পালক পুত্রের হাতে নিঃসন্তান দম্পতি খুন

ভোরের আলো ডেষ্ক: পাবনা শহরের দিলালপুর মহল্লায় স্ত্রী ও পালিত মেয়েসহ সাবেক ব্যাংক কর্মকর্তা হত্যার রহস্য উদঘাটন করেছে পুলিশ। এ হত্যাকাণ্ডের একমাত্র হোতা তানভীর হোসেন ইমামকে (২৬) গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তারের পর তানভীর হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন এবং হত্যাকাণ্ডের বর্ণনাও দিয়েছেন। গ্রেপ্তার তানভীর নওগাঁ জেলার মহাদেবপুর উপজেলার হরিপুর গ্রামের মৃত হাতেম আলীর ছেলে। তিনি দিলালপুর মহল্লায় অবস্থিত ফায়ার সার্ভিস মসজিদের ইমাম। ওই দম্পতি নিঃসন্তান হওয়ায় তারা তানভীরকে নিজের ছেলের মতো আদর করতেন।

আজ রোববার দুপুরে পাবনার পুলিশ সুপার (এসপি) শেখ রফিকুল ইসলাম পাবনা পুলিশ লাইনস অডিটোরিয়ামে এই চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে এক প্রেস ব্রিফিং করেন। সেখানে তিনি জানান, তানভীর একাই তিনজনকে ঘুমন্ত অবস্থায় গলায় গামছা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করেন এবং ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে ও কাঠের বাটাম দিয়ে মাথায় আঘাত করে নৃশংসভাবে হত্যা করেন।

ব্রিফিংয়ে জানানো হয়, আবদুল জব্বার দম্পতি নিঃসন্তান ছিলেন। সানজিদা জয়া (১২) তাদের পালিত মেয়ে। সানজিদা শহরের কালেক্টরেট মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের ৬ষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী ছিল।

পুলিশ সুপার জানান, পাবনা শহরের দিলালপুরে ব্যাংক কর্মকর্তা (অবসরপ্রাপ্ত) আবদুল জব্বারের ভাড়া বাসার পাশেই ফায়ার সার্ভিস অফিসের মসজিদ অবস্থিত। ওই মসজিদের ইমামতি করা তানভীর হোসেনের সঙ্গে দেড় বছর আগে জব্বারের পরিচয় হয়। তার আচার ব্যবহারে সন্তুষ্ট হয়ে তাকেও জব্বার দম্পতি সন্তানের মতো ভালোবাসতেন। সেই সূত্রে ওই বাড়িতে তানভীরের অবাধে যাতায়াত ছিল। এমনকি সন্তানের মতোই ব্যাংক, পোস্ট অফিসের টাকা তোলাসহ সব বিষয়ে তার সঙ্গে আলোচনা করতেন এই নিঃসন্তান দম্পতি। আর এটাই ওই দম্পতির জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়।

পাবনার এসপি শেখ রফিকুল ইসলাম জানান, তানভীরকে তারা সন্তানের মতো ভালোবাসলেও তিনি মনে মনে তাদের অর্থ সম্পদ লুটপাটের পরিকল্পনা করতে থাকেন। সেই মোতাবেক গত ২৫ মে ইমাম তানভীর ছুটি নিয়ে নিজের বাড়ি নওগাঁর হরিপুর চলে যান এবং ৩১ মে রাতে পাবনায় ফিরে আসেন। পরে রাত সাড়ে ১০টার দিকে তানভীর আবদুল জব্বারের বাসায় এসে ওঠেন। জব্বার রাতে তানভীরকে তার নিজ বিছানায় ঘুমানোর ব্যবস্থা করে দেন। অর্থ্যাৎ এক রুমে তানভীর ও জব্বার এবং অন্য রুমে জব্বারের স্ত্রী ছুম্মা খাতুন ও পালিত মেয়ে সানজিদা ঘুমিয়ে পড়েন। গভীর রাতে সবাই ঘুমিয়ে পড়লেও তানভীর ছিলেন সুযোগের অপেক্ষায়।

ভোরে আবদুল জব্বার ঘুম থেকে উঠে বাথরুমে যাওয়ার চেষ্টা করলে তানভীর পেছন থেকে তার গলায় গামছা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে বিছানার ওপর ফেলে দেন। পরে তাকে উপর্যুপরি কুপিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করেন। এরপর তিনি অন্য রুমে গিয়ে ছুম্মা খাতুন ও মেয়ে সানজিদাকে ঘুমের মধ্যেই কুপিয়ে হত্যা করেন। এরপর তিনি আলমারি থেকে নগদ ২ লাখ টাকা, ১ লাখ ভারতীয় মুদ্রাসহ বেশ কিছু সোনার গহনা নিয়ে ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে নওগাঁয় নিজ বাড়ির উদ্দেশে রওনা হন।

পুলিশ সুপার আরও জানান, জব্বার দম্পতি ও তাদের মেয়ের মরদেহ উদ্ধারের পরপরই অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (পুলিশ সুপার পদোন্নতিপ্রাপ্ত) গৌতম কুমার বিশ্বাসের নেতৃত্বে সদর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইবনে মিজান, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (হেডকোর্য়টার) খন্দকার রবিউল আরাফাত লেনিন, সদর থানার ওসি নাসিম আহম্মেদ ও ওসি (ডিবি) ফরিদ হোসেনের সমন্বয়ে একটি টিম গঠন করা হয়। ওই টিম প্রযুক্তি ব্যবহার করে ঘাতক তানভীরকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তার নিজ বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার এবং লুণ্ঠিত টাকা ও সোনার গহনা উদ্ধার করে। এ ছাড়া হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত তিনটি চাকু, একটি গামছা ও চারটি মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়।

প্রেস ব্রিফিংয়ের পরই দুপুরে তানভীরকে পাবনার ১ নম্বর আমলি আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দির জন্য নেওয়া হয়। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (হেড কোর্য়াটার) আরাফাত লেনিন বলেন, ‘আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দির পর তানভীরকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ডের আবেদন করা হবে।’

প্রসঙ্গত, গত শুক্রবার দুপুরে স্থানীয়দের কাছ থেকে খবর পেয়ে পুলিশ পাবনা শহরের দক্ষিণ রাঘবপুরের একটি ভাড়া বাসা থেকে রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক পাবনা শাখার অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবদুল জব্বার (৬২), তার স্ত্রী ছুম্মা খাতুন (৫৬) এবং মেয়ে সানজিদা খাতুনের অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করে। পরে এ ঘটনায় নিহত আবদুল জব্বারের ভাই আবদুল কাদের বাদী হয়ে পাবনা থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। নিহত আবদুল জব্বারের গ্রামের বাড়ি পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার কাশীনাথপুর ইউনিয়নের পাইকরহাটি গ্রামে।