নির্যাতনের বর্ণনা দিলেন সাংবাদিক আরিফ

কুড়িগ্রামের সাংবাদিক আরিফুল ইসলামকে শুক্রবার মধ্যরাতে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যাওয়ার পর থেকে কারাগারে পাঠানো পর্যন্ত তার সাথে কি কি ঘটেছিল তা কুড়িগ্রামের হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রোববার দুপুরে সাংবাদিকদের কাছে বর্ণনা দেন তিনি ।

বাংলা ট্রিবিউনের এ জেলা প্রতিনিধি বলেন, ‘শুক্রবার রাত ১২টার দিকে ঘুমানোর জন্য যখন প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম ঠিক তখনই হঠাৎ বাড়িতে বুটের শব্দ শুনতে পাই। আরিফ ভাই বলে ডাক দিয়ে দরজা খুলতে বলা হয় বাইরে থেকে। আমি কে জানতে চাইলে বাইরে থেকে বলা হয়, থানা থেকে আসছি। তখন আমি সদর থানার ওসিকে ফোন দিই। থানা থেকে বলা হয় তিনি পুলিশ পাঠাননি। ফোনে কথা বলা শুনে দরজা ভেঙে ঘরে ঢুকে হাত-পা বেঁধে মারধর করা হয় আমাকে।’

কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসনের আরডিসি (সিনিয়র সহকারী কমিশনার) নাজিম উদ্দীনের নেতৃত্বে তার উপর এ নির্যাতন চালানো হয় বলে অভিযোগ করে সাংবাদিক আরিফুল ইসলাম রিগ্যান বলেন, ‘আরডিসি নাজিম উদ্দীন তার মাথায় কিলঘুষি মারেন। লাথি দেন। এরপর টেনে হিচড়ে বাড়ি থেকে নিয়ে গিয়ে মাইক্রোবাসে তোলেন এবং বলেন তোকে আজ এনকাউন্টারে দেওয়া হবে। তুই বেশি বেড়ে গেছিস, তোকে সাংবাদিকতা শেখাবো। তুই এই সমাজের জঞ্জাল।’

সাংবাদিক আরিফুল ইসলাম রিগ্যান বলেন, ‘তার হাত-পা-চোখ বেঁধে অকথ্য ভাষায় তাকে গালিগালাজ করতে থাকেন আরডিসি নাজিম উদ্দীন। অজ্ঞাত স্থানে এনকাউন্টার করার জন্য নিয়ে যায়। আমি তখন অনেক আকুতি করি। আল্লাহ’র ওয়াস্তে ক্ষমা চাই। শেষে আমার দুই সন্তানের কসম দেই। আমার ছোট ছোট দু’টি বাচ্চা আছে। আমার বাবা-মা নেই। আমি মারা গেলে আমার সন্তানদের দেখবে কে। এরপরও তিনি মারতে থাকেন।’

আরিফুল ইসলাম রিগ্যান বলেন, ‘চোখ খুলে দিলে দেখতে পারি আমি ডিসি অফিসে। এখানে এনে আমাকে আবারও মারধর করে। জোর করে ৪টি কাগজে সই নেয়। আমাকে বিবস্ত্র করে ভিডিও ধারণ করেছে। এরপর রাতের মধ্যে গাড়িতে করে কারাগারে রেখে এসেছে। কোন অপরাধে আমাকে নিয়ে আসা হয়েছে-বারবার জিজ্ঞাসা করা সত্ত্বেও তারা আমাকে কিছু বলেনি।’

এর আগে রোববার সকাল ১১টার দিকে তার জামিন মঞ্জুরের মাত্র ২০ মিনিটের মাথায় তাকে কারাগার থেকে মুক্তি দেওয়া হয়। তার জামিন নিয়েও ঘটেছে নানা নাটকীয় ঘটনা। কে তার দণ্ডের বিরুদ্ধে আপিল করেছেন-কে তার জামিন আবেদন করেছেন তা কেউ জানে না।

রিগ্যানের মামা নবীদুল ইসলামসহ অন্যান্য স্বজনরা জানিয়েছেন, আপিল এবং জামিনের আবেদন বিষয়ে পরিবারের কেউ কিছু জানে না। সকালে জামিন হওয়ার কথা শুনে তারা বিস্ময় প্রকাশ করেন। তবে আরিফুল ইসলাম রিগ্যান বলেছেন, শনিবার রাতে কারাগারে আপিল ও জামিন আবেদনের জন্য ওকালতনামা ও জামিনের জন্য বেলবণ্ড নিয়ে গিয়ে বলা হয়েছে এগুলো স্বাক্ষরের জন্য পরিবারের পক্ষ থেকে পাঠানো হয়েছে। এ কথা শুনে স্বাক্ষর করেছি।

এ বিষয়ে পাবলিক প্রসিকিউটর এসএম আব্রাহাম লিংকন জানান, রোববার সকালে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে ভ্রাম্যমাণ আদালতের দেওয়া দণ্ডের বিরুদ্ধে আপিল আবেদন এবং জামিনের আবেদন দাখিল করা হলে তা গ্রহণ করেন। এরপর শুনানির জন্য অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে তা পাঠানো হয়। ২৫ হাজার টাকার বণ্ডে এবং একজন আইনজীবী ও প্রেস ক্লাবের সভাপতির জিম্মায় তাকে আপিলের নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সময়ে জামিনে মুক্তি দেওয়ার আদেশ দেন অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. সুজাউদ্দৌলা। এ সময় রিগ্যানের পক্ষে তিনি নিজে এবং অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন ও আহাসান হাবীব নীলু অংশগ্রহণ করেন। অ্যাডভোকেট আহসান হাবীব নীলু প্রেস ক্লাবের সভাপতি।

তিনি আরও জানান, আপিল আবেদন ও জামিন আবেদনে সাংবাদিক আরিফুল ইসলাম রিগ্যান স্বাক্ষর করেছেন এবং তা সত্যায়িত করেছেন জেলার। আর ভ্রাম্যমাণ আদালতের দণ্ডের আবেদনে পরিবারের কারো স্বাক্ষর করার বিধান নেই। শুধু দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তি আবেদন করতে পারেন। এজন্য রিগ্যানের স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে।

এদিকে জেনারেল হাসপাতালের অর্থোপেডিক ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন অরিফুল ইসলাম রিগ্যানের বর্তমান শারিরীক অবস্থা সম্পর্কে অর্থোপেডিক বিভাগের সিনিয়র কনসালটেন্ট ডা. ইউকে রায় জানান, রিগ্যানের শরীরে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। কয়েকটি পরীক্ষা করা হয়েছে।

রিগ্যানের স্ত্রী মোস্তারিমা সরদার নিতু জানান, জেলা প্রশাসকসহ জেলা প্রশাসনের যেসব কর্মকর্তা নির্যাতনের সাথে জড়িত তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। এছাড়া রিগ্যান সুস্থ হওয়ার পর নির্যাতনকারীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়ে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

জেলা প্রশাসককে প্রত্যাহার করা হচ্ছে এমন সংবাদ শোনার পর জেলা সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের আহ্বায়ক শ্যামল ভৌমিক তদার প্রতিক্রিয়ায় বলেন, শুধু জেলা প্রশাসককে প্রত্যাহার করলে হবে না। তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। সেই সাথে জড়িত অন্যান্য কর্মকর্তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।

কুড়িগ্রাম প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমান বিপ্লব বিচার বিভাগীয় তদন্ত করে জেলা প্রশাসকসহ জড়িত অন্যান্য কর্মকর্তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদানের দাবি জানান।

জেলা প্রশাসক মোছা. সুলতানা পারভীন ও সেদিনের ঘটনায় জড়িত ম্যাজিস্ট্রেটদের বক্তব্য জানার জন্য তাদেরকে কয়েকবার ফোন দেওয়া হলেও তারা ফোন রিসিভ করেননি।

গত শুক্রবার মধ্যরাতে জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রিন্টু বিকাশ চাকমা, রেভিনিউ ডিপুটি কালেক্টর (আরডিসি) নাজিম উদ্দিন ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এসএম রাহাতুল ইসলামের নেতৃত্বে টাক্স ফোর্সের সদস্যরা জেলা সদরের কৃষ্ণপুর চরুয়াপাড়া এলাকার বাড়িতে গিয়ে আরিফুল ইসলাম রিগ্যানকে জোরপূর্বক জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে ধরে নিয়ে যায়। এরপর তাকে মাদক মামলায় ১ বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড এবং ৫০ হাজার টাকা জরিমানার দণ্ড দিয়ে কারাগারে পাঠিয়েছিল ভ্রাম্যমাণ আদালত।