চীন যেভাবে করোনাভাইরাস জয় করলো

লিখেছেন নাদিম মাহমুদ

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে খবর বের হয়েছে যে, যে স্থান থেকে নভেল করোনাভাইরাস-১৯ ছড়িয়েছিল, সেই চীনের হুবেই প্রদেশে আক্রান্তদের জন্য ব্যবহৃত ১৬টি অস্থায়ী হাসপাতালের মধ্যে ১১টি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। দেশটিতে করোনাভাইরাসে নতুন আক্রান্তদের সংখ্যা দুই অংকের ঘরে নেমেছে। কয়েক সপ্তাহ আগে যে দেশটিতে এই ভাইরাসটি প্যানডেমিক আকার ধারণ করেছিল, সেই দেশটি এখন শক্তহাতে নভেল করোনাভাইরাস জয়ের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে।

চীন জয়ের কাছাকাছি গেলেও বিশ্বব্যাপী করোনাতঙ্ক বেশ মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। বিশেষ করে ইউরোপের ইতালি, ইরানের পরিস্থিতি ভয়াবহ। বাংলাদেশেও ইতিমধ্যে প্রবাসীদের পোষকের ভূমিকায় তিনজন আক্রান্ত হওয়ার খবর বের হয়েছে। আর এর মধ্যে শুরু হয়ে গিয়েছে আতঙ্ক। মাস্ক বা বদনবন্ধনী কেনার হিড়িক আর গুজবের আবডালে সাধারণের চোখে কিছুটা অস্বস্তি দেখা যাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চলছে, গুজব নির্ভর আলোচনা।

কভিড-১৯ কি আসলে আতংকের কোন কিছু? বদনবন্ধনী আমাদের কতটা সুরক্ষা দিবে, সেই আলোচনা হয়তো আর একদিন করা যাবে তার আগে চলুন একবার দেখে আসি চীন কিভাবে নব্য করোনাভাইরাসকে শাসন করছে। সেখান থেকে আমরা তথা বিশ্ববাসী কতটা শিক্ষা নিতে পারে?

চীন এমন এক সময় করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে, যখন তার কয়েক সপ্তাহ পর দেশটির সবচেয়ে বড় উৎসব ‘চীনা বষপূর্তি’ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু করোনাভাইরাসের দাপটে দেশটিতে আশি হাজারেরও বেশি আক্রান্ত ও তিন হাজারেরও বেশি মৃত্যুর খবর বিশ্ববাসীকে শোকাতুর করে তোলে। কিন্তু গত কয়েক সপ্তাহ দুয়েক ধরে কভিড-১৯ রোগীদের দ্বারা উপচে পড়া চীনা হাসপাতালগুলিতে এখন খালি বিছানা দেখা যাচ্ছে। পরীক্ষামূলকভাবে তৈরি করা করোনাভাইরাসের ওষুধের পরীক্ষা করার মত উপযুক্ত রোগী খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ঠিক  কোন কোন কৌশল অবলম্বন করে চীন করোনাভাইরাসটিকে বাগে এনেছে তা নিয়ে বেশ কিছু গবেষণা নির্ভর তথ্য এসেছে বিজ্ঞান সাময়িকী ‘সায়েন্স’ ও চিকিৎসা সাময়িকী ‘দি ল্যানসেটে’ গবেষকদের প্রবন্ধে।

গত ২২ ফেব্রুয়ারি ১২ জন চীনা ও ১৩ জন বিদেশি বিজ্ঞানীর একটি দল গত ১৬ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৪ ফেব্রুয়ারি কভিড-১৯ আক্রান্ত চীনের পাঁচটি শহর ভ্রমণ করে দেখে যে প্রতিবেদন করেছে, তা সত্যি নতুন আক্রান্ত দেশগুলোর জন্য অনুকরণীয় হতে পারে। ইতিমধ্যে   Report of the WHO-China Joint Mission on Coronavirus Disease 2019 (COVID-19) শিরোনামে প্রকাশিত চল্লিশ পৃষ্ঠার এক প্রতিবেদনও প্রকাশ হয়েছে। তিন ধাপে বিভক্ত করা চীনের কভিডের আক্রমণের ডেমোগ্রাফ দেখে বুঝা যাচ্ছে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত রোগী ছিল জানুয়ারির ২০ তারিখ থেকে ফেব্রুয়ারির ৭ তারিখ পর্যন্ত যেখানে আক্রান্তদের সংখ্যা দিনে এক হাজার থেকে তিন হাজার ছিল।

শ্বাস-প্রশ্বাসজনিত রোগের দ্রুত বিস্তার রক্ষার জন্য চীনের সাহসী দৃষ্টিভঙ্গি দ্রুত ছড়িয়ে পরার পথ পরিবর্তন করেছে। বেইজিং, শেনজেন, গুয়াংজু, চেংদু এবং সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত শহর উহান ঘুরে গবেষকরা দেখছেন, চীনের কর্তৃত্ববাদী সরকার মানবাধিকারকে তোয়াক্কা না করে এই ভাইরাস ছড়ানোর মধ্যে লাখ লাখ মানুষকে কার্যত গৃহবন্দি করে ফেলে তাদের তথ্য প্রযুক্তির আওতায় পর্যবেক্ষণের সিদ্ধান্ত নেন।

২৩ জানুয়ারির পর থেকে উহানের অন্তত ৫০ মিলিয়ন লোককে বাধ্যতামূলক পৃথকীকরণ বা কোয়ারেনটাইনের আওতায় নিয়ে আসে। সপ্তাহের মধ্যে একটি হাসপাতাল তৈরি করে ফেলে। যে কারণে যারা আক্রান্ত হয়েছিলেন তারা মূলত ঘরের ভিতর আক্রান্ত হন, সাথে পরিবারের সদস্যরা। যেটি যেকোনও ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস জ্বরের মতই একটি সাধারণ ঘটনা। আর আক্রান্তদের চিকিৎসা সেবা ছিল আইসোলেশনের মাধ্যমে।

চীনের সরকার দেশটির জনপ্রিয় দুটি মোবাইল ফোন অ্যাপস আলিপে এবং উইচ্যাট নাগরিকদের ব্যবহারে বাধ্যবাধকতা তৈরি করেছিল। যার ফলে জনগণের গতিবিধির উপর নজর রাখতে এবং এমনকি সংক্রামিত নিশ্চিত ব্যক্তিদের যাতায়াত বন্ধ করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বেগ পেতে হয়নি। মোবাইলের এইসব অ্যাপসে সংক্রমিত এলাকাকে বিভিন্ন ট্রাফিক সিগনালের ব্যবস্থা করে দেয়। যদি কারও জরুরি প্রয়োজনে বাইরে বের হতে হয়, তাহলে তারা সংক্রমিত এলাকার রাস্তা, বাসস্ট্যান্ড কিংবা রেলস্টেশনের নিরাপদ স্থানগুলোকে সহজে চিহিৃত করে ফেলতে পারে। যে কারণে, কভিড-১৯ আক্রান্তরা অন্যদের শরীরে তেমন একটা ভাইরাস ছড়াতে পারেননি।

আক্রান্তদের চিকিৎসা সেবা দেয়ার নিয়মটা ছিল কিছুটা ভিন্ন। রোগীদের আধিক্য অনুযায়ী চার ধরনের হাসপাতালে ব্যবস্থা করে। সকল শহরের এই হাসপাতালগুলো ছিল বিশেষ কেন্দ্র যেখানে বিশেষায়িত ডাক্তার, নার্স ও স্বেচ্ছাসেবীরা রোগীদের দেখভাল করতো। রোগীদের লক্ষণ দেখে তাদেরকে পৃথিকীকরণের কাজটিও করেছে তারা। যেসব রোগীর সংকটময় পরিস্থিতির মধ্যে ছিল তাদের জন্য ছিল বিশেষ মেডিকেল বোর্ড যারা মৃত্যুহার কমিয়ে আনার লক্ষ্যে পরামর্শ ও সেবা দেয়ার ব্যবস্থা করেছিল।

অন্যদিকে চীনের গবেষকরা দারুণ একটা গবেষণা করেছে যা দেশটির নীতি নির্ধারকদের জন্য বেশ সহায়তা করেছে। চীনা বিজ্ঞানীরা একটি বিশাল ডেটা সেট সংকলন করেছেন যা এই রোগের সর্বোত্তম উপলব্ধ চিত্র দেয়। তারা দেখছেন যে কভিড-১৯ আক্রান্তদের প্রায় ৮০ শতাংশ আক্রান্ত ব্যক্তিদের হালকা থেকে মাঝারি জ্বরে এবং শুকনো কাশি ছিল; ১৩.৮ শতাংশদের শরীরে গুরুতর কিছু লক্ষণ ছিল এবং ৬.১ শতাংশ রোগীর শ্বাস প্রশ্বাসের সমস্যা ছিল। চীনে মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি ছিল ৮০ বছরের বেশি বয়সীদের প্রায় শিশুরা এই মামলার মাত্র ২ দশমিক ৪ শতাংশ ছিল এবং প্রায় ২২ শতাংশ, এবং যাদের হৃদরোগ, ডায়াবেটিস ও হাইপারটেনশন বা উচ্চ রক্তচাপ ছিল তাদের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ মৃত্যুহার ছিল তবে ৩ দশমিক ৮ শতাংশ। আর আক্রান্তরা দুই সপ্তাহের মধ্যে সুস্থ হয়ে ঘরে ফিরেছেন।

চীনের প্রচলিত চিকিৎসা বীমার কিছুটা পরিবর্তন এনে সরকার কভিডে আক্রান্তদের চিকিৎসার ভার যেমন বহন করেছে ঠিক তেমনি আটকে পড়া মানুষদের জন্য খাবার সংগ্রহ করেছে। আর চিকিৎসার ব্যয় সরকার বহন করায় নাগরিকরা অনেকটা দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ছাড়ায় হাসপাতালগুলোতে নিজেদের স্বাস্থ্য সেবা গ্রহণের সুযোগ পেয়েছে। ফলে যাদের শরীরে কভিডের লক্ষণ প্রকাশ পেয়েছিল তারা আইসোলেশন হওয়ার সুযোগ পেয়েছে।

সারাদেশে স্বাস্থ্যকর্মীদের ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা ছিল আর একটি বড় অর্জন। ফলে চীনের জাতীয় স্বাস্থ্য কমিশন গাইডলাইন অনুযায়ী রোগীদের চিকিৎসা আরও একটি যুগান্তকারী সাফল্য ছিল। পালস অক্সিমেট্ররি মাধ্যমে অক্সিজেনের লেবেল নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করে তাদেরকে ক্লোরোকুইন, ফসফেট, লোপিনাভার / রিটোনাভির, আলফা ইন্টারফেরন, রিবাভাইরিন ও আরবিডলের মত ওষুধ কার্যকরী ভূমিকা রেখেছিল।

রোগীদের কাছে তাদের স্বজনদের দূরে যেমন রেখেছিল ঠিক তেমনি সেরে উঠা রোগীদের শরীরের তাপমাত্রা ও ২৪ ঘণ্টায় দুইবার RT-PCR (রিভারস ট্রান্সক্রিপ্টেজ পলিমারেজ চেইন রিয়াকশন) নেগেটিভ হওয়ার পরই তাদের মুক্তি মিলেছে।

দেশব্যাপী  RT-PCR জন্য ৬ ধরনের কিট, ১ টি আইসোথার্মাল এমপ্লিফিকেশন কিট, ১টি ভাইরাস সিকোয়েন্সিং কিট এবং ২ ধরনের কলয়েডাল অ্যান্টিবডি সনাক্তকরণ কিট হাসপাতালগুলোতে দ্রুততার সাথে সরবরাহ করা হয়। যে কারণে কভিড-১৯ আক্রান্তদের সনাক্তকরণ প্রায় শতভাগ নিশ্চিত করে দেশটি।

চীন সরকার সংক্রমণের বিস্তার রোধে জরুরি ব্যবস্থা হিসাবে দেশব্যাপী স্কুল বন্ধের নির্দেশ দেন যার ফলে পাবলিক কার্যক্রম নিরুৎসাহিত করা হয়। দেশটির শিক্ষামন্ত্রণালয় প্রায় ২২০ মিলিয়নের বেশি শিক্ষার্থীকে বাড়িতে বসেই ক্লাস করার সুযোগ দেয়, যার মধ্যে ১৮০ মিলিয়ন ছিল প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার্থী এবং ৪৭ মিলিয়ন প্রাক-বিদ্যালয়ের। কিন্তু মজার বিষয় হলো, এইসব শিক্ষার্থী পড়াশোনায় তেমন একটা ক্ষতির শিকার হয়নি। সরকার দেশটির টেলিভিশন ও ইন্টারনেটের মাধ্যমে অনলাইন কোর্স তৈরি করে স্কুলের শিক্ষকরা সর্বস্তরের সর্বস্তরে শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। যার ফলে ঘরে বসে থাকা শিশুদের শিক্ষা ব্যপারে পিতামাতাদের যে উদ্বিগ্নতা ছিল তা কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হচ্ছে স্কুলগুলি।

যদিও এইসব শিশুদের যখন গ্রীষ্মকালিন ছুটি থাকে তারা কিন্তু তেমন একটা পড়াশোনায় মনযোগ দেয় না। বাইরে খেলাধুলা কিংবা ঘোরাঘুরি করলেও করোনাভাইরাসের সংক্রমণে বাহিরে যাওয়ার নিষেধাজ্ঞায় এইসব শিশুরা পড়াশোনায় বেশ মনযোগীও হয়ে ওঠে।

যার ফল আসতে শুরু করেছে ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহ থেকে। ১০ মার্চ মাত্র ১৯ জন আক্রান্ত হওয়ার তথ্য সত্যি অন্য রকম চীনের সফলতা তুলে ধরে। এখানে চীনের প্রতিটি নাগরিকের রোগ মোকাবেলার যুদ্ধ ছিল। সবার অবদানে চীন কভিড-১৯ কব্জা করতে যাচ্ছে। চীনের অনুকরণে অন্যরা এগিয়ে যাবে কি না সেটা স্বীয় দেশগুলোর নীতি নির্ধারকরা ঠিক করবে তবে আমাদের মত গরীব দেশে চীনের ব্যবস্থাপণা করার মত অবস্থা আছে কি না তা ভাবতে হবে।

যে স্বাস্থ্যবিধির কথা বাংলাদেশ সরকার থেকে প্রচার করা হচ্ছে, সেই স্বাস্থ্যবিধি কেবল করোনার জন্য নয়, এটা সারা বছরের জন্য আমাদের স্বাস্থ্য বিধি হওয়া উচিত। পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা, সাবান দিয়ে হাত ধোয়া যেমন নিত্যদিনের আমাদের কাজ হবে ঠিক তেমনি সাধারণ জ্বর সর্দিতে সর্তকর্তা অবলম্বন করতে হবে। মাস্কের পেছনে যারা দৌড়াচ্ছেন, তারা হয়তো জানেন না, সাধারণ সার্জিক্যাল মাস্ক কভিড-১৯ তেমন একটা প্রতিরোধ হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি। বিশেষায়িত মাস্ক যেটা পারে ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে পারে সেগুলো আমাদের দেশে অপ্রতুল ।

যদিও এই বাংলাদেশে কভিডে-১৯ প্রাদুভার্ব ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা তেমন একটা আমি দেখছি না, তবে ভবিষ্যতে এই ধরনের পরিস্থিতে যে কোনও জাতি পড়বে না তা বলা কঠিন। সময় থাকতে আমাদের এগিয়ে নিতে হবে। চিকিৎসা ব্যবস্থার আধুনিকায়নের পাশাপাশি এই নিয়ে গবেষণার উৎকর্ষতা বাড়ানো সরকারের আর একটি বড় ভূমিকা হতে পারে। তাই কভিড-১৯ নিয়ে আতংক না ছড়িয়ে এটাকে স্বাভাবিক একটি রোগ বিবেচনায় আমাদের লড়তে হবে। গুজবের দৌড়ে কভিড-কে মরণব্যাধী না বানিয়ে ফেলি- সেটাই কামনা।  আশা করি, সবার ঐকান্তিক সহযোগিতায় বাংলাদেশ কভিড-১৯ কে প্রতিরোধ করবে।

নাদিম মাহমুদ : জাপানের ওসাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যায়নরত