কোভিড-১৯ : সামাজিক দূরত্ব ও আমাদের প্রস্তুতি এবং করনীয়

লিখেছেন ড: মোহম্মদ মাহবুব চৌধুরী, মন্ট্রিয়ল থেকে

কোভিড-১৯ আমাদের জানা বিশ্বকে সম্পুর্ন এক নতুন মাত্রায় উপস্থাপন করেছে। গত ডিসেম্বরে চীনের উহান প্রদেশ হতে এই নতুন ভাইরাস (করোনা ভাইরাস) এর সংক্রমন শুরু হয়ে আজ পর্যন্ত বিশ্বের ২১২ টি দেশের ৭,৩৬৩,৫০৩ বেশী মানুষকে সংক্রমিত করেছে, ৪১৪,৫৮৮ বেশী মানুষ ইতিমধ্যে মৃত্যুবরন করেছে, ৪ লক্ষ ২৪ হাজার এর মত আক্রান্ত রোগী সেরে উঠেছে। এই রোগের ভয়াবহতার অন্যতম কারন এই ভাইরাসের দ্রুত সংক্রমনের ক্ষমতা যা নির্বিচারে যে কাউকেই আক্রান্ত করতে পারে এবং যার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল সে যেই হোক তার জন্য জীবনসংহারী হয়ে উঠতে পারে। যেহেতু এই রোগ এর কোন কার্যকর ড্রাগ নেই, কোন ভ্যাক্সিন ও আবিষ্কৃত হয়নি তাই সাবধানতা মুলক ব্যবস্থা গ্রহন করে ভাইরাসের সংক্রমন হতে নিজেকে দুরে রাখাই হল এই রোগ এর বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকরী ও প্রতিরোধমুলক পদক্ষেপ। এই সাবধানতামুলক ব্যবস্থার অন্যতম হল সামাজিক ও নিরাপদ শারীরিক দুরত্ব নিশ্চিতকরন (৬ ফুট ব্যবধান) যা এই মুহুর্তে গোটা বিশ্বই এক অবিসংবাদিত নীতি হিসেবে গ্রহন করেছে। তো করোনা ভাইরাস সংক্রমন রোধে সারা বিশ্বে সামাজিক এবং শারীরিক দুরত্ব বজায় রাখার যে সাবধানতামুলক নীতি গৃহিত হয়েছে তার উদ্দেশ্য হল করোনা ভাইরাস সংক্রমনের হার যথাসম্ভব কমিয়ে একটা নির্দিষ্ট সময়ে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যাকে নিয়ন্ত্রনে রাখা যাতে এই নিয়ন্ত্রিত সংখ্যক রোগীকে যাতে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা দেয়া যায়। এটা করা সম্ভব না হলে রোগ বিস্তারের একেবারে শুরুতেই রোগ সংক্রমনের হার অনিয়ন্ত্রিত ভাবে বেড়ে গিয়ে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা এমনভাবে বেড়ে যাবে যে তাদেরকে আর কোন ভাবেই জরুরী ও প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করা সম্ভব হবেনা। যেহেতু এই নতুন ভাইরাস কে মোকাবেলা করার মত কার্যকর কোন ড্রাগ নেই এখনো তাই এর একটি কার্যকর ভ্যাকসিন আবিষ্কৃত না হওয়া পর্যন্ত এই সাবধানতামুলক ব্যবস্থা গুলো যথাযথভাবে মেনে চলাই হল একমাত্র কার্যকর ব্যবস্থা। কিন্তু একটি কার্যকর ভ্যাক্সিন আবিষ্কার, এরপর কোয়ালিফাই করে জনগনের জন্য ব্যবহারোপযোগী অবস্থায় আনতে কয়েক বছর পর্যন্ত লেগে যায়। তাই কানাডার প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত দেশের নাগরিকদের কে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসার সময় ২০২১ সাল এর শেষ বা তারো বেশী পর্যন্ত হতে পারে বলে আশংকা ব্যক্ত করেছেন।বিশ্বের তাবৎ দেশগুলোতে এই সময়ের মধ্যে নাগরিকদের বিভিন্ন মাত্রার সামাজিক দুরত্ব বজায় রাখা সহ অন্যান্য সাবধানতামুলক ব্যবস্থা- বাইরে অবস্থানের ক্ষেত্রে মাস্ক, হ্যান্ড গ্লাভস ব্যবহার সহ একজন আরেকজন হতে ৬ ফুট শারীরিক দুরত্ব বজায় রাখা, নিয়মিত হাত-মুখ সাবান দিয়ে ধোয়া ইত্যাদি বিষয়গুলো শক্তভাবে পালনের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

এখন এই সামাজিক দুরত্ব অথবা লক-ডাউন কার্যকর রাখার পাশাপাশি এই দেশগুলো আর যা করছে তা হল-বেশীরভাগ সংখ্যক ঠান্ডা-কাশি-সর্দি-জ্বর এর উপসর্গ বিশিষ্ট রোগীদেরকে কোভিড-১৯ টেষ্ট এর আওতায় এনে আক্রান্ত রোগীদের কোয়ারেন্টেইন করে চিকিৎসার আওতায় নিয়ে আনা, এর ফলে তাদের দ্বারা নতুন কাউকে সংক্রমনের সম্ভাবনা কমিয়ে ফেলা, এবং তাদের সংস্পর্শে কেউ ইতিমধ্যে এসে থাকলে তাদেরকে চিহ্নিত করে তাদেরকেও কোয়ারেন্টেইন বা চিকিৎসার আওতায় নিয়ে আসা। এতে করে সংক্রমন যেমন কমানো সম্ভব তেমনি অতি দ্রুত আক্রান্তকে এভেইলেবল স্বাস্থ্যসেবাও প্রদান করা সম্ভব। এপদ্ধতিতে রোগ বিস্তারের প্রাথমিক পর্যায়ে রোগীর সংখ্যা নিয়ন্ত্রিত পর্যায়ে রাখতে পারলে স্বাস্থ্যব্যবস্থার কোন দুর্বলতা থাকলেও তাড়াতাড়ি কোন কার্যকর ব্যবস্থা নিয়ে সেই গ্যাপ মিটানোর চেষ্টা করা যায়- ডাক্তারদের জন্য পর্যাপ্ত পিপিই- মাস্ক, ফেইস শীল্ড, কোভিড-১৯ পেশেন্ট রোগী সনাক্তকরনের জন্য টেষ্ট কীট, আক্রান্ত রোগীদের দের জন্য ডেডিকেটেড হাসপাতাল, আইসিইউ সুবিধা বাড়ানো যায়।

এখন দেখি কোভিড-১৯ বিস্তার রোধে আমরা কী করেছি বা করছি-

আমাদের সরকার জানুয়ারী হতে মার্চ পর্যন্ত সময় পেয়েছিল এই প্রস্তুতি নেবার-সেটাতো করেনিই, বরং মন্ত্রীরা দাম্ভিকভাবে বারবার জনগনকে মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে বলে গেছে – ‘ আওয়ামী লীগ করোনার চেয়েও বেশী শক্তিশালী’, ‘করোনা নিয়ন্ত্রনে আমেরিকা-ইতালীর চেয়েও বাংলাদেশ বেশী সফল’ ‘সিংগাপুরের চেয়েও বৃহৎ হাসপাতাল নির্নয় করা হবে’-নানা হাবিজাবি। তাদের এই সমস্ত রাজনৈতিক গলাবাজি জনগন তিন মাস ধরে শুনে গেছে- কতখানি বিশ্বাস করেছে বলা মুসকিল। করোনার অস্তিত্ব নিয়ে একটা লম্বা সময় ‘অস্বীকৃতির’ নীতি বজায় রাখার পর মার্চ এর শুরুতে যখন প্রথম কোভিড-১৯ রোগী চিহ্নিত হল তখন আমাদের সরকারের নীতিনির্ধারকরা শুরু করলেন-‘নো টেষ্ট নো করোনা’ নীতি। জনগন কিন্তু দেখলো ১৮ কোটি জনগনের জন্য মাত্র কয়েক হাজার টেষ্টিং কিট, ১০০-২০০ ভেন্টিলেটর, ৬০-৭০ টা আইসিইউ ছাড়া আমাদের আর কিছুই নাই, এমনকি ডাক্তারদের পর্যাপ্ত পিপিই পর্যন্ত নেই-মন্ত্রীদের এতদিনের গলাবাজির স্বরূপ উন্মোচিত হল। কিছু সুবিধাবাদী মন্ত্রীতো পরিস্থিতি টের পেয়ে ইতিমধ্যেই গর্তে ঢুকে গিয়েছেন।তো এটা হল সরকারী ভাবে প্রথম করোনা রোগী সনাক্ত করার আগে আমাদের প্রস্তুতি।

এখন দেখি প্রথম রোগী সনাক্তকরনের পরেও আমরা কী ধরনের কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহন করেছি বা নিচ্ছি-

প্রথমত, আমরা সামাজিক দুরত্ব বা লকডাউনের জন্য কোন স্ট্র্যাটেজিক ব্যবস্থা না নিয়েই মার্চের শেষে এক সপ্তাহের জন্য জনগনকে কাজ হতে ছুটি দিয়েছি। ১ কোটি জনগন এই খুশীতে ঢাকা শহর থেকে গ্রামের বাড়িতে যাবার জন্য বাস, ট্রেন, লন্চ স্টেশনে গিয়ে গাদাগাদি করে জড়ো হয়েছে- নিরাপদ শারীরিক দুরত্ব বজায় রাখার নীতিকে সম্পূর্ন উপেক্ষা করেই, কিছু মানুষ গেছে আবার কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে আনন্দভ্রমন এ-সংক্রমনের ষোলকলা পূর্ন করতে। জনগন অসচেতন বা মুর্খ মানলাম, কিন্তু সরকার তো পারতো ‘ছুটি’র ঘোষনা না দিয়ে লক-ডাউন এর ঘোষনা দিয়ে জনগনকে নিজের অবস্থান না ত্যাগ করার নির্দেশ প্রদান করতে, বা জনগনকে বাড়িতে যাবার সুযোগ দিলেও আর্মি-পুলিশ কে রাস্তায় নামিয়ে প্রয়োজনীয় শারীরিক দুরত্ব মেনে চলার জন্য চাপ প্রয়োগ করতে দিতে-সেটা করা হয় নাই। উপরন্তু এই বিপুল সংখ্যক লোক গ্রামে গিয়েও গ্রামের যে মানুষগুলো এতদিন কিছুটা নিরাপদ ছিল তাদেরকেও পাঠিয়ে দিলো আরো বড় ঝুকির মাঝে।

দ্বিতীয়ত, মসজিদগুলোতে এই মুহুর্তে মক্কা-মদীনা বা অন্যান্য মুসলিম দেশের আদলে সমস্ত জামাত বন্ধ করার রাষ্ট্রীয় আদেশ না দিয়ে আমরা ছেড়ে দিলাম তা সম্পূর্ন রূপে অসচেতন কিছু অতি-ধার্মিক মানুষের বিবেচনার উপর। কিছু অপরিনামদর্শী মোল্লা আর মুসলিম কোন রাষ্ট্রিয় বা জাতীয় সিদ্ধান্তের অনুপস্থিতে দলেদলে মসজিদে হাজির হয়েছে সম্ভাব্য বিপদকে তোয়াক্কা না করেই। সরকার কী ইসলামী ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে একটা জাতীয় ঘোষনা দিতে পারতো না বা এখনও তা দিতে পারেনা? নানা মত থাকবেই মোল্লাদের মাঝে, কিন্তু রাষ্টীয়ভাবে ঘোষনা এলে এই অবিবেচকরা কতটা বিরোধিতারই সুযোগ পেত? আমার ধারনা এই পরিস্থিতিতে এরা কোন ঝামেলাই করতে পারতোনা যদি ইসলামী ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে কোন কেন্দ্রীয় নিষেধাজ্ঞা আসতো।যাই হোক জানিনা রাষ্ট্র এ ব্যাপারে কী ভুমিকা নিচ্ছে।এছাড়া কতিপয় অশিক্ষিত ধর্মব্যবসায়ী মোল্লা সোশাল মিডিয়াতে অনবরত করোনা ভাইরাস সংক্রান্ত মনগড়া তথ্য দিয়ে যাচ্ছে, ধর্মের অপব্যাখ্যা করছে, সাধারন মানুষকে বিভ্রান্ত করছে যা এই করোনাময় সময়ে অত্যন্ত বিপদজনক। এমনিতেই সরকার সবকিছুর উপর নজরদারী করে কোন না কোনভাবে কিন্তু এই বিশেষ ধর্মব্যবসায়ীদের জন্য যে ধরনের রেগুলেটরি ভুমিকা রাখা উচিত তা তো চোখে পড়লোনা।

তৃতীয়ত, সরকারী ছুটির সাথে সাথে গারমেন্টস ব্যবসায়ীরা হাজার হাজার কর্মীদের ছুটিতে পাঠায় এক সপ্তাহের জন্য মাসের শেষে বেতনের কোন বন্দোবস্ত না করেই। তো এ কর্মীরা যখন তাদের ছুটির শেষদিনে কাজে যোগদানের জন্য পায়ে হেটে, গাড়ীর ছাদে গাদাগাদি করে ঢাকামুখী হয় তখন হঠাৎ করে গারমেন্টস মালিকরা একেবারে শেষমুহুর্তে তাদের ছুটির মেয়াদ আরো এক সপ্তাহ বাড়িয়ে দেয়। এই অমানবিক কান্ডে গারমেন্টস ব্যবসায়ীরা এবং সরকারের দায়ভার কোনভাবেই এড়ানো যায়না। উপরন্তু এতগুলো মানুষদের রাস্তায় এনে নতুন করে আবার করোনাবিস্তার এর পথ খুলে দেয়া হল।

চতুর্থত, আমাদের জনসংখ্যার ৩০-৩২% লোক এখন দরিদ্র এবং অতি-দরিদ্র। এদের মধ্যে প্রায় এক কোটি লোক দারিদ্র সীমার নীচে বাস করে এবং এরা দিনে এনে দিনে খায়। আর প্রায় সাড়ে পাচ কোটি লোক আছে দরিদ্র শ্রেনীর যাদের বড়জোর ৩-৭ দিন নিজেদের খাবার এর ব্যবস্থা আছে। তাই লকডাউনের প্রথম সাতদিনের মধ্যেই দেশের ৩০-৩২% লোক খাদ্যের অভাবে অনাহারে মৃত্যুর সম্মুখীন। এদের জন্য করোনা তে মৃত্যুর চাইতে অনাহারে মৃত্যুর সম্ভাবনাই বেশী প্রকট।আর নিম্নমধ্যবিত্ত বা মধ্যবিত্য শ্রেনী কাজের অভাবে আগামী ১৫-৩০ দিনের মধ্যেই এক অর্থনৈতিক বিপর্যয়ে নিপতিত হচ্ছে। এগুলো ঘটছে আমরা প্রকৃত ক্রাইসিসে পড়ার আগেই, সংক্রমনের সর্বোচ্চ সামনের দিনগুলোতে কী ঘটবে আল্লাহই জানেন। এখন প্রশ্ন হল আমাদের ‘মধ্যম আয়’ এর দেশ এই বৃহৎ জনগোষ্ঠীর জন্য কী ব্যবস্থা নিয়েছে বা নিচ্ছে? আমাদের সরকার কর্তৃক সাড়ে ৭২ হাজার কোটি টাকার প্রাথমিক অর্থনৈতিক প্রনোদনা উচুতলার লোকদের জন্য সুনির্দিষ্ট ভাবে আর্থিক বরাদ্দের ঘোষনা করলেও দরিদ্র, মধ্যবিত্ত জনগনের সরাসরি আর্থিক সাহায্য প্রদানের জন্য সুনির্দিষ্ট কিছু বলেনি-এচলমান সময়ের বাস্তবতায়।পাকিস্তানের মত চরম ভঙ্গুর অর্থনীতির দেশ ও করোনাময় দুর্যোগ এর বাস্তবতায় তাদের দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের জনগনের জন্য মাথাপিছু মাসিক ১২০০০ রুপির বরাদ্দ করেছে, পশ্চিম বংগেও মমতা ব্যানার্জি ও সাড়ে সাত কোটি দরিদ্রের জন্য সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ফ্রি রেশনের ব্যবস্থা করেছে- জনগনের কাছে সরাসরি আর্থিক সাহায্য পৌছানোর ব্যবস্থা করেছে। আমাদের সরকার কী ব্যবস্থা নিয়েছে বা নিচ্ছে আমাদের নিম্নআয়ের মানুষদের সরাসরি আর্থিক সাহায্যের জন্য? আজকে শুনলাম সরকার ৫০০০ কোটি টাকা ঋন প্রদানের ব্যবস্থা নিয়েছে হতদরিদ্র মানুষদের জন্য। দেরিতে হলেও এই উদ্যেগ কে সাধুবাদ জানাই কিন্তু বলা বাহুল্য, এখানেও করা হয়েছে হতদরিদ্র মানুষদের প্রতি এক ধরনের বৈষম্য-যেখানে ধনী গারমেন্টস শিল্পের মালিকদের ২% সুদে আর ভারী শিল্পমালিকদের ৪% সুদে প্রায় ৭২০০০০ কোটি টাকার ঋন প্রদানের ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে সেখানে হতদরিদ্র মানুষদের জন্য সবচেয়ে বেশী ৫% সুদে ঋন প্রদানের ব্যবস্থা করেছে সরকার। আমরা জানি ধনীদের ঋণখেলাপ হলেও তারা সরকারের আনকুল্যে কোনভাবে পার পেয়ে যায়, কিন্তু দরিদ্র জনগন কে কোনধরনের ঋনখেলাপেও দড়ি বেধে নিয়ে যাওয়া হয়। যাই হোক আমাদের এখানে লক-ডাউন কাজ করছেনা বা লোকজন বেরিয়ে আসছে এর অন্যতম প্রধান কারন হচ্ছে ক্ষুধা। বাংলাদেশের মত ঘনবসতিপুর্ন দেশে যেখানে প্রায় সাড়ে ছয় কোটি লোক এর খাদ্য মুলত দৈনিক জীবিকা নির্ভর বা নিম্ন আয়ের পেশা নির্ভর সেখানে এভাবে কতদিন লক-ডাউন চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে বলা মুশকিল কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতিতে আগামী ১-২ মাস অত্যন্ত ক্রিটিক্যাল করোনা পরিস্থিতি কে পর্যবেক্ষনের জন্য। আমাদের মাত্র কম্যুনিটি সংক্রমন শুরু হয়েছে। বিশ্বের অন্যান্য দেশের প্যাটার্ন দেখলে আমাদের সংক্রমনের সর্বোচ্চ হার সামনের ১ মাসের মধ্যেই প্রতিভাত হবার কথা। তাই ন্যুনতম সামনের ১ মাস যদি আমরা কঠোরভাবে সামাজিক বা শারীরিক দুরত্ব বজায় রাখতে না পারি করোনা পরিস্থিতি যে ভয়ালভাবে উপস্থিত হতে পারে তা চিন্তা করতেও ভয় হয়- বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আশংকা করেছে যদি কোন ব্যবস্থা গ্রহন না করা হয় বাংলাদেশে করোনা রোগে মৃতের সংখ্যা ৫-২০ লক্ষ পর্যন্ত হতে পারে। সেই কথা মাথায় রেখেই আমরা যদি সামাজিক দুরত্ব বা শারীরিক দুরত্ব বা সামাজিক লকডাউনকে কার্যকরী করতে চাই ন্যুনতম দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মাঝে অন্তত ১ মাসের খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে যাতে ক্ষুধার তাড়নায় তাদের বের হতে না হয়। সরকার কি চাইলে এই জরুরী পরিস্থিতিতে পশ্চিম বংগের মত দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য সামনের ১-২ মাসের জন্য বিনামুল্যে রেশনের বন্দোবস্ত করতে পারেনা? প্রয়োজনে শহরের বস্তি, পাড়া-মহল্লা, গ্রামে, ইউনিয়নে এই খাদ্য সরবরাহের কাজে আর্মিকে ব্যবহার করা যেতে পারে। জানিনা সরকার এভাবে কিছু ভেবেছে কিনা।

এবার আসি করোনা প্রতিরোধে আমরা কী জরুরী স্বাস্থ্যব্যবস্থা গ্রহন করেছি বা করছি-

আগেই বলেছি সামাজিক, শারীরিক দুরত্ব বা লকডাউনের সুফল পেতে হলে সংক্রমন এর একেবারে শুরুর দিকে এবং সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌছানোর আগে যে সময়টুকু পাওয়া যায়, ওই সময়টাকে পুরো কাজে লাগাতে হয় বেশী সংখ্যক সন্দেহভাজন রোগীকে টেষ্ট করে আক্রান্ত ব্যক্তিদের কোয়ারেনটেইন করা যাতে তার দ্বারা ভবিষ্যত সংক্রমনকেও প্রতিরোধ করা যায় এবং আক্রান্ত ব্যক্তিকেও যথাযথ স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের ব্যবস্থা করা যায়। এই প্রকৃত রোগীর সংখ্যা জানাটা অতি জরুরী যে তা সরকারের পক্ষে কার্যকর স্ট্যাটেজি নিতে সহায়ক হয়- যাতে সংক্রমন এর হার যখন অতি দ্রুত (এক্সপোনেনশিয়াল গ্রোথ) পর্যায়ে পৌছায়, ওই ভয়ংকর সময়ের তান্ডবকে মোকাবিলা করার জন্য স্বাস্থ্যব্যবস্থার যথাযথ প্রস্তুতি আগে থেকেই নেবার একটা সুযোগ পাওয়া যায়। আমাদের পাশের দেশ ভারত ইতিমধ্যেই ১ লক্ষেরও বেশী টেষ্ট করেছে, পাকিস্তান করেছে ৫০ হাজারের ও বেশী। সেখানে গত এক মাস ধরে সর্বসাকুল্যে আমাদের টেষ্ট হয়েছে ৯৬৫৩। বাংলাদেশে পার মিলিয়নে টেষ্ট এর সংখ্যা যেখানে ৫৯, সেখানে ভূটানে এই সংখ্যা ১৫১১, নেপালে ১৫২, শ্রীলংকায় ২১১। করোনা প্রতিরোধে স্বাস্থ্যব্যবস্থায় আমরা তো দক্ষিন এশিয়ায় সেরা! যাই হোক এই প্রতিরোধমুলক পদ্ধতি কাজে লাগিয়ে দ. কোরিয়া, তাইওয়ান এর মত দেশগুলো করোনা প্রতিরোধে যথেষ্টই সফল হয়েছে। আবার ইউরোপ এর অনেক দেশ, আমেরিকা বা কানাডার মত অনেক ধনী দেশেই শুরুর দিকে এই চরম অবস্থা মোকাবিলার জন্য স্বাস্থ্যসেবায় কিছুটা ঘাটতি ছিল, কিন্তু করোনা সনাক্ত হবার পরে তারা আর বসে থাকেনি- দ্রুত টেষ্ট এর সংখ্যা বাড়িয়ে সনাক্তকারী রোগীকে আইসোলেট করার ব্যবস্থা নিয়েছ, তার সংস্পর্শে আসা মানুষদের চিহ্নিত করেছে, দ্রুত চিকিৎসার আওতায় নিয়ে আসছে-রোগের বিস্তার কমানোর জন্য দিনরাত কাজ করে যাচ্ছে-এর মাঝে আবার স্থানীয় বা আন্তর্জাতিক পরিসরে চেষ্টা চলছে চিকিৎসকদের পিপিই সরবরাহ বৃদ্ধি, ভেন্টিলেটরসহ হাসপাতালের সক্ষমতা বাড়ানো-ফিল্ড হাসপাতাল তৈরীর জরুরী ব্যবস্থাও নেয়া হচ্ছে। এই দেশগুলো তাদের জনসংখ্যার ঘনত্ব বাংলাদেশের তুলনায় অনেক কম থাকা সত্ত্বেও এবং মেডিকেল ব্যবস্থা হাজার গুনে ভাল থাকা সত্তেও রোগ সংক্রমন সীমিত রাখতে রীতিমত হিমসিম খাচ্ছে- কোন কোন দেশে রোগ সংক্রমনের চুড়ায় প্রতিদিন হাজার হাজার লাশও পড়ছে এত সামাজিক দুরত্ব বা সাবধানতামুলক ব্যবস্থা নেয়া সত্ত্বেও। সেইখানে পৃথিবীর সবচেয়ে ঘনবসতিপুর্ন দেশ ১৮ কোটি জনগনের বাংলাদেশে করোনা সংক্রমনের তীব্রতা বাড়ার সাথে সাথে মাত্র কয়েক হাজার টেষ্ট কীট, কয়েকশ ভেন্টিলেটর আর অপ্রতুল পিপিই সাপোর্ট এর সক্ষমতা নিয়ে সংক্রমনের শুরুতেই যেই সমন্বয়হীনতা ও কার্যকর স্ট্রাটেজির অভাব প্রতিভাত হয়েছে -এতে সত্যিকার অর্থেই এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের আশংকা করছি, যার করাল গ্রাস হতে আমাদের-আপনাদের পরিবার-পরিজন কারুরই রেহাই হয় কিনা বলা মুসকিল। প্রাথমিকভাবে শুধু আইডিসিআর এর হাতে ন্যস্ত হয়েছিল করোনা রোগী সনাক্তকরনের টেষ্ট এর দায়িত্ব। এখন শোনা যাচ্ছে শুধু ১৮ টি নির্দিষ্ট হসপিটালেই এই রোগের টেষ্ট বা চিকিৎসা দেয়া হবে কিন্তু অনেক অভিযোগ এসেছে এই হসপিটালগুলো সম্পর্কে-অনেক সর্দি-কাশির উপসর্গের রোগীকে ফিরিয়ে দেয়া হয়েছে।সরকার দেরীতে হলেও ৭০০০০ হাজার টেষ্টকিট আমদানী করেছে- কিন্তু এখনই এই মুহুর্তেই অতি দ্রুত টেষ্ট এর সংখ্যা বৃদ্ধি করে আক্রান্ত রোগীকে কোয়ারেন্টেইন করতে না পারলে অতি দ্রুতই আমরা রোগ সংক্রমনের এক অনিয়ন্ত্রনযোগ্য অবস্থায় পড়ে যাব যার পরিনতি সত্যিই বড় ভয়ংকর।ইতিমধ্যে সরকারী হিসেবে প্রায় ৬২১ রোগী সনাক্ত হয়েছে, ৩৪ জন মৃত্যুবরন করেছে, ৩৯ জন সুস্থ হয়েছেন আর ৫৪৮ জন চিকিৎসাধীন। বেসরকারী হিসেবে আরো প্রায় ১০৯ এর ও বেশী করোনা সন্দেহভাজন রোগীর মৃত্যু হয়েছে দেশের বিভিন্ন এলাকায়। এই সংখ্যাগুলো কম্যুনিটি সংক্রমনের সুনির্দিষ্ট ইংগিত প্রদান করে। এখন নানা এলাকায় লকডাউন করা হচ্ছে কিন্তু একই সাথে টেষ্ট এর সংখ্যা বৃদ্ধি করে আক্রান্ত ব্যক্তিকে আইসোলেট করতে না পারলে প্রতিদিনই রোগ সংক্রমনের বা বিস্তারের ঝুকি আমরা বাড়িয়ে দিচ্ছি। তাই লক-ডাউনের পূর্ন সুবিধা নিতে হলে আমাদের টেষ্ট সংখ্যা না বাড়িয়ে কোন উপায় নেই। এমনিতেই অনেক দেরী হয়ে গিয়েছে।

এই লক-ডাউনের বা সামাজিক দুরত্ব বজায় রাখার সময়ে আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থার ক্ষেত্রে এখনো যা করা যেতে পারে-

ড. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর পরামর্শ মত করোনা রোগীর টেষ্ট বা চিকিৎসার জন্য শুধু ১৮ টা নির্দিষ্ট হাসপাতালই নয় সকল বেসরকারী ও সরকারী হাসপাতাল, থানা স্বাস্থ্য কেন্দ্রকে ২৪ ঘন্টা সর্দি-কাশির রোগীর টেষ্ট এর ব্যবস্থা করতে হবে-প্রয়োজনে জনস্বাস্থ্যকেন্দ্রের উদ্ভাবিত টেষ্টকীটকেও অতি দ্রুত বেশী সংখ্যক রোগীর প্রাথমিক টেষ্ট এর জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে। এরপর সনাক্তকারী রোগীকে অতি দ্রুত হাসপাতালগুলোর বেড এ কোয়ারেন্টেইন করা যেতে পারে। প্রয়োজনীয় ভেন্টিলেটর আর অক্সিজ্ন সরবরাহের নিশ্চয়তাপূর্বক আইসিইউ’র সংখ্যা বাড়াতে হবে, প্রয়োজনে ফিল্ড হাসপাতাল তৈরীরও উদ্যেগ নিতে হবে। অবিলম্বে সকল ডাক্তারদের জন্য উপযুক্ত পিপিই’র সরবরাহ নিশ্চিত করে, এক বিপুল সংখ্যক ডাক্তারকে যারা করোনা রোগীর বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবায় অভ্যস্ত নয় তাদেরকে এই বিশেষ ‘ইনটিউবেশন’ সংক্রান্ত একটা স্বল্পকালীন প্রশিক্ষন এর ব্যবস্থা করতে হবে। ডাক্তারদের ভিলেইন না বানিয়ে তাদের প্রয়োজনীয় প্রোটেক্টিভ ইকুইপমেন্ট এর ব্যবস্থা করে তাদের সাহস আর আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে- কারন এযুদ্ধে তারাই আমাদের ফ্রন্টলাইন যোদ্ধা। কিন্তু ইতিমধ্যে পিপিই’র অভাবে কোভিড-১৯ রোগীকে সেবাদান করতে গিয়ে কমপক্ষে ২০ জন ডাক্তার করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে – তাদের নিজের এবং তাদের পরিবারের জীবন আজ হুমকীর সম্মুখীন। সরকার স্বাস্থ্যব্যবস্থার এই বিষয়গুলোতে কী কার্যকর ব্যবস্থা এখন নিচ্ছে এটা এখনো পরিষ্কার না- সময় কিন্তু আর বেশী নাই।

কোভিড-১৯ সংক্রান্ত এই ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মাঝে আমাদের সরকারের দ্রুত এবং কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহনের সীমাবদ্ধতা তো দৃশ্যমানই- তার উপর ‘গোদের উপর বিষফোঁড়া’র মত নতুন এক উপদ্রব হাজির হয়েছে- তা হল সরকারীদলের স্থানীয় নেতৃবৃন্দ কর্তৃক করোনা সংক্রান্ত ত্রানের হাজার হাজার বস্তা ভর্তি চাল চুরির মহোৎসব। এই চোরগুলো বুঝতেই পারছেনা কোন মহা সংকটের মধ্য দিয়ে আমরা যাচ্ছি বা যাবো। এটা কোন সাধারন অর্থনৈতিক সংকট বা যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি না যে আজকে চাল চুরি করে স্টক করে একটা কৃত্রিম সংকট তৈরী করে দুদিন পরে বেশী দামে অভাবী লোকের কাছে বিক্রি করে কিছু মুনাফা লুটবে। সমগ্র মানবজাতি এমুহুর্তে এমন এক মরনঘাতি ভাইরাসের সাথে যুদ্ধ করতেছে যা কোন ধনী-গরীব, চোর-ডাকাত, সরকারী দল-বিরোধীদল চিনেনা-যে কোন মুহুর্তে আমাদের যে কাউক, এমনকী চোরগুলোকেও তার নির্মম শিকার এ পরিনত করতে পারে- চাল চুরি করে পরে বিক্রি করে মুনাফা লুটা তো বহু দুরের ব্যাপার।অতদিন পর্যন্ত বাঁচার নিশ্চয়তা কি আছে?! যাই হোক সরকারের উচ্চ পর্যায় হতে এগুলোকে শক্তহাতে প্রতিহত করা হোক- তা না হলে ক্ষুব্ধ মানুষের জনরোষের কবল হতে শেষ রক্ষা নাও হতে পারে। ‘৭৪ এর দুভিক্ষের মত যেন ‘আমার কম্বল গেল কই’-এই অবস্থা না হয়। মানুষ কিন্তু কিছুই ভুলেনা।

আরেকটা বিষয় না উল্লেখ করলেই নয়-সরকার মিডিয়া নিয়ন্ত্রন এবং গুজব প্রতিরোধ এর জন্য ইতিমধ্যেই বিশেষ আইনের আওতায় ৫০ জনকে গ্রেফতার করেছে – শুধুমাত্র করোনা পরিস্থিতি নিয়ে সরকারের প্রস্তুতি বিষয়ক জনগনকে দেয়া মিথ্যা আশ্বাস, করোনা রোগী চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে গাফলতি, মৃতের সংখ্যা নিয়ে লুকোচুরি বা অস্পষ্টতা, সার্বিক সমন্বয়হীনতা নিয়ে সমালোচনার করার অভিযোগে। এই মুহুর্তে মানুষের জানের নিরাপত্তা প্রদান যেখানে সরকারের প্রধান কাজ সেখানে সরকারের ফোকাস হল মিডিয়াতে নজরদারীতে-সোশাল মিডিয়াতে কে কী বলতেছে সেদিকে পাত্তা দেয়ার! এযুগে তথ্য গোপন করার আসলে খুব একটা সুযোগ নেই। সরকারীভাবে নিয়ন্ত্রন করলেও নানা উপায়ে মানুষের কাছে তথ্য পৌছায়ই। এছাড়া এই মুহুর্তে মানুষ নানা কারনেই নিজের বা নিজের আপনজনের প্রান হারানো নিয়ে শংকিত। এটা জীবন-মরনের প্রশ্ন। তাই সরকারের কোন গাফলতি বা অব্যবস্থাপনায় কিছু প্রতিক্রিয়া আসাটাই স্বাভাবিক এই দূর্যোগের মুহুর্তে। কিন্তু পরিস্থিতির বিবেচনায় সেই প্রতিক্রিয়াকে পজিটিভ হিসেবে দেখাটাই সরকারের বিচক্ষনতার কাজ হবে। মনে রাখতে হবে এটা কোন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে বা কোন মানব শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ না যে জোর প্রয়োগ করে তাকে চাপিয়ে রাজনৈতিকভাবে জয়লাভ করার কোন বিষয় আছে। গোটা বিশ্বের মানুষ একাট্টা হয়ে এক অদৃশ্য ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়ছে। তাই এপরিস্থিতিতে এই ধরনের উটকো নিষেধাজ্ঞা ও দমনমুলক আচরন হিতে বিপরীত হতে পারে। এসত্যটুকু যত তাড়াতাড়ি বুঝতে পারবে সরকার, ততই মংগল।

এখন নাগরিক হিসেবে আমাদের নিজেদের ও কিছু দায়িত্ব আছে। আমাদের সীমাবদ্ধতা আছে, সরকারেরও সীমাবদ্ধতা আছে। সরকারের সমালোচনা জারি থাকবে সেটার প্রয়োজনও আছে। এই দুর্যোগপূর্ন সময়ে সবার জীবনই যখন হুমকীর মুখে-এমনকী সরকারের লোকেরও, সেখানে সরকারের কোন গাফলতি ও অব্যবস্থাপনা যদি সবার জীবনকেই বিপদগ্রস্থ করে তোলে, দলমতের উর্ধ্বে উঠে বিবেকবান মানুষকে সেই প্রতিবাদ জারি রাখতে হবে-এধরনের প্রতিবাদ আমার জন্য, আমার আপনজনের জন্য, আপনার জন্য, আপনার আপনজনের জন্যও। শুধু খেয়াল রাখতে হবে সমালোচনা যাতে নির্ভরযোগ্য তথ্যের নিরিখে হয়-একতরফা শুধু সমালোচনার জন্য সমালোচনা যাতে না হয়। আমাদের ব্যক্তিগত পর্যায়ে যে সাবধানতামুলক ব্যবস্থাগুলো নেয়া সম্ভব- যথাসম্ভব পারিবারিক ও সামাজিক সমাগম এড়িয়ে সামাজিক ও নিরাপদ শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখাসহ মাস্ক, গ্লাভস ব্যবহার, নিয়মিত সাবান দিয়ে হাত-মুখ ধোয়া সবকিছুই যথাসম্ভব মেনে চলা- কমপক্ষে পরবর্তী ১-২ মাসের জন্য। বাইরে জনসমাগম এড়িয়ে এমনকি নামাজও আপাতত ১-২ মাস নিজের ঘরেই পড়াটা আপনার নিজের জন্য, আপনার আপনজনের জন্য এবং অপরের জন্যও মংগলজনক। বরং বাসায় থেকে নিজের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য নিয়ম করে ভিটামিন সি (লেবু, কমলা, ট্যাংগ ইন্সট্যান্ট জ্যুস ইত্যাদি), এক চামুচ মধু, ডিমের কুসুম আপনার খাদ্যমিলে রাখুন। মন ভালো রাখার জন্য বই পড়ুন, পারলে কমেডি মুভি দেখুন, আত্মার প্রশান্তির জন্য নিজ নিজ ধর্মের ইবাদতে মগ্ন থাকতে পারেন। এসময়ে শারীরিকভাবে সুস্থ থাকার পাশাপাশি মানসিকভাবেও সুস্থ থাকতে হবে। আরেকটি বিষয় যা আমাদের সাধারন জনগন করোনা রোগী নিয়ে বা মৃতদেহের ক্ষেত্রে এক ধরনের অস্বস্তি বোধ করছেন-তাদের জন্যই বলছি মৃত ব্যক্তির শরীরে এই ভাইরাস ৪-৫ ঘন্টার বেশী বাঁচতে পারেনা। তাই মোটামুটি ৫-৬ ঘন্টা পর মৃত লাশকে গোসল করিয়ে নিরাপদেই সামাজিক কায়দায় দাফন করা সম্ভব। এছাড়া এই সময়ে অনেক সোর্স হতেই করোনা রোগীকে ইথানল ভাঁপ বা ক্লোরকুইন জাতীয় ম্যালেরিয়ার ড্রাগ নেবার পরামর্শ শোনা যাচ্ছে। এগুলো প্রানঘাতি ! ভুলেও ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া নিজের বুদ্ধিতে বা কারো কথায় ইথানল ভাঁপ অথবা ক্লোরকুইন জাতীয় কোন ম্যালেরিয়ার ড্রাগ গ্রহন করবেন না!

সরকার আর আমাদের সবার সন্মিলিত প্রচেষ্টাতেই করোনা ভাইরাসের মত এই প্রানঘাতি প্রাকৃতিক শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।

 

লেখক : ডঃ মোহম্মদ মাহবুব চৌধুরী কানাডার অটোয়াস্থ কার্লটন বিশ্ববিদ্যালয় হতে রসায়নে পিএইচডি সম্পন্ন করে বর্তমানে একটি মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানী-NXP Semiconductor Inc. এ External Quality Engineer হিসেবে কর্মরত আছেন। এর আগে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এর রসায়ন বিভাগ হতে বিএসসি (সম্মান) এবং এমএসসি সম্পন্ন করে প্রায় তিন বছর শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগে শিক্ষকতা করেন।