একজন আরজ আলীর সত্যের সন্ধান

লিখেছেন সুদীপ্ত সালাম

আরজ আলী মাতুব্বরের সঙ্গে আমার পরিচয় অনেক দিনের। আমি তখন ৫ম কি ৬ষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্র। তখনো বই পড়া শুরু করিনি। কিন্তু রাতে বড় ভাই আমাকে মাতুব্বর সাহেবের ‘রচনা সমগ্র-১’ থেকে প্রশ্নোত্তরগুলো পড়ে শোনাতো (যদিও আমার ভাইটি বর্তমানে আপাদমস্তক জামায়াতে ইসলামীর সমর্থক)। খুব বেশি বুঝতাম না, কিন্তু বইটির প্রতি তীব্র আগ্রহবোধ ছিল। প্রতিরাতে আরজ আলী পাঠ শোনা অভ্যাস হয়ে গেল। ভাইও পেয়ে বসলো, তার শরীর মর্দনের বিনিময়ে পাঠ শুনতে পেতাম। আরজ আলী মাতুব্বরের চিন্তা তখনই আমার শিশুমনে আলোড়ন সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছিল। ভাইয়ের অনুমতি ছাড়া বইটি আমার এক শিক্ষককে পড়তে দিয়েছিলাম। তিনি আর বইটি ফেরত দেননি। ফলে আমার আর আরজ আলী মাতুব্বরের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়। দীর্ঘদিন এই দূরত্ব বজায় ছিল।


আরজ আলী মাতুব্বরের ‘সত্যের সন্ধান’ বইটি এখনো পড়ি, আজো আন্দোলিত হই, বিস্মিত হই। এই স্বশিক্ষিত দার্শনিকের প্রথম, প্রধান এবং সবচেয়ে আলোচিত গ্রন্থ এটি। গ্রন্থটি ১৯৭৩ সালে প্রথম প্রকাশিত হয়, কিন্তু লেখক গ্রন্থটির পাণ্ডুলিপি শেষ করেছিলেন ১৯৫২ সালে। ভাবতে অবাক লাগে! যখন তৎকালীন ইসলামপন্থী পাকিস্তান সরকার উভয় ভূন্ডের রাষ্ট্রভাষা হিসাবে উর্দুকে মনোনিত করেছে, ঠিক সে সময় পূর্ব-পাকিস্তান নিবাসী একজন কৃষক প্রশ্ন করছেন, ‘…জ্বীন আগুনের তৈয়ারী। তাহাই যদি হয়, তবে তাহাদের পরকালে আবার দোজখ বা অগ্নিবাস কিরূপ?’ ‘ভগবানের নামে জীবহত্যা করিলে পুণ্য হইবে কেন?’  ‘হেজরল আসোয়াদ পাথরখানা একখন্ড উল্কাপিন্ড নয় কি?’ এ ধরণের প্রশ্নের জন্য সে সময় তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয় এবং মত প্রকাশের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। সে সময়ের চমকপ্রদ বর্ণনা দিয়েছেন লেখক নিজেই, ‘…তিনি (তবলিগ জামাতের আমির এফ. করিম) আমাকে তাঁহার জামাতভুক্তির অনুরোধ জানাইলে আমি তাঁহাকে বলিলাম যে, ধর্মজগতে এরূপ কতগুলি নীতি, প্রথা, সংস্কার ইত্যাদি এবং ঘটনার বিবরণ প্রচলিত আছে, যাহা সাধারণ মানুষের বোধগম্য নহে…এমনকি অনেক ক্ষেত্রে  বিপরীতও বটে।…ধর্ম, দর্শন ও বিজ্ঞান এই তিনটি মতবাদের সমন্বয় সাধনের উদ্দেশ্যে চিন্তা করিতে যাইয়া আমার মনে কতগুলি প্রশ্নের উদয় হইয়াছে এবং হইতেছে।…আপনি আমার প্রশ্নগুলির সুষ্ঠু সমাধনপূর্বক আমাকে সেই বিভ্রান্তির আঁধার কূপ হইতে উদ্ধার করিতে পারিলে আমি আপনার জামাতভুক্ত হইতে পারি।…তিনি উহা (প্রশ্নগুলো) পাঠ করিলেন এবং সঙ্গে লইয়া চলিয়া গেলেন, আর বলিয়া গেলেন, “কিছুদিন বাদে এর জওয়াব পাবেন।” করিম সাহেব চলিয়া যাইবার কয়েকদিন পরে আমি পাইলাম কম্যুনিজমের অপরাধে আসামী হিসাবে ফৌজদারী মামলার একখানা ওয়ারেন্ট, কিন্তু আমার প্রশ্নগুলির জবাব আজও পাই নাই।’


বাংলাদেশের জন্মের পর ১৯৭৩ সালে, অর্থাৎ দীর্ঘ প্রায় ২২ বছর পর সত্যের সন্ধান গ্রন্থটি আত্মপ্রকাশ করে। বিলম্বে প্রকাশ হওয়ার কারণ আমরা বুঝি। রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ধর্মীয় গোঁড়ামির  পাশাপাশি আর্থিক অসঙ্গতিও একটি কারণ হতে পারে। অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী গ্রন্থটির প্রথম সংস্করণের বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে, ‘ম্রিয়মান দরিদ্র চেহারা সে বইয়ের, বাংলাদেশের গ্রামের মতো। ছাপা ভালো নয়, কাগজ খারাপ, বাঁধাই দুর্বল, প্রচ্ছদপট অনাকর্ষণীয়। প্রকাশনা শিল্পে যে বিপ্লব ঘটেছে ইতিমধ্যেই এই বাংলাদেশে তার কোনো হদিস নেই এ-বইতে।’ সত্যিই তাই। গ্রন্থের প্রথম সংস্করণের ভূমিকায় আরজ আলী মাতুব্বর লিখেছেন, ‘…প্রকাশনায় আর্থিক সাহায্য দান করিয়াছেন অধ্যাপক শরফুদ্দিন রেজা হাই।…আমি চির কৃতজ্ঞ।’ আমরাও কৃতজ্ঞ, কেননা শরফুদ্দিন রেজা হাই-এর সাহায্য ছাড়া এই অনিন্দ্য গ্রন্থটি আলোর মুখ দেখতে পেতো কিনা সন্দেহ। যাইহোক। দেখতে ‘অনাকর্ষণীয়’ গ্রন্থটি সুশীল সমাজে সমাদৃত হয়। পন্ডিত আহমদ শরীফ বলেন, ‘আরজ আলী মাতুব্বরের গ্রন্থ পড়ে আমি মুগ্ধ ও বিস্মিত হয়েছি নতুন কথা বলে নয়, তার মুক্তবুদ্ধি, সৎসাহস ও উদার চিন্তা প্রত্যক্ষ করে।’ সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী তার আরণ্যক দৃশ্যাবলী (১৯৭৫) গ্রন্থে লিখলেন, ‘সত্যের সন্ধানে বইটিতে দ্বিতীয় একটি নাম আছে, সেটি হলো যুক্তিবাদ। মাতুব্বরের ভরসা হচ্ছে যুক্তি, ভরসা বিশ্বাস নয়। বিশ্বাসের জগৎ পার হয়ে তিনি পৌছতে চান যুক্তির জগতে। তাই তিনি বর্ণনা করেন না, প্রশ্ন করেন।…তাঁর সম্বেন্ধে প্রধান কথা ওই জিজ্ঞাসা। জীবন জিজ্ঞাসা। বিস্ময়ের ব্যাপার সেটাই।’ ১৯৭৯ সালে গ্রন্থটিকে হুমায়ুন কবির স্মৃতি পুরস্কারে অলংকৃত করে বাংলাদেশ লেখক শিবির।
ব্যতিক্রম ধারার দার্শনিক আরজ আলী মাতুব্বরের জন্ম বরিশালে (কোতয়ালী থানার লামচরি গ্রামে), ১৯০০ সালে। লেখকের অল্প বয়সে বাবা এন্তাজ আলী  মারা যান। ১৯৩২ সালে মাও মৃত্যুবরণ করেন। মৃত মায়ের ছবি তোলার অপরাধে গ্রামের কেউ তার মার জানাজা পড়তে রাজি হয়নি। এই মর্মান্তিক ঘটনা আরজ আলী মাতুব্বরের জীবনকে ওলোট-পালোট করে দেয়। ধর্মের নামে চলতে থাকা কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাসের বিরুদ্ধে তিনি হয়ে ওঠেন দুঃসাহসিক কণ্ঠস্বর। ১৯৮৫ সালে এই সত্যান্বেষী মানুষটি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুর পর তার দেহটি বরিশাল মেডিক্যাল কলেজের শিক্ষার্থীদের ব্যবহারের জন্য দান করার ব্যবস্থা নিজেই করে যান। আত্মপ্রচারবিমুখ বিজ্ঞানমনস্ক আরজ আলী মাতুব্বর আমৃত্যূ সংগ্রাম করেছেন, ন্যায় ও মুক্তচিন্তার পক্ষে, কুসংস্কারের বিরুদ্ধে এবং অর্থাভাবের সঙ্গে। জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দিতে নিজ উদ্যোগে পাঠাগার প্রতিষ্ঠা এবং মেধাবী শিক্ষার্থীদের বৃত্তি প্রদানের ব্যবস্থা করেছেন।


প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ তার হয়নি বললেই চলে। কিন্তু অন্তত তার সত্যের সন্ধান গ্রন্থটি হাতে নিলে আমরা অনুধাবন করতে পারি তার জ্ঞানের ব্যাপ্তি কত গভীর। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী গ্রন্থটি পাঠ করে মন্তব্য করেছেন, ‘বরিশালের মাতুব্বর এথেন্স পাবেন কোথায়, কোথায় পাবেন এথেনীয় সংস্কৃতি ও গণতন্ত্র?…অন্ধকারেই জন্ম তাঁর, সেখানেই বসবাস। মারাও গেছেন অন্ধকারাচ্ছন্ন দীনদরিদ্র পরিবেশে। কিন্তু ওই সামান্যতাকে মেনে নেননি। ধর্মগ্রন্থ, বিজ্ঞানের বই, দর্শনের আলোচনাÑযেখানে যা পেয়েছেন মনোযোগ দিয়ে পড়েছেন, মর্গান থেকে আইনস্টাইন, কোরান থেকে বেদ-বাইবেল কিছুই অপাঠ্য ছিল না তাঁর জন্য।’
সত্যের সন্ধান বইটি শুরু হয়েছে দর্শনের মৌলিক প্রশ্নের মধ্য দিয়ে, ‘আমি কে?’ আর শেষ হয় ধর্মের কিছু অমীমাংসিত ও গোঁজামিল দিকের প্রতি পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তিনি এমন কিছু প্রশ্নের অবতরণ করেছেন, যেগুলোর হয়তো উত্তর রয়েছে, কিন্তু আমরা বিস্মিত হই প্রশ্নকর্তার স্পর্ধা দেখে। আজো ভাবি, কিভাবে অজপাড়াগাঁয়ের একজন কৃষক আজ থেকে প্রায় ৬০ বছর আগে প্রশ্ন করতে পারেন, ‘ঈশ্বর সময়কে সৃষ্টি করেছেন কোন সময়ে?’ ‘স্থানকে সৃষ্টি করা হলো কোন স্থানে থেকে?’ ‘শক্তি সৃষ্টি করা হলো কোন শক্তি দ্বারা?’ হয়তো এ কারণেই সন্দেহ দেখা দিয়েছিল যে, আরজ আলী মাতুব্বর ছদ্মনামে কোনো বিদগ্ধ পন্ডিত এ গ্রন্থ লেখেননি তো? একজন কৃষকের পক্ষে কি এমন প্রশ্ন উত্থাপন করা সম্ভব? আরজ আলী মাতুব্বর নিজেই প্রমাণ দিয়েছিলেন- সম্ভব। একজন কৃষকের পক্ষে সম্ভব নাও হতে পারে কিন্তু একজন স্বশিক্ষিত মানুষের পক্ষে নিশ্চই সম্ভব। প্রমাণের পরও এই দার্শনিকের যা প্রাপ্য তা পাননি। পেয়েছেন শুধু অবহেলা, অসম্মান ও তিরস্কার। একাডেমিক দার্শনিকরা তাকে মেনে নিতে পারেননি। তার অপরাধ তিনি কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ডিগ্রি অর্জন করেননি এবং ধর্ম নামে প্রচলিত অধর্মের বিরোধিতা করেছেন। এ প্রসঙ্গে হাসনাত আবদুল  হাই বলেছেন, ‘…আরজ আলী মাতুব্বর শিক্ষিত বুদ্ধিজীবীদের অহঙ্কার ও আত্মতৃপ্তিকে শক্ত হাতে নাড়িয়ে দিয়েছেন।’ এটিও একটি অপরাধ বৈকি। আজো একই অবস্থা। আজো আমরা আরজ আলী মাতুব্বরকে এড়িয়ে চলি, তার পক্ষে মুখ খুলতে সংকোচ বোধ করি, তাকে তার প্রাপ্য সম্মানটুকু দিতে ভয় পাই। মুসলমানপ্রধান দেশে আমরা সংখ্যাগরিষ্ঠদের রোষানলে পড়তে ভীষণÑভীষণ ভয় পাই। অন্নদাশঙ্কর রায় লিখেছিলেন, ‘জব্দিতে কে শব্দীকে?/শব্দ যে যায় সব দিকে/যতই আসুক দুঃসময়/শব্দ যে যায় বিশ্বময়।/যতই ঘটুক ভোগান্তি/শব্দ যে যায় যুগান্তে।’ আমি মনে করি, আরজ আলী মাতুব্বরের প্রগতিশীল মতবাদ ও চিন্তার ক্ষেত্রেও এ কথা সত্য। আমরা তাকে নিয়ে কথা বলি আর নাই বলি, আরজ আলী ছড়িয়ে পড়বেন যুগ থেকে যুগান্তে।