এ যেন নিস্তব্ধ প্যারিস!

মারূফ অমিত, প্যারিস থেকে

সোডিয়াম আলোর শহর প্যারিস নিস্তব্ধ, নিথর। সারাদিন যে শহরে লোক সমাগম লেগেই তাকে সেখানে পুরো প্যারিস শহর তথা সম্পূর্ণ ফ্রান্স লক ডাউন। ফ্রান্সের রাস্তার পাশে দেয়ালগুলোতে সৌখিন শিল্পীরা রাতভর জেগে দেয়ালগুলোতে রঙের আলপনায় জীবনের চিত্র তুলে ধরেন সেসব জায়গা শুনশান।

বিশ্বখ্যাত আইফেল টাওয়ার থেকে লুভর মিউজিয়াম জনমানবহীন। শুধু ফ্রান্স নয়, পুরো পৃথিবী যেন স্তব্ধ।

করোনাভাইরাসের মহামারি ঠেকাতে ফ্রান্স সরকার বাহিরে জনসাধারণের চলাচলে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। বিশেষ জরুরি অবস্থা ছাড়া বাইরে চলাচল করলেই গুণতে হচ্ছে জরিমানা।

এর আগে গত ১৪ মার্চ প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড ফিলিপের নির্দেশনা অনুযায়ী কেবল ফার্মেসি, গ্রোসারি শপ, টোব্যাকো শপ, পোস্ট অফিস, ব্যাংক ও সরকারি প্রতিষ্ঠান ছাড়া সব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান পরবর্তী নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত বন্ধ ঘোষণা করেছেন।

বিশেষ অনুমতিপত্র সাথে নিয়ে ১৮ মার্চ গিয়েছিলাম একটি সুপার শপে। শিউরে উঠার মত চিত্র, যেন মহাদুর্ভিক্ষের অশনি সংকেত। ক্যারিফোর নামক সুপার শপের প্রায় ৭০ শতাংশ জিনিসপত্র জনসাধারণ কিনে নিয়েছেন।

সুপার শপে কর্মরত একজন কর্মীর সাথে কথা বলে জানা যায়, করোনাভাইরাসের কারণে মানুষ বাসার বাইরে বের হবার আতঙ্কে মানুষ জিনিসপত্র কেনাকাটা করে নিয়েছেন। তিনি জানান, আগামী দুই থেকে তিনদিনের মধ্যে আরও অনেক মালামালা বিক্রি হয়ে যাবার সম্ভাবনা আছে।

ফ্রান্সের অভারভিলিয়া শহরের বাংলাদেশি রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ী আহমেদ হোসাইন জানান, ইতোমধ্যে আমাদের রেস্টুরেন্ট সার্ভিস বন্ধ করে দিয়েছি। তিনি জানান, দৈনিক আমাদের গড়ে ৮শ থেকে ১৩শ ইউরো লোকসান গুণতে হচ্ছে।

এদিকে প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ ১৩ মার্চ শুক্রবার জাতির উদ্দেশে ভাষণে বর্তমান পরিস্থিতিকে ফ্রান্সের ১০০ বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে বিপদজনক ও প্রতিকূল পরিস্থিতি হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।

১৬ মার্চ থেকে পরবর্তী নির্দেশনা পর্যন্ত সব বিদ্যাপীঠ বন্ধ ও সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থা ঘোষণা দেওয়ার ২৪ ঘণ্টার ভেতর প্রধানমন্ত্রী এই দ্বিতীয় দফা নির্দেশনা দিয়েছেন।

এদিকে ফ্রান্সের সীমান্তগুলোয় রাখা হয়েছে অতিরিক্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা, ইউরোপের অন্যান্য দেশ থেকে অতিপ্রয়োজন এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা ছাড়া সীমান্ত দিয়ে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।

পর্যটন এলাকা হিসেবে খ্যাত ফ্রান্সের আন্তর্জাতিক রেলওয়ে স্টেশন গার দ্যু নর্দ এলাকা ঘুরে দেখা যায় চারপাশ শুনশান নীরবতা। মেট্রো ট্রেন, আরইআর ট্রেনসহ লোকাল বাসগুলো যাত্রীবিহীন।

প্যারিসে কর্মরত বাংলাদেশি একজন উবার চালকের সাথে কথা বলে জানা যায়, উবার ব্যবসা করোনাভাইরাসের প্রভাবে ক্ষতির মুখে। দৈনিক নয় থেকে ১০ ঘন্টা উবার ফুড ডেলিভারিতে কাজ করে তিনি সত্তর থেকে আশি ইউরো আয় করতে পারতেন সেখানে গত ১৫ মার্চ থেকে তিনি কাজই করতে পারেননি।

ফ্রান্সের মুলান শহরের বাসিন্দা অহিদুজ্জামানের সাথে মুঠোফোনে কথা বলে জানা যায়, মুলান শহরে জনজীবন স্থবির, করোনাভাইরাসে প্রভাবে তিনি বহিরাগমন থেকে বিরত আছেন।

ফ্রান্সের বৃহত্তম আন্তর্জাতিক দুটি বিমানবন্দরেই আংশিক এলাকা যাত্রীসাধারণের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এয়ারলাইনসগুলো তাদের ফ্লাইট বাতিল ঘোষণার কারণে এয়ারপোর্ট অনেকটা যাত্রীবিহীন ফাঁকা হয়ে পড়েছে। যাত্রীদের পরীক্ষায় ভাইরাস আক্রান্তদের ১৪ দিনের জন্য কোয়ারেন্টাইন সেন্টারে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

আজ পর্যন্ত ৩ নম্বর বিপদ সংকেতে অবস্থানকারী দেশ হিসেবে ফ্রান্সের ৭০ বছরের সব নাগরিকের জরুরি প্রয়োজন ছাড়া বাইরে না যাওয়ার জন্য জোরালো নির্দেশনা রয়েছে। তা ছাড়া ১০০ লোকের অধিক জনসমাগমের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।

১৫ মার্চ পূর্বনির্ধারিত মিউনিসিপাল নির্বাচনের প্রথম রাউন্ড যথারীতি ভোট গ্রহণ অব্যাহত রয়েছে। কিন্তু ভোটকেন্দ্রগুলোকে সংক্রামকমুক্ত রাখার জন্য ব্যাপক স্যানিটারি ও স্বাস্থ্য নিরাপত্তার জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছিল।

ফ্রান্স সরকার আসন্ন আর্থিক সংকট মোকাবিলায় ব্যবসার ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ করে ভর্তুকি প্রদান করার আশ্বাস প্রদান করেছেন। কিন্তু অবৈধ অভিবাসী বাংলাদেশিরা যেহেতু চুক্তিবিহীন কাজ করে থাকেন, তাই তারা এসব সুবিধা পাবেন না বলে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন।

এ ব্যাপারে ফাস্টফুডে শপে কাজ করা আফিয়া নামের একজন বাংলাদেশি নারী জানিয়েছেন, যেহেতু তিনি চুক্তিবিহীন কাজ করছেন, তাই তার কাজ চলে যাবার আশঙ্কা রয়েছে। এখন সরকার থেকে যে সুবিধা দেওয়া হবে সেসব সুবিধা পাবেন না বলে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তিনি।

ফ্রান্স সরকারের ওয়েবসাইটের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ফ্রান্সে করোনাভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা সাড়ে ৪ হাজারের বেশি। এখন পর্যন্ত ৯১ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। সরকারের পক্ষ থেকে অতিদ্রুত বিস্তারকারী এই ভাইরাসের বিস্তার রোধে সর্বোচ্চ জননিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।