গণস্বাস্থ্যের করোনা ভাইরাসের কিট বনাম বাংলাদেশের রাজনীতির চিরাচরিত রূপ

সাকের মোস্তফা চৌধুরি: করোনা ভাইরাসের ভয়ংকর থাবায় গোটা বিশ্বে এখন ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা। একদিকে পৃথিবীজুড়ে লক্ষ লক্ষ মানুষের করুণ মৃত্যু, অপরদিকে রয়েছে বিশ্বের সামগ্রিক আর্থিক ব্যবস্থা ধসে পড়ার শংকা। ভবিষ্যতের অনিশ্চিত অর্থনীতির শংকায় যেখানে স্বয়ং উন্নত পশ্চিমা দেশগুলোর নেতৃবৃন্দের ঘাম বয়ে যাচ্ছে, সেখানে উন্নয়নশীল আর দরিদ্র দেশগুলোর করুণ অবস্থা সহজেই অনুমেয়। বলা যায় সে আর্থিক খাতের দুশ্চিন্তা থেকেই বিশ্বের সবচাইতে বড় অর্থনীতির দেশ আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন অনেকটা প্রলাপ বকার মতোই আবোলতাবোল কথা বলছেন।

যদি করোনার বিস্তার বাড়তে থাকে তাহলে জাপানের মতো অতি উন্নত দেশের চিকিৎসা সেবাও কার্যত ভেস্তে যাওয়ার হুমকিতে আছে।

করোনা ভাইরাসের সংক্রমনরোধে যে দেশটি অভাবনীয় সাফল্য দেখিয়েছে সে দেশটি হলো দক্ষিণ কোরিয়া। তাদের এ সাফল্যের মূলমন্ত্র হলো সে দেশের জনসংখ্যার বিশাল অংশকে করোনা ভাইরাসের টেস্ট করানো। এক হিসেব অনুযায়ী যেখানে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতি মিলিয়নে অর্থাৎ দশ লক্ষের মধ্যে করোনার টেস্ট করানো হয়েছে গড়ে পাঁচ হাজার দুশো, সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের সংখ্যাটা হলো মাত্র চুয়াত্তর। করোনারোধে দক্ষিণ কোরিয়ার এ সাফল্যের কারণটি সহজেই অনুমেয়।

উন্নত পশ্চিমা দেশগুলোর তুলনায় আমাদের বাংলাদেশের সামগ্রিক প্রস্তুতি আর সামর্থের কথা চিন্তা করলেও গা শিউরে উঠে। জানি, আমাদের দেশের বিশাল জনসংখ্যার তুলনায় সামর্থ অপ্রতুল। সরকারের তরফ থেকে পরিস্থিতি মোকাবেলায় চেষ্টা করা হচ্ছে তাতে সন্দেহ নেই। তারপরেও আছে অনেক শুভঙ্করের ফাঁকি। করোনার ভয়ে যখন কানাডা এবং সাথে অনেক দেশের স্কুল-কলেজ বন্ধ ঘোষণা করা হয়, তখনও আমাদের দেশে মহাসমারোহে (মূল অনুষ্ঠান বাতিল হলেও) পালিত হয় জন্ম শতবার্ষীকি। যাইহোক, ঐসব প্রসংগ আর নাইবা তুললাম।

সরকারের বর্তমান কার্যক্রমকে সাধুবাদ জানাই। কিন্তু সরকারেরই কিছু সংখ্যক কুলাংগার কতৃক যখন অসহায় মানুষদের জন্য বরাদ্দকৃত চাল-ডাল চুরির খবর দেখতে পাই, তখন সবকিছু অবিশ্বাস্য মনে হয়। জানিনা, কোন ওঝা এসে মন্ত্রবলে সর্ষের মধ্যে লুকিয়ে থাকা ঐসব ভূতগুলোকে তাড়াতে পারবে কিনা।

যাইহোক, এ মুহু্র্তে বাংলাদেশের করোনা ভাইরাসজনিত সার্বিক পরিস্থিতির মধ্যে যুগান্তরারী ঘটনা হলো গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র কতৃক করোনাভাইরাসের টেস্টিং কিট উদ্ভাবান। উল্লেখ্য যে, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র কতৃক গত দুই মাসের অক্লান্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে উক্ত কিট উদ্ভাবিত হয়। তাদের মতে অত্যন্ত স্বল্পমূল্যের এ পদ্ধতিতে পাঁচ থেকে পনেরো মিনিটের মধ্যে করোনা শনাক্ত করা যাবে এবং খরচ পড়বে মাত্র তিনশো পঞ্চাশ টাকার মতো, যেখানে  করোনাভাইরাস শনাক্তকরণের অন্যান্য যে কিট আছে তার দাম প্রায় দশ থেকে পনেরো হাজার টাকা। প্রায় সতেরো-আঠারো কোটি মানুষের দেশে তা কত বড় আশার বাণী তা আর বলার অপেক্ষা রাখেনা।

কিন্তু খবর দেখে বিস্ময়ে হতবাক না হয়ে পারলামনা। গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র কতৃক উদ্ভাবিত করোনাভাইরাসের টেস্টিং কিট হস্তান্তর অনুষ্ঠানে আসেননি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বা স্বাস্থ্য অধিদফতরের কোনও প্রতিনিধি। আসেননি ওষুধ প্রশাসনের কোনও কর্মকর্তাও। যদিও এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে গণস্বাস্থ্যের টেস্টিং কিট চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্যে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে হস্তান্তরের কথা ছিল। গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী জানান, স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল, তিনিও কোনও উত্তর দেননি। ঐ অনুষ্ঠানে কেবল উপস্থিত ছিলেন মার্কিন গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার্স ফর ডিজিস কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি)-এর প্রতিনিধিরা।

দেশের টিভি চ্যানেলগুলোর টক শোগুলোতে সরকারের কর্তাব্যক্তিদের বকবকানিতে কান ঝালাপালা। কিন্তু দেশের  এহেন সংকটময় পরিস্থিতিতে আশার আলো জাগানিয়া ঐ অনুষ্ঠানে সরকারের পক্ষ থেকে কেউ উপস্থিত নেই!! কিন্তু কেন সবাই অনুপস্থিত?? কারণটা কি গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডাঃ জাফরুল্লাহ চৌধুরী, যিনি গত সংসদ নির্বাচনে আওয়ামিলীগ বিরোধী জোটে ছিলেন??

সবকিছুতে রাজনীতির নোংরামি আর কাঁদা ছোড়াছোড়ি বুঝি আমাদের অস্থিমজ্জাতে পুরোপুরিভাবে মিশে গেছে। কোথায় আজ স্বাস্থ্যমন্ত্রী বা সচীব?? প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকেও কি এ সম্পর্কিত কোন নির্দেশনা আসেনি?? বিষয়টি কেমন জানি অবিশ্বাস্য বলে মনে হয়!!

সেই স্কুলজীবনে থাকতে ইংরেজী থেকে বাংলায় অনুবাদ শিখতাম। প্রচলিত সেই অনুবাদগুলোর অন্যতম একটি ছিল – Black will take no other hue, অর্থাৎ, কয়লা ধুলে ময়লা যায় না ।

আর কতকাল আমরা সংকীর্ণ রাজনীতির নামে গায়ে ঐ কয়লা মেখে থাকবো??