বাংলাদেশে করোনা প্রস্তুতি শূন্যের কোটায়, তথ্য গোপন চলছেই

ভোরের আলো ডেষ্ক: সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়া প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাসের কারণে দুনিয়া জুড়ে এক ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। সারাবিশ্বে এখন পর্যন্ত ৬ লাখ আক্রান্ত ও ৩০ হাজারের বেশি মানুষ মারা গেছে। বিশেষজ্ঞ ও সচেতন মানুষ মনে করছেন করোনা সংক্রমণে অন্যান্য দেশের মতো ভয়াবহ পরিস্থিতির শিকার হতে যাচ্ছে বাংলাদেশও।আর দুইটি কারণে মূলত বাংলাদেশের সামনে বড় ধরণের বিপদ অপেক্ষা করছে। একটি হলো করোনা মোকাবেলায় সরকারের প্রস্তুতি শূন্যের কোটায়, আর দ্বিতীয় হলো-করোনায় আক্রান্ত ও মৃতের সঠিক সংখ্যা প্রকাশ না করা।

সরকারের কোনো প্রস্তুতি নেই

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা থেকে শুরু করে সরকারের সব মন্ত্রীরা প্রতিদিনই জোর গলায় বলে বেড়াচ্ছেন যে, করোনা মোকাবেলায় সরকারের শতভাগ প্রস্তুতি রয়েছে। দুই মাস আগেই সরকার সব প্রস্তুতি গ্রহণ করে রেখেছে। কিন্তু বাস্তবতা বলছে সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা।

দেখা যাচ্ছে, গত ২৪ ঘণ্টায় মাত্র ৪২ জনকে টেস্ট করতে পেরেছে। আর এ পর্যন্ত আইইডিসিআর ১০৬৮ জনকে টেস্ট করতে পেরেছে। তাতে যদি চলতি মার্চ মাস পুরোটা ধরা হয়। তাহলে ২৮ দিনে,এ পর্যন্ত গড়ে ২৪ ঘন্টায় ৩৮ জনকে টেস্ট করা হয়েছে।

কিন্তু করোনাতঙ্কে বিদেশ থেকে এসেছেন প্রায় ১০ লাখ প্রবাসী। সেই হিসাব দেখা যায় ২৪ ঘন্টায় ৪২ জনকে টেস্ট করলে ১০ লাখ মানুষকে পরীক্ষা করতে লাগবে ২৩,৪০৯ দিন অর্থাৎ ৬৫ বছর।

আর যদি কাল থেকে টেস্ট করার সক্ষমতা চার গুণ বাড়ে তারপরও সময় লাগবে প্রায় সাড়ে ১২ বছর।

জার্মানি, ইতালী, চীন, আমেরিকা, স্পেন প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪০ হাজার মানুষকে পরীক্ষা করছে।

দেশের গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে দেখা যাচ্ছে, বিভিন্ন জায়গায় মানুষ করোনার উপসর্গ নিয়ে আইইডিসিআর এর হটলাইনগুলোতে ফোন করেও কোনো সাড়া পাচ্ছে না। চিকিৎসার অভাবে অনেকে মারাও যাচ্ছেন।

বিশেষজ্ঞরাও বলছেন, টেস্ট না করার কারণে সঠিক সংখ্যা জানা যাচ্ছে না যে দেশে আসলে করোনা আক্রান্ত সংখ্যা কত।আর ধীরগতির টেস্টের কারণে পরিস্থিতি ভয়াবহতার দিকেও যেতে পারে।তখন শুধু লকডাউন দিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা যাবে না।

এদিকে জাতিসংঘের ফাঁস হওয়া একটি আন্তঃসংস্থা নথি মোতাবেক, করোনাভাইরাসের বিস্তার প্রশমন ও অবদমনে জরুরী পদক্ষেপ নেওয়া না হলে কভিড-১৯ রোগে আক্রান্ত হয়ে বাংলাদেশে “৫ লাখ থেকে ২০ লাখ” মানুষের মৃত্যু হতে পারে। “জাতীয় প্রস্তুতি ও প্রতিক্রিয়া পরিকল্পনা” (সিপিআরপি ভি১) শীর্ষক এই নথিতে এই সংখ্যাকে “ভয়াবহ” বলে আখ্যা দেওয়া হয়েছে। চলতি সপ্তাহে ঢাকায় বিদেশী কূটনীতিকদের এই নথিটি দেওয়া হয় বলে খবর প্রকাশ করেছে সুইডেন ভিত্তিক সংবাদ মাধ্যম নেত্র নিউজ।

২৬ মার্চের এই নথিতে বলা হয়, “বাংলাদেশে জনসংখ্যার ঘনত্ব অত্যধিক হওয়ায়, বৈশ্বিকভাবে প্রযোজ্য মডেলিং পদ্ধতি ও পরামিতি অনুমান অনুযায়ী, কভিড-১৯ রোগের প্রভাবের পূর্বাভাস হলো, মহামারী চক্রে ৫ লাখ থেকে ২০ লাখ মানুষের জীবনহানি ঘটবে। অন্যান্য দেশে ব্যবহৃত মডেলিংয়ের বিপরীতে চিন্তা করলে এই সংখ্যা ও মাত্রা খুব আশ্চর্য্যজনক কিছু নয়। কিন্তু এই সংখ্যা অত্যন্ত ভয়াবহ। এই সংখ্যাকে বিবেচনা করে পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য আহ্বান জানানো উচিৎ।”

তারা আরও পূর্বাভাস দিয়েছেন যে, দুর্বল “সংক্রমণ প্রতিরোধ নিয়ন্ত্রণ চর্চা, পিপিই’র (পারসোনাল প্রোটেকটিভ ইকুইপমেন্ট) অপ্রতুলতা এবং মাধ্যমিক ও পরিণত পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে রোগীদের চাপ অত্যাধিক বেশি” হওয়ার কারণে কভিড-১৯ ভাইরাসে স্বাস্থ্যসেবাকর্মীরা “ব্যাপকহারে” সংক্রমিত হতে পারেন।

২৬ মার্চ ঢাকা বন্ধ করে দেওয়ার আগে শহর থেকে আনুমানিক ৯০ লাখ মানুষকে বের হতে দেওয়ার যেই সিদ্ধান্ত সরকার নিয়েছে, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে এই সিপিআরপি নথিতে। এতে বলা হয়, সরকারের ওই সিদ্ধান্তের কারণে “খুব সম্ভবত ঝুঁকিপূর্ণ ও সংক্রমণশীল লোকজন সারাদেশে ছড়িয়ে পড়েছ. ফলে রোগের বিস্তার আরও ত্বরান্বিত হয়েছে।” তবে নথিতে এও বলা হয় যে, ঢাকা থেকে লোকজন বের হয়ে যাওয়ায় রাজধানী শহরের ওপর কভিড-১৯ রোগীদের বোঝা হয়তো কমেছে এবং তা দেশজুড়ে বিন্যস্ত হয়েছে।

তথ্য গোপন করছে সরকার

করোনা পরিস্থিতি আরও ভয়াবহতার দিকে যাওয়ার পেছনে আরেকটি কারণ হবে সরকারের তথ্য গোপন। সরকারি হিসাবে এখন পর্যন্ত করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন মোট ৪৮ জন। আর শনিবারে কোনো আক্রান্তের সংখ্যা নেই। আর করোনায় মারা গেছে ৫ জন। কিন্তু দেশের গণমাধ্যমের সংবাদ বলছে ভিন্ন কথা।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদে দেখা যাচ্ছে, করোনার উপসর্গ নিয়ে প্রায় প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন স্থানে লোকজন মারা যাচ্ছেন। চিকিৎসার জন্য সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত লোকজনকে ফোন করলেও কোনো কাজ হচ্ছে না। এমনকি করোনা টেস্টেরও সুযোগ পাচ্ছেন না তারা।

জানা গেছে, শুক্রবার রাতে বগুড়ায় করোনার উপসর্গ নিয়ে একজন মারা গেছেন। অনেক অনুরোধের পরও সরকারের লোকজন তার কাছে আসেনি। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে তার মৃত্যুকে স্বাভাবিক মৃত্যু বলে ঘোষণা করা হয়েছে।

এরকম আরও অনেকেই করোনার উপসর্গ নিয়ে মারা যাচ্ছে কিন্তু এসব মৃত্যু সরকারি হিসেবে আসছে না।

এরপর, আইইডিসিআর এর পরিচালক মীর্জাদা সেব্রিনা ফ্লোরা নামে এক নারী শনিবার বললেন-নতুন কোনো করোনায় আক্রান্ত রোগী নাই। কিন্তু গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদে দেখা গেছে, গাইবান্ধায় দুইজন আক্রান্ত হয়েছেন। একজন ঢাকা থেকে সিলেটে গিয়ে আইসোলেশনে আছেন। এভাবে আরও অনেক আক্রান্তের সংখ্যা গণমাধ্যমে আসলেও সরকার হিনেবে এগুলো বাদ দেওয়া হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকার বহির্বিশ্বে কৃতিত্ব নিতে ডেঙ্গুর মতো করোনায় আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা চাপা দিচ্ছে।সরকারের এই অপচেষ্টা হীতেবিপরীত হতে পারে।

জাতিসংঘের এই আন্তঃসংস্থা নথিতে উল্লেখ করা হয় যে, শুধুমাত্র “লকডাউন” করে বাংলাদেশে কভিড-১৯ সংক্রমণ খুব বেশি কমানো যাবে না। শুধুমাত্র ভাইরাসের অবদমনই এর সংক্রমণ হার পর্যাপ্তভাবে কমিয়ে মহামারীর প্রকোপকে ভোঁতা করে দিতে পারে।

বাংলাদেশে কভিড-১৯ রোগের বিস্তার অবদমন ও প্রশমনের জন্য ৬-দফা কর্মপরিকল্পনার কথা নথিতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এগুলো হলো: অনতিবিলম্বে দেশজুড়ে কভিড-১৯ আক্রান্ত রোগী খোঁজা ও শনাক্ত করা; কভিড-১৯ পরীক্ষা শুরুর জন্য বর্তমানে যেসব পরীক্ষাগার আছে তাদের সামর্থ্য যাচাই করা; জরুরীভিত্তিতে পিপিই, হাসপাতালের জন্য যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য মেডিকেল সরঞ্জাম ক্রয় করা; “রোগী অগ্রাধিকার, সংক্রমণ প্রতিরোধ ও রোগী ব্যবস্থাপনা উন্নতকরণের লক্ষ্যে” দেশজুড়ে স্বাস্থ্যসেবাকর্মীদের প্রশিক্ষণ শুরু করা; কম্যুনিটি পর্যায়ে ঝুঁকি যোগাযোগ; এবং সামাজিক দূরত্ব সংক্রান্ত পদক্ষেপ বজায় রাখতে সচেতনতামূলক প্রচারণা।

এতে বলা হয়, বাংলাদেশে কভিড-১৯ রোগে আক্রান্তের প্রকৃত সংখ্যা এখনও অজ্ঞাত, “তবে সরকারী প্রতিবেদন, মৌখিক প্রমাণ ও মডেলিং পূর্বানুমান মিলিয়ে এই সংখ্যা বেশি হবে বলেই অনুমান করা হচ্ছে।” এতে আরও বলা হয়, “স্বাস্থ্যসেবা কর্মীদের মাঝে পিপিই’র সরবরাহ এখনও বিক্ষিপ্ত অবস্থায় আছে।” সন্দেহভাজন ও নিশ্চিত কভিড-১৯ রোগীদের চিকিৎসায় মেডিকেল “স্থাপনাসমূহ সাধারণ অর্থে অপ্রস্তুত, যদিও জাতীয় পর্যায়ে বাছাই করা কিছু স্থাপনায়” সম্প্রতি কিছুটা উন্নতি সাধন করা হয়েছে।