.এস এবং আসাম প্রদেশে হিন্দু মুসলিমদের মধ্যে প্রথম। আই.সি.এস অর্থাৎ ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসের কর্মকর্তা। গজনফর আলী খান ছিলেন ভারতের মধ্য প্রদেশে নাগপুর ডিভিশনের পরম প্রতাপশালী কমিশনার। প্রায় অর্ধশতাব্দিকাল এদেশিয় ও ইউরোপীয় শিক্ষায় শিক্ষিত ও অভিজাত সমাজের ও শহুরে জীবনকে পরিত্যাগ করে ১৯৩২ খ্রিস্টাব্দে অবসর গ্রহণ করে চলে আসেন নিজ গ্রাম বিরাহীমপুরে।
এ পরিবারে আরেক খ্যাতিমান ব্যক্তি উনার অগ্রজ। খাঁন বাহাদুর আহদ্দর আলী খান ছিলেন আসাম প্রদেশের প্রথম মুসলিম সিভিল সার্জন। সে সুবাদে তাঁহার বাড়ির পাশেই একটি সরকারি হাসপাতাল নির্মিত হয়েছিল না হয় তখনকার সময়ে গ্রাম অঞ্চলে কোন সরকারি হাসপাতাল ছিল না। কালের সাক্ষী আজও সেই হাসপাতাল একই জায়গায় বর্তমান।
ভারতের পাটনার সিভিল সার্জন খান বাহাদুর আহদ্দর আলী খান সাহেব তাহার অনুজ কমিশনার গজনফর আলী খানের পূর্বেই অবসর গ্রহণ করে চলে আসেন নিজ গ্রামে। পাটনার প্রতিথযশা সিভিল সার্জন ও নাগপুরের পরম প্রতাপশালী কমিশনার এদের ভ্রাতৃত্ববোধও ছিল আদর্শনীয়, অবসর গ্রহণের পর তাঁরা নিজ গ্রামে ফিরে এসে কিভাবে এলাকাবাসির উন্নয়নে আত্মনিয়োগ করা যায় তাঁর একটি নীল নকশা তৈরি করলেন দুই সহোদয়। অবসরে এসেই জনসাধারণের দুরবস্থা দূর করতে গ্রামে পানিয় জল, চিকিৎসালয়, রাস্তা, স্কুল, কৃষিশিক্ষা, তাঁতকেন্দ্র ও পোষ্ট অফিস স্থাপন করলেন নিজ গ্রাম বিরাহীমপুরে।
একশ’ বিঘা জমির উপর গড়ে তুললেন বসত বাটি। বিলাতী লেক (হ্রদ) এর নমুনায় প্রায় ২০ বিঘা জমির উপর খনন করা হয় একটি মনোরম দিঘী। তাঁদের পিতার নাম অনুসারে দিঘীর নামকরণ করা হয় আবীদসাগর। দিঘীর উত্তর পশ্চিম পাড়ে বসতবাড়ির অট্টালিকা থেকে অনেক দূরে একটি নিরিবিলি জায়গায় চিরকুমার কমিশনার সাহেবের জন্য ইংলিশ কটেজের অনুকরনে নির্মিত হল একটি চমৎকার কুটি। তাঁদের পিতামহের নামে এটির নামকরণ হল রাহাত মঞ্জিল। আবিদ সাগরের পূর্ব পাড়ে জনপথের সন্নিকটে তৈরি হলো একটি সুন্দর বিশ্রামাগার। এর গায়ে মার্বেল পাথরের ফলকে লেখা হলো-
‘তাবীদ সাগর আমাদের স্নেহময় পিতা মৌলভী আবীদ আলি খানের জন্য পূণ্যময় স্মৃতির উদ্দেশ্যে নিবেদিত। খান বাহাদুর আহদ্দর আলী খান অবসরপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন পাটনা’।
গজনফর আলী খান আই.সি.এস ও বি.ই.সি.আই.ই অবসরপ্রাপ্ত কমিশনার নাগপুর ডিভিশন আজ ও প্রান্ত পথিক আবীদ সাগরের পানিতে তৃষ্ণা নিবারন করে। আজও ক্ষণিকের বিরতিতে ছায়া ঢাকা সেই স্মৃতি সৌধের গায়ে লিখিত ছত্র কয়টি পথিককে মনে করিয়ে দেয় এক স্বার্থক পিতার সুযোগ্য সন্তানদের কথা। আবীদ সাগরের ওপারে আজও চমৎকারভাবে রক্ষিত কমিশনার সাহেবের কোটি পথচারিদের স্মরণ করিয়ে দেয় এক ক্ষণজন্মা বিলেত ফেরৎ গ্রামবান্ধবের কথা।
জনাব গজনফর আলী খানের কোন সন্তানাদী ছিলেন না কারন উনি ছিলেন চিরকুমার। জনাব, আছদ্দর আলী সাহেবের সাত ছেলে ও দুই মেয়ে। এরা প্রত্যেকেই ছিলেন উচ্চতর ডিগ্রিধারি বিলাত ফেরৎ। তাঁর ছেলেদের মধ্যে ব্যারিস্টার আহমদ আলী খান ও ব্যারিস্টার মোহাম্মদ আলী খান ছিলেন কলকাতা হাইকোর্টের প্রতিষ্ঠিত আইনজীবি।আবরার আলী খান ছিলেন পাটনা হাইকোর্টের নামি আইনজীবি। তাঁর চতুর্থ ছেলে ডা. বশারত আলী খান ছিলেন পাটনায় ডাক্তার পেশায় নিয়োজিত। আরেক ছেলে জাওয়াদ আলী খান ছিলেন কলকাতার ডাক্তারি পেশায় নিয়োজিত।ছয় নম্বর লেনে সাহাদত আলী খাঁন ছিলেন প্রথম মহাযুদ্ধে বৃটিশ সামরিক বাহিনীতে মেজর এবং পরে পূর্ব পাকিস্তানের পোষ্ট মাষ্টার জেনারেল। আরেক ছেলে ইকবাল আলী খান ছিলেন ইন্ডিয়ান পুলিশ সার্ভিসের সদস্য এবং বিহারের মূঙ্গের জেলার পুলিশ সুপারেরেন্টনডেন্ট। তাঁর দুই মেয়েও ছিলেন ক্যামব্রিজের ডিগ্রিধারি বিলাত ফেরত। একজন বেগম সহিদুন্নেছা খার ওরফে মিস জিল খান সমাজকর্মে নিবেদিত হয়ে চিরকুমার থাকলেন। অন্য মেয়ে বেগম হাবীবা খান ছিলেন সিলেট বারের প্রখ্যাত সরকারি উকিল খাঁন বাহাদুর আমজদ আলী খান চৌধুরীর সহধর্মিনী ও পাকিস্তান সরকারের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী মরহুম আজমল আলী চৌধুরীর গর্ভধারিনী মাতা। আসলে তিনি ছিলেন বিদ্যুৎসাহী রমনী। তাদের প্রত্যেকের ছেলেমেয়েরাই ছিলেন উচ্চ শিক্ষিত এবং দেশের বিভিন্ন বিভাগে উচ্চ পদে আসীন।
একই সময়ে মনে পড়ে ঐতিহ্যবাহী এই পরিবারের অকালমৃত আরেক সুসন্তান রিয়াল এডমিরাল এম এ খানের কথা। তিনিও ছিলেন বিলাত ফেরত। বিলেতের রয়েল নেভীতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এডমিরাল সাহেব ছিলেন খাঁন বাহাদুর ডা. আছদ্দর আলী খানের বড় ছেলে ব্যারিস্টার আহমদ আলী খানের সুযোগ্য পুত্র। তিনি তাঁর স্বনামধন্য পিতামহের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে বাংলাদেশে নৌবাহিনী প্রধানের মতো এত বড় একটা উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন মন্ত্রীত্বে থাকাকালীন অবস্থায় বিদেশি ও এদেশীয় শহুরে জীবন পরিত্যাগ করে জনসেবার উদ্দেশ্যে সিলেট গ্রামের বাড়িতে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। তখন আবিদ সাগরের পাড়ে ‘রাহাত মঞ্জিল’- এর নবরুপ দান হচ্ছে। অন্যদিকে গণসংযোগের জন্য সিলেট শহরে তাদের বাসস্থান ‘দিল খুসকে’ সুন্দর করে সাজানো হচ্ছে। এমনি সময় ঢাকা বিমানবন্দরের অদূরে ঘটে গেল বাংলাদেশ বিমানের একটি মর্মান্তিক দূর্ঘটনা। উদ্ধার কাজের তত্বাবধানে ব্যক্তিগতভাবে এগিয়ে এলন মানবদরদি এডমিরাল মাহবুব আলী খান। দূর্ঘটনার হৃদয়বিদারক দৃশ্যে নিজেকে সামলাতে পারলেন না তিনি। অকুস্থলে নিজেই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে পড়লেন এবং কয়েক ঘন্টার ভেতরেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন কম্বাইন্ড মিলিটারি হাসপাতালে (সিএমএইচ)।
সিলেট দক্ষিণ সুরমার ছায়াসুনিবিড় নিজ গ্রাম বিরাহিমপুরের আবীদ সাগরের পাড়ে শান্তিনীড় রাহাত মঞ্জিলে তাঁর আর ফিরে আসা হলো না।
উল্লেখ্য, রিয়াল এডমিরাল এম এ খানের সুযোগ্য কন্যা জোবায়দা রহমান ডাক্তার হিসেবে সুনাম কুড়িয়েছেন। বিসিএস পরীক্ষার মাধ্যমে বাংলাদেশে ডাক্তারি পেশায় যোগদান করেন। পরিণতি বয়সে তিনি স্বাধীনতার ঘোষক, বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবক্তা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের জৈষ্ঠপুত্র ও বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হন। বর্তমানে স্বামী তারেক রহমানের উন্নত চিকিৎসার জন্য একমাত্র সন্তান কন্যা জায়মা রহমানসহ জোবায়দা বিলাতের লন্ডন শহরে অবস্থান করছেন। ঐতিহ্যবাহী এই পরিবারটিকে নিঃসন্দেহে দেশের একটি আদর্শ পরিবার হিসেবে গণ্য করা যায়।