পরীক্ষা চাই পরীক্ষা নাই

লিখেছেন প্রতীক ইজাজ

করোনা রোগী শনাক্তে পরীক্ষা নিয়ে সন্তুষ্ট হতে পারছে না দেশের মানুষ। প্রতিদিনই করোনা সন্দেহ নিয়ে সরকারের স্বাস্থ্য বাতায়ন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে (আইইডিসিআর) ফোন করছে তারা। অধিকাংশই লাইনে ঢুকতে পারছে না। যারা ঢুকছে, তাদের চিকিৎসা ও সতর্কতার পরামর্শ দিয়ে বিদায় জানানো হচ্ছে। মাঝখানে কিছুদিন লোকজন সশরীরে আইইডিসিআরে উপস্থিত হয়ে পরীক্ষার অনুরোধ জানালেও, আইইডিসিআরে নিষেধাজ্ঞার কারণে এখন সেখানেও যেতে পারছে না। এমনকি এখনো পরীক্ষার অনুমতি আইইডিসিআরের হাতে রয়েছে এবং এখানে নমুনা পাঠালেই শুধু পরীক্ষা করা হচ্ছে। শুধু ঢাকার বাইরে যে একটি প্রতিষ্ঠানে করোনা পরীক্ষা হচ্ছে, ওই প্রতিষ্ঠান নিজেরাই নমুনা সংগ্রহ করছে।

এমনকি গত কয়েক দিন ধরেই সরকারের পক্ষ থেকে করোনা নমুনা পরীক্ষার পরিসর বাড়ানো হচ্ছে বলা হলেও এখনো তা মূলত রাজধানীকেন্দ্রিক। আবার পরীক্ষার কেন্দ্রের সংখ্যার একেক দিন একেক রকম তথ্য দিচ্ছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী থেকে শুরু করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। সর্বশেষ গতকাল মঙ্গলবার সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম শাখার পরিচালক হাবিবুর রহমান বলেন, নভেল করোনাভাইরাস (কভিড-১৯) শনাক্তে দেশের ২৮টি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে নমুনা পরীক্ষা সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এর আগের দিন সোমবার সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেছিলেন, ‘আমাদের ইতিমধ্যে ১১টি ল্যাব কাজ করছে। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি আরও ১৭টি নতুন ল্যাব স্থাপন করব। যাতে চিকিৎসা করতে পারে, তাড়াতাড়ি পরীক্ষা করতে পারে। টেকনিশিয়ান ও অন্যান্য যারা স্যাম্পল কালেকশন করে তাদের বিশেষভাবে প্রশিক্ষণ দিয়ে যাচ্ছি। কাজেই পরীক্ষার পরিধি আমরা বৃদ্ধি করেছি।

আবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংবাদ সম্মেলনে দেওয়া তথ্য ও গণমাধ্যমে আইইডিসিআরের পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তির তথ্যের মধ্যেও ফারাক রয়েছে। এমনকি এসব তথ্যের সঙ্গে মাঠের চিত্রের কোনো মিল পাওয়া যায়নি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর গতকালের সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেছে, রাজধানীতে আইইডিসিআর ছাড়াও ঢাকা শিশু হাসপাতাল, আইপিএইচ ইনস্টিটিউট, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল ও উত্তরার কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে করোনাভাইরাস নির্ণয়ের পরীক্ষা শুরু হয়েছে। এর বাইরে গণমাধ্যমে পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে রাজধানীতে আরও দুটি প্রতিষ্ঠানে করোনা পরীক্ষা শুরু হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। এ দুটি প্রতিষ্ঠান হলো আইসিডিডিআর,বি ও আর্মড ফোর্সেস ইনস্টিটিউট অব প্যাথলজি। অর্থাৎ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী গতকাল পর্যন্ত রাজধানীতে ৯টি প্রতিষ্ঠানে করোনা পরীক্ষা শুরু হয়েছে। কিন্তু খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এই নয়টির মধ্যে চারটি প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা শুরু হয়েছে। এগুলো হলো আইইডিসিআর, ঢাকা শিশু হাসপাতাল, জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান ও আর্মড ফোর্সেস ইনস্টিটিউট অব প্যাথলজি। বাকি পাঁচটি হাসপাতালে এখনো পরীক্ষা শুরু হয়নি। এগুলো হলো ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল (মিটফোর্ড হাসপাতাল), কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল, উত্তরার কুয়েত মৈত্রী হাসপাতাল ও আইসিডিডিআর,বি।

এর মধ্যে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. খান মো. আবুল কালাম আজাদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, যে মেশিনে পরীক্ষা করা হবে সেটার বায়োসেফটি পরীক্ষা করে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা রিপোর্ট দিলে আমরা পরীক্ষা শুরু করব। কিছু কিট এসেছে। এ ক্ষেত্রে আমাদের এখানে সর্দি-জ্বরের জন্য আসা রোগীদের মধ্যে কারও সন্দেহ হলে নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করা হবে।

মিটফোর্ড হাসপাতালের পরিচালক ডা. রশিদুন নবী দেশ রূপান্তরকে বলেন, করোনা পরীক্ষার জন্য যেখানে মেশিন বসানো হবে সে জায়গা প্রস্তুত রেখেছি। এখনো শুরু হয়নি। মেশিনও বসেনি। প্রস্তুতি চলছে।

আইসিডিডিআর,বির এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, তারা তাদের স্টাফদের মধ্যে যাদের সন্দেহ হচ্ছে, তাদের পরীক্ষা করছেন। এখনো আইইডিসিআর থেকে কোনো নমুনা আসেনি। বা বাইরের কোনো পরীক্ষা শুরু হয়নি। এমনকি কী প্রক্রিয়ায় এখানে পরীক্ষা হবে, সেটাও ঠিক করেনি আইইডিসিআর। গতকাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে বলা হয়েছে, আইসিডিডিআর,বিতে গত ২৪ ঘণ্টায় ১৬টি এবং এখন পর্যন্ত ১৬৯টি পরীক্ষা হয়েছে। এ ব্যাপারে এই কর্মকর্তা বলেন, এগুলো সবই এখানকার স্টাফদের পরীক্ষা। এছাড়া কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল ও কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালেও গতকাল পর্যন্ত পরীক্ষা শুরু হয়নি বলে জানা গেছে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) ল্যাবে শুরু হচ্ছে নভেল করোনাভাইরাস শনাক্ত পরীক্ষা। শাহবাগের বাংলাদেশ বেতার ভবনের দ্বিতীয় তলায় স্থাপিত ল্যাবরেটরিতে আজ বুধবার থেকে করোনা পরীক্ষা করানো যাবে। সকাল সাড়ে ৮টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত এ পরীক্ষা করা যাবে বলে জানিয়েছেন বিএসএমএমইউর উপাচার্য অধ্যাপক ডা. কনক কান্তি বড়ুয়া।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর গতকালের সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেছে, ঢাকার বাইরে তিনটি প্রতিষ্ঠানে করোনার পরীক্ষা শুরু হয়েছে। কিন্তু খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এর মধ্যে মাত্র একটি প্রতিষ্ঠানে শুরু হয়েছে। সেটি হলো চট্টগ্রামের ফৌজদারহাটে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ট্রপিক্যাল অ্যান্ড ইনফেকশাস ডিজিজেস। এ প্রতিষ্ঠানের পরিচালক অধ্যাপক ডা. এমএ হাসান চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, গত ২৪ ঘণ্টায় ছয়জনের পরীক্ষা হয়েছে। মোট পরীক্ষা হয়েছে ৪৪ জনের। এর মধ্যে ১৫টি নমুনা আইইডিসিআর পাঠিয়েছে। বাকিটা চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকা থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে।

কক্সবাজারের সিভিল সার্জন ডা. মাহবুবুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, কক্সবাজার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আইইডিসিআরের একটি ফিল্ড ল্যাবরেটরি রয়েছে। এখনো করোনার পরীক্ষা শুরু হয়নি। কিট দুয়েক দিনের মধ্যেই চলে আসবে। এছাড়া ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও করোনা পরীক্ষা শুরু হয়নি বলে জানা গেছে। এর বাইরে ৫ এপ্রিলের মধ্যে ঢাকার ভেতরে আরও তিনটি ও ঢাকার বাইরে আরও পাঁচটি প্রতিষ্ঠানে এবং ২০ এপ্রিলের মধ্যে ঢাকায় আরও চারটি ও ঢাকার বাইরে ছয়টি প্রতিষ্ঠানে কভিড-১৯-এর পরীক্ষা করা হবে বলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম শাখার পরিচালক হাবিবুর রহমান জানিয়েছেন। তবে এসব ল্যাবরেটরি স্থাপনের কাজ এখনো শুরু হয়নি বলে অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন। তার মতে, প্রাথমিকভাবে ঢাকার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। এগুলো সম্পন্ন হলে ঢাকার বাইরে শুরু করা হবে।

বিশেষজ্ঞরা করোনা পরীক্ষা নিয়ে এমন ধীরগতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এ ব্যাপারে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও ভাইরোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, পরীক্ষা বাড়াতে সমস্যা কোথায় এটাই তো বুঝতে পারছি না। পরীক্ষা না বাড়ালে রোগটি ঠিক কোন পর্যায়ে আছে এবং নিয়ন্ত্রণে ঠিক কী ব্যবস্থা নিতে হবে, সেটা বোঝা যাচ্ছে না। তাছাড়া পরীক্ষা বাড়ানোর জন্য সরকারের হটলাইনের সংখ্যা বাড়াতে হবে। অনেক লোক অভিযোগ করেন, তারা হটলাইনে ফোন করে পান না। আবার পেলেও তাদের পরামর্শ দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। এভাবে করলে হবে না। সামনে করোনার জন্য আরও ঝুঁকির সময় আসছে। একবার যদি রোগটি কমিউনিটিতে ব্যাপক হারে ছড়িয়ে পড়ে, তখন নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে।

এ বিশেষজ্ঞ বলেন, মাঠপর্যায়ে পরীক্ষা বাড়াতে হবে। রাজধানীকেন্দ্রিক রাখলে হবে না। বিশেষ করে ঢাকার বাইরের হাসপাতালগুলোতে নমুনা সংগ্রহের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। এখান থেকে নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করালে নানা জটিলতা দেখা দেয়। যার যার নমুনা তারাই সংগ্রহ করবে। তাহলে অসংখ্য মানুষের পরীক্ষা করা যাবে।

আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশের (আইসিডিডিআর,বি) প্রধান চিকিৎসক ডা. আজহারুল ইসলাম খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমরা শুরু থেকেই বলে আসছি পরীক্ষার পরিধি বাড়াতে হবে। ল্যাবরেটরি বাড়াতে হবে। ঢাকার বাইরে মাঠপর্যায়ে পরীক্ষা করা না গেলে ঠিক কী পরিমাণ রোগী রয়েছে বা আক্রান্তের আশঙ্কা কেমন সেটা বোঝা যাবে না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বিশেষজ্ঞ করোনা পরীক্ষার ব্যাপারে সরকারকে কিছু পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি বলেন, আইইডিসিআর প্রতিদিন বলছে তাদের কাছে অনেক কল আসে। সেখান থেকে যাদের সন্দেহ হয় তারা পরীক্ষা করে। কিন্তু দেখতে হবে এ কলের মধ্যে সাধারণ সর্দি-কাশি-জ¦রের সংখ্যা কত। সেজন্য তারা সবার স্যাম্পল কালেকশন করে না। যতগুলো প্রতিষ্ঠান করোনা পরীক্ষা করছে, তাদের এলাকা বা হাসপাতাল ভাগ করে দিতে পারে। এসব প্রতিষ্ঠানের বিশেষজ্ঞরা মাঠপর্যায়ে গিয়ে বা নিজস্ব হটলাইন খুলে সন্দেহজনকদের থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে পারে।

এ বিশেষজ্ঞ উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, কল বাছতে গিয়ে আইইডিসিআর পরীক্ষার সংখ্যা কমিয়ে ফেলছে। মাইল্ড উপসর্গ যাদের মধ্যে বা যাদের মধ্যে সন্দেহ করা হচ্ছে, এমন কাউকে পরীক্ষা করা হচ্ছে না। অবশ্যই পরীক্ষার সংখ্যা বাড়াতে হবে।

এ ব্যাপারে আইইডিসিআরের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা বলেন, যাদের মধ্যে করোনার উপস্থিতি রয়েছে বলে সন্দেহ করব তাদের প্রত্যেকের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করতে চাই, যাতে করে কোনো আক্রান্ত ব্যক্তি সমাজে রয়ে না যান, যার কাছ থেকে সংক্রমণটি ছড়িয়ে পড়তে পারে তার চিকিৎসারও ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে চাই।

তিনি আরও বলেন, আমাদের হটলাইনে গত ২৪ ঘণ্টায় প্রাপ্ত কলের সংখ্যা ৩ হাজার ৬৩৭টি। যার মধ্যে ২ হাজার ৫০৯টি কল কভিড-১৯ সংক্রান্ত। এ পর্যন্ত আমরা মোট নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করেছি ১ হাজার ৬০২ জনের। গত ২৪ ঘণ্টায় ১৪০ জনের। অনেকের মনে প্রশ্ন হতে পারে, গতকালকের (সোমবার) চেয়ে আজকের (মঙ্গলবার) সংখ্যা একটু অন্যরকম দেখাচ্ছে। এখন আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা শুরু হয়েছে, সেখানে মোট পরীক্ষার যে সংখ্যা, সেই সংখ্যার তথ্যটি আমাদের কাছে দেরিতে আসার কারণে আজকে আমরা সন্নিবেশিত করেছি। যে কারণে সোমবারের সঙ্গে মঙ্গলবারের ১৪০টি যোগ করলেও সংখ্যাটি আগের তুলনায় বেশি দেখাচ্ছে। সবমিলিয়ে সর্বমোট নমুনা পরীক্ষার সংখ্যা ১ হাজার ৬০২। গত ২৪ ঘণ্টায় ১৪০ জনের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। এখানে সংখ্যা বলছি মানে কতজন সন্দেহজনক রোগীর নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। যারা নিশ্চিত রোগী, তাদের ক্ষেত্রে আমরা একাধিকবার নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করে থাকি। সে সংখ্যাটি এখানে উল্লেখ করা হয়নি।