হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)- এর নবীত্ব ও শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ

ইয়াকুব সিদ্দিকী (টরোন্টো)

সত্য ও ন্যায়ের প্রতীক হযরত মুহম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর কথা মনে পড়লেই এমন এক মহা মানবের ছবি আমাদের মানস পটে ধরা পড়ে, যা চির উজ্জ্বল, চির ভাস্বর, সূর্যের মত দীপ্তিমান, নক্ষত্রের মত চিরস্থায়ী অমর অক্ষয়। তিনি শত মহিমায় মহিমান্বিত, শত ণ্ডণে ণ্ডণান্বিত একজন সুদর্শণ মহা মানব। তাঁর চির দীপ্তিমান জীবনী আলোচনা করলে এটাই প্রতিভাত হয় যে, তিনি ছিলেন মানবকুলের এক মহা আদর্শ। একাধারে ছিলেন পথের কাঙ্গাল, অন্যদিকে মহা প্রতাপশালী বিত্তবান। যদিও তাঁর ধন-সম্পদ বলতে কিছুই ছিলো না, তথাপি তিনি কোনদিন সম্পদের অভাব অনুভব করেননি। পরম করুণাময় আল্লাহর কাছে চাইলে তিনি যথেষ্ঠ পেতেন, কিন্তু ঘূর্ণাক্ষরেও কোনদিন তা চাননি- দুহাত তুলে তার জন্য প্রার্থনাও করেননি। চরম দারিদ্রতাই উত্তম ভূষণ হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন তিনি। তাই তা ত্যাগ করতে কোনদিনই রাজী ছিলেন না। কতজন কতরূপে কত টাকা দিয়ে তাঁকে প্রলুব্ধ করতে চেয়েছে, কিন্তু তাতে তিনি কস্মিন কালেও ভোলেননি, তিনি তাতে পদাঘাত করেছেন। বিত্তশালিনী খাদীজা (রাঃ) কে বিয়ে করার পর তাঁর সমস্ত সম্পত্তির মালিক হন তিনি। কিন্তু তিনি তা ভোগ করেননি- গরীব-দুঃখীদের মাঝে বিলিয়ে দিয়েছেন। কারণ পার্থিব বস্তুর লোভ-লালসা যার মধ্যে আছে, তার মধ্যে আল্লাহ-প্রেম থাকতে পারে না।
আমি এখানে মহানবী হযরত মহম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রসঙ্গে দুটো প্রশ্নের উত্তর দেয়ার চেষ্টা করবো। প্রশ্ন দুটো হলো_প্রথমতঃ তিনি সত্যি সত্যি নবী বা রাসুল ছিলেন কিনা এবং যদি তিনি নবীই প্রমাণিত হন, তবে তাঁকে আর আর নবীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ আসন দেয়া যায় কিনা। আচ্ছা, প্রথমে আমরা মনে করি, তিনি নবী ছিলেন না। তাহলে প্রশ্ন উঠে-
প্রশ্নঃ তবে মহাগ্রন্থ কুরআন এলো কোত্থেকে?
উত্তরঃ তিনি কল্পনা করে লিখেছেন।
প্রশ্নঃ তিনি কি হেরাণ্ডহায় ধ্যান করার পূর্বে কোনদিন কুরআনের মত এমন কোন বাক্য মুখ থেকে বের করেছেন?
উত্তরঃ না, কোনদিনই নয়।
প্রশ্নঃ তবে এমন বাক্য তিনি কখন থেকে বলতে শুরু করেছেন?
উত্তরঃ হেরাণ্ডহায় ধ্যান করার পর থেকে।
উপরোক্ত প্রশ্ন ও উত্তর থেকে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, কুরআন মহানবী হযরত মহম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর কাল্পনিক সৃষ্টি কোনদিনই নয়। প্রথমতঃ তিনি ছিলেন নিরেট নিরক্ষর-চরম অশিক্ষিত-লেখাপড়া মোটেই তিনি জানতেন না। বিদ্যা শিক্ষা অর্জন করার সৌভাগ্য তাঁর জীবনে ঘটেনি। তৎকালীন আরবের তাঁর ঘোর দুষমণও দাবী করেনি যে, তিনি তার কাছে পড়াশোনা শিখেছেন। এটা সর্বজন বিদিত যে, তিনি যখন তাঁর মাতৃগর্ভে তখন তাঁর পিতা আব্দুল্লাহ ইহলোক ত্যাগ করেন। আবার অতি শৈশবেই স্নেহময়ী মা আমিনা তাঁকে অকূল পাথারে ফেলে পরলোক গমন করেন। তখন তাঁর প্রতিপালনের দায়িত্ব পড়ে দাদা আব্দুল মুত্তালিবের উপর। কিন্তু ভাগ্যের এমনি পরিহাস, তিনিও তাঁকে ফেলে চিরযাত্রা করলেন। এবারে চাচা আবু তালিব তাঁকে লালন পালনের ভার গ্রহণ করলেন। পিতৃব্য আবু তালিব ছিলেন তৎকালীন ব্যবসায়ীদের মধ্যে মশহুর। তিনি বালক মহম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে তেজারতি বিদ্যাই শিক্ষা দেন। ব্যবসা উদ্দেশ্যে তিনি মক্কার কোরাইশদের ভয়ে ভাতিজা মহম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)কে বিদেশে সাথে করে নিয়ে যেতেন। তাই বিদ্যাশিক্ষা লাভের সুযোগ তাঁর ভাগ্যে ঘটেনি। এখন অনুধাবনযোগ্য যে, এমন সুন্দর তত্ব ও তথ্য বহুল বাক্য এমন অশিক্ষিত লোকের মুখ থেকে কোনদিন কোন কালেও বের হতে পারে না। তাই হেরাণ্ডহায় যখন হযরত জিব্রাইল (আঃ) প্রথম আল্লাহর কালাম পড়তে বলেন –
পড় তোমার প্রভুর নামে যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন।(সূরাহ আলাক, আয়াত ১)
তিনি বলেছেন, আমি পড়তে জানি না।
দ্বিতীয়তঃ জীবনেও তিনি কোনদিন মিথ্যে কথা বলেননি বা তাঁর পবিত্র মুখ থেকে এমন কথা নির্গত হয়নি। তাই তৎকালীন মিথ্যেবাদীরাও তাদের চরম দুষমণকেও আল-আমীন উপাধীতে ভূষিত করেছিলো। তাছাড়া তাঁর পূর্ব পুরুষেরা কোনদিন নবুওয়াত প্রাপ্তি বা বড় হওয়ার দাবী করেনি। তাই নবুওয়াত প্রাপ্তির কথা প্রচার করে, কুরআনের বাক্য নিজের কল্পনা দ্বারা সৃষ্টি করে বিশ্ব মানবকে প্রতারিত করতে তিনি কখন প্রয়াস পাননি এবং তাঁর তেমন স্বভাবও ছিলো না।
তৃতীয়তঃ যদি তাঁর সৃষ্টি করার ক্ষমতাই থাকতো, তবে ছোটবেলা থেকেই একটু একটু করে প্রকাশ পেতো। প্রতিভা কোনদিন চাপা থাকে না, তাই এমন হঠাৎ করে প্রকাশিত হতো না। শৈশব থেকেই তাঁকে মৌন ও স্বল্পভাষী দেখা যায়। তিনি কারো সাথে তেমন একটা মিশতেন না এবং এমন সুন্দর সুললিত ভাষায় এমন তত্ব ও তথ্যপূর্ণ কথা কেউ কোনদিন তাঁর মুখ থেকে শোনেনি।
চতুর্থতঃ মানুষ যখন তাঁর প্রচারিত আয়াত বা বাক্য তাঁর কাল্পনিক তৈরী বলে উড়িয়ে দিতে প্রয়াস পেলো, তখনও তিনি এতোটুকু ভীত হননি। তিনি আল্লাহর কথাই জোর দিয়ে বলেছিলেন, “কেউ যদি পারো এর সমকক্ষ একটি ক্ষুদ্রতম বাক্য তৈরী করে আনো।“ আরবে তখন আইয়ামে জাহিলিয়াত বা চরম কুসংস্কারের যুগ। তথাপি কবি-লেখক ও সুধী-মনীষীর অভাব সেখানে ছিলো না। তারা একবাক্যে স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছিলো যে, এমন সুন্দর বাক্য কোন মানুষের সৃষ্টি হতে পারে না। তারা বলতে বাধ্য হয়েছিলো হাযা কালামাল বাসার। হযরত আলী (রাঃ) এর মত বিদ্বান, জ্ঞানী ও কবি তৎকালে দ্বিতীয় কেউ ছিলো না। তিনিও এর সঠিক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি। তাই তিনিও স্বীকার করেছিলেন এটা মহম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর
কাল্পনিক সৃষ্টি নয়-স্বয়ং আল্লাহর বাণী। আর সেই জন্যই তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। হযরত ওমরের (রাঃ) মত বীর কুরআনের বাক্য শুনে অভিভূত হয়ে ইসলাম কবুল করে নিজেকে ধন্য মনে করেছিলেন।

এখন উপরোক্ত আলোচনা থেকে স্বতঃই প্রমাণিত হয় যে, সত্যি তিনি আল্লাহর প্রেরিত মহাপুরুষ ছিলেন এবং আল্লাহই তাঁকে এমন তত্ব ও তথ্যপূর্ণ কথা দান করেছিলেন। মহান আল্লাহ তায়ালা তাঁর নবীত্বের কথা বার বার কুরআন মজিদে উল্লেখ করেছেন।
(সূরা বাকারা আয়াত ১১৯)
(সূরা আস সাবা আয়াত ২৮)
আসুন, এখন দেখা যাক, নবী হিসেবে তাঁকে শ্রেষ্ঠ আসন দেয়া যায় কিনা। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেছেন, “যদি আমি মহম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)কে পয়দা না করতাম, তবে বিশ্বজাহান, জ্বিন-ইনসান কিছুই সৃষ্টি করতাম না।“
মহম্মদকা খোদা পয়দা না করদে
আসমানো জমিনো পয়দা না করদে
এতে স্পষ্ট বোঝা যায় একমাত্র মহম্মদ মোস্তফা আহমদ মোস্তফা (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর অছিলায় এ বিশ্ব সংসারের অবতারণা এবং সকল পার্থিব বস্তুর সৃষ্টির আগে মহম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর রূহকে সৃষ্টি করে আল্লাহর আরশে নির্ধারিত জায়গায় রেখেছিলেন এবং এক লাখ চব্বিশ হাজার দ্বিমতে দুলাখ চব্বিশ হাজার নবী ণ্ডজরে যাওয়ার পর তাঁকে শেষ ও শ্রেষ্ঠ নবী করে পাঠালেন অন্ধকারাচ্ছন্ন ধরণীর বুকে। এজন্যই তাঁকে খাৎমুন নাবেঈন বলা হয়।
অন্যান্য নবীদের জীবনেতিহাস আলোচনা করলে দেখা যায়, তাঁদের সবারই কিছু না কিছু অলৌকিক ক্ষমতা ছিলো। যেমন, হযরত মুসা (আঃ) এর লাঠি, হযরত ঈসা (আঃ) এর মৃত মানুষের জীবন দান, হযরত ইউনুস (আঃ) এর মাছের পেটে বসবাস, হযরত নূহ (আঃ) এর নৌকা, হযরত ইব্রাহিম (আঃ) এর আণ্ডন জয় ইত্যাদি। কিন্তু মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর জীবনে অনেক অলৌকিক ঘটনা ঘটেছে। যেমন, সিনাচাক, মেরাজ, জাবেরের পুত্রদ্বয়ের জীবন দান ইত্যাদি। তবে আমাদের প্রিয় নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পূর্ববর্তী নবী (আঃ)দের মত এণ্ডলো চেয়ে নেননি, আল্লাহ পাকই ইচ্ছে করে তাঁকে উপহার দিয়েছিলেন। তিনি কোন অলৌকিক ক্ষমতার দোহাই দিয়ে ধর্ম প্রচার করেননি বা মানুষকে মুগ্ধ করতে চাননি। তিনি এমন সব কাজ করতেন যা একজন সাধারণ মানুষের পক্ষে কোন ক্রমেই কঠিন নয়। মানুষ যা করতে পারে এবং তার দ্বারা সম্ভব তাই তিনি আজীবন করে গিয়েছেন। আল্লাহর আদেশ নিষেধ নিজের জীবনে বাস্তবায়িত করে মানব জাতির কাছে এক মহান আদর্শ রেখে গেছেন, আর বিশ্ব মানুষকে সেই সব কাজে উদ্বুদ্ধ করে গেছেন। অন্যদিকে পূর্ববর্তী নবী-রাসুলরা আল্লাহর অলৌকিকত্বের দোহাই দিয়ে মানুষকে আল্লাহর পথে চলতে আহবান করেছেন।
এই প্রসঙ্গে একটি কথা বলে রাখা বিশেষ প্রয়োজন। অন্য নবীদেক হেয় প্রতিপন্ন করা আমার উদ্দেশ্য নয়। কারণ আমি সকল নবীকেই বিশ্বাস এবং শ্রদ্ধা করি। এটা ঈমানের অঙ্গ। আমি শুধু এটাই বলতে চাই মহম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) শ্রেষ্ঠ নবী কিনা।
পূর্ববর্তী নবীদের জীবনী আলোচনা করলে দেখতে পাবেন, তাঁরা আল্লাহর নির্দেশিত পথে চলতে মানবকুলকে শুধু আহবানই করেছেন। যারা তাঁদের কথা শুনে পালন করেছে, তাঁদেক বিশ্বাস করেছে, তারা সৃষ্টিকর্তার অনুগ্রহ লাভে সক্ষম হয়েছে। আর যারা বিশ্বাস করেনি, বরং আরও অত্যাচার উৎপীড়ন করেছে, তাদের শায়েস্তার জন্য তাঁরা আল্লাহর কাছে গজব প্রার্থনা করেছেন এবং এইভাবে যুগে যুগে আল্লাহ তায়ালা গজব দিয়ে বেঈমানকে ধ্বংস করে পৃথিবীকে পাপমুক্ত করেছেন। নবীরা কোন সময়ই নিজেদের ঘাড়ে দোষ নিতেন না। আল্লাহর আদেশ প্রচার করেই ক্ষান্ত হতেন। এখন চিন্তা করুন আমাদের বিশ্বনবী মহম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর কথা। ভেবে দেখুন, কোরাইশদের দৈনন্দিন অন্যায় অত্যাচার বিষধর সর্পের মত তাকে দংশনের নিত্য নৈমিত্তিক ঘটনা। তায়েফের যুদ্ধের কথা একটিবার স্মরণ করুন।
ইসলামের দুষমনরা তাঁর দাঁত মোবারক ভেঙ্গে দিয়েছিলো। সেদিন তিনি শোণিত স্নান করেছিলেন, অজ্ঞান হয়ে ভূতলশায়ী হয়েছিলেন। তিনি কি সেদিন আল্লাহর কাছে গজব চাইতে পেরেছিলেন? না, কখনই নয়। বরং নিজের অক্ষমতা প্রকাশ করে আল্লাহর কাছে অবুঝ মানুষের মঙ্গল কামনাই তিনি করেছেন। বলেছেন, “হে পরোয়ারদেগার, ওরা যে আমাকে অপমান অপদস্থ করেছে এটা ওরা বুঝতে না পেরেই করেছে। ওরা যে তোমার পথে ফিরছে না, সেটা ওদের অপরাধ নয় ু এটা আমারই অক্ষমতা। আমি ওদেরকে ঠিকমত বুঝাতে পারিনি, তাই ওরা আমার কথা শুনছে না। হে আল্লাহ, তুমি তোমার বান্দাকে হেদায়েত দান করো।“ কেমন ধৈর্য! নিজের শরীরকে তিলে তিলে আঘাত করে ক্ষয় করে দিচ্ছে, নানা অবরোধ সৃষ্টি করে তাঁকে বিপদের পর বিপদে ফেলছে, আর তাদের মঙ্গলের জন্য তিনি কিভাবে আল্লাহর কাছে দিবস-যামী তাদের কল্যান কামনা করছেন। একটি দিনের জন্যেও তিনি বিরক্ত হননি এবং কোন কটু কথাও কাউকে কোনদিন বলেননি, এমন কি চরম দুষমণকেও নয়। আল্লাহর গজবের কথা চিন্তা করে তিনি বিহ্বল হয়ে পড়তেন এবং তাঁর হাত থেকে বিশ্বমানবের জন্য সব সময় আল্লাহকে অনুরোধ করতেন ু জানাতেন কত না কাকুতি মিনতি! তাইতো তিনি রাহমাতুল্লিল আলামীন।
মহান আল্লাহ বলেছেন —

আমি আপনাকে সারা বিশ্বজাহানের রহমত হিসেবেই প্রেরণ করেছি। (সূরাহ আম্বিয়া আয়াত ১০৭)

বড় দুর্ভাগ্যের বিষয় সেই মানুষ তাঁকে বুঝতে পারেনি। এই কল্যানকামী মহাপুরুষকে আঘাতের তীব্র দহনে অতিষ্ঠ করে তুলেছে। কিন্তু ধৈর্যহারা কোন সময়ের জন্যও হননি তিনি। তিনি কি তাদের শাস্তি প্রার্থনা করতে পারতেন না? আল্লাহ রাব্বুল আলামীন কি তাঁর প্রতি এতো অত্যাচার দেখেননি? হ্যাঁ, নিশ্চয়ই পারতেন আর আল্লাহর চোখও বন্ধ ছিলো না। তাঁরই প্রিয়তম হাবীবকে তাঁরই সৃষ্ট মানুষ অত্যাচার করছে, তিনি কি তা সহ্য করতে পারেন? কখনই না। আল্লাহ পাক বার বার মহম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে তাদের সমুচিত শাস্তির কথা বলেছেন এবং তাঁর অনুমতি চেয়েছেন। কিন্তু মহম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কোন সময়ই স্বীকার করেননি।

(লাকাদ কানা লাকুম ফি রাসুলুল্লাহি উসওয়াতুন হাসানাহ) সূরাহ আহজাব আয়াত ২১

অর্থাৎ নিশ্চয় আল্লাহর রাসুলের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জীবনের মধ্যেই তোমাদের জন্য উত্তম আদর্শ রয়েছে।

এক আল্লাহর অস্তিত্বে বিশ্বাস ও তাঁর ণ্ডণগান কীর্তন করার কথাই ছিলো পূর্বতন নবীদের মুখে। মানুষের সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক বিষয়ে তাঁরা কোন কথা বলেননি বা এণ্ডলো তাঁদের আলোচনার বাইরে ছিলো। কিন্তু আমাদের মহানবী হযরত মহম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর কথা স্মরণ করুন। মানব জাতির সর্বযুগের, সর্বকালের, সর্ববিষয়ের এমন কোন সমস্যা নেই যা তাঁর নজরে পড়েনি বা তাঁর আদেশ, উপদেশ বা নিষেধ নেই। তিনি সকল স্তরের সকল মানুষের সর্বযুগের সুষ্ঠূ জীবন ব্যবস্থা রেখে গেছেন। সর্বযুগে সমভাবে তাঁর মতবাদ প্রযোজ্য। আরবের মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) শুধু ইসলাম প্রচারই করেছেন। কিন্তু তার মধ্যে রয়েছে পরিপূর্ণ জীবন ব্যবস্থা। সত্যি বলতে কি মানব জীবনের কোন একটা দিকও এতে বাদ পড়েনি। হযরত মহম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ভাল রাজনীতি জানতেন। তৎকালে সারা মুসলিম জাহানের সর্বময় কর্তা ছিলেন তিনি। একচ্ছত্র অধিপতি তিনি হলেও মানুষ কোনদিন কোন অসুবিধায় পড়েনি, বরং অতীব স্বচ্ছন্দে জীবন যাপন করতে পেরেছে। আধুনিক যুগের সমস্যাবলী দেখে ইংরেজ কবি বার্নার্ড শ দুঃখ করে বলেছিলেন, “যদি এই সময় আরবের মহম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এক নায়ক হয়ে সারা পৃথিবী শাসন করতেন তবে বিশ্বে কোন সমস্যা থাকতো না।“
যুদ্ধ বিদ্যায়ও তিনি ছিলেন বিশেষ পারদর্শী। হযরত আলীর (রাঃ) মত রণ-কৌশলী, হযরত ওমরের (রাঃ) মত মহাবীর থাকা সত্বেও মহম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অধিকাংশ যুদ্ধে সৈন্য পরিচালনা ও পরামর্শ দান করেছেন এবং অভূতপূর্ব রণ-কৌশলের পরিচয় দিয়েছেন। কিন্তু অন্য নবীদের জীবনেতিহাসে এমন কোন যুদ্ধ দেখা যায় না। সুষ্ঠূ জীবন যাপনের জন্যও তিনি মানুষকে আদেশ করেছেন। সব মানুষ ভাই ভাই। একের বিপদে অন্যে সাহায্য করবে এটাও ধর্মেরই একটা বিশিষ্ট অঙ্গ। তাঁরই অছিলায় মানব জাতি জাতি-ধর্ম-নির্বিশেষে সমাজকে এতো উন্নত করতে পেরেছে।
অর্থনৈতিক ব্যাপারেও তিনি মানুষকে হিসেবি হতে পরামর্শ দিয়েছেন। অমিতব্যয়ী হওয়া কখনই উচিত নয়। অনেকে বলে থাকেন, ইসলাম ধর্মে টাকা পয়সা সঞ্চয় করা নিষেধ। তা মোটেই ঠিক নয়। মোট কথা, সৎ পথে উপার্জন করে সৎ পথে ব্যয় করে উদ্বৃত্ত অংশের জাকাত দিলেই হালাল হবে। সমস্ত টাকা অবিমৃশ্যকারীর মত ব্যয় করে বা দান করে নিজেকে পরের উপর নির্ভরশীল করে তোলা, ইসলাম ধর্ম মতে অবৈধ কাজ। তাঁর জীবিত অবস্থায় সাহিত্যেরও চরম উৎকর্ষ সাধিত হয়েছিলো। সত্যি বলতে কি তাঁর আগমনে অন্ধকারাচ্ছন্ন আরবের বুকে যেনো এক যুগান্তরের সৃষ্টি হয়েছিলো ু আর মরা বৃক্ষ পেয়েছিলো ফুল ও ফল।

আমাদের মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ছিলেন বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী। তিনি আজ পনের শ’ বছর আগে যে সূত্রের সন্ধান দিয়ে গেছেন, সেই সূত্র ধরেই আজকের বিজ্ঞানীরা বিজ্ঞানের এতো উন্নতি করতে পেরেছেন। পনের শ’ বছর আগে তিনি যে সব বস্তু হারাম করে গেছেন আজকের বিজ্ঞানীগণ পরীক্ষা করে দেখেছেন হারাম বস্তুণ্ডলোর মধ্যে এমন সব অণু পরমাণু রয়েছে যা মানব দেহের পক্ষে নিতান্তই ক্ষতিকর। তিনি ছিলেন হক ইনসাফী। বিচারক হিসেবে তাঁর যথেষ্ঠ সুনাম ছিলো। সমগ্র মুসলিম জাহানের বিচারতো তিনি করতেনই এমন কি বিধর্মীরাও তাদের বিচারে মহম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে ডাকতো এবং তাঁর উপরই ন্যাস্ত করে নিশ্চিত হতো। ন্যায় বিচারে তিনি ঘনিষ্ট আপন জনকেও রেহাই দিতেন না। তিনি একাধারে ছিলেন আল্লাহ ভক্ত ও গরীবের প্রতি কুসুমের ন্যায় কোমল ও অন্য দিকে মিথ্যাবাদী ও প্রবঞ্চকের প্রতি ছিলেন সচেতন।

সুতরাং বিভিন্ন দিক দিয়ে আলোচনা করলে দেখা যায় বিশ্বের সর্ব বিষয়ে তাঁর ছিলো অগাধ জ্ঞান। আমি মনে করি তাঁর শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ দিতে আর অধিক আলোচনার প্রয়োজন পড়ে না। তাঁর জীবনের সর্বদিক আলোচনা করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। তাছাড়া প্রবন্ধের কলেবর বৃদ্ধি করে পাঠকের বিরক্তি উৎপাদন করতে চাইনে। এখন এর বিচারের ভার রইল পাঠকের উপর। যদি বিচারে আমার যুক্তি না টিকে তবে নিছক গল্প বলেই ধরে নিবেন।

পারগোপালপুর

আগস্ট ১৫, ১৯৬৬